অপরাধী শনাক্তকরণে প্রযুক্তি
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৩০
॥ ইবরাহীম খলিল ॥
বিশ্বজুড়ে অপরাধীরা যেমন অপরাধ সংঘটনে নতুন নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করছে. তেমনি অপরাধ ও অপরাধী শনাক্তকরণেও প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং সাফল্য অভাবনীয়। বলতে গেলে কয়েকগুণ এগিয়ে গেছে প্রযুক্তির ব্যবহার। এসব প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার অপরাধ দমনে বেশ কার্যকর বলে প্রমাণ হয়েছে। ধরা যাক, বিশ্ব জুলুমবাজ ইসরাইল থেকে বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার দেশের রাজনীতিবিদদের নজরদারি করার জন্য যে প্রযুক্তি কিনেছে, তার নাম স্পিয়ার হেড। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে আশপাশের প্রায় আধাকিলোমিটারের মধ্যে থাকা এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফেসবুক চ্যাট, যোগাযোগের তালিকা, কল ও টেক্সট মেসেজ সংগ্রহ করা যায়। এর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে সন্দেহভাজন অপরাধীদেরও শনাক্ত করা সম্ভব অপরাধ সংঘটনের আগেই।
ইসরাইলি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ যে সরঞ্জাম কিনেছে, তা মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট মাধ্যমে যোগাযোগের ওপর নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) কাছে এ প্রযুক্তি বিক্রি করেছে প্যাসিটোরা নামের একটি কোম্পানি। কোম্পানিটি সাইপ্রাসে নিবন্ধিত। তবে এটি পরিচালনা করেন ইসরাইলের গোয়েন্দা প্রযুক্তি ইউনিটের সাবেক কমান্ডার টাল দিলিয়ান। ইসরাইলি কোম্পানির তৈরি করা পেগাসাস স্পাইওয়্যার দিয়ে ৪৫টির বেশি দেশে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোনে আড়িপাতা হয়েছে।
এ সিস্টেমে রয়েছে নজরদারির সরঞ্জাম ও ট্র্যাকিং সফটওয়্যার দিয়ে সজ্জিত একটি ভ্যান। এটা সেলুলার ও ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মুঠোফোন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। আশপাশের প্রায় আধাকিলোমিটারের মধ্যে থাকা এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, ফেসবুক চ্যাট, যোগাযোগের তালিকা, কল ও টেক্সট মেসেজ সংগ্রহ করতে পারে। উইস্পেয়ার নিয়ে একটি উপস্থাপনায় বলা হয়, এর মাধ্যমে আওতার মধ্যে থাকা কম্পিউটার ও ফোনে আড়িপাতার জন্য স্পাইওয়্যারও প্রবেশ করিয়ে দেওয়া যায়।
এবার আসা যাক অপরাধী শনাক্তে আরও কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। সিসিটিভির ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট তো আছেই, অপরাধের তদন্তের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ভেহিকল থেফট অ্যান্ড রিকভারি ডাটাবেজ, মেটাল ডিটেক্টর, ডিজিটাল সার্ভিলেন্স ক্যামেরা, ডিএনএ টেস্ট, কলট্র্যাকিং, ওয়াকিটকি, ইলেক্ট্রনিক ট্রাফিক সাইনবোর্ড, মোবাইল ট্র্যাকিং ইত্যাদি প্রযুক্তিসেবার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও দমন করা সহজ হচ্ছে।
এখন কোথাও কোনো অপরাধ ঘটামাত্রই শুরু হয় ওই এলাকায় ব্যবহৃত মুঠোফোনের কল ও খুদেবার্তা আদান-প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষা, রাসায়নিক পরীক্ষা, ব্যক্তির বায়োমেট্রিক তথ্য, দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সূত্রবিহীন ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসছে অপরাধীরা।বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আলামত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে পুলিশ আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম। ঘটনাস্থল থেকে শরীরবৃত্তীয় আলামত যেমন রক্ত, বীর্য, লালা বা অন্যান্য উপাদান সংগ্রহের উপকরণ ও কৌশল এখন থানা পর্যায়েও ছড়িয়েছে। ফলে ঘটনা উদ্ঘাটনে এখন ফরেনসিক ও বায়োমেট্রিক আলামতের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সিআইডির পরীক্ষাগারের এসব আলামত বিশ্লেষণের সক্ষমতা রয়েছে।
অপরাধী শনাক্তে পুলিশ এখন তিনটি তথ্যভান্ডার কাজে লাগাচ্ছে। প্রায় এক যুগ ধরে কারাগারে যাওয়া সব সন্দেহভাজনেরই আঙুলের ছাপ, ডিএনএ, চোখের আইরিশসহ পাঁচ ধরনের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য সংগ্রহে রাখা হচ্ছে। থানাগুলোয় যাদের নামে মামলা হচ্ছে তাদের নাম, বিস্তারিত পরিচয় ও ছবি সংগ্রহে রাখছে পুলিশ। এছাড়া অপরাধী বা অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ শনাক্তে ব্যবহৃত হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার। ছদ্মপরিচয়ে থাকা কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পরে আঙুলের ছাপ দেওয়ামাত্রই জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার থেকে উঠে আসছে তাঁর পরিচয়। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার কোনো থানায়ও তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে সেটি খুব অল্প সময়েই জানা যাচ্ছে।
বোমা উদ্ধার ও অপসারণেও যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি। এখন ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুটি অত্যাধুনিক রোবট। দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটগুলো বোমা খোঁজা, নিষ্ক্রিয় করা থেকে শুরু করে দেয়াল ভাঙা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো কাজও করতে পারে। স্পর্শকাতর কোনো স্থানের নজরদারিতে পুলিশ ড্রোনও ব্যবহার করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি এখন অপরাধ বিশ্লেষণে ব্যবহার হচ্ছে। অপরাধের ধরন, সময়, স্থান ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে কোথায় কী ধরনের অপরাধ ঘটতে পারে, তা আগাম ধারণা দিয়ে থাকে এ প্রযুক্তি। যেমন- যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে চৎবফরপঃরাব চড়ষরপরহম টুল ব্যবহারে পুলিশের টহল কার্যক্রম আরো কার্যকর ও সময়োপযোগী হয়েছে।
সাম্প্রতিক খবর হলো, যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আওতায় আসছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এতে মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে গতিসীমা লঙ্ঘন করলেই হয়ে যাবে অটো মামলা। ফলে কমবে দুর্ঘটনা, বন্ধ হবে থ্রি-হুইলার যানবাহন ও ফিরবে শৃঙ্খলা। এ লক্ষ্যে ২৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশে ১ হাজার ৪২৭টি সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ওসব ক্যামেরায় ফুটেজ সংরক্ষণ থাকবে এক মাস পর্যন্ত। তাছাড়া বৃহত্তর একটি ডাটা সেন্টার, পাঁচটি কন্ট্রোলরুম ও ১৬টি চেকপোস্টের মাধ্যমে হাইওয়ে পুলিশের তত্ত্বাবধানে তা নিয়ন্ত্রিত হবে এই মহাসড়ক।
জানা গেছে, বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবারে সংযুক্ত এআই প্রযুক্তির ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ২৪ ঘণ্টা হাইওয়ে পুলিশের নজরদারিতে থাকবে এবং যানবাহনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বিআরটিএর সংযোগ পেলেই চালু হবে ডিজিটাল অটোফাইন সিস্টেম, যা চলতি বছর নভেম্বরের দিকে হয়ে যেতে পারে। মহাসড়কে অটোমেটিক নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ, যানবাহনের গতিপথ নির্ধারণ, হাইস্পিড ডিটেকশন ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যান এআই প্রযুক্তিতে দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। শক্তিশালী ক্যামেরায় থাকবে অন্ধকার ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায়ও রাস্তায় চলাচলরত যানবাহনের নম্বর প্লেটের স্পষ্ট ছবি ধারণ ও সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা।
আর মহাসড়কে যানজটসহ কোথাও কোনো ঝামেলা বা অপরাধের কারণে লোকসমাগম বেশি হলে আগাম সংকেত চলে যাবে মনিটরিং সেলে। তাছাড়া মহাসড়কে সেন্সরযুক্ত ক্যামেরা বসানোর পর কোনো যানবাহন আইন অমান্য করার পর পুলিশ না ধরলেও সমস্যা নেই। কারণ মামলার তথ্য যানবাহনের মালিকের ঠিকানা ও মোবাইল ফোনে চলে যাবে। ফলে মহাসড়কে কোনো যানবাহন অপরাধ করে পার পাবে না। এভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা হয় উন্নত বিভিন্ন দেশে যানবাহনের অপরাধ। মহাসড়কে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়াতে ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা, দাউদকান্দি ও চট্টগ্রাম জোন করা হয়েছে। শেষ হয়েছে ২৫০ কিলোমিটারজুড়ে ১ হাজার ৪২৭টি সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজও। এর মধ্যে ১৬টি লং ভিশন ক্যামেরা, ৪৭১টি ৪এমপি পিটিজেড ডোম ক্যামেরা, ৯২৪টি বুলেট ক্যামেরা ও ১৬টি চেক পয়েন্ট ক্যামেরা রয়েছে।
মোদ্দাকথা হলো- অপরাধ দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন সুফল বয়ে আনছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। একদিকে যেমন অপরাধীরাও প্রযুক্তি ব্যবহার করে দিন দিন চতুর হচ্ছে, তারা অপরাধের ধরন পরিবর্তন করছে। দক্ষ, প্রশিক্ষিত প্রযুক্তির জনবল তৈরি করতে না পারলে অপরাধের মাত্রা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এসব বিষয় প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এছাড়া প্রযুক্তির ব্যবহার যেন নাগরিকদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। প্রযুক্তিকে হতে হবে আইন ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে। নাগরিকদেরও সচেতনতা, তথ্য নিরাপত্তা জ্ঞান এবং প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামগ্রিকভাবে বললে, অপরাধ দমনে প্রযুক্তির ভূমিকা এখন অপরিহার্য। তবে প্রযুক্তি কেবল একটি উপকরণ, এর সঠিক ও নৈতিক ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে অপরাধ দমন কার্যক্রমকে সফল করে তুলতে। আমরা যদি প্রযুক্তিকে অপরাধের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন আর দুঃস্বপ্ন নয়। আমাদের এই দেশ এগিয়ে যাবে দুর্বার গতিতে।
লেখক : সাংবাদিক, অপরাধ বিশ্লেষক।