এবারও কোটা পূরণ নিয়ে সংশয়
২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৬
দুই মাসে প্রাথমিক নিবন্ধন মাত্র দুই শতাংশ
স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী বছরের ২৬ মে হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবার বাংলাদেশ থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের হজ পালনের সুযোগ রেখেছে সৌদি আবর কর্তৃপক্ষ। এ বছর হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু হয়েছে ২৭ জুলাই থেকে, যা চলবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। নিবন্ধন শুরু হওয়ার দুই মাসে কোটার মাত্র দুই শতাংশ মুসল্লি হজের জন্য প্রাথমিক নিবন্ধন করেছেন। অর্থাৎ এবার বাংলাদেশের হজ কোটা ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের বিপরীতে ২৭ জুলাই থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন মাত্র ২ হাজার ৮৯ জন। অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ কোটা এখনো ফাঁকা।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়ও ৩ হজ প্যাকেজ
সরকারি প্যাকেজ ঘোষণার পর এবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় তিনটি হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর রোববার সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বিজয়নগরের একটি হোটেলে হাবের মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার এসব হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এ সময় হাবের সভাপতি সৈয়দ গোলাম সরওয়ার উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের তথ্যানুযায়ী, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় এবার হজযাত্রীদের জন্য খাওয়া ও কুরবানিসহ তিনটি হজ প্যাকেজ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ হজ প্যাকেজের খরচ ঠিক করা হয়েছে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর সাধারণ প্যাকেজের মাধ্যমে হজ পালনে ব্যয় হবে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আর সাশ্রয়ী হজ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা। গত বছরের তুলনায় এবার সাধারণ প্যাকেজের ব্যয় বেড়েছে ২৭ হাজার টাকা। গত বছর এ প্যাকেজের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা। লিখিত বক্তব্যে হাব মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, সৌদি পর্বের চূড়ান্ত ব্যয়ের হিসাব না পাওয়ায় বিগত বছরের ব্যয়ের ধারাবাহিকতায় সম্ভাব্য খরচ হিসাব করে হজ প্যাকেজ প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে সৌদি সরকার কর্তৃক কোনো খাতে খরচ বৃদ্ধি বা কমা প্রযোজ্য খাতের বর্ধিত বা হ্রাসকৃত ব্যয় প্যাকেজমূল্য হিসেবে গণ্য হবে এবং হজযাত্রীকে তা পরিশোধ করতে হবে এবং একই সাথে বিমানভাড়া কমলে তা প্যাকেজমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
প্রতি সৌদি রিয়াল ৩২ টাকা ৮৫ পয়সা ধরে প্যাকেজের খরচ হিসাব করা হয়েছে জানিয়ে হাব মহাসচিব বলেন, এ বছর কুরবানির অর্থ নুসুক মাসার প্ল্যাটফর্মে পরিশোধ বাধ্যতামূলক হওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমের প্যাকেজে কুরবানির অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর হজযাত্রীর বিমানভাড়া বাংলাদেশ অংশের ট্যাক্স ও চার্জ ছাড়া ধরা হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রীদের খাবার খরচ প্যাকেজের বহির্ভূত থাকলেও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় উন্নত সার্ভিসের জন্য খাবারের মূল্য প্রতিটি প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০২৫ সালে হজযাত্রীদের বিমানভাড়া ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮২০ টাকা। ২০২৬ সালের বিমানভাড়া নির্ধারণের আগে হাব বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিমানভাড়া কমানোর আবেদন করে। হজসংক্রান্ত সব সভায়ও বিমানভাড়া কমানোর দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালে হজে বিমানভাড়া ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১২ হাজার ৯৯০ টাকা কম।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এ বছর শতভাগ হজযাত্রীর (সিলেট ও চট্টগ্রাম বাদে) সৌদি অংশের ইমিগ্রেশন বাংলাদেশেই সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ‘মক্কা-রুট-সার্ভিস-ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় হজযাত্রীদের প্রি-অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন বাংলাদেশেই সম্পন্ন করার জন্য নির্ধারিত হজ ফ্লাইট হওয়া বাধ্যতামূলক। হজযাত্রী পরিবহনে ডেডিকেটেড ফ্লাইটের হিসাব করেই সর্বোচ্চ মূল্যে বিমানভাড়া ঠিক করা হয়েছে।
হাব জানিয়েছে, বিগত বছরগুলোয় ডেডিকেটেড ফ্লাইটের ভাড়া নিলেও এয়ারলাইনসগুলো শিডিউল ফ্লাইটেও হজযাত্রী পরিবহন করেছে। এবার যেহেতু নির্ধারিত ফ্লাইটের ভাড়া পরিশোধ করা হচ্ছে, তাই হজযাত্রীদের সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন ঢাকায় নিশ্চিত করার জন্য সব হজ ফ্লাইট নির্ধারিত হতে হবে। কোনোভাবেই কোনো শিডিউল ফ্লাইটে হজযাত্রী পরিবহন করা যাবে না।
সরকারি হজ প্যাকেজে কমল উড়োজাহাজ ভাড়া
আগামী বছরের জন্য হজের গত ২৮ সেপ্টেম্বর নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি প্যাকেজ বাড়িয়ে তিনটি করা হয়েছে। এছাড়া উড়োজাহাজ ভাড়া আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ হাজার টাকা কমছে। তবে স্বাস্থ্যবিমার টাকার পরিমাণ বাড়ছে। ২৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণা করেন ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি প্যাকেজ করা হয়েছে; যেখানে ন্যূনতম খরচ ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া আগামী বছরের জন্য উড়োজাহাজ ভাড়া ১২ হাজার ৯৯০ টাকা কমছে। তিনি বলেন, গত বছর বিমানভাড়া ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮২০ টাকা। এ বছর বিমানভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০ টাকা।
ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, এ বছর সরকারি মাধ্যমে ‘হজ প্যাকেজ-১ (বিশেষ)’, ‘হজ প্যাকেজ-২’ ও ‘হজ প্যাকেজ-৩’ শিরোনামে মোট তিনটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্যাকেজ-১-এর আওতায় হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের বহিরাঙ্গন থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ মিটারের মধ্যে এবং মদিনায় মার কাজিয়া বা সেন্ট্রাল এরিয়ায় আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৫৯৭ টাকা। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্যাকেজ মূল্যের পুরো অর্থ আবশ্যিকভাবে জমা দিতে হবে। ৯ নভেম্বর হজ চুক্তি; আগামী বছরের ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাড়িভাড়া ও পরিবহন চুক্তি করতে হবে। ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হজ ভিসা ইস্যুর কার্যক্রম শুরু হবে।
খালিদ হোসেন বলেন, হজ প্যাকেজ-২ কিছুটা সুলভ। এ প্যাকেজের হজযাত্রীদের মক্কায় হারাম শরিফের বহিরাঙ্গন থেকে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার থেকে ১ দশমিক ৮ কিলোমিটারের মধ্যে এবং মার কাজিয়া বা সেন্ট্রাল এরিয়ায় আবাসন সুবিধা দেওয়া হবে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮১ টাকা। ধর্ম উপদেষ্টা বলেন, হজ প্যাকেজ-৩ একটি সাশ্রয়ী প্যাকেজ। এ প্যাকেজের হজযাত্রীদের আবাসন হবে মক্কায় আজিজিয়া এলাকায় এবং মদিনায় মার কাজিয়া এলাকার বাইরে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৬৭ টাকা।
উপদেষ্টা বলেন, হজ প্যাকেজ-৩ সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রীদের জন্য নতুন সংযোজন। এর আগে কখনো সরকারি মাধ্যমের হাজিদের আজিজিয়া এলাকায় আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি। তবে সর্বোচ্চ হজযাত্রী প্রেরণকারী তিনটি দেশ ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার হজযাত্রীদের অনেক আগ থেকে আজিজিয়া এলাকাতেই রাখা হয়।
আগামী বছর হজে সৌদি সরকার স্বাস্থ্যবিমার পরিমাণ বাড়িয়েছে ১৩০ সৌদি রিয়াল বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ২৭০ টাকা।
ধর্ম উপদেষ্টা জানান, হজ এজেন্সিগুলোর জন্য ‘বেসরকারি মাধ্যমের সাধারণ হজ প্যাকেজ’ শিরোনামে একটি প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্যাকেজের খরচ ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার ১৮৫ টাকা। সরকার অনুমোদিত এ প্যাকেজ নিয়ে এজেন্সিগুলো অতিরিক্ত দুটি প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারবে।
খালিদ হোসেন বলেন, প্রত্যেক হজযাত্রীর খাবার বাবদ প্রতিদিন ন্যূনতম ৩৫ সৌদি রিয়াল ব্যয় হতে পারে। এ হিসাব অনুসারে খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা হজযাত্রীদের সঙ্গে নিতে হবে এবং নিজ দায়িত্বে খাবার কিনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মিনা ও আরাফায় তাঁবুভাড়া ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। নুসুক মাসার প্ল্যাটফর্মে ‘দমে শোকর (কুরবানি)’ বাবদ ৭২০ সৌদি রিয়াল তথা ২৩ হাজার ৬৫২ টাকা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ বছর প্রথমবারের মতো দমে শোকর বাবদ টাকা হজ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করে প্যাকেজ ঘোষণা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।