ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

দৃশ্যমান হচ্ছে ইসির তৎপরতা ভোটাধিকার পাচ্ছেন প্রবাসীরা


২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:০১

স্টাফ রিপোর্টার : ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরকারের নির্দেশনা অনুয়ায়ী আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভোট হচ্ছে- এমন টাইমলাইন মাথায় রেখে আগামী ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। জামায়াতে ইসলামীর জোরালো দাবির প্রেক্ষিতে দেশের বাইরে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার কারিগরদের (প্রবাসী) ভোটার করার উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। ভোটগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১০ লাখ জনবলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। এছাড়া দৃশ্যমান উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ভোটের নানা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা, কমিশন ইতোমধ্যে তা সংগ্রহ শুরু করেছে।
প্রবাসীদের ভোটাধিকার সুবিধা : আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ‘ডিজিটাল পোস্টাল ভোটিং’ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। এ উদ্যোগের ফলে মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা নিজ অবস্থান থেকেই ভোট প্রদান করতে পারবেন। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এবারই প্রথমবারের মতো প্রবাসীরা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। প্রবাসীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি-সহায়ক পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়া চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে ভোটার হিসেবে আবেদন ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা হবে। নিবন্ধিত ভোটাররা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন। পরবর্তীতে ডাকযোগে প্রেরিত ব্যালট পেপার পূরণ করে নির্দিষ্ট খামে রিটার্নিং অফিসারের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে। ভোটাররা তাদের ব্যালট পেপারের গন্তব্য অনলাইনে ট্র্যাক করার সুযোগও পাবেন।
ইসিতে পৌঁছাতে শুরু করেছে সরঞ্জাম
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সামগ্রী আসতে শুরু করেছে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, কয়েক মাস আগে দেওয়া কার্যাদেশের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই অন্তত ছয়টি সামগ্রী ধাপে ধাপে এনে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে সরঞ্জামের চালানগুলো আসতে শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের উপসচিব রাশেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচনী সরঞ্জামের মধ্যে লাল গালা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের লক, অফিসিয়াল সিল, মার্কিং সিল, বড় ও ছোট হেসিয়ান ব্যাগ সরবরাহ শুরু হয়েছে। বড় ও ছোট হেসিয়ান ব্যাগ চাহিদার সবগুলোই পৌঁছে গেছে বলেও জানানো হয়। বড় হেসিয়ান ব্যাগের চাহিদা ছিল ৭০ হাজার এবং ছোট হেসিয়ান ব্যাগের চাহিদা ছিল এক লাখ ১৫ হাজার। কেনাকাটা ও ইসিতে সরবরাহ শুরু হওয়া আট ধরনের মালামালের মধ্যে লাল গালার ২৩ হাজার কেজি চাহিদার এক-চতুর্থাংশ পৌঁছেছে, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের ৫০ লাখ লক চাহিদার মধ্যে পাঁচ লাখ লক সরবরাহ শুরু হয়েছে। ৮ লাখ ৪০ হাজার দাপ্তরিক সিলের চাহিদা রয়েছে, এর মধ্যে পাঁচ লাখ সেপ্টেম্বরের শুরুতে সরবরাহ হয়েছে। মার্কিং সিলের ১৭ লাখ ৫০ হাজার চাহিদার বিপরীতে দেড় লাখ সিল সরবরাহ শুরু হয়েছে। ব্রাশ সিল এবং গানি ব্যাগ রিটেন্ডার হওয়ায় সরবরাহ শুরু হয়নি। দুইটারই চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার করে। এদিকে নির্বাচনের সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরে আগস্টের শুরুতে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছিলেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব ধরনের নির্বাচনী সরঞ্জাম কেনাকাটা শেষ হবে। লোকাল পারচেজ প্রকিউরমেন্টে আটটি আইটেম ছিল। তার ভেতরে একটিতে পুনরায় দরপত্র দিতে হয়েছে। আমাদের যে সময়সীমা রয়েছে, তার মধ্যে সব সরঞ্জাম পাওয়া যাবে। ভোটের সামগ্রীর অধিকাংশই নির্বাচন কমিশন থেকে সরবরাহ করা হয়। তবে কিছু মনোহারি জিনিস রিটার্নিং অফিসারকে স্থানীয়ভাবেও সংগ্রহ করতে হয়। ভোট সামনে রেখে সুঁই-সুতা, দিয়াশলাই, আঠা ও কলম থেকে প্লাস্টিকের পাত- প্রতিটি কেন্দ্র ও বুথের জন্য এমন ২১ ধরনের জিনিস লাগে। আসনভিত্তিক ভোটার, ভোটকেন্দ্র ও সামগ্রিক প্রস্তুতি শেষ হলে তফসিল ঘোষণার পর আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা অফিসে ধাপে ধাপে তা বিতরণে যাবে। আর ব্যালট পেপারসহ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোটের আগেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো হয় সব সরঞ্জাম।
প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন দশ লক্ষাধিক কর্মকর্তা
নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে ইসি। ১০ লাখের বেশি প্রিজাইডিং-পোলিং অফিসারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বিভিন্ন গ্রুপে শুরু হওয়া এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভোট গ্রহণের চার-পাঁচদিন আগে শেষ হবে বলে জানিয়েছেন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের ইলেক্টোরাল ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট (ইটিআই) মহাপরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২৩ ধরনের কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় চার মাস সময় লাগবে। তবে নির্বাচন সংক্রান্ত মূল প্রশিক্ষণটা হবে প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের। এদের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি হবে বলে ইসি সচিবালয় জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের চ্যালেঞ্জটা একটু ভিন্ন। বিগত তিনটি নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এবার যতটুকু পারি ফ্রেশ লোক দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হবে। কমিশনের এমন চিন্তাভাবনা আছে। যেহেতু ফ্রেশ লোক আসবে। ওদের ইলেকশনের ধারণা কম হবে। সুতরাং তাদের প্রশিক্ষিত করতে ট্রেনিংটা আমাদের আরো ইনডেপথ করতে হবে। অলরেডি আমরা ভোটার তালিকায় হালনাগাদের সময় চ্যালেঞ্জ ফেইস করেছি। কাজেই আমরা নতুন নতুন লোক নেয়ার জন্য চেষ্টা করবো। যাতে একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেয়া যায়।
ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও অন্যান্য নির্বাচনী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিষয়ে ইসি ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সে অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পূর্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ‘ট্রেনিং অব কোর ট্রেনিং’ (টিওটি) সম্পন্ন করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নির্দেশনা প্রদান কার্যক্রম চলমান থাকবে। ইসির রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে টিওটি ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নির্দেশনা প্রদান করা হবে। টিওটি ট্রেইনারদের মধ্যে রয়েছে- নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ ও নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সব কর্মকর্তারা, সিনিয়র জেলা/জেলা নির্বাচন অফিসার, উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসার, সহকারী উপজেলা/সহকারী থানা নির্বাচন কর্মকর্তা, প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও অন্য বিভাগের কর্মকর্তা। পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে মাস্টার ট্রেইনারদের প্রশিক্ষণ (টিওটি) এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের প্রশিক্ষণ (টিওটি) প্রদান করা হবে। এ সময় ৩ হাজার ৬০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
ইসি সূত্র জানান, কমিশন ইতোমধ্যে তাদের রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী ১ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে মাঠ প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তা (বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কর্মকর্তা) ও সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ/ব্রিফিংয়ে যোগদানের অনুমতি প্রদানের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারদেরও প্রশিক্ষণ/ব্রিফিং করা হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মাঠ পর্যায়ে আচরণবিধি প্রতিপালনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে অনলাইনে প্রশিক্ষণ/ব্রিফিং করা হবে। আগামী ১ থেকে ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণ বা ব্রিফিং দেয়ার বিষয়টিও প্রস্তাবনায় রয়েছে। ভোট গ্রহণের পাঁচ থেকে সাত দিন পূর্বে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রশিক্ষণ বা ব্রিফিং দেয়া হবে। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ নির্বাচনের পূর্বের দুদিন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পর দুদিন মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন।
এ বিষয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান জানান, ‘নির্বাচনের প্রশিক্ষণ একটা লম্বা প্রক্রিয়া। হাতে যে কয়েক মাস সময় আছে এই সময়ের মধ্যেই নির্বাচন সংক্রান্ত ২৩ ধরনের প্রশিক্ষণ আমাদের শেষ করতে হবে। এখানে আমাদের কোর প্রশিক্ষণ আছে। কোর প্রশিক্ষণ হলো- নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যারা সিনিয়র কর্মকর্তা তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া। ওইসব কর্মকর্তা পরে একটি টিওটি প্রশিক্ষণ দেবে। টিওটি প্রশিক্ষণ হলো, প্রথম অংশ কোর প্রশিক্ষণ এবং দ্বিতীয় অংশ হলো টিওটি। এটা আমাদের উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের যারা কর্মকর্তা আছেন এবং যারা অন্যান্য ডিপার্টমেন্টের যারা আছেন, তাদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং দেওয়া হয়। ওদের নিয়ে আমরা টিওটি করি। এই সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের উপরে।
তিনি বলেন, এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলার প্রশিক্ষণের বিষয় আছে। এখানে ডিভিশনাল কমিশনার, ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, তাদের ট্রেনিং করা হবে। তারপরে ডিসি-এসপিদের বিভিন্ন ধাপে-ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এরপর ইউএনও-দের ট্রেনিং দেওয়া হবে। আনসারের প্রশিক্ষণ হবে। আবার টেকনিক্যাল যে বিষয় আছে, সে বিষয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় আমাদের যে প্রোগ্রামার ও অ্যাসিস্টেন্ট প্রোগ্রামার আছে, তাদের অর্থাৎ প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের মূল প্রশিক্ষণটা দিতে হবে। এদের সংখ্যাটা ১০ লাখের উপরে হবে। তিনি আরো বলেন, গত ২৯ আগস্ট থেকে আমাদের ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আর এটা শেষ হবে নির্বাচনের চার বা পাঁচ দিন আগে। আমাদের ট্রেনিং করানোর জন্য প্রায় চার মাস সময় লাগবে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইতোপূর্বে জানিয়েছিলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধেই ঘোষণা করা হবে । সেই সময়সীমা মাথায় রেখেই এগোচ্ছে কমিশন।