ক্যালিগ্রাফির প্রচার ও প্রসারে আমাদের দায়িত্ব
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:২৭
ইব্রাহীম মণ্ডল
রাসূল সা. ক্যালিগ্রাফি শিল্প এবং শিল্পীদের ভালোবাসতেন ও এ শিল্পের প্রচার এবং প্রসারে কাজ করেছেন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বদরের যুদ্ধে যেসকল বন্দী মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল, তাদের প্রত্যেককে দশজন মুসলমানকে লেখাপড়া শিক্ষা দেয়ার শর্তে মুক্তি দেয়া হয়। এ শিক্ষাদানের মধ্যে ক্যালিগ্রাফিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ থেকেই ক্যালিগ্রাফির প্রতি রাসূল সা.-এর ভালোবাসা গভীরতা নিরূপণ করা যায়। সে সময় শুধু রাসূল সা.-এর কাছে নয়, মুসলিম সমাজের সর্বস্তরে ক্যালিগ্রাফির এবং ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের কদর ছিল। মুসলিম শাসকগণ শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করতেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দান করতেন। আব্বাসীয় আমলে রাষ্ট্রনায়কগণ ক্যালিগ্রাফি চর্চা ও প্রসারে সহায়তা করতেন। অক্ষকে বিশেষভাবে বিন্যাসের মাধ্যমে সুন্দর আকর্ষণীয় রূপ দেয়া এবং ইসলামী আদর্শকে সামনে রেখেই অতীতে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোয় ক্যালিগ্রাফি চর্চা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ৩১নং আয়াতের আলোকেই বিশ্বাস করা হয়। যেহেতু প্রত্যেক বস্তু সম্পর্কে মহান আল্লাহ আদম আ.-কে সৃষ্টির পর অবহিত করা হয়েছিল। যেহেতু তাকে আরবী সম্পর্কেও অবহিত করা হয়েছিল এবং আদম আ.-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ‘আলআস্তু বি রাব্বিকুম’ আমি কি তোমার প্রভু নই। আদম আ. উত্তরে বলেছিলেন ‘ক্বলুবালা’ জী। এতে বলা যেতে পারে সেই ভাষা ছিল আরবী। মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করে একটি ভাষায় দিয়েছিল, তা হলো আরবী। বেহেশতের ভাষাও হবে আরবী, কুরআনের ভাষা আরবী।
ড. সুনীতি কুমার বলেছেন, প্রতি পাঁচ মাইল অন্তর মানুষের ভাষার পরিবর্তন হয়। রংপুরের মানুষ একরকম কথা বলে, সিলেটের মানুষ অন্যরকম, চট্টগ্রামের অনেক ক্ষেত্রে বোঝাই যায় না যে বাংলা ভাষায় কথা বলছে। উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেম শামসুল হুদা পাঁচভাগী বলেন, ‘আবহাওয়ার পরিবর্তনে মানুষের ভাষার পরিবর্তন। আরব গরম আবহাওয়ার দেশ। এখানে ‘তাসারু’ শব্দের অর্থ খুরমা। শীতপ্রধান দেশে অর্থাৎ ইংল্যান্ডের এরা তাকে টি উচ্চারণ করে ট্রামার অর্থাৎ খুরম ইংরেজি উচ্চারণ। বেহেশতে একই রকম আবহাওয়া থাকবে, সুতরাং অন্য কোনো ভাষাই থাকবে না, থাকবে শুধু আরবী ভাষা।
এসব তথ্য বিশ্লেষণে হযরত আদম আ.-এর পুত্র শীষ আ. আরবী বর্ণ বিন্যাসে উৎকর্ষ সাধন করেন। এমনি বংশাণুক্রমে তারাই আরবী ভাষার বিকাশ সাধন করেছেন। আব্বাসীয় আমলে মুসলিম সভ্যতার যখন স্বর্ণযুগ, তখন আরবী ভাষা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছিল বলে অভিমত পাওয়া যায়। এ তথ্য থেকেই আরবী ভাষা এবং ক্যালিগ্রাফি শিল্পের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়।
গ্রিক শব্দ কধষষড়ং মানে সুন্দর, এৎধঢ়যবরহ মানে মিলিতভাবে ‘ক্যালিগ্রাফিয়া’ থেকে ইংরেজি ‘ক্যালিগ্রাফি’, যার অর্থ সুন্দর লেখা, অর্থাৎ হস্তলিখন শিল্প।
পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা রয়েছে। আজ আমরা ভাষাগুলো যে নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ দেখি, তা একদিনে হয়নি। ক্যালিগ্রাফার শিল্পীদের হাতে ক্রমোন্নতির মাধ্যমে এ পর্যায়ে এসেছে। সব ভাষায়ই ক্যালিগ্রাফি করার চেষ্টা হয়েছে। চীনা, জাপানি, আরবী, ফার্সি, হিন্দি, বাংলা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ ও খ্যাতি অর্জন করেছে আরবী ক্যালিগ্রাফি। অবশ্য তার কতগুলো কারণ আছে। আরবী অক্ষর ২৯টি প্রত্যেক অক্ষরেই ফরাইজান্টাস এবং ভ্যাটিক্যাল স্বভাবের লেখার ক্ষেত্রে স্টোক বা গতি আনা সম্ভব। এ ফন্টগুলো যেকোনো নকশার সাথে সমন্বয় করে লেখা যায়। ডিজাইন করা যায়। ব্রাশিং যেন অনন্তে হারিয়ে যায়। দর্শকদের মুগ্ধ করে। মুসলিম শিল্পীরা প্রাণীর ছবি নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা আল্লাহর বাণী কুরআনের আয়াতকে শিল্পীর উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছে। আল্লাহ নিরাকার। তাঁকে আমরা দেখি না। তাঁর আপাতকে আমরা দেখি মনের মাধুরী মিশিয়ে। মনোজ্ঞ করা ইবাদত মনে করেছি। তারা কুরআনের আয়াতকে অসাধারণ লিপি চাতুর্য নির্মাণ করে উচ্চাঙ্গ শিল্পে রূপ দিয়েছে। কুরআনের আয়াতের মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক প্রেরণা কাজ করে, যা শিল্পীদের নান্দনিকতা প্রেরণা জাগিয়ে দেয়। এ ক্যালিগ্রাফি শিল্প বিশ্বের শিল্পীপ্রেমী মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে শিল্প শিল্পকলার ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। পাশ্চাত্যের বিমূর্ত শিল্পের জনক মন্ডিয়ান, কান্দিনেস্বী, পলক্লীকেও প্রভাবিত করেছে। এরা আরবী লেখার অর্থ না বুঝলে তাদের ক্যানভাসে আরবী লিখেছে।
পলক্লীর একটি পেইন্টিং ‘ডকুমেন্ট’। ছবিটির মধ্যে কতগুলোর আরবী অক্ষর ছাড়া আর কিছু নয়। এ ফন্টগুলো একটা ইলোয়েশন তৈরি করে দর্শকদের আজ মডার্ন বিশ্বে এ ক্যালিগ্রাফি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে ধর্মগত কারণে নয়। শিল্পের বৈশিষ্ট্যগত কারণে পূর্ণাঙ্গ শিল্পের বৈশিষ্ট নিয়েই। ক্যালিগ্রাফি একটি শিল্প। আরবী ক্যালিগ্রাফি ইউরোপীয় শিল্পেও প্রভাবিত করেছে। আরবী লেখার অনুকরণে নকশা করেছে। কাপড় বুননেও নকশায় আরবী লিপিকলার অনুকরণ করার চেষ্টা করেছে।
আধুনিক শিল্প আন্দোলনের অন্যতম দিকপাল পাবলো পিকাশের জন্ম স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলে। এ অঞ্চল আরবদের অধীনে ছিল প্রায় ৭শ’ বছর। এখানে কার নকশায় ইসলামী জ্যামিতিক মণ্ডনকলার প্রভাব স্পষ্ট। তার ছবিতেও ক্যালিগ্রাফি নকশাকলার প্রভাব দেখা যায়। আধুনিক শিল্প আন্দোলনের পথিকৃত বিখ্যাত শিল্পী আরি মাতিশ।
কবিতায় আছে মাতিসের রমণীর মতো মাতিস সারা জীবন রমণী এঁকেছেন মাতিসের রমণী আবার কাপড় ছাড়া শেষ জীবন ইরানের গালিচার নকশা দেখে শিল্পের সংজ্ঞাই পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তিনি বলতেন, একটি সঠিক শিল্প হলো সার্থক নকশা। শেষ জীবনে ইরানের গালিচার নকশা এঁকে গেছেন।
তার ছবি, রং ও ডিজাইন ইরানি গালিচা থেকে নেয়া। তিনি তার শিল্পে অবিমিশ্র রং ব্যবহারের পাশাপাশি সংস্থাপনের মাধ্যমে রং-এর আবেদন ফুটিয়ে তুলেছেন। বিমূর্ত শিল্পের মন্ডিয়ান ক্যালিগ্রাফি শিল্পে মুগ্ধ হয়েই বিমূর্ত শিল্প জন্ম দিয়েছেন। বিমূর্ত শিল্পে ফিগার নেই ফর্ম এসেছে। শিল্পীরা ক্যালিগ্রাফির আদলে ফর্ম ব্যবহার করেছেন। বলা যেতে পারে, পৃথিবীর বিমূর্ত মূলত এখান থেকেই তৈরি।
পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষা আরবী। বেহেশতের ভাষা আরবী, আরবী অক্ষর ইসলামী শিল্পকলায় দিয়েছে বিশিষ্ট রূপ ও শিল্পগত ঐক্য। আরবী লিপিকার ইসলামে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। চিত্রের স্থান দখল করে আছে আরবী ক্যালিগ্রাফি। সুন্দর লিপিই হচ্ছে শিল্পের মাধ্যমে ইসলামের বাণী প্রচারের উপায়। কুরআনের বাণী আল্লাহর বাণী, যা মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে।
আল্লাহকে আমরা দেখি না, কিন্তু তার বাণী তেলাওয়াতের সময় আমরা দেখি। তাই শিল্পীরা অক্ষরগুলোকে হৃদয়গ্রাহী করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছেন এবং তারা এ কাজ আল্লাহর ইবাদত মনে করেন। এজন্য ক্যালিগ্রাফি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র। কুরআনের এ ভাষাকে অবলম্বন করে যে লিখন শিল্প মুসলিম দেশগুলোয় গড়ে উঠেছে, তা সমস্ত বিশ্বের জন্য অতুলনীয়। শিল্প সম্পদ। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতকে সুন্দর হস্তাক্ষরের মাধ্যমে বিশেষভাবে অন্তরে গেঁথে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে।
কাজেই এ ভাষার একটা অলৌকিকতা আছে, তাই যুগে যুগে কুরআনের বাণীকে সুন্দর লিখক পদ্ধতিতে ধারণ করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে।
সুতরাং এক অর্থে হস্তলিখন কুরআন অলৌকিক পদ্ধতিতে উচ্চাঙ্গ শিল্পে পরিণত হয়েছে। এ লিখন পদ্ধতি তাই অলৌকিকতা ধারণ করে রাখার চেষ্টা করেছে। সুতরাং হস্তলিখন কুরআনের বাণী হচ্ছে অলৌকিক বাণীর শৈল্পিক রূপ ব্যঞ্জনা, মুসলমান শিল্পীরা একে উচ্চাঙ্গ শিল্পে পরিণত করেছে।
এ লিখন পদ্ধতি প্রকৃতি একক নয়, বহুবিধ তা হচ্ছে অক্ষরগুলো লম্ব এবং সমান্তরাল বহু স্বভাবের। এ দুটি বৈপরীত্যের মাধ্যমে শিল্পীরা লিপিকর্মে সৌন্দর্য নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। যেন আল্লাহ শব্দটিতে যে কয়টি অক্ষর আছে, সব কটিই লম্ব স্বভাবের। এ লম্ব স্বভাবটি সমান্তরাল স্বভাবের সাথে সমন্বিত হয়ে যে বৈচিত্র্য রূপ দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে, তা শিল্পকর্ম অতুলনীয়। ফুল, লতা-পাতা ও জিওমেট্রিক্যাল ফর্মের সাথে সঙ্গতি রেখে যে কোনোভাবে এ লিপিকে উপস্থাপন করা যায়। তাই আরবী ক্যালিগ্রাফি ব্যাপকভাবে উপস্থাপন করা যায়। অন্য কোনো ভাষার লিপি দ্বারা সম্ভবপর নয়। তাই আরবী ক্যালিগ্রাফি এত ব্যাপকভাবে বিকাশ লাভ করেছে।