পাহাড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির নেপথ্যে কারা?


২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:৫১

স্টাফ রিপোর্টার : খাগড়াছড়িতে রাত ৯টায় প্রাইভেট পড়ে ফেরার পথে এক কিশোরী স্কুলছাত্রী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার। ওইদিন রাত ১১টার দিকে অচেতন অবস্থায় একটি ক্ষেত থেকে তাকে উদ্ধার করেন স্বজনরা। এ ঘটনায় কিশোরীর বাবার মামলার পর জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার নাম শয়ন শীল (২১)। তাকে ছয় দিনের রিমান্ডের আদেশও দিয়েছেন আদালত। অথচ এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য পরবর্তীতে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে একটি রাষ্ট্রের ইন্ধনের কথাও বলছেন কেউ কেউ। সরকারের একজন উপদেষ্টা তৃতীয়পক্ষের ইন্ধনের কথা বলছেন। রাজনীতিকরা বলেছেন, নেপথ্যে কারা, তা খুঁজে বের করতে হবে। ওই কিশোরী ধর্ষণের পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে জুম্ম ছাত্র-জনতা ধর্ষণের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করে। তাদের ডাকে ২৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার আধাবেলা সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার নারী নিপীড়নবিরোধী সমাবেশ পালন করেন আন্দোলনকারীরা।
২৭ সেপ্টেম্বর সকাল-সন্ধ্যা অবরোধ ডাকা হয়। সেদিন সদর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে অবরোধকারীদের সঙ্গে স্থানীয় একটি পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। তখন উভয় পক্ষের চারজন আহত হয়। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও বিকেল ৪টার দিকে শহরের মহাজনপাড়া এলাকায় আবারও সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় মহাজনপাড়া, নারকেলবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাটে ভাঙচুর চালানো হয়। সেদিনে দুপুর সাড়ে ১২টার থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সদরের চারটি স্থানে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ২৭ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুর ২টার পর সদর, পৌর এলাকা ও গুইমারায় ১৪৪ ধারা জারি করে, যা ৩০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত বহাল ছিল। অগ্নিসংযোগ ও সংঘাতের ঘটনায় অন্তত তিনজনের প্রাণহানি ঘটে।
ওই কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনার প্রতিবাদে টানা পাঁচদিন উত্তেজনার পর এখনো পরিস্থিতি থমথমে রয়েছে। সড়ক অবরোধ চলার সময় সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপেরও ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। এর মধ্যেই খাগড়াছড়ি সদরের পাশের উপজেলা গুইমারা বাজারে আগুন দেওয়া ও সংঘর্ষ ঘটনা ঘটেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিরা হলেনÑ উপজেলার সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের দেবলছড়ি চেয়ারম্যান পাড়ার আথুই মারমা (২১), হাফছড়ি ইউনিয়নের সাং চেং গুলিপাড়ার আথ্রাউ মারমা (২২) ও রামসু বাজার বটতলার তৈইচিং মারমা (২০)। আহত হন সেনাবাহিনীর সদস্য, পুলিশসহ অন্তত ২০ জন। ৩০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা শহর এখন থমথমে। সব দোকানপাট বন্ধ। লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। তবে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এদিকে জুম্ম ছাত্র-জনতা তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধসহ তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। জুম্ম ছাত্র-জনতা নামের ফেসবুক পেজে পোস্ট করা বিবৃতিতে তা জানানো হয়। এতে তারা আট দফা দাবি দিয়েছে।
এদিকে খাগড়াছড়ি শহরের বিভিন্ন স্থানে মঙ্গলবার সকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে ‘জুম্ম-ছাত্র জনতা’র ব্যানারে ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ চলছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি-ঢাকা সড়কে অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দেওয়া হলেও গত মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে এই দুই সড়কে সীমিত পরিসরে যান চলাচল করতে দেখা যায়। অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো অবরোধের কারণে অচল অবস্থায় রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে খাগড়াছড়ি শহর, শহরতলী ও গুইমারার অধিকাংশ দোকান খোলেনি। সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। খাগড়াছড়ি শহরে কিছু ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চলাচল করছে। তবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ির কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। এদিকে খাগড়াছড়ি পৌরসভা, সদর উপজেলা ও গুইমারা উপজেলায় ১৪৪ ধারা বহাল আছে। জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার জানান, অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসলে নির্দেশনা তুলে নেওয়া হবে।
গুইমারা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানান, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জেলার গুইমারায় সহিংসতায় নিহত তিনজনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে ২৯ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাতের মধ্যে দাহক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তোরণে কাজ চলছে।
বিজিবির খাগড়াছড়ি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. আব্দুল মোত্তাকিম ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তরণে বিজিবি বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে। উদ্ভুত অবস্থা যাতে অবনতি না ঘটে সেজন্য ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’
শান্ত থাকার অনুরোধ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতেও তিনজন পাহাড়ির নিহতের বিষয়টি জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলায় দুষ্কৃতকারীদের হামলায় তিনজন পাহাড়ি নিহত এবং মেজরসহ ১৩ জন সেনাসদস্য, গুইমারা থানার ওসিসহ তিনজন পুলিশ সদস্য এবং আরও অনেকে আহতের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গভীর দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে আশ্বস্ত করা হয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতি শিগগির তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্যধারণপূর্বক শান্ত থাকার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।
তৃতীয়পক্ষের ইন্ধন রয়েছে, বলছেন উপদেষ্টা
খাগড়াছড়িতে চলমান পরিস্থিতিতে তৃতীয়পক্ষের ইন্ধন রয়েছে বলে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা তৈরি করে একটি পক্ষ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। এ সময় পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এরা নতুন নতুন ইস্যু তৈরি করে পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচন দেওয়া। কেউ যদি নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন করে কোনো ইস্যু তৈরি করতে দেওয়া হবে না। এখন থেকে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কেউ মিছিল-মিটিং করতে পারবে না।
পাহাড়ে অস্থিরতায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে বললেন জামায়াতের আমীর
খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত তিনজন নিহত ও একজন মেজরসহ ১৫ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্য আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ২৯ সেপ্টেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘এগুলো কীসের লক্ষণ? হঠাৎ করে পাহাড়ে এমন অস্থিরতার নেপথ্যে কারা আছে? পোস্টে জামায়াত আমীর বলেন, খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষে অন্তত ৩ জন নিহত হয়েছেন এবং একজন মেজরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও ১৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। তিনি লেখেন, এগুলো কীসের লক্ষণ? হঠাৎ করে পাহাড়ে এমন অস্থিরতার নেপথ্যে কারা আছে? অবিলম্বে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করতে হবে এবং তাদের পেছনে কোনো ক্রীড়নক থাকলে তাকেও খুঁজে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, খাগড়াছড়ি অখণ্ড বাংলাদেশেরই অংশ। জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অনস্বীকার্য দায়িত্ব। এ বিষয়ে যথাযথ দৃষ্টি দেওয়া এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।