৪০ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল বাড়ল
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:২৩
স্টাফ রিপোর্টার : প্রায় ৪০ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন সেবা খাতে ট্যারিফ (মাশুল) বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ট্যারিফের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গড়ে ট্যারিফ বেড়েছে ৪১ শতাংশের মতো। সর্বশেষ ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন সেবা খাতে ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছিল। প্রায় ৪০ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকার বন্দরের ট্যারিফ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর রোববার দিবাগত রাতে নতুন ট্যারিফের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৫২টি খাতে ট্যারিফ আদায় করা হয়। সেখান থেকে ২৩টি খাতে সরাসরি বর্ধিত হারে ট্যারিফ আদায় অনুমোদন হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ জুলাই বন্দরের প্রস্তাবিত ট্যারিফ অনুমোদন করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। সে সময় একসঙ্গে গড়ে ৪১ শতাংশ হারে ট্যারিফ বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানায় বন্দর ব্যবহারকারীরা। এরপরই বিষয়টি নিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে একদফা আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু ব্যবহারকারীদের আপত্তি আমলে না নিয়েই প্রজ্ঞাপন জারি করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে মাশুল বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়েছিল, সেটিই বহাল থাকল। আর এতে করে বৃদ্ধি পাবে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যমূল্য।
১৯৮৬ সালের পর থেকে এবারই প্রথম সিপিএ বড় আকারে তাদের চার্জ বাড়াল। এর আগে ২০০৭-০৮ সালে কিছু নির্দিষ্ট সেবার (যেমন: টাগবোট, পানি সরবরাহ, জেটির ভাড়া) ফি বাড়িয়েছিল। নতুন ট্যারিফের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কনটেইনার পরিবহন খরচ। একটি ২০-ফুট কনটেইনারের গড় খরচ ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কনটেইনারে ৪ হাজার ৩৯৫ টাকা বেশি দিতে হবে। আমদানি কনটেইনারে খরচ বেড়েছে ৫ হাজার ৭২০ টাকা এবং রপ্তানি কনটেইনারে ৩ হাজার ৪৫ টাকা। এককভাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জাহাজ থেকে কনটেইনার লোড ও আনলোডের ক্ষেত্রে। ৪৩ দশমিক ৪০ ডলার (প্রায় ৫,২৮২ টাকা) থেকে বেড়ে ৬৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার টাকা বেড়েছে। কনটেইনারভিত্তিক পণ্য পরিবহনে প্রতি কেজির খরচ ১ দশমিক ২৮ টাকা থেকে বেড়ে ১ দশমিক ৭৫ টাকা হয়েছে, যা প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি পণ্যই বহির্নোঙরে হ্যান্ডল করা হয়। এক্ষেত্রে খরচ তুলনামূলকভাবে কম বাড়বে, কারণ সেগুলো বন্দরের জেটিতে ওঠানো-নামানো হয় না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম পারভেজ গণমাধ্যমকে বলেন, চার্জ বৃদ্ধি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, নতুন এই শুল্ক কাঠামো ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়াবে এবং দেশীয় উৎপাদকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি করবে। একইসঙ্গে রপ্তানিকারকরা বৈশ্বিক বাজারে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবেন। তিনি বলেন, ‘অদক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনার কারণে পণ্য ছাড়তে দেরি হচ্ছে, তার ওপর হঠাৎ এ শুল্ক বৃদ্ধি অযৌক্তিক।’ বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, তারা সরকারকে এক বছরের জন্য শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত স্থগিত করার অনুরোধ করেছিলেন, তবে তা গৃহীত হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার মূলত বেশিরভাগ জেটি বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ‘এই শুল্ক বৃদ্ধি বিদেশি অপারেটরদের লাভবান করতেই করা হয়েছে,’ বলেন তিনি।
সিপিএ সচিব ওমর ফারুক জানান, ব্যবসায়ীদের অনুরোধ সত্ত্বেও বাড়তি শুল্ক স্থগিত করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক এখনো অনেক কম। সরকার সম্ভবত এই বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়েছে। গত ২৪ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় শুল্ক বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়। এ নিয়ে আপত্তি ওঠায় ২৫ আগস্ট নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জাহাজ চলাচল উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। সেখানে ব্যবসায়ীরা আবারও এটি ধাপে ধাপে বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। বৈঠকে সিপিএ-এর ডেপুটি চিফ ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার কাজী মেরাজ উদ্দিন আরিফ এই শুল্ক বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এই বৃদ্ধির পরেও অন্যান্য প্রধান বৈশ্বিক বন্দরের তুলনায় শুল্ক এখনো কম। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এই বৃদ্ধিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ এম আরিফও এর বিরোধিতা করে বলেন, বন্দরের পাশাপাশি বার্থ অপারেটর ও বেসরকারি অফ-ডকের বাড়তি শুল্ক সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, বিদেশি শিপিং লাইনগুলোর কাছেও মালবাহী চার্জ বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকবে না, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।