প্যারিসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালিত

সোনার বাংলা অনলাইন
১৫ জুন ২০২৬ ১৯:৩১

প্যারিসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালিত

ফ্রান্স থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছে দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। প্রবাসী বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ এবং আদর্শিক অঙ্গীকারের এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

প্যারিসের স্থানীয় ‘সোনার বাংলা’ রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত এ সভায় ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিএনপি, যুবদল এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানস্থলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফ্রান্স যুবদলের সহ-সভাপতি বাছিত হোসেন। যৌথভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ফ্রান্স যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক সাব্বির আহমেদ এবং জিয়া সাইবার ফোর্স ফ্রান্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি কায়সার আহমেদ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাবেক ছাত্রনেতা মোহাম্মদ মামুন উপস্থিত অতিথি ও নেতাকর্মীদের স্বাগত জানান। পরে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন হাফিজ মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম। এ সময় উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ প্রয়াত নেতাকর্মীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ফ্রান্স বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদ। তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমান শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা নন; তিনি ছিলেন জাতীয় পুনর্গঠনের এক সাহসী রূপকার। স্বাধীনতা-পরবর্তী সংকটময় সময়ে তিনি বাংলাদেশকে আত্মবিশ্বাসী ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পথ দেখিয়েছিলেন।”

প্রধান বক্তা ফ্রান্স বিএনপি নেতা ইকবাল হুসাইন আলী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়ন। তাঁর আদর্শ আজও দেশের কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।”

বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যেও উঠে আসে শহীদ প্রেসিডেন্টের কর্মময় জীবনের নানা দিক। নজির উদ্দিন যসরী, সোহাগ মুহাম্মদ ইয়াসিন, জিসাদ রহমান, জমির আলি সাহেদ ও ইরশাদ হুসাইন তাঁদের বক্তব্যে বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আলোচনা সভায় বক্তারা স্মরণ করেন, স্বাধীনতার পর ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ়করণ এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা বলেন, দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা সময়ের দাবি।

বক্তারা আরও বলেন, দেশের বাইরে বসবাস করলেও প্রবাসীরা বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রশ্নে সচেতন ও সক্রিয়। প্রবাসে সংগঠনের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করে জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রসারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তাঁরা।

অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা সালেহ আহমেদ, কামরুল হোসেন, মুহাম্মদ মুয়াজ্জিন হোসেন, নজির আহমেদ, কাতার বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম, ফ্রান্স যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ সুমন আমিন ও ফয়সাল আহমেদ, দফতর সম্পাদক (যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদা) মাসুদ মিয়া, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন, ফ্রান্স জিয়া সাইবার ফোর্সের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ওয়াদুদ আহমদ বাপ্পি, যুবদল সদস্য শামিম আহমেদ, যুবদল নেতা খালেদ আহমেদসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ মোনাজাত। মোনাজাতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া, মরহুম আরাফাত রহমান কোকো এবং বিএনপির প্রয়াত সকল নেতাকর্মীর রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে তাঁর সফল নেতৃত্ব কামনা করা হয়।

আলোচনা, স্মৃতিচারণ এবং দোয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এ আয়োজন প্রমাণ করেছে—দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি ও আদর্শ আজও সমানভাবে জীবন্ত। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও জাতীয়তাবাদী চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এমন আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা।

ফ্রান্স বিএনপিতে দীর্ঘদিনের কমিটি সংকট, বাড়ছে সাংগঠনিক অচলাবস্থা

ইউরোপে বিএনপির সবচে সক্রিয়ভাবে সংগঠন পরিচালিত হতো ফ্রান্স বিএনপি কমিটি। কিন্তু সেই ফ্রান্সেই দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় ওইখানে বিএনপিতে হতাশা, ক্ষোভ ও বিভক্তি ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। একসময় প্রবাসে বিএনপির অন্যতম শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে পরিচিত সংগঠনটি বর্তমানে নেতৃত্ব সংকট, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংগঠনিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অপেক্ষার পরও নতুন কমিটি গঠন না হওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে অনাস্থা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তবে বিষয়গুলোর সঙ্গে পুরাপুরি একমত নন, সাবেক সাধারন সম্পাদক এম এ তাহের। সম্প্রতি দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি কমিটি গঠন না হওয়ার নেপথ্য তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সে কমিটি নেই এ কথাটা একেবারে সঠিক নেই। আবার আপনার দিক থেকেও সঠিক। আমাদের যে কমিটি ছিল, সেটা মেয়াদোত্তীর্ন হয়ে যাবার পর স্বাভাবিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। এরপর থেকে আমাদেরকেই দ্বায়িত্ব পালনের জন্য দিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমাদের দলীয় কনিস্টিটিউশন অনুসারে আরেকটি কমিটি না হওয়া পর্যন্ত পূর্বের কমিটিই তাদের দ্বায়িত্ব চালিয়ে যাবে। পূর্ব কমিটি সাবেক হবে যখন আরেকটি নতুন কমিটি আসবে। আর নতুনদের উপর দ্বায়িত্বভার দিয়েই এ কমিটি বিদায় নেবে। এটাই হলো সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। এখন দীর্ঘ সময় থেকে আমাদের দল দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত যারা আছেন, জনাব মাহিদুর রহমান সাব এর নেতৃত্বে, আনোয়ার হোসেন খোকন সাব সহ এই কমিটিটাকে নতুন করে সাঝানোর পক্রিয়া গ্রহন করেছিলেন। দেশে ফ্যাসিষ্ট কর্তৃক যে শাসনব্যবস্থা চালু ছিল, ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ কর্মসূচিতে জনাব তারেক রহমান সাবের নেতৃত্বে যে টেকব্যাক কর্মসূচির যে ধারাবাহিকতা ছিল, যেখানেই হাসিনা সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এবং ফ্যাসিস্ট শাসন ও দীর্ঘ অগনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে শাসনব্যবস্থার প্রচলন ছিল, তার বিরুদ্ধে গনতন্ত্র উত্তরনের লক্ষ্যে দেশ বিদেশে যে আন্দোলন সংগ্রাম ছিল, সে আন্দোলন সংগ্রামে আমাদের ফ্রান্স বিএনপিও সম্পৃক্ত ছিল। ইউরোপ সহ বিশ্বের সকল দেