জঙ্গিবাদের পথেই আওয়ামী লীগ


২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৩৯

প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ জনগণ

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশ অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা পাহাড়ে অস্থিতিশীলতায় ফ্যাসিস্টরা জড়িত বলে জানিয়েছেন। দেশবিরোধী নানা ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতে বিরামহীন প্রচেষ্টায় রয়েছেন পলাতক নেতারা। সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোয় আওয়ামী আমলারা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। খুন-গুমে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকে ঘরে বসে সামাজিকমাধ্যমে ছড়াচ্ছেন গুজব, হুমকি দিচ্ছেন অভ্যুত্থানের নায়কদের। দেশ-বিদেশে সৃষ্টি করা হচ্ছে বিশৃঙ্খলা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিদিনই মিছিল করছে আওয়ামী লীগ। এসবে বাড়ছে কর্মীর সংখ্যাও। মিছিল ও দলীয় কর্মে সক্রিয় হতে পলাতক এমপি-মন্ত্রীরা জুম মিটিং চালিয়ে যাচ্ছেন। আর বিদেশে বসে বিশৃঙ্খলা উসকে দিতে প্রতিদিনই নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন স্বৈরাচার হাসিনা।
প্রশাসনে আওয়ামী আমলারা এখনো বহাল তবিয়তে
সচিবালয়সহ অনেক সরকারি দপ্তর ও সংস্থায় এখনো রাজত্ব করছেন পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আস্থাভাজন সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শীর্ষ পদগুলোয় পরিবর্তন হয়েছে সামান্যই। সরাসরি দলীয় স্টেজে ওপর বক্তৃতা করা আমলারাও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অনুসারী আমলারা ‘জনতার মঞ্চ’ নাম দিয়ে আন্দোলন করেন এবং একপর্যায়ে সচিবালয়ে ‘আমলা বিদ্রোহ’ হয়। এখনো এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পতিত সরকারের সুবিধাভোগীরা এখনো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে হাসিনার নিয়োগকৃত অধিকাংশ কর্মকর্তা এখনো বহাল রয়েছেন। এরা সরকারের কাজে অসহযোগিতার পাশাপাশি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা কৌশল আটছেন। সুযোগের অপেক্ষায় আছেন, যাতে বড় ধাক্কা দেওয়া যায়। সরকারের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বর্তমানে এমন ৪৬ জন সচিব ও অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন, যারা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের কট্টর সমর্থক। এদের কেউ কেউ আওয়ামী পরিবারের সন্তান, জামাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজন। একই সঙ্গে এরা দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী। ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থক ও ব্যাপক সুবিধাভোগী এমন ডজনখানেক সচিব আছেন, যারা ওএসডি হিসেবে চাকরিতে বহাল আছেন। দুর্নীতিগ্রস্ত এসব সচিব বিপুল অর্থবিত্তের মালিক। এরা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন দায়িত্বে ফিরে আসার চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের অনেকেই ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের ভোটের কারিগর আমলাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু ২০২৪-এর ভোটের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তারা এখনো বহাল আছেন। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে ২০২৬-এর নির্বাচন পরিচালনা করা সহজ হবে না। কারণ তারা সচিবালয়সহ অন্যান্য সরকারি দপ্তরে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী এক বছরে উচ্চপদে নিয়োগ ও পদোন্নতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পদলেহী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তারাই সচিব পদে বেশি পদোন্নতি পেয়েছেন। হাসিনা সমর্থক সচিবদের অপসারণের জন্য ‘জুলাই ঐক্য’, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এবং ‘বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা ঐক্য’সহ বিভিন্ন সংগঠন দাবি জানালেও এরা বহালতবিয়তে দায়িত্বে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন।
খুন-গুমে জড়িত অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে
২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সাভার থেকে গুম হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী শিক্ষার্থী। এরা হচ্ছেন- দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ওয়ালি উল্লাহ এবং আল-ফিক্হ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের আল মুকাদ্দাস। সাড়ে ১৩ বছর পরও এদের কোনো সন্ধান এখনো মেলেনি। বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম ও এম ইলিয়াস আলীদের মতো নেতা গুমের শিকার হন। রাজনৈতিক নেতাসহ যেসব নাগরিকদের গুম করা হয়েছে, এদের কেউ কেউ আয়না ঘর থেকে বের হলেও অনেকের হদিস নেই এখনো। এই গুম ও খুনের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। গুমের শিকার শিবির নেতা ওয়ালি উল্লাহ এবং আল মুকাদ্দাসের সন্ধানে ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির পুনর্গঠন করেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ। গত ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ বিষয়ে জানা যায়। পুনর্গঠিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটিতে ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হান্নান শেখকে আহ্বায়ক এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটি দুই নেতার গুমের বিষয়ে তদন্ত এবং এদের খুঁজে বের করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা দেবে। গুম ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়লেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের দেওয়া হতো দায়মুক্তি। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে শুধু দায়মুক্তিই নয়, জড়িত কর্মকর্তাদের দেওয়া হতো পুরস্কার। গত ৫ আগস্টের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল দেশজুড়ে যারা এমন অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্তু না, আলোচিত দু-চারজন ছাড়া এরা আইনের আওতায় আসেনি।
বিদেশে বসে বিশৃঙ্খলা উসকে দিচ্ছেন হাসিনা
বিদেশে বসে প্রতিদিনই দেশে কল দিচ্ছেন ফ্যাসিস্ট হাসিনা। তিনি নেতাকর্মীদের জঙ্গি তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিচ্ছেন। দেশে গণ্ডগোল লাগানোর অপচেষ্টা করছেন। তার নির্দেশেই জাতিসংঘে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গীদের ওপর চড়াও হয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে ইতোপূর্বে। এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং অনলাইন বৈঠকে যোগ দেওয়ায় তা ঠেকানো উদ্যোগ নেওয়া হয়। আটক নেতাকর্মীদের ব্যবহার করা মোবাইল ফোনে দেখা সম্প্রতি আটক ২৪৪ জনের মধ্যে দেড় শতাধিক ব্যক্তি দুটি অ্যাপ ব্যবহার করে যোগাযোগ রাখেন। দুটি অ্যাপ হচ্ছে, টেলিগ্রাম ও বোটিম। টেলিগ্রাম ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগের একটি জনপ্রিয় অ্যাপ। টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পাভেল দুরভ রুশ বংশোদ্ভূত। অন্যদিকে বোটিম কথা বলা, ভিডিও কল ও অর্থ আদান-প্রদানের জনপ্রিয় অ্যাপ। বোটিমের প্রধান কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় এ বিষয় তুলে ধরা হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে আলোচনা হয় যে, সরকার আপাতত রাতে অ্যাপ দুটির (টেলিগ্রাম ও বোটিম) ব্যবহারে গতি কমিয়ে দেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দুই অ্যাপ বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়া হবে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় এ বিষয় তুলে ধরা হয়।
পলাতক এমপি-মন্ত্রীরা জুম মিটিংয়ে সক্রিয় রাখছেন কর্মীদের
বিদেশে পলাতক এমপি-মন্ত্রীরা প্রতিদিন দেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, জুমে মিটিং করছেন। এছাড়া নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, দিচ্ছেন নানা নির্দেশনা। রাজধানীর অলিগলিতে যেখানে আগে মাঝেমধ্যে মধ্যরাতে কিংবা ভোরের আলো ফোটার আগেই দেখা যেত ঝটিকা মিছিল, এখন তা যেন রূপ নিয়েছে শোডাউনে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আওয়ামী লীগ আবারও রাজপথে সক্রিয় হচ্ছে। পুলিশের ওপর জঙ্গি কায়দায় হাতবোমা ছুড়ছে। হাসিনা বর্তমানে ভারতে, দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন কারাগারে এবং অনেকে পলাতক, তা সত্ত্বেও দলের কর্মীরা মাঠে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন শুধু পলাতক নেতাদের ফোনালাপে। ইতোপূর্বে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে চার ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক করেছেন গাজীপুরের পলাতক সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম। এতে দেশের জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীদের নিয়ে জুম মিটিং হয়, যেখানে রাজপথে নামার পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ে মিছিল শুরুর নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। অর্থের ঘাটতি মেটাতে বিদেশে থাকা নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সাহায্য না পাওয়ার কারণে আপাতত প্রতিটি জেলায় স্থানীয় কর্মীদের নিয়ে মিছিল চালানোর নির্দেশ এসেছে। এমনকি রিকশাচালক, অটোরিকশাচালক বা বাস হেল্পারের ছদ্মবেশে অংশ নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে আত্মরক্ষার্থে বৈদ্যুতিক শক ডিভাইস ও অন্যান্য সরঞ্জাম রাখার পরামর্শও হয় ওই মিটিং থেকে। সম্প্রতি পলাতক এমন একজন এমপির ঘনিষ্ঠ কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক ওই এমপি কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন মিটিং করছেন।
সামাজিকমাধ্যমে ছড়াচ্ছেন গুজব, হুমকি দেওয়া হচ্ছে বিপ্লবীদের
রাত যত গভীর হয়, গুজব তত বাড়তে থাকে। প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের লোকেরা রাতভর গুজব ছড়াচ্ছে। নিজস্ব ফেসবুক আইডির পাশাপাশি ফেইক আইডির মাধ্যমে এসব গুজব ছড়ানো হয়। এসব গুজবের উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। কেউ কেউ আবার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতাদের নানা হুমকি দিচ্ছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য অনলাইনে গুজব ছড়ানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে ভুয়া খবর তৈরি করা হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। সেই খবরের সত্যতা ও সূত্র যাচাই না করে তা প্রচার করছে ফেসবুক-টুইটার ব্যবহারকারীরা। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে সমাজে। কোনো কোনো গণমাধ্যমও গুজব যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করছে।
দেশ-বিদেশে সৃষ্টি করছে বিশৃঙ্খলা, অংশ নিচ্ছে হামলায়
গত বছরের নভেম্বর মাসের ঘটনা। প্রায় দুই মিনিটের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে রেখেছেন একদল লোক। তারা উপদেষ্টার সঙ্গে উত্তেজিত ভাষায় কথা বলছেন। তর্ক করছেন। বার বার তার দিকে তেড়ে আসছেন। ঘিরে ধরছেন। সামনে এগোতে দিচ্ছেন না তাকে। বলছেন, আপনি মিথ্যা বলছেন। জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গভর্নিং বডি এবং সংস্থাটির গুরত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে দেশে ফিরছিলেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। দূতাবাসের প্রটোকলে তিনি গাড়িতে করে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে পৌঁছান। গাড়ি থেকে বিমানবন্দরে নামার পর হঠাৎ একদল লোক এসে আইন উপদেষ্টাকে ঘিরে ধরেন। তাকে বিরক্ত করতে থাকেন। এরপর গত সদ্যসমাপ্ত সেপ্টেম্বরে প্রথমার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কনস্যুলেট অফিসে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলাকারীরা আওয়ামী লীগের লোক। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে নিউইয়র্কে বিমানবন্দরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিনিধিদলের সদস্য জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেনকে লক্ষ করে ডিম নিক্ষেপ করে লাঞ্চিত করেছেন আওয়ামী লীগের-নেতাকর্মীরা। দেশেও বিভিন্ন ব্যানারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।
ফটো তোলার কথা বলে মিছিলে লোক আনছে
জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের ১৯ দিনে আওয়ামী লীগ ৪৮টি মিছিল করেছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও ঢাকাসহ সারা দেশে তারা মিছিল করেই চলেছে। দেশের বাইরে দলটির কিছু নেতা-কর্মীকে সরকার-সংশ্লিষ্টদের হেনস্তা করতে দেখা গেছে। পুলিশের ওপরও বোমা ছুড়ছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ছবি তুলে তাদের নিয়ন্ত্রিত ফেসবুক পেজগুলোয় ওইসব মিছিলের ভিডিও দ্রুতই ‘আপ’ করা হচ্ছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকায় অন্তত ৬টি পয়েন্টে মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন। কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, কাকরাইল, মতিঝিল, ধানমন্ডি, উত্তরায় এসব মিছিল হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর ‘মানুষের ক্ষোভই আওয়ামী লীগের আন্দোলনের রসদ’ শিরোমানে সংবাদ পরিবেশন করে কলকাতার প্রভাবশালী পত্রিকা আনন্দবাজার। ওই পত্রিকায় আওয়ামী লীগের পলাতক প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর নানক বলেন, মিছিল আরও বাড়বে। প্রতিদিন বিক্ষোভ মিছিল হবে।
পতিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনে যেসব কালাকানুন ও আইন তৈরি করা হয়েছিল, সেই আইন দিয়েই তাদের (আওয়ামী লীগের) বিচার করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গণহত্যার বিচারের বিষয়ে আরও বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে ওদের (আওয়ামী লীগের) সঠিক পাওনা বুঝে দিতে হবে।’ দলের এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতের আমীর বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, তারা (আওয়ামী লীগ) শিক্ষা নেবে। কিন্তু কয়লা ধুইলে ময়লা যে যায় না। কয়লা যত পরিষ্কার করবেন আরও কালো হবে। কালো রংটা আরও ফুটে উঠবে। যত স্বচ্ছ পানি দিয়ে ধোবেন, সাদা হবে না। লজ্জিত হয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা পথ তারা বের করতে পারত। সেটা না করে আনসার লীগ নামায়, সেটা না করে বিচার লীগ নামায়, সেটা না করে তারা এই দাবি লীগ, ওই দাবি লীগ নামিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।’ দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জামায়াতের এই শীর্ষনেতা বলেন, ‘আমরা আগামীতে একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করতে চাই। সুতরাং আমাদের সীমাহীন ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ভারতে বসে শেখ হাসিনা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি বলেন, ‘পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতে বসে দেশকে আনস্টেবল সিচুয়েশনে নেয়ার জন্য, দেশকে ধ্বংস করতে যেটুকু বাকি রেখেছেন সেটি পূর্ণ করার জন্য নতুনভাবে এই ফ্যাসিস্ট দলকে (আওয়ামী লীগ) নিয়ে মাঠে নামতে চান।’ ‘অবিলম্বে এখন প্রয়োজন বাংলাদেশে সব দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে থাকতে চাই। বিশেষ করে যে ছাত্র-সমাজ অংশগ্রহণ করেছে জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে, তাদের ও হাসিনাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য আমরা গড়ে তুলতে চাই’। এটি সম্ভব হলে হাসিনার ষড়যন্ত্র সফল হবে না।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আ’লীগের কোনো অনুশোচনা নেই। তারা তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আনছে না। জঙ্গিবাদের পথেই হাঁটছে। এদেশের মানুষ সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। তাই আ’লীগের ফিরে আসার পথ দিন দিন আরো কঠিন হচ্ছে।