রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া, সরকারের দুঃখ প্রকাশ

নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে রাজনৈতিক নেতাদের হেনস্তা, ঢাকায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ


২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৪৭

স্টাফ রিপোর্টার : জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা। এই রাজনীতিকরা গত ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার নিউইয়র্কে জেএফকে বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরপর মুহাম্মদ ইউনূস সরকারপ্রধানের মর্যাদায় বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি গেট দিয়ে বেরিয়ে যান। কিন্তু এই একই গেট দিয়ে তার সফরসঙ্গীদের বের হওয়ার কথা থাকলেও তাদের বিকল্প গেট দিয়ে বের করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতারা প্রথমে একসঙ্গে বের হন। পরে বিএনপি মহাসচিবকে রিসিভ করে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা, তার সঙ্গে তিনি অগ্রসর হলে তাকে অনুসরণ করেন এনসিপির নেতারাও। এ সময় মির্জা ফখরুল ও হুমায়ুন কবির পাশাপাশি হেঁটে পার্কিং স্পটের দিকে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা স্লোগান দেন। বিএনপি নেতাদের পেছনেই ছিলেন এনসিপির আখতার হোসেন ও তাসনিম জারা। বিমানবন্দরে বিক্ষোভকারীরা তাঁদের থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তাঁরা গালাগাল করতে থাকেন এবং আখতার হোসেনের পিঠে ডিম ছুড়ে মারেন। ওই সময় দলীয় কর্মীদের একটি অংশ জামায়াত নেতাকে নিরাপত্তাবেষ্টনী দিয়ে বের করে আনেন। আরেকটি অংশ ছুটে যান বিএনপি ও এনসিপি নেতাদের রক্ষা করতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে এমন চিত্র দেখা যায়। বিএনপি মহাসচিবকে উদ্দেশ করে একজন সাবেক শিবির নেতাকে বলতে শোনা যায়, স্যার আপনি চিন্তা করবেন না, আমাদের জামায়াত-শিবিরের লোকজন এখানে আছে। এদিকে ডিম ছুড়ে মারা ব্যক্তি যুবলীগ নেতা বলে শনাক্ত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ তাকে আটক করেছে। তার বিরুদ্ধে বিএনপির এক কর্মীকে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টার অভিযোগও করেছে। পরে ঘটনার রাতে কোর্ট তাকে জামিন দেন।
নিউইয়র্কে আখতারের ওপর ডিম নিক্ষেপ, যা বললেন জামায়াতের নায়েবে আমীর
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর যারা ডিম মেরেছে, তারা দেশকে অসম্মানিত করেছে। এতে তারা নিজেরাই অপমাণিত হয়েছেন। এ ধরনের নেগেটিভ সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। এ প্রথম কোনো দেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বিদেশে কোনো অনুষ্ঠানে আসা। সমগ্র বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ আছি এটাই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতিসংঘের অনেক অনুষ্ঠানে এসেছি অনেকবার। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গী হয়ে আসা এটাই প্রথম। এজন্য ড. ইউসূনকেও ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান জামায়াতের এই নায়েবে আমীর।
আখতারের ওপর বিমানবন্দরে ডিম ছুড়ে মারা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ তাহের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেনের ওপর হামলার ঘটনাটি আমি এখানে এসে জানতে পেরেছি। বিমানবন্দরে থাকা অবস্থায় আমি জানতাম না। কারণ সেখানে অনেক বাংলাদেশি আমাকে সম্মান জানিয়েছেন সুতরাং ওই ঘটনা আমি টের পাইনি। তিনি বলেন, আমি খুব বিব্রতবোধ করিনি বা নেগেটিভ বোধ করিনি এজন্য যে, বাংলাদেশের এই কালচারটা আগে থেকে হয়ে আসছিল। যখন কোনো সরকারপ্রধানরা সফর করেন, তখন বিরোধীরা স্লোগান দেন। আমেরিকা গণতান্ত্রিক দেশ। ১০ থেকে ২০ জন স্লোগান দিতে পারেন, ডিম মারতে পারেন তবে এটি একটি খারাপ আচরণ নিঃসন্দেহে। তবে ব্যতিক্রমধর্মী কোনো বা হতাশ হওয়ার মতো বা খুব উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো ঘটনা না। কারণ ১০ জন এসেও একটা ডিম মেরে দিতে পারে, বাংলাদেশের জন্য এটা লজ্জাজনক। এই সংস্কৃতিটা খুব নেগেটিভ, এটার অবসান হওয়া উচিত। এখানে যারা করেছে তারাও অপমানিত হয়েছে। তারাই বাংলাদেশকে অপমানিত করেছে।
সবকিছুর বিচার আইনের মাধ্যমে হবে, প্রতিক্রিয়ায় ফখরুল
নিউইয়র্কের জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে যা ঘটেছে, তা আবারও প্রমাণ করল, আওয়ামী লীগ তাদের অন্যায়ের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা করে না। আওয়ামী লীগ আজ পর্যন্ত যা করেছে, সবকিছুর বিচার আইনের মাধ্যমে হবে। দল ও দেশের স্বার্থে ধৈর্য ধরুন।’
এনসিপি সদস্য সচিবের প্রতিক্রিয়া
গত ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার নিউইয়র্ক থেকে এক ভিডিও বার্তায় আখতার হোসেন বলেন, শেখ হাসিনার গুলি-বুলেটকে বিন্দুমাত্র ভয় পাইনি, ভাঙা ডিমে কিছুই আসে যায় না। আখতার হোসেন বলেন, নিউইয়র্কে বিমানবন্দরে নামার পর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হুংকার দিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। তারা এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারাকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করেছে। এটাই আওয়ামী লীগের প্রকৃত চরিত্র। প্রধান উপদেষ্টা ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটসের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় দুপুরে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। কিছুটা দেরিতে বিমানবন্দর থেকে বের হলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির; আখতার হোসেন এবং ডা. তাসনিম জারাকে ঘিরে স্লোগান দিতে থাকেন আওয়ামী লীগের কর্মীরা। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এবং শিবিরের কয়েকজন সাবেক নেতা তাদের নিরাপত্তা দিয়ে বের করার চেষ্টা করেন। এ সময় আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়েন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজন কর্মী। তাসনিম জারাকেও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন তারা। প্রতিবাদে ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান তোলেন আখতার। পরে পুলিশের সহযোগিতায় গাড়িযোগে বিমানবন্দর এলাকা ছাড়েন তারা।
রাজধানীতে এনসিপির বিক্ষোভ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সফররত আখতার হোসেন ও ডা. তাসনিম জারার ওপর হামলা এবং ডিম নিক্ষেপের ঘটনার প্রতিবাদে রাজধানীর শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন নেতা-কর্মীরা। ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচির আয়োজন করে ঢাকা মহানগর কমিটি। এতে সামান্তা শারমীন, সারোয়ার তুষার, ডা. তাজনূভা জাবীনসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা অংশ নেন। এ সময় তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে হওয়া সফর কর্মসূচিতে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁরা হামলায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি তুলে এনসিপি নেতারা বলেন, ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগ দেশে ও বিদেশে এমন ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে টার্গেট করে হামলা করা হচ্ছে। তাই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার এখন সময়ের দাবি। এছাড়া মঙ্গলবার বিকেলে ভোলা, বরিশাল, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ করেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা। তাঁরা আখতার হোসেন ও তাসনিম জারার ওপর হামলাকারীদের বিচার দাবি করেন।
এনসিপির তিন দাবি
সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রীয় সফররত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে তিনটি দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার এবং নিউইয়র্ক শহরের সরকারি কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করতে হবে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলসহ পুরো টিমকে অবিলম্বে চাকরিচ্যুত করতে হবে এবং সফররত নেতাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
গণসংহতির নিন্দা
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল এক যৌথ বিবৃতিতে আখতার হোসেনকে ডিম ছোড়ার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
সরকারের গভীর দুঃখ প্রকাশ
ভিসার ধরন এক না হওয়া এবং সমন্বয়হীনতার কারণে নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে আখতার হোসেনকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। ঢাকা ও নিউইয়র্কের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে দেশের রাজনৈতিক নেতাদের হেনস্তার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও দুঃখ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই ঘটনায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আখতার হোসেন ও তাসনিম জারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত হামলার শিকার হয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার সহযোগী ও সমর্থকেরা এ হামলা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, এই নিন্দনীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার শাসনামলে গড়ে ওঠা বিধ্বংসী ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক স্পষ্ট ও মর্মান্তিক চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। এই বিধ্বংসী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক নেতাদের জন্য ভিভিআইপি প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তাসুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হলেও দুঃখজনকভাবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে প্রতিনিধিদলের ওই সদস্যরা ঝুঁকির মুখে পড়েন।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা। এই রাজনীতিকরা গত ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার নিউইয়র্কে জেএফকে বিমানবন্দরে পৌঁছান। ২৬ সেপ্টেম্বর অধিবেশনে মূল ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা।