মুমিনের হতাশ হওয়ার কিছু নেই


২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৫০

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ আদম আ. থেকে শুরু করে মুহাম্মদ সা. পর্যন্ত যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়ে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের চলার পথ বলে দিয়েছেন। আল্লাহকে ও তাঁর রাসূলদের মেনে দুনিয়ায় চললেই দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে সীমাহীন জান্নাত পাওয়া যাবে। কোনো নবীর সময়েও সব জনগোষ্ঠী নবীর কথা শোনেনি। ফলে অবস্থাভেদে দুনিয়াতেই অনেক জাতির সাজা হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে। আবার রাতের অন্ধকারেও অনেক গোষ্ঠীর সাজা হয়েছে। কেউবা পানিতে ডুবে মরেছে, কেউবা ঝড়ে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়েছে। বাদশাহ আবরাহা আল্লাহর ঘর ভাঙতে এসে সামান্য চড়ুই পাখির মতো আবাবিলের আক্রমণে তাদের সেনাবাহিনী ধূলিসাৎ হয়েছে।
এই কয়েক বছর পূর্বে আফগানিস্তানে আমেরিকার বাহিনী পরাস্ত হয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়েছে। তারও কিছুদিন পূর্বে প্রতাপশালী ইরানের পাহলভী রাজা পালাতে বাধ্য হয়েছে। পালাতে বাধ্য হয়েছে শ্রীলঙ্কার শাসকদেরও, আর সিরিয়ায় পালিয়েছে স্বৈরাচার সরকার ১২ দিনের আন্দোলনে। আমাদের বাংলাদেশেও ৩৬ দিনের আন্দোলনে লেডি হিটলার হাসিনা পালিয়েছে তার দোসরদের নিয়ে। স্থানীয় মেম্বার থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী, বিচারপতি, উকিল, মোক্তার; এমনকি মসজিদের ইমাম পর্যন্তও।
মহান আল্লাহ পাক আমাদের এ বাংলাদেশি জাতিকে ৫৪ বছর ধৈর্যের পরিচয় দিয়েই এই ২৪-এর জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়েছেন। কোনো দেশীয় বা বিদেশের গোয়েন্দা সংস্থা স্বৈরাচারী হাসিনাকে বাঁচাতে পারেনি।
স্বৈরাচার হাসিনার আমলের আগে ও তার সময়ে শহীদ হয়েছেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শহীদ আবদুল মালেকের রক্ত ঝরেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসির রুমে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে অপদস্থ হতে হয়েছে। আবার সেই রুমে আমাদের ইমামতিতে নামায আদায়ের সুযোগ দিয়েছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। আবার কয়েকদিন পূর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হয়ে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল। এটা বর্তমান যুগে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা, আলহামদুলিল্লাহ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অপপ্রচার আছে, ইসলামী ছাত্রশিবির নাকি গুপ্ত সংগঠন ছিল। আমরা ডাকসুতে তাহের-কাদের পরিষদে ১৯৭৯ সালে এবং কাদের-এনাম পরিষদে ১৯৮১ সালে শিবিরের প্যানেলে প্রতিযোগিতা করেছি। মধুর ক্যান্টিনে কত মিটিং করেছি, মিছিল করেছি। তাই শিবির কোনো গুপ্ত সংগঠন নয়। হাসিনার স্বৈরশাসনের কারণে গা বাঁচিয়ে চলতে হয়েছে। তাই তো ৪০% মেয়ে ভোট থাকলেও শিবিরের প্যানেল নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে। কারণ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কাছে মেয়েরা নিরাপদ। এ বিজয়ে আরো একটি অপপ্রচার বিলোপ হয়েছে যে, ইসলাম বা জামায়াত-শিবির ক্ষমতায় গেলে মেয়েদের ঘরে ঢুকিয়ে দেবে। সবাইকে বাধ্যতামূলক বোরকা পরতে হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রমাণ হয়েছে ইসলাম সবার। সবাইকে শালীনতার মধ্যে থাকতে হবে।
আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সবার মতপ্রকাশের যেমন স্বাধীনতা থাকবে, আবার পোশাক কী পরবে, তা তাদের বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করবে। তবে যার যার পোশাক অবশ্যই শালীন হতে হবে।
ডাকসু নির্বাচনে বেদনা আমাদের বন্ধুরা ভুলতে পারছে না। হারজিত থাকবেই। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তারপর বিএনপির কিছু বন্ধু পাগলপারা হয়ে গেছে। তারা বলছে, ডাকসু নির্বাচন নাকি সুষ্ঠু হয়নি। কোথায় নাকি ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে। মানুষ বা ছাত্র-ছাত্রীরা কিন্তু বোকা নেই। ছাত্র-ছাত্রীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছে। যথাযথ ভোট কেন্দ্রগুলো নিরাপত্তাবলয়ে ছিল। সব দলের প্রতিনিধির উপস্থিতিতেই ডাকসুর ভোট গণনা হয়েছে। যথাযথভাবে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো প্রতিবাদের বালাই ছিল না।
এদিকে অভিযোগকারীদের অভিযোগ আমলে নিয়ে তা যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সাংবাদিকদের সামনে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং অভিযোগগুলোর কোনো যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি।
দেশে আমরা সুখী-সুন্দর পরিবেশ ফেরাতে চাই। তাই আযথা কোনো অভিযোগ এনে জনগণকে বিভ্রান্ত করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। সাংবাদিক ভাইদেরও সত্য প্রকাশের দৃঢ় মনোবল থাকতে হবে। একটি পত্রিকায় দেখলাম বড় হেডিং দিয়ে ‘ডাকসুর ফল বাতিল’-এর আশঙ্কার কথা। এই পত্রিকার মূল মালিক মাওলানা আবদুল মান্নান সাহেবের সাথে আমার পরিচয় ছিল। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো এরকম হেডিং হতো না। আমি বর্তমান সম্পাদকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দেশ আমাদের ১৮ কোটি মানুষের।
এদেশ আমাদেরই চালাতে হবে জনগণের মতামত নিয়ে। মতামতের বড় কাঠামো হলো স্থানীয় প্রশাসন। গ্রামে মেম্বার, চেয়ারম্যান, কমিশনার, মেয়র। তাদের অনুপস্থিতিতে সাধারণ জনগণ চরম অসুবিধায় আছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পালানোর কারণে স্থানীয় প্রশাসনের লোকেরাও পালিয়েছে। তাই অতিসত্বর স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচন হওয়া দরকার। এমপিরা তো দেশের আইন প্রণয়ন করবে, তাই তাদের ভোট পরে হলেও সাধারণ জনগণের খুব একটা অসুবিধা হবে না। তারপরও আগামী রোজার আগে দুই ভোটই হতে কোনো বাধা নেই। নির্বাচন কমিশনকে বলব, অতিসত্বর স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ধাপে ধাপে এক মাসের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচন দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। স্থানীয়ভাবে সৎ, যোগ্য, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত লোক যদি স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত হয়ে আসে, তবে দেশের অবস্থা ভালো হতে বাধ্য। আমাদের দেশে গ্রাম থেকে শুরু করে মেয়র পর্যন্ত ভালো লোকের অভাব নেই। স্থানীয় নির্বাচনে লোক বাছাই করা স্থানীয় লোকদের জন্য সহজ।
আমরা যারা দেশের নেতৃত্ব দেব, তাদের লক্ষ্যই থাকতে হবে জনগণের উন্নয়ন। দেওয়ার হাত প্রসারিত করতে হবে, নেয়ার হাত সংকুচিত করতে হবে। আমীরে জামায়াত ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে বলেছেন, আমাদের নির্বাচিত এমপিরা সরকারের দেয়া বৈধ সুযোগ-সুবিধাও নেয়ার ব্যাপারে হিসাব করে নেবে। কোনোভাবেই সরকারের টাকা ব্যক্তিগত কাজে লাগাবে না। জনগণের স্বার্থই মূল লক্ষ্য করে তারা কাজ করবে। যেমন ডাকসুতে নির্বাচিত হয়ে শিবিরের প্যানেলের সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার আমূল পরিবর্তন করে ফেলেছে। ফাও খাওয়া বন্ধ হয়েছে। অবৈধভাবে হলে থাকা বন্ধ হয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ছেলেমেয়েরা স্বাচ্ছন্দ্যে ক্লাস করতে পারছে। শীতাতপ লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করছে। স্বল্পমূলে ক্যান্টিনে খাবার পাচ্ছে। সুলভমূল্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আমরা ডাকসুর এ ভালো কাজের জন্য দোয়া করছি। ১ মাস যেতে না যেতেই ডাকসুর নির্বাচিত সদস্যরা যে ভূমিকা রাখছে, তা জাতীয় জীবনেও প্রভাব ফেলবে। বিরোধীদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আপনারাও প্রস্তুতি নেন ভবিষ্যতের জন্য।
এবার জাতিসংঘে কী ঘটলো। তিন দলের ৬ জনকে প্রধান উপদেষ্টা সাথে নিয়ে গেছেন, যা অতীতে হয়নি। যে যাই মন্তব্যই করুক না, এ সিদ্ধান্ত দেশের জন্য খুবই দৃষ্টান্তমূলক হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাহায্য করবে। দেশ আমাদের সবার। তাই সব দল, ধর্ম ও মতের লোক নিয়েই দেশ চালাতে হবে। সবার মতের গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।
শিবির-জামায়াতের তৈরি লোকজন শুধু দেশে নয়, গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে। আমার আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, প্রাচ্যের অনেক দেশ সফর করার সুযোগ হয়েছে। সব জায়গায়ই জামায়াত-শিবিরের লোকদের সাথে সাক্ষাতের সময় তাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন উপলব্ধি করেছি। ডা. তাহের সাহেব ব্যক্তি নয়, তিনি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর। তাকে আমেরিকার জামায়াত ও প্রবাসী লোকেরা সংবর্ধনা দিয়েছে। এটা আমাদের সংগঠনের কাজের অংশ। তাই বিএনপিসহ অন্যান্য দলেরও সৎ-যোগ্য লোক তৈরির প্রোগ্রাম নিতে হবে। হঠাৎ করে আপনারা ভালো লোক পাবেন না। জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন যাবত সৎ, যোগ্য, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত লোক তৈরি করে আসছে। তার ফল এখন পাওয়া শুরু করেছে।
জামায়াত-শিবিরের উত্থানে দেশে ও বিদেশিদের ভয়ের কারণ নেই। আমরা কোনো দেশের মডেল এখানে কার্যকরী করব না। আমাদের টার্গেট মুহাম্মাদ রাসূল সা.-এর আদর্শে দেশ চালানো এই সময়ের প্রেক্ষাপটে। ইসলাম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার জন্য আসেনি। আদম আ. থেকে শুরু করে আজকের যুগের উপযোগী করেই কুরআন-হাদিসের আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নবী মুহাম্মদ সা.-এর সময় উড়োজাহাজ ছিল না। তাই বলে কি আমরা উড়োজাহাজে চড়ব না। উড়োজাহাজে নামাজের সময় হলে কি আমরা নামাজ পড়বো না। আমি তো নিজে উড়োজাহাজে ভ্রমণ করার সময় নামাজিদের নিয়ে জামায়াতের সাথে নামাজ পড়েছি। কুরআন-হাদিসের আলোকে নামাজ কীভাবে পড়তে হবে, তা বলে দেয়া আছে।
তাই আসুন, দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা এদেশ গড়তে চাই মানুষের সার্বিক উন্নতি-অগ্রগতির জন্য। দেশকে পেছনে নয়, গোটা দুনিয়ার আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করেই জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চাই। মহান আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। তাই নামাজ ও ধৈর্যের সাথে আল্লাহর রহমত চাইলে তিনি বান্দার চাওয়া পূরণ করে দেবেন। আমার অভিজ্ঞতায় বলে, বাংলাদেশকে মহান আল্লাহ তার অনুগ্রহের মধ্যে রেখেছেন। তাই আমাদের এই ৯২% শতাংশ মুসলমানের দেশে আমরা যদি জনগণের সাথে কাজ করি তবে তিনি আমাদের অবশ্যই সাহায্য করবেন, দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করেই। মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।