জননেতা আব্বাস আলী খানের অবদান জাতি কোনোদিন ভুলবে না


২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫৩

সোনার বাংলা রিপোর্ট : মরহুম জননেতা আব্বাস আলী খানের মৃত্যুবার্ষিকী ৩ অক্টোবর। ১৯৯৯ সালের এদিন দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে দুনিয়ার সফর শেষ করে চলে গেছেন মহান রবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আব্বাস আলী খান ১৩২১ সালের ফাল্গুন মাসের শেষ সপ্তাহে সোমবার সকাল ৯টায় জয়পুরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন পাঠান এবং আফগানিস্তান থেকে আগত। তাঁর দাদা সুবিদ আলী খানের মধ্যে পাঠানদের বৈশিষ্ট্য ছিল।
এ মহান ব্যক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত করার পর থেকে ১৯৭৯ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকাশ্যে দেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭৯ সালের ২৫, ২৬ ও ২৭ মে ঢাকার হোটেল ইডেনে আয়োজিত এক রুকন সম্মেলনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকার রাজনৈতিক দল বিধি বাতিল ঘোষণা করার ফলেই জামায়াতে ইসলামী বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে এদেশে নতুনভাবে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করার সুযোগ পায়। রাজনৈতিক দল বিধি বাতিল করার কয়েক মাস পূর্বে জামায়াত উক্ত দল বিধি অনুযায়ী বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে কার্যক্রম শুরু করার জন্য মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকারের নিকট আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার নানা অজুহাতে সম্মতি দেয়নি। হোটেল ইডেনের সম্মেলনে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমীর ও শামসুর রহমানকে সেক্রেটারি জেনারেল করে জামায়াতে ইসলামীর কাজ শুরু হয়। জামায়াতে ইসলামী নতুনভাবে বাংলাদেশে কাজ শুরু করার পেছনে মরহুম আব্বাস আলী খান বিরাট অবদান রেখে গেছেন।
১৯৭২ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক ময়দানে অনুপস্থিত থাকার কারণে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট ও ধর্মনিরপেক্ষবাদী ভারতপন্থীরা একতরফাভাবে নানা অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল। এমনি একটি বৈরী পরিবেশে কঠিন পরিস্থিতিতে আব্বাস আলী খানকে জামায়াতের হাল ধরতে হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সাথে সংবাদ সম্মেলনসহ সভা-সমাবেশে যুক্তিপূর্ণভাবে জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য জনগণের সামনে উপস্থাপন করে আল্লাহর মেহেরবানিতে জামায়াতে ইসলামীকে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন।
ইসলামী বিপ্লবের ৭ দফা গণদাবি ঘোষণা : মরহুম আব্বাস আলী খান ১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগরীর রমনা গ্রীণে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইসলামী বিপ্লবের সাত দফা গণদাবি ঘোষণা করেন।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা পালন : ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে তদানীন্তন বিরোধীদলগুলোর সমন্বয়ে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট) গড়ে ওঠে, তিনি তার অন্যতম নেতা ছিলেন। এরও আগে সকল বিরোধীদল নিয়ে গঠিত ‘কপ’ (কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি)-এর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও তিনি একজন ছিলেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিপরীতে ‘কপ’-এর প্রার্থী মিস্ ফাতেমা জিন্নার নির্বাচনী প্রচারণাকালে রাজশাহী বিভাগে মিস্ জিন্নার একাধিক সভায় সভাপতিত্ব করেন। পি.ডি.এম-এর আন্দোলনের পর আরো বৃহত্তম রূপ নিয়ে গঠিত ‘ডাক’ (ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি) যে আন্দোলন সৃষ্টি করে তাই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। ডাকের শরিকদল জামায়াতে ইসলামীর নেতা হিসেবে আব্বাস আলী খান এ আন্দোলনে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেন। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন চলে তিনি তার একজন সংগ্রামী কর্ণধার ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ৯ বছরের যুগপৎ আন্দোলনে তিনি নির্ভীক ভূমিকা পালন করেন। তিনিই জামায়াতের গণআন্দোলন কর্মসূচি, কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দেন এবং পরবর্তীতে কেয়ারটেকার সরকার গঠন দাবি সকলের গণদাবিতে পরিণত হয় এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে পার্লামেন্টে কেয়ারটেকার সরকার গঠন পদ্ধতি আইন হিসেবে পাস হয়।
ভাষা ও সাহিত্যচর্চা : ভাষা ও সাহিত্যচর্চার প্রতি খানের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। আরবি ভাষায় তিনি সুন্দরভাবে লিখতে পারতেন। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায়ও তাঁর দখল ছিল এবং এসব ভাষায় বক্তৃতায় তিনি ছিলেন সাবলীল। অতি ব্যস্ততা সত্ত্বেও মরহুম খান গ্রন্থ প্রণয়ন ও অনুবাদের কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। আত্মস্মৃতিচারণমূলক তাঁর গ্রন্থ ‘স্মৃতি সাগরের ঢেউ’ শুধু সুখপাঠ্যই নয়, তদানীন্তন সমাজের একটা দর্পণও বটে। বিলেতে সফরের ওপর তাঁর লেখা ‘যুক্তরাজ্যে একুশ দিন’ এবং আমেরিকা-কানাডা সফরের ওপর লেখা ‘বিদেশে পঞ্চাশ দিন’ যেমন উপভোগ্য, তেমনি তথ্যবহুল ও শিক্ষণীয়। অনুবাদ ও মৌলিক রচনা মিলিয়ে আব্বাস আলী খানের প্রায় পঁয়ত্রিশটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সমসাময়িক ও নানা ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপরও সংবাদপত্রের প্রবন্ধ লিখে গেছেন। প্রকাশিত এমন নিবন্ধের সংখ্যা তাঁর অনেক। তিনি অনেক ছোট গল্পের লেখক। তিনি বেশ কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থও রচনা করেছেন। ‘বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস’ তার এমনি একটি রচনা।
আব্বাস আলী খানের রচিত গ্রন্থাবলি- ১. জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস, ২. জামায়াতে ইসলামীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, ৩. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, ৪. মাওলানা মওদূদী : একটি জীবন, একটি ইতিহাস, একটি আন্দোলন, ৫. আলেমেদীন মাওলানা মওদূদী, ৬. মাওলানা মওদূদীর বহুমুখী অবদান, ৭. মৃত্যু যবনিকার ওপারে, ৮. ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাক্সিক্ষত মান, ৯. ঈমানের দাবি, ১০. ইসলাম ও জাহেলিয়াতের চিরন্তন দ্বন্দ্ব, ১১. একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ : তার থেকে বাঁচার উপায়, ১২. ইসলামী বিপ্লব একটি পরিপূর্ণ নৈতিক বিপ্লব, ১৩. সমাজতন্ত্র ও শ্রমিক, ১৪. গটঝখওগ টগগঅঐ, ১৫. স্মৃতি সাগরের ঢেউ, ১৬. বিদেশে পঞ্চাশ দিন, ১৭. যুক্তরাজ্যে একুশ দিন, ১৮. বিশ্বের মনীষীদের দৃষ্টিতে মাওলানা মওদূদী, ১৯. ইসলামী আন্দোলন ও তার দাবি, ২০. দেশের বাইরে কিছুদিন। আব্বাস আলী খানের অনূদিত গ্রন্থাবলি, ২১. পর্দা ও ইসলাম, ২২. সীরাতে সরওয়ারে আলম (২-৫ খণ্ড), ২৩. সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং (সহ-অনুবাদ), ২৪. বিকালের আসর, ২৫. আদর্শ মানব, ২৬. ইসলাম ও সামাজি সুবিচার, ২৭. জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের ভিত্তি, ২৮. ইসলামী অর্থনীতি (সহ-অনুবাদ), ২৯. ইসরা ও মিরাজের মর্মকথা, ৩০. মুসলমানদের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের কর্মসূচি, ৩১. একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার, ৩২. পর্দার বিধান, ৩৩. ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ, ৩৪. আসান ফিকাহ (১-২ খণ্ড), ৩৫. তাসাউফ ও মাওলানা মওদূদী।
তার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা : ১৯৩৫ সাল। দুর্লভ সরকারি চাকরি। বড় সাবের হুকুম-অফিস থেকে নামাযের জন্য যাওয়া যাবে না। বসের রক্তচক্ষু উপক্ষো করেও জামায়াতে নামাজ পড়তে গেছেন। একপর্যায়ে বসের কড়াকড়িতে চাকরি ছেড়ে দেন। কিন্তু নামাজ ছাড়েননি। চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের গেস্ট রুম। গভীর রাত আনুমানিক ৩টা তখন। হঠাৎ পাশের ঘরে থেকে শোনা গেলো, “রাব্বি জিদনী ইলমা” “ইয়া আইয়াতুহান্নাফসুল মুত্বমাইন্না ইরজিয়ী ইলা রাব্বিকি রাদিয়াতাম মারদিয়া, ফাদখুলি ফী ইবা-দি ওয়াদ খুলি জান্নাতি”। পাশে শায়িত ইমাম সাহেব জেগে উঠলেন। তিনি উঁকি মেরে দেখলেন এক মর্দে মুজাহিদ আল্লাহর গভীর ধ্যানে নিমগ্ন। দিনের বেলা আনুমানিক বিকাল ৫টা। হঠাৎ রুমে ঢুকলেন একজন। রুমে ঢুকেই দেখলেন- তিনি তাফহীমুল কুরআন পড়ছেন আর তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। ১০ বছর একাধারে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন তদানীন্তন মহকুমা শহরের হাইস্কুলে। ডাক এলো আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য, মানুষকে আহ্বান জানানোর কাজে বড় দায়িত্ব পালন করতে হবে। হ্যাঁ, যেমনি হুকুম তেমনি কাজ- সাথে সাথেই চাকরি ছাড়লেন। রাজশাহী বিভাগীয় আমীরের দায়িত্ব নিয়ে চলে গেলেন রাজশাহীতে।
মরহুম খান ১৯৩৬ সালের শেষদিকে আবার চাকরিতে ঢোকেন এবং কলকাতা ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে যোগদান করেন। এ সুবাদে শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সেক্রেটারি হিসেবে কয়েক বছর নিয়োজিত থাকেন। দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সার্কেল অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু তিনি সে পদে যোগদান করেননি। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে জয়পুরহাটে স্থানীয় স্কুলের হেড মাস্টার সীমান্ত পার হয়ে চলে যাওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেটের অনুরোধে হেড মাস্টারের পদ গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে স্থানীয় একটি মাদরাসায় ইসলামী জলসা ছিল। তাঁরই ছাত্র উক্ত মাদরাসার সেক্রেটারির অনুরোধে তিনি ঐ জলসায় যান। উক্ত জলসায় প্রধান অতিথি ছিলেন ড. শহীদুল্লাহ। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক আমীরে জামায়াত তদানীন্তন কারমাইকেল কলেজের তরুণ অধ্যাপক গোলাম আযম। ড. শহীদুল্লাহ অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি। শুধু অধ্যাপক গোলাম আযম গিয়েছিলেন। মরহুম আব্বাস আলী খান সাইকেলে চড়ে সভাস্থলে পৌঁছেন। অধ্যাপক গোলাম আযমের মুখে কালেমা তাইয়্যেবার ব্যাখ্যা শুনে মুগ্ধ হয়ে যান। সভা শেষে একসাথে খাওয়া-দাওয়া ও পরিচয় হয়। আব্বাস আলী খান অধ্যাপক গোলাম আযমের কাছ থেকে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)-এর লেখা কিছু বইপুস্তক কেনেন এবং তার কাছেই শুনতে পান যে বগুড়ার জামায়াতের দায়িত্বশীল হলেন শায়খ আমীন উদ্দিন। ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে আব্বাস আলী খান বগুড়ার দায়িত্বশীল শায়খ আমীন উদ্দিনের সাথে দেখা করে মুত্তাফিক ফরম পূরণ করেন এবং নিজ এলাকায় একটি ইউনিট কায়েম করে সেই ইউনিট চালান। ১৯৫৬ সালের মাঝামাঝি জামায়াতের রুকন হন এবং তদানীন্তন রাজশাহী বিভাগের আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম আব্বাস আলী খানের রুকনিয়াতের শপথ পাঠ করান। সেই থেকে তিনি আলোকিত পথের পথিক হিসেবে আলোর পথে ডেকেছেন এদেশের মানুষকে। এ জাতি তার অবদান কোনোদিন ভুলবে না।