রাসূল সা. প্রদর্শিত পানাহার পদ্ধতি


৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:০৩

ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস
আহার ও পানীয় মানবজীবনের অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। জীবন ধারণের জন্য পানাহারের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য-পানীয় মানুষের দেহ-মন সুস্থ ও সতেজ রাখার প্রধান উপকরণ। এগুলোর অভাবে মানুষের শরীর ভেঙে যায় এবং দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং কোনো কাজে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে না। পানাহার করা একদিকে একটি মৌলিক মানবীয় চাহিদা পূরণ; অন্যদিকে একটি ইবাদত। এটি মহান আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। হালাল রিজিক গ্রহণ বা পানাহার পদ্ধতি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পানাহারে তাঁর অনুসৃত নীতি নিয়ে আল-হাদীসের কোনো কোনো গ্রন্থে আলাদা অধ্যায়ও সন্নিবেশিত হয়েছে। মহানবী সা.-এর পানাহারে অনুসৃত নীতি অনুসরণ করলে আমাদের পানাহার ইবাদতের মধ্যে গণ্য হবে এবং মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা চান যেন বান্দারা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাহলে তিনি তাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেবেন। আর অকৃতজ্ঞ হলে তিনি তাদেরকে পাকড়াও করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তাহলে অবশ্যই তোমাদেরকে আমি আরো বেশি দান করব। আর যদি কুফরী কর (অকৃতজ্ঞ হও), তাহলে (জেনে রেখ যে) আমার আযাব বড়ই কঠিন।’ [সূরা ইবরাহীম : ৭]। এ প্রবন্ধে রাসূলুল্লাহ সা. প্রদর্শিত পানাহার পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।
পানাহারে আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশ করা: রাসূলুল্লাহ সা. পানাহারের সময় কীভাবে বসতেনÑ তার বর্ণনাও হাদীসের ভাষ্য থেকে পাওয়া যায়। আবু জুহাইফাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আমি কখনো হেলান দিয়ে পানাহার করি না। [আত-তিরমিযী]। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আমি তো (আল্লাহর) একজন দাস। তাই আমি সেভাবে আহার করি যেভাবে কোনো দাস আহার করে এবং সেভাবে বসি যেভাবে কোনো দাস বসে। [আখলাকুন্ নবী]। আবদুল্লাহ ইবন আমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা.-কে কখনো হেলান দিয়ে পানাহার করতে দেখা যায়নি এবং তাঁর পেছনে কারো পদক্ষেপ পড়েনি। [মুসনাদে আহমাদ] উবাই ইবন কা’ব রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী সা. (আহারের সময়) হাঁটু উঁচু করে বসতেন এবং হেলান দিয়ে বসতেন না। [আখলাকুন্ নবী]। মুসনাদে আহমাদ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. মাটির ওপর (মেঝেতে) বসতেন এবং মাটির ওপর (মেঝেতে) বসেই আহার করতেন। [বায়হাকী]।
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহামহিম আল্লাহ কোনো এক ফেরেশতাকে জিবরাইল আ. সহকারে মহানবী সা.-এর নিকট প্রেরণ করেন। ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ সা.-কে বললেন: মহান আল্লাহ আপনাকে দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি বেছে নেয়ার এখতিয়ার দান করেছেন। আপনি আল্লাহর বান্দা ও নবী হতে চান, নাকি রাজা নবী? রাসূলুল্লাহ সা. পরামর্শের জন্য জিবরাইল আ.-এর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। জিবরাইল আ. তাঁর হাতের ইশারায় বললেন, আপনি নিজেকে নিচু রাখুন। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, বরং আমি আল্লাহর বান্দা ও নবী হতে চাই। (রাবী বলেন) এরপর থেকে নবী সা. তাঁর মহান প্রভুর সাথে সাক্ষাতের (মৃত্যুর) পূর্ব পর্যন্ত কখনো হেলান দিয়ে আহার করেননি। [বায়হাকী]। ঠেস বা হেলান দিয়ে পানাহার করা সুন্নতি তরীকা নয়। তাই এভাবে পানাহার না করে সোজা হয়ে বসে পানাহার করতে হবে। অনুরূপভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে খাওয়া নিষেধ। রাসূল সা. বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যেন উপুুড় হয়ে পেটের ওপর ভর করে না খায়’। [আবু দাউদ ও ইবনু মাজাহ]।
