আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষণ নেই
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০৩
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়বে খুন হওয়ার ঘটনা। এমন কোনো দিন যাচ্ছে না, যেদিন খুন-খারাবি হচ্ছে না। দিনে-দুপুরে হত্যার শিকার হচ্ছেন নাগরিকরা। ছিনতাই বা ডাকাতি করতে এসেও করছে খুন। নিজ ঘরেও নিরাপদ থাকছেন না নাগরিকরা। রাজধানীতে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ঝনঝনানি চলছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হাতুড়ি দিয়ে নির্মম ও নির্দয়ভাবে পিটিয়ে ঘুমন্ত যুবকের মাথা থেঁতলে দিয়ে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে প্রাণ। শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হচ্ছে মা-মেয়েকে। বাবার হাতে সন্তান আবার সন্তানের হাতে খুন হচ্ছেন বাবা। শোনা যাচ্ছে সপরিবারে লাশ উদ্ধারের খবর। নানা অপরাধের অজুহাতে বিচার ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই কেউ কেউ শিকার হচ্ছেন গণপিটুনির। অনেকেরই অভিযোগ, পুলিশ অপরাধ দমনে ধীরগতিতে চলছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও স্বীকার করছেন পরিস্থিতির অবনতির কথা। কিন্তু কেন সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না? সেই প্রশ্ন সর্বত্র।
বগুড়ায় ঘুমন্ত মানুষের ওপর নির্মমতা!
মাত্র ২০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে ঠাণ্ডামাথায় একজন ঘুমন্ত মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে বগুড়ায়। নিহত ব্যক্তি একটি পেট্রলপাম্পের ম্যানেজার ছিলেন, তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রেফতারের পর হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ঘাতক রাকিবুল ইসলাম রতন (২৬)। গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। নিহত ম্যানেজারের নাম ইকবাল হোসেন। তিনি সিরাজগঞ্জ সদরের পিপুলবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। গ্রেফতার রাকিবুল ইসলাম বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর এলাকার বাসিন্দা। গত ৭ সেপ্টেম্বর রবিবার রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকা থেকে তাকে আটক করেন বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা। পরে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। আটকের পর রাকিবুল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর শনিবার ভোররাতের দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেট্রলপাম্পের ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেনকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে পরে স্লাই রেঞ্চ এবং চাকু দিয়ে চোখে আঘাত করেন। এরপর বগুড়া থেকে পালিয়ে কালিয়াকৈরে গিয়ে আত্মগোপন করেন। পেট্রলপাম্পের তেল চুরি করা নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মারধরের বদলা নিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে সে।
বাবার হাতে সন্তান আবার সন্তানের হাতে বাবা প্রাণ হারাচ্ছেন
ভোলায় আলোচিত এক ইসলামিক বক্তা ও রাজনীতিক খুনের ঘটনায় জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পুলিশ ব্রিফিং করে জানিয়েছেন ওই খুন করেছেন তারই নিজের আদরের সন্তান। অন্যদিকে চট্টগ্রামে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একমাত্র সন্তানকে খুন করেন জন্মদাতা পিতা। জানা গেছে, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন ভোলা জেলার সেক্রেটারি মাওলানা আমিনুল হক নোমানী তার কিশোর ছেলের হাতেই খুন হয়েছেন। নোমানীর ১৭ বছরের ছেলেকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি ভোলা জেলা পুলিশ সুপার শরীফুল হকের। গত ১২ সেপ্টেম্বর রাতে তজুমদ্দিন উপজেলা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। নোমানী (৪৫) ভোলা দারুল হাদিস কামিল মাদরাসার মোহাদ্দিস ও সদর উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। নিহতের সাত দিনের মাথায় ঘটনার রহস্য উন্মোচন করল পুলিশ। গত ১৩ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকালে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার শরীফুল হক বলেন, “নোমানীর ছেলে একাই ‘কিলিং মিশনে’ অংশ নিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কড়া শাসন মানতে না পেরে ক্ষোভে সে বাবাকে খুন করে। দুই মাস আগে থেকে বাবাকে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। কীভাবে আঘাত করলে বাবার মৃত্যু নিশ্চিত হবে, তা শিখতে ইউটিউবে বিভিন্ন ক্রাইম মুভি দেখে দক্ষতা অর্জন করে। এরপর ছুরি, টি-শার্ট, ক্যাপ এবং হাতঘড়ি সংগ্রহ করে সে। আর একাই খুন করেন বাবাকে।”
এদিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ছেলেকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন বাবা নুরুজ্জামান। গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই এলাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে নুরুজ্জামানের দ্বিতীয় স্ত্রী আনোয়ারা বেগমকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীকে ঘরে তোলা নিয়ে বিবাদেই খুন হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মোহাম্মদ শাহেদ (২৪)। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মিরসরাইয়ের মায়ানী ইউনিয়নের পশ্চিম মায়ানী গ্রামের নুরুজ্জামান তাঁর একমাত্র ছেলে মোহাম্মদ শাহেদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। নিহত শাহেদ চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সপ্তম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। সৌদি আরব প্রবাসী নুরুজ্জামানের দ্বিতীয় স্ত্রীকে ঘরে তোলা নিয়ে বিতণ্ডা থেকে এ ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।
পরপর দুই পরিবারের প্রাণ গেল সবার
নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি ফ্ল্যাট থেকে শিশুসন্তানসহ এক দম্পতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শহরের বাবুরাইল বৌবাজার এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে লাশ তিনটি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ দেড়শ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, স্ত্রী ও শিশুসন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর গৃহকর্তা আত্মহত্যা করেছেন। নিহতরা হলেনÑ হাবিব উল্লাহ শিপলু (৩৫), তার স্ত্রী মোহিনী আক্তার মিম (২৫) ও শিশু আফরান (৪)। নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ বাবুরাইল এলাকার ঐ ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতর থেকে ৩ জনের লাশ উদ্ধার করে। চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকতেন শিপলু।
এর একদিন আগে ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় সন্তানসহ একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে স্বামীর লাশ ঝুলন্ত অবস্থায়, কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর লাশ বিছানা থেকে উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘটে ইয়ারপুর ইউনিয়নের নরসিংহপুর এলাকার আবুল হোসেনের টিনশেড বাড়ির একটি কক্ষে। নিহতরা হলেন- বগুড়া জেলার ধুনট থানার নলডাঙা গ্রামের রুবেল আহমেদ (৩৫), তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তার বগুড়ার বড়িতলি এলাকার বাসিন্দা ও তাদের ৫ বছরের কন্যা সন্ত্রাস জামিলা। আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মজিবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে স্বামী তার স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন।
কুমিল্লায় মা-মেয়েকে, ভোলায় শিক্ষককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা
কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুরি এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও তার মাকে খুন করা হয়েছে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার কালিয়াজুরি এলাকার নেলী কটেজ নামে একটি ভবনের দ্বিতীয়তলা থেকে তাদের লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন- কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন (২৪) এবং তার মা তাহমিনা আক্তার (৫০)। প্রাথমিকভাবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই ধারণা করছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম। অপরদিকে ভোলায় দারুল হাদীস কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস ও সদর উপজেলা পরিষদ মসজিদের খতিব মাওলানা আমিনুল হক নোমানীকে (৪৫) নিজ বাসায় নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত ৮ সেপ্টেম্বর জেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে তার জানাজা থেকে তিন দফা কর্মসূচির ঘোষণা দেন ভোলা দারুল হাদীস কামিল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মাওলানা মোবাশ্বিরুল হক নাঈম। ওই তিন দফার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারে সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু ৯ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনিতে এক যুবকের প্রাণ নেওয়া হয়েছে। একই দিন ঢাকায় ভয়াবহ সংঘাতে লিপ্ত হয় কিশোর গ্যাংয়ের বিবাদমান দুটি গ্রুপ।
মোহাম্মদপুরে সংঘাতে কিশোর গ্যাং
গত ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে রনি খান (২০) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। এদিন সন্ধ্যায় পারটেক্স গলি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘দাঁতভাঙা সোহাগ’ গ্রুপের সদস্যরা প্রতিপক্ষ গ্যাং ‘পিচ্চি আবীর’ গ্রুপের সদস্য রনিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। আহতের বড় ভাই রকি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার ভাই এখন আর মোহাম্মদপুর এলাকায় থাকে না। বর্তমানে মেঘনা ভাটার চর এলাকায় সিনোবাংলা নামে একটি কোম্পানিতে চাকরি করে। কবে এখানে এসেছে আমরা জানি না। খবর পেয়ে হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসক জানিয়েছেন, মাথার হাড় ভেঙে গেছে, হাঁটুর হাড় প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, দাঁতভাঙা সোহাগ গ্রুপের সোহাগ ও রিপনসহ ১৫ থেকে ১৬ জন মিলে তার ভাইকে কুপিয়েছে। রায়েরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, আহত রনির বিরুদ্ধেও মোহাম্মদপুর থানায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতির প্রস্তুতির একাধিক মামলা রয়েছে। তার নামে দুটি গ্রেফতারি পরোয়ানাও ঝুলছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় ‘গণপিটুনিতে’ মো. আয়নাল হোসেন (৪২) নামে এক চিহ্নিত ডাকাত নিহত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ডাকাতি ও গণধর্ষণসহ অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের প্রভাকরদী কবরস্থানের পাশের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আয়নাল একই গ্রামের মহিজ উদ্দিনের ছেলে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন ব্যর্থ হচ্ছে সরকার?
এর আগে ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সরকারকে তুমুল সমালোচনার মুখে ফেলেছে। তখনো প্রশ্ন উঠছে- অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তের মাস পার হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন ব্যর্থ হচ্ছে? দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা, বিভিন্ন স্থানে হামলা, খুন-ধর্ষণের মতো ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। দল সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ না থাকলেও অপরাধী দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ ঠিকই উঠছে। মিটফোর্ডের ঘটনা ছাড়াও খুলনায় যুবদলের এক নেতাকে হত্যার পর পায়ের রগ কেটে দেয়া, চাঁদপুরে মসজিদের ভেতরে ইমামকে চাপাতি দিয়ে কোপানোসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা, চাঁদাবাজিসহ বহু ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এর আগে মার্চ মাসে ঢাকার কাছে মাদারীপুর জেলার সদর উপজেলায় আপন দুই ভাইসহ তিনজনকে মসজিদের ভেতরে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছিলো। অভিযোগ রয়েছে, অনেকে ক্ষেত্রেই সরকার কিংবা পুলিশ ঘটনা দেখেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতির ক্রমাবনতির জন্য ‘সরকারের সদিচ্ছা’ কতটা আছে সেই প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের আগ্রহটাই তাদের পদক্ষেপে প্রকাশ পায়নি বলেই পরিস্থিতি এ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। তাদের মতে, শুরু থেকে শৈথিল্য দেখিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে এখন মব সন্ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেছে।
গড়ে প্রতিদিন খুন হচ্ছে ১১ জন
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে খুন হয়েছেন ১ হাজার ৯৩০ জন। মাসভিত্তিক খুনের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। জানুয়ারিতে ২৯৪ থেকে জুনে এসে তা পৌঁছেছে ৩৪৩-এ। গড়ে প্রতিদিন খুন হচ্ছে ১১ জন। একই সময়ে সংঘটিত হয়েছে ৩৬৬টি ডাকাতি, অপহরণ ৫১৫ এবং ১১ হাজার ৮ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এসব তথ্য স্পষ্টভাবে একটি বিষয়ই নির্দেশ করছেÑ দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৩০টি, যার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ছিলো ৬৬টি। এর মধ্যে বাইশটি হলো ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা।
স্বীকারোক্তি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার
রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আয়োজিত নির্বাচনী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গত ৭ সেপ্টেম্বর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা বলেছেন তিনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এত দিন যেমন ছিল, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনায় আমি বলব, সেটা কিছুটা খারাপের দিকে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে দ্রুতই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।’ রাজবাড়ীর ঘটনায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘রাজবাড়ীর ঘটনা (নুরাল পাগলা) আমরা তদন্ত করে দেখছি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ হইনি। যারা এসব ঘটিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আসলে আমরা অনেকটাই অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছি। সমাজে ধৈর্যের অভাব তৈরি হয়েছে। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছি।’
সরকারের যে দুর্বলতা দেখছেন অভিজ্ঞরা
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠনে দীর্ঘসময় নেয়া ও পুলিশের ভয় কাটাতে বিলম্ব হওয়াকে দায়ী করছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার যে আগ্রহী- সেটি তাদের কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পায়নি কখনো। পুলিশের সাবেক আইজিপি এম নূরুল হুদা মনে করেন, পরিস্থিতি উন্নতি করতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক শৈথিল্য দেখানো হয়েছে। যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে অনেকে মনে করেছে অন্যায় করলে কোনো সাজা পেতে হবে না। মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন মনে করেন, সরকারের দিক থেকে যে পদক্ষেপ প্রত্যাশা করা হয়েছিলো তাতে ঘাটতি রয়েছে। ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের নাম দিয়ে কোনো অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আবার এগুলোকে হালকা করে দেখা মানে আইনের শাসনকে কুঠারাঘাত করার শামিল। আবার কোনো ঘটনা ঘটলেই একটি পক্ষ তাকে রাজনৈতিক রং দেয়ার যে চেষ্টা করছে, সেটিও অনেককে অপরাধে উৎসাহিত করছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিগত এক বছরেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি, মব ভায়োলেন্স ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় সীমা ছাড়িয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ভাঙাড়ি পণ্যের ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে (৩৯)। হত্যার আগে ডেকে তাকে নিয়ে যায় খুনিরা। পরে পিটিয়ে ও পাথর দিয়ে আঘাত করে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। হত্যার পর মৃতদেহের ওপরে লাফিয়ে উল্লাস করা হয়। এ ঘটনাটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়। এরপর হত্যার এ ধারাবাহিকতা কোথাও থেমে নেই। খুনের কারণ পাল্টাচ্ছে, কিন্তু খুন বন্ধ হচ্ছে না।