সম্পাদকীয়

সময় এখন আত্মপর্যালোচনার


১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৬:১০

৩৬ জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরাট ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এদেশের তরুণ ছাত্র-জনতা রাজনীতিবিদদের কাছে সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে- রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়, রাজত্ব দখল নয়, জমিদার সেজে এলাকা ভাগ করে নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সেই এলাকার জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ধান্ধাবাজি কিংবা বিচার-সালিশের নামে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার লাইসেন্স নয়। রাজনীতি হলো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো সাহসী কাজ। রাজনীতি মানে জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে জনসেবার নাম। রাষ্ট্র নামের ভয়ংকর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্মচারীরা যেন জনগণের সেবক থেকে প্রভুতে পরিণত হয়ে তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করার সাহস না দেখায়, তা প্রতিহত করার দুঃসাহসী কাজই হলো রাজনীতি। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে যেন আর জনগণের অধিকার হরণের সাহস কোনো সরকার, রাষ্ট্র, প্রভাবশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দলের ব্যানারধারী দুর্বৃত্তরা দেখাতে না পারে, তার বিরুদ্ধে অতন্দ্রপ্রহরী হলেন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। তারা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে আরো শক্তিশালী হয়ে জনগণের বন্ধু ও সেবকে পরিণত হবেন।
উল্লেখিত রাজনীতির সংজ্ঞার উদাহরণ হয়ে ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাচ্ছে এ প্রজন্মের তরুণ-মেধাবী শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (জাকসু) বিপুল ভোটে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত যথাক্রমে ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ও ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ এর বিজয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের এ বার্তাই দিচ্ছে।
তাদের বিপুল বিজয় এবং বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের পরাজয়ের পর একটি মহল এ সত্য উপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনা না করে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর ভুয়া অপপ্রচার চালিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। তারা ভুলে গেছে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে জনগণকে; বিশেষ করে জেন-জি বলে পরিচিত তরুণ প্রজন্মকে বোকা বানানো সম্ভব নয়। বরং মিথ্যা অপপ্রচারকারী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে তাদের ঘৃণা আরো বাড়বে। সমাজ ও দেশ থেকে উল্লেখিত জঞ্জাল দূর করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এ তরুণরা জানবাজি রেখে সংগ্রাম করেছে। অতএব বড় দলটির উচিত এবার অপপ্রচার বন্ধ করা। নির্বাচন বর্জন নয়, মানবিক গুণাবলি অর্জন এবং রাজনীতির নামে ক্ষমতার দম্ভে জমিদার সেজে চাঁদাবাজি, জুলুম-নির্যাতন, দখল ও দুর্নীতি বর্জন করা। সেবার ব্রত নিয়ে কাজে আত্মনিয়োগ করা। হজরত আলী রা. বলেছেন, ‘নেতৃত্ব চাও, তবে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ কর।’
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা দেখতে পাচ্ছি দলান্ধরা তা বুঝতে চাচ্ছে না। অপপ্রচার অব্যাহতভাবে চালিয়েই যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক নামের একটি সংগঠন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ তুলে তা প্রত্যাখ্যান করে গত ১৫ সেপ্টেম্বর সোমবার একটি বিবৃতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ বিবৃতির কোথায় সংগঠনের পক্ষে কারা কারা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন, তাদের কোনো নাম খুঁজে পাওয়া গেলো না। অবশ্য এটি একটি ভালো লক্ষণ। দলীয় আদেশে বিবৃতি দিলেও সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে তারা নিজেদের মানহানি করতে চাননি হয়তো।
শিক্ষার্থীরা কেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ও ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’কে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছেনÑ এ সত্য আজ দিবালোকের মতো প্রকাশিত। যারা এতদিন ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়ে বিভ্রান্তির জালে বন্দি ছিলেন, তারাও আজ নির্দ্বিধায় বিভিন্ন মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে সত্য কথা বলছেন। রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও সত্য স্বীকার করতে গিয়ে মেকিয়াভেলির দর্শনের আশ্রয় নেননি।
আমরা আশা করি, দেশের সকল রাজনৈতিক দল এবং নেতা এখন আত্মসমালোচনা এবং আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমে নিজেদের জনগণের চাওয়ার উপযোগী করবেন। তারপর জনগণকে কিছু দেয়ার জন্য রাজনীতির মাঠে তৎপর হবেন। জনগণের ভালোবাসা এবং দেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তিগত এজেন্ডায় বন্দি হবেন না। রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে দুর্বৃত্তপনার হাতিয়ারে পরিণত করা থেকে বিরত থাকবেন।