দাঁড়িয়ে পানাহার না করা: কোনো পানীয় দাঁড়িয়ে পান করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। কেউ ভুলে গিয়ে পান করে থাকলে সে যেন তা বমি করে ফেলে’। [সহীহুল বুখারী] আনাস রা. বলেন, নবী করীম সা. নিষেধ করেছেন যে, কোনো লোক যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। আনাস রা.-কে দাঁড়িয়ে খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বললেন, ‘এটা তো আরো খারাপ এবং আরো নিন্দনীয়। [সহীহুল বুখারী]। কিন্তু বসার মতো জায়গা বা পরিবেশ না থাকলে অথবা অন্য কোনো অসুবিধা বা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পানাহার করা যায়। [বুখারী- মুসলিম]।
স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে পানাহার না করা: স্বর্ণ-রুপার পাত্র হচ্ছে কাফেরদের জন্য। যাতে অহংকার প্রকাশ পায়। সোনা-রুপার পাত্রে পানাহার করতে নবী করীম সা. নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা সোনা-রুপার পাত্রে পানাহার কর না। আর তোমরা রেশমী বস্ত্র পরিধান কর না। কারণ তা দুনিয়াতে কাফেরদের জন্য এবং আখিরাতে তোমাদের জন্য’। [সহীহুল বুখারী]। তিনি আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি রূপার পাত্রে পানাহার করে, সে ব্যক্তি নিজ উদরে জাহান্নামের আগুন পূর্ণ করে’। [সহীহুল বুখারী]।
খাবার পাত্রের মধ্যস্থল থেকে না খাওয়া: পাত্রের মধ্যস্থল থেকে খাবে না, বরং এক পার্শ্ব থেকে খাবে। [সহীহুল বুখারী]। রাসূল সা. বলেন, খাদ্যের মধ্যস্থলে বরকত নাযিল হয়। সুতরাং তোমরা পার্শ্ব থেকে খাও, মধ্যস্থল থেকে খেও না। [আত-তিরমিযী]। তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন পাত্রের ওপর (মাঝখান) থেকে না খায়। বরং পাত্রের নিচে (একধার) থেকে খায়। কারণ বরকত তার ওপর (মাঝখান) অংশে নাযিল হয়’। [ইবনু মাযাহ]।
সালাতের সময় হলে আগে খাবার খাওয়া : খাবার তৈরি হয়ে গেলে সালাতের সময় হলেও আগে খাবার খেয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা ক্ষুধার্ত অবস্থায় সালাত শুরু করলে একাগ্রতা থাকে না। এজন্য নবী করীম সা. বলেন, ‘সালাতের ইকামত হলে এবং রাতের খানা উপস্থিত হলে আগে খানা খেয়ে নাও’। [সহীহুল বুখারী]। তিনি আরো বলেন, ‘যখন কেউ খেতে বসবে তখন খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত সে যেন তাড়াহুড়া না করে, যদিও সালাতের ইকামত হয়ে যায়’। [সহীহুল বুখারী]
খাবার শুরু করার আগে ও পরে উভয় হাত ধৌত করা: খাওয়ার পূর্বে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। আর খাবার পরেও হাত ধোয়া জরুরি। রাসূল সা. খাবার পরে কুলি করেছেন এবং হাত ধুয়েছেন। [মুসনাদে আহমাদ]। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি হাতে গোশতের গন্ধ ও চর্বি না ধুয়ে তা নিয়েই ঘুমায়, অতঃপর কোনো বিপদ ঘটে, তাহলে সে যেন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ না করে’। [আবু দাউদ ও তিরমিযী]। এখানে বিপদ বলতে, হাত না ধুয়ে ঘুমানোর ফলে চর্বির গন্ধে তেলাপোকা, ইঁদুর বা অন্য কোনো প্রাণী হাত বা আঙুল কামড়াতে পারে। তাছাড়া এতে কোনো রোগ-ব্যাধি হওয়ারও সম্ভাবনা থাকতে পারে।
খাবার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ ও শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা: খাবারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ ও শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা সুন্নত। ইমাম আহমাদ বলেন, খাবারে ৪টি জিনিস জমা হলে সে খাবার পরিপূর্ণ হয়; খাবার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা, শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা, (একাধিক লোকের) অনেক হাত পড়া এবং তা হালাল হওয়া। [যাদুল মা‘আদ] বিসমিল্লাহ বলে শুরু করলে শয়তানের প্রভাব ও শরীক হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাসূল সা. বলেন, ‘অবশ্যই শয়তান (মুসলিমের) খাবার খেতে সক্ষম হয়; যদি খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ না বলা হয়’। [সহীহ মুসলিম]।
তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের কেউ নিজ বাড়িতে প্রবেশকালে এবং খাওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বললে, তখন শয়তান (তার সঙ্গীদের) বলে, ‘তোমাদের জন্য রাত্রিযাপনের স্থানও নেই এবং রাতের খাবারও নেই’। আর সে বাড়িতে প্রবেশকালে ‘বিসমিল্লাহ’ বললে এবং রাতে খাবার সময় না বললে শয়তান বলে, ‘তোমরা রাতের খাবার পেলে, কিন্তু রাত্রি যাপনের জায়গা নেই। আর যখন সে খাবার সময়েও বিসমিল্লাহ না বলে, তখন শয়তান বলে, ‘তোমরা রাত্রি যাপনের জায়গাও পেলে এবং খাবারও পেলে’। [সহীহ মুসলিম]। খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাাহ’ বলতে ভুলে গেলে নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে হয়। আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কোনো খাবার খাবে, তখন সে যেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। প্রথমে বলতে ভুলে গেলে স্মরণ হওয়া মাত্র বলবে, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আ-খিরাহু’। অর্থাৎ আল্লাহর নামে খাওয়ার শুরু ও শেষে। [আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী]। রাসূল সা. খাবার শেষে বলতেন, ‘“আল্লাহুম্মা আত্ব‘আমতা ওয়া আসক্বায়তা ওয়া হাদাইতা ওয়া আহ্য়াইতা, ফালাকাল হাম্দু ‘আলা মা আ’ত্বায়তা’। অর্থ: ‘হে আল্লাাহ! তুমি আমাকে আহার করিয়েছ, পান করিয়েছ, হেদায়াত দিয়েছ এবং আমাকে জীবিত রেখেছ। সুতরাং তুমি যা আমাকে দিয়েছ, তার জন্য তোমার সমস্ত প্রশংসা’।” [মুসনাদে আহমাদ]।
ডান হাতে পানাহার করা: ডান হাতে পানাহার করতে হবে। রাসূল সা. বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার বাম হাত দ্বারা না খায় এবং পান না করে। কারণ শয়তান তার বাম হাত দিয়ে পানাহার করে থাকে’। বর্ণনাকারী বলেন, নাফে রা. দুটি কথা আরো বেশি বলতেন, ‘কেউ যেন বাম হাত দ্বারা কিছু গ্রহণ না করে এবং অনুরূপভাবে তা দ্বারা কিছু প্রদানও না করে’। [সহীহ মুসলিম]। ওমর বিন আবী সালামাহ রা. বলেন, আমি শৈশবকালে রাসূল সা.-এর সাথে খাবার সময় আমার হাত পাত্রের যেখানে-সেখানে পড়লে তিনি আমাকে বললেন, ‘হে বৎস! বিসমিল্লাহ বল, তোমার ডান হাত দিয়ে খাও এবং নিজের পার্শ্ব থেকে খাও’। [সহীহুল বুখারী] একদা এক ব্যক্তি রাসূল সা.-এর নিকট বাম হাত দিয়ে কিছু খাচ্ছিল। তিনি তা লক্ষ করে তাকে বললেন, ‘তুমি ডান হাত দিয়ে খাও। সে বলল, আমি পারি না। রাসূল সা. বললেন, তুমি যেন না পার। অহংকারই ওকে (আদেশ পালনে) বিরত রেখেছে। রাবী সালামাহ বলেন, ‘সুতরাং (এই বদ দোয়ার ফলে) সে আর তার হাতকে মুখ পর্যন্ত উঠাতে পারেনি’। [সহীহ মুসলিম]। তবে যার ডান হাত নেই অথবা ডান হাত ব্যবহার করার ক্ষমতা নেই, সে বাম হাত ব্যবহার করবে।
খাবার শেষে আঙুল ও প্লেট চেটে খাওয়া: খাবার শেষে আঙুল ও প্লেট চেটে খাওয়া উচিত। রাসূল সা. এরূপ করতেন এবং অপরকে করতে আদেশ করতেন। তিনি বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ খাবার খায়, তখন সে যেন তার আঙুল চেটে খাওয়ার আগে তা না মুছে বা না ধোয়’। [সহীহুল বুখারী]। জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. বলেন, ‘নবী করীম সা. আঙুল ও প্লেট চেটে খেতে আদেশ করেছেন এবং বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ খাবার খাবে আঙুল ও প্লেট চেটে না খেয়ে হাত মুছবে না। কেননা সে জানে না যে, কোন খাবারে বরকত আছে’। [মুসনাদে আহমাদ]। অন্য বর্ণনায় আছে, শেষের খাবারে বরকত নিহিত আছে। [নাসাঈ]।
খাবার শেষে কুলি করা: খাবার শেষে কুলি করা, যাতে খাদ্যের অবশিষ্টাংশ মুখ থেকে বের হয়ে যায়। রাসূল সা. খাবার শেষে কুলি করতেন। [সহীহুল বুখারী] খাবার শেষে দস্তরখানা ও থালা-বাসন উঠানোর সময় নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করার নির্দেশ রয়েছে। ‘আল-হামদু লিল্লাহি হাম্দান্ কাছীরান্ ত্বাইয়্যিবাম্ মুবা-রাকান্ ফীহি গায়রা মাকফিইয়্যিন ওয়ালা মুওয়াদ্দাঈন ওয়ালা মুস্তাগ্নান্ আনহু রাববানা’। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা তোমার, অধিক অধিক প্রশংসা, যা পবিত্র ও বরকতময়। হে প্রভু! তোমার অনুগ্রহ হতে মুখ ফিরানো যায় না, আর এর অন্বেষণ ত্যাগ করা যায় না এবং এর প্রয়োজন হতে মুক্ত থাকা যায় না’। [সহীহুল বুখারী]।
খাবারের কোনো কিছু পড়ে গেলে তা উঠিয়ে পরিষ্কার করে খাওয়া: পড়ে যাওয়া খাবার তুলে নিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে খাওয়ার নির্দেশ এসেছে হাদীসে। কারণ ঐ পতিত খাবারে বরকত থাকতে পারে। রাসূল সা. বলেন, ‘তোমাদের কারো খাবারের লোকমা হাত থেকে পড়ে গেলে তার ময়লা দূর করে সে যেন তা খেয়ে ফেলে। আর শয়তানের জন্য তা ছেড়ে না দেয়। তিনি আমাদেরকে প্লেট চেটে খাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, তোমরা জান না যে, তোমাদের কোন্ খাবারে বরকত আছে’। [মুসনাদে আহমাদ]।
পানীয়তে মাছি পড়লে তা ডুবিয়ে দিয়ে তুলে ফেলা: পানীয়তে মাছি পড়লে সেটিকে সরাসরি না তুলে পূর্ণরূপে তাতে ডুবিয়ে, অতঃপর তা তুলে ফেলে পান করা উচিত। রাসূল সা. বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়বে, তখন তাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দিবে। তারপর তাকে বাইরে ফেলে দিবে। কারণ তার দুটি ডানার মধ্যে একটিতে আছে রোগজীবাণু এবং অপরটিতে আছে রোগমুক্তি’। [সহীহুল বুখারী] মাছি যে ডানাতে রোগজীবাণু থাকে সেটিকে ডুবিয়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। অতএব তা সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেওয়ার পর ফেলে দেওয়া উচিত।
গরম খাবার ঠাণ্ডা হলে খেতে শুরু করা : অধিক গরম খাবার খেলে জিহ্বা বা মুখ পুড়ে যেতে পারে এবং খাবারের আসল স্বাদও আস্বাদন করা যায় না। বেশি গরম খাবার গিলে ফেললে পেটেরও কোনো ক্ষতি হতে পারে। এজন্যই খাবার ঠাণ্ডা করে খেতে হবে। নবী করীম সা. বলেন, ‘(খাবারের বেশী গরমভাব দূর করে খেলে) তাতে বরকত বেশি হয়’। [মুসনাদে আহমাদ] আবু হুরায়রা রা. বলেন, ‘ভাপ না চলে যাওয়া পর্যন্ত কোনো খাবার খাওয়া উচিত নয়’। [বায়হাকী]
খাদ্য ও পানীয়তে ফুঁ দিয়ে না খাওয়া: গরম খাবার ঠাণ্ডা করার জন্য অথবা পানীয়তে পতিত কোনো ময়লা দূর করার জন্য ফুঁ দেওয়া উচিত নয়। আর আহার্য বা পানপাত্রে নিঃশ্বাস ছাড়া যাবে না। কারণ এর ফলে খাদ্য ও পানীয়তে ফুঁকের সাথে নির্গত কার্বনডাই-অক্সাইড গ্যাস মিশ্রিত হতে পারে। ফলে সে দূষিত গ্যাস শরীর ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। নবী করীম সা. বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কিছু পান করে, তখন সে যেন পানপাত্রে নিশ্বাস না ছাড়ে অথবা ফুঁ না দেয়’। [সহীহুল বুখারী]। তিনি খাদ্য ও পানীয়তে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। [মুসনাদে আহমাদ]।
পানীয় তিন নিশ্বাসে পান করা: পানীয় এক নিশ্বাসে পান না করে তিন নিশ্বাসে পান করতে হবে। রাসূল সা. তিন নিশ্বাসে পানি পান করতেন এবং বলতেন, ‘এতে বেশি তৃপ্তি আসে বা পিপাসা নিবারণ হয়, পিপাসার কষ্ট থেকে অথবা কোনো ব্যাধি সৃষ্টির হাত থেকে বাঁচা যায় এবং হজম, পরিপাক ও দেহের উপকার বেশী হয়’। [সহীহুল বুখারী]। এর অর্থ এই নয় যে, এক নিশ্বাসে পানি পান করা বৈধ নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, এক নিশ্বাসে পান করা অপেক্ষা তিন নিশ্বাসে পান করা উত্তম। কোনো পানীয় পান করার সময় পাত্রের বাইরে ৩ বার নিশ্বাস ফেলবে। [সহীহুল বুখারী] পানির পাত্রে বা খাবারে নিশ্বাস ছাড়বে না বা ফুঁ দেবে না। [সহীহুল বুখারী] কলসী, জগ বা এ জাতীয় পাত্রের মুখে মুখ লাগিয়ে পান করা উচিত নয়। নবী করীম সা. এভাবে পান করতে নিষেধ করেছেন। [সহীহুল বুখারী]। এভাবে পানি পান করলে জগ বা কলসীর ভিতরে কোনো ময়লা বা পোকা-মাকড় থাকলে তা পেটে চলে যেতে পারে। তাছাড়া এভাবে পান করলে সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু অন্যের মাঝে সংক্রমিত হতে পারে।
একাকী না খেয়ে একত্রে খাওয়া: একাকী না খেয়ে একাধিক লোক একত্রে খাওয়া ভালো। এতে বরকত রয়েছে। নবী করীম সা. বলেন, ‘একজনের খাবার ২ জনের জন্য, ২ জনের খাবার ৪ জনের জন্য এবং ৪ জনের খাবার ৮ জনের জন্য যথেষ্ট’। [সহীহ মুসলিম]। তিনি বলেন, ‘তোমরা এক সাথে খাও এবং পৃথক পৃথক খেয়ো না। কারণ জামাতের সাথে (খাবারে) বরকত আছে’। [ইবনে মাযাহ]। একদা সাহাবীগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা খাই, কিন্তু পরিতৃপ্ত হই না। তিনি বললেন, সম্ভবত তোমরা পৃথক পৃথক খাও। তাঁরা বললেন, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা খাবারে এক সাথে বস এবং আল্লাহর নাম নাও, তাহলে তোমাদের খাবারে বরকত হবে’। [মুসনাদে আহমাদ]। তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় খাবার হল সেই খাবার, যার ওপর অনেক হাত পড়ে’। [আল-মুজামুল আওসাত]। তবে একাকী খাওয়াও বৈধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথক পৃথকভাবে আহার কর তাতে তোমাদের জন্য কোনো অপরাধ নেই’। [সূরা আন-নূর: ৬১] যে ব্যক্তি খাবার পরিবেশন করবে তার জন্য মুস্তাহাব হল যে, সে সবার শেষে খাবে। রাসূল সা. এরূপ করেছেন ও বলেছেন, ‘যে লোকদেরকে পানি পান করায়, সে যেন সবার শেষে পান করে’। [সহীহ মুসলিম]।
একাধিক লোক এক পাত্রে খাবার খেলে বেশি খাওয়ার চেষ্টা না করা: একত্রে খাবার খাওয়ার সময় সবার চেয়ে বেশি খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। বরং সবার চেয়ে কম খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে সকলের সমান খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। আর খাবার সময় ভালো জিনিসটি আগে-ভাগে তুলে না খাওয়া এবং বড় বড় লোকমা ধরে না খাওয়া। একটির স্থলে দুটি এক সাথে তুলে খাওয়া এবং স্বাভাবিকতার সীমালঙ্ঘন করে গোগ্রাসে খাওয়া সমীচীন নয়। রাসূল সা. সঙ্গীর অনুমতি ব্যতীত এক সঙ্গে দুটি করে খেজুর খেতে নিষেধ করেছেন। [সহীহুল বুখারী]। কেউ কাউকে খাবার জন্য আহ্বান করলে এবং ক্ষুধা ও খাবারের চাহিদা থাকলে এগুলো গোপন করে মিথ্যা ওযর পেশ করে খাওয়ার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। [মুসনাদে আহমাদ]।
খাদ্যের দোষ বর্ণনা না করা প্রস্তুতকারীকে খাবারে শরীক করা: খাদ্যের কোনো প্রকার ত্রুটি বর্ণনা না করে তা পছন্দ হলে খেতে হবে অন্যথা খাবে না। কারণ তাতে রাঁধুনী মনে কষ্ট পায়। মহানবী সা. কখনো খাবারের ত্রুটি বর্ণনা করতেন না। কিছু খেতে ইচ্ছা হলে খেতেন, না হলে তা বর্জন করতেন। [সহীহুল বুখারী]। খাদেম দ্বারা খানা প্রস্তুত করলে খাবারে তাকেও শরীক করাতে হবে। খাবার তৈরিতে খাদেম পরিশ্রম করে, খাদ্যের সুগন্ধ তার নাকে যায় এবং হয়তো তার মন ঐ খাবারের প্রতি আকৃষ্টও হয়। এজন্যই রাসূল সা.-এর নির্দেশ হল, তাকে বসিয়ে এক সাথে খাওয়া। আর তাকে বসানো যদি সম্ভব না হয় বা সে বসতে না চায়, তাহলে সেই খাবার হতে কিছু অংশ তুলে তাকে দেওয়া। [সহীহুল বুখারী]।
খাবারের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা: এতো অধিক খাবার না খাওয়া যাতে স্বাভাবিক নড়াচড়ায় সমস্যা হয়। আবার বেশি খেলে পেটের পীড়া ও শরীর ভারী হতে পারে। ফলে ইবাদতে অলসতা আসতে পারে। আর বেশি খাওয়া আসলে কাফেরদের অভ্যাস। রাসূল সা. বলেন, ‘মুসলিম খায় একটি মাত্র অন্ত্রে, পক্ষান্তরে কাফের খায় সাত অন্ত্রে। [সহীহুল বুখারী]। তিনি আরো বলেন, ‘উদর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর কোনো পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের জন্য ততটুকু খাদ্যই যথেষ্ট যতটুকুতে তার পিঠ সোজা থাকে। আর যদি এর চেয়ে বেশি খেতেই হয়, তাহলে সে যেন তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ব্যবহার করে’। [আত-তিরমিযী]। তবে এত কম খাওয়াও ঠিক নয়, যাতে শরীর ভেঙে যায়। কারণ স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়লে ইবাদতেও দুর্বলতা আসবে। সুতরাং পানাহারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত।
দাওয়াত খেলে মেজবানের জন্য দোয়া করা : কারো বাড়িতে মেহমান হলে মেজবানের জন্য দো‘য়া করা সুন্নাত। মেহমান মেযবানের জন্য এ দো‘য়া করবে, ‘আল্লাহুম্মা আত্ব‘ইম মান আত্ব‘আমানী ওয়াসক্বি মান সাক্বানী’। ‘হে আল্লাহ! যে আমাকে খাওয়ালো তাকে তুমি খাওয়াও। আর যে আমাকে পান করাল তাকে তুমি পান করাও’। [সহীহ মুসলিম]। যে মজলিসে যে অনুষ্ঠানে কোনো হারাম খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করা হয়, সেখানে যাওয়া মুসলমানের জন্য বৈধ নয়। রাসূল সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন কখনোই সেই ভোজ অনুষ্ঠানে না বসে যাতে মদ পরিবেশিত হয়’। [আত-তিরমিযী]। পানাহারে পছন্দ ও অপছন্দ: সাধারণভাবে যে কোনো হালাল খাদ্য ও পানীয় গ্রহণে রাসূলুল্লাহ সা. এর কোন প্রকার অনীহা বা অনাগ্রহ ছিল না। যেমন- তিনি মাছ, গোশত, রুটি, খেজুর ইত্যাদি স্বাভাবিক খাবার ছাড়াও খেজুর গাছের রস, খেজুর গাছের মাথি, শসা, দুধ, নাবীয, মধু, সিরকা, যাইতূনের তেল ও ঘি খেয়েছেন। তবে কিছু কিছু খাবারকে তিনি অন্য খাবারের তুলনায় অধিক পছন্দ করতেন। কিন্তু অমুক খাবারটা না হলেই নয় অথবা অমুক খাবারটা আমার চাইÑ এরূপ কোনো মানসিকতা তাঁর কখনোই ছিল না।
লাউ বা কদুর তরকারী খাওয়া: আনাস রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী সা.-এর খুবই পছন্দনীয় (তরকারী) ছিল কদু। [মুসনাদে আহমাদ] আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. কদু খুবই পছন্দ করতেন। অতএব আমাদের নিকট কদু তরকারি থাকলে আমরা তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাঁকে দিতাম। [আখলাকুন্ নবী]। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত যে, কদু তরকারি ছিল নবী সা.-এর খুবই প্রিয়। অতএব আমি তাঁর নিকট কখনো কদুর তরকারী নিয়ে আসলে তিনি তা আঙুল দিয়ে তালাশ করে খেতেন। [মুসনাদে আহমাদ] অন্য বর্ণনায় আনাস রা. বলেন: কদুর প্রতি রাসূলুল্লাহ সা. এর বিশেষ আকর্ষণের কারণে আমিও তা পছন্দ করি। [মুসনাদে আহমাদ]। আতা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: তোমাদের উচিত বেশি বেশি কদু খাওয়া। কেননা এটি বুদ্ধি বাড়ায় এবং স্মরণশক্তি প্রখর করে। [বায়হাকী]। হাকীম ইবনে জাবির আল-আহমাসী রা. থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত, তিনি (জাবির) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সা. এর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর সামনে কদু দেখতে পেলাম। আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ! সা. এ কী? তিনি বললেন: এর দ্বারা আমি আমার পরিবারের সদস্যদের খাদ্যে পরিবৃদ্ধি ঘটাই। [আত-তাবারানী]। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সা. প্রচুর পরিমাণে কদু তরকারি খেতেন। আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি প্রচুর পরিমাণে কদু তরকারি কেন খাচ্ছেন? তিনি বললেন: কদু মগজের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং স্মরণশক্তি প্রখর করে। [আখলাকুন নবী]
পিঠ, কাঁধ এবং বাহুর গোশত খাওয়া: হালাল পশু-পাখির গোশতের মধ্যে পিঠ, কাঁধ এবং বাহুর গোশতই ছিল রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট বেশি পছন্দনীয়। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: গোশতের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে পিঠের গোশত। [আল-মুসতাদরাক]। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সা. বকরীর কাঁধের গোশতই সর্বাধিক পছন্দ করতেন। [আখলাকুন্ নবী]। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. এর নিকট কাঁধের গোশতই অধিক পছন্দনীয় ছিল। [আখলাকুন্ নবী]। আয়েশাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. এর নিকট বাহুর (সামনের পা) গোশতই অধিক প্রিয় ছিল। [আখলাকুন্ নবী] যাহদাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবূ মূসা আল-আশ’আরীর নিকট উপস্থিত হলাম। তখন তিনি মুরগির গোশত খাচ্ছিলেন। তিনি বললেন: কাছে এসো এবং খাও। কেননা আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে মুরগির গোশত খেতে দেখেছি। [আত-তারাবনী]। উপরোক্ত বর্ণনাসমূহ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সা. মুরগি, বকরী ও উট ইত্যাদির গোশত খেতেন। গোশতের মধ্যে তিনি পিঠ, বাহু, রান ও কাঁধের গোশত অধিক পছন্দ করতেন।
মিষ্টি জাতীয় খাবার: মিষ্টি জাতীয় খাবারের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা. -এর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তিনি দুধ, দুগ্ধজাতীয় অন্যান্য খাবার, মধু এবং হালুয়া ইত্যাদি পছন্দ করতেন। বিশেষ করে খেজুর ছিল তাঁর একান্ত পছন্দনীয় খাদ্য। দিনের কোনো না কোনো অংশে তিনি অবশ্যই খেজুর খেতেন। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. মধু ও মিষ্টি দ্রব্যাদি খেতে পছন্দ করতেন। [মুসনাদে আহমাদ]। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: মুহাম্মদ সা.-এর পরিবার একদিনে যখনই দুইবার আহার করেছেন তার মধ্যে একবার খেজুর খেয়েছেন। [সহীহুল বুখারী]। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূল সা.-এর খেদমতে তাজা খেজুর পেশ করলে তিনি পাকাগুলো খেতেন এবং আধাপাকাগুলো ত্যাগ করতেন। [আখলাকুন নবী]। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ‘আজওয়া (নামের) খেজুর অত্যধিক প্রিয় ছিলো। [কানযুল ‘উম্মাল]। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন যে, যে ঘরে খেজুর নাই সে ঘরের লোকেরা অভুক্ত। [আবু দাউদ]। এক হাদীসে তিনি বলেন- যে ব্যক্তি রোজ সকালে উঠে খালি পেটে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে তার উপর (ঐদিন) বিষ অথবা যাদুটোনা ক্রিয়া করবে না। [সহীহ মুসলিম]।
আবু হুরাইরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন: আজওয়া জান্নাতের খেজুরের অন্তর্ভুক্ত এবং তাতে বিষের নিরাময় বিদ্যমান। [মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ]। আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সা.-কে তাজা খেজুরের সাথে শসা খেতে দেখেছি। [মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ]। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সা. তাজা খেজুরের সাথে তরমুজ মিশিয়ে খেতেন। [আত-তারাবানী]। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সা. তাজা খেজুরের সাথে তরমুজ মিশিয়ে খেতেন। আর বলতেন, এটির উষ্ণতা দিয়ে ঐটির শীতলতা এবং এইটির শীতলতা দিয়ে ঐটির উষ্ণতা দূর করব। [আবু দাউদ]। জাবির রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সা. তাজা খেজুরের সাথে খরবুযা খেতেন এবং বলতেন: উভয়টিই বড় উত্তম ফল। [বায়হাকী]। ‘আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সা. তাজা খেজুরের সাথে তরমুজ খেতেন এবং লবণ মিশিয়ে শসা খেতেন। [আবু দাউদ]।
সমাপনী: পরিশেষে রাসূল সা.-এর এসকল হাদীসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, খাদ্য ও পানীয়ের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা. সবসময় সংযম ও অল্পে তুষ্টির নীতি অবলম্বন করতেন। যখন যা সামনে আসতো তাই তিনি সন্তুষ্টচিত্তে খেয়ে নিতেন। এবং এর জন্য মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। কখনো কোনো খাবারের সমালোচনা করতেন না। খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে নিতেন। দস্তরখানা বিছিয়ে খাওয়া দাওয়া করতেন। উপস্থিত লোকদের সাথে নিয়েই খেতে বসতেন। অল্প পরিমাণ খাবার মুখে নিতেন এবং তা ভালোভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতেন। বেশিরভাগ সময় খাওয়ার কাজে তিন আঙুল ব্যবহার করতেন। আঙুলে লেগে থাকা খাদ্য-কণাগুলো ভালো করে চেটে নিতেন। কোনো কিছুতে হেলান দিয়ে বসে পানাহার করতেন না। বিসমিল্লাহ বলে খাবার শুরু করতেন। খাওয়া শেষে হাত ধুতেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করতেন।
রাসূলুল্লাহ সা. পেট পুরে খাওয়া পছন্দ করতেন না। কোনো কোনো দিন তিনি শুধু খেজুর খেয়েই কাটিয়ে দিতেন। এমন কখনো হয়নি যে, একই দিনে দু’বেলা তিনি গোশত-রুটি খেয়েছেন। পানীয়ের মধ্যে ঠাণ্ডা পানি ছিল তাঁর বেশি পছন্দ। তরল জিনিস পান করার সময় তিনবার বিরতি দিয়ে শ্বাস নিতেন। ক্ষীর বা পায়েস রান্নার সময় পাতিলের তলায় হালকাভাবে যেটুকু লেগে যায় তা খেতে খুব পছন্দ করতেন। কেউ খাওয়ার জন্য দাওয়াত করলে দাওয়াত গ্রহণ করতেন এবং নিজেও অন্যদের দাওয়াত করে খাওয়াতেন। খাওয়ার সময়ও বিভিন্ন নসিহতপূর্ণ কথা বলতেন। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর তিনি কাইলূলাহ (বিছানায় শুয়ে একটু আরাম) করতেন। রাতের খাবার যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতেন এবং সাথে সাথেই বিছানায় যেতেন না। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে পানাহারে রাসূল সা. এর অনুসৃত নীতি মেনে সুস্থভাবে জীবনযাপন করে আল্লাহর ইবাদত করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ ও নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জীবনকথা, পাবনা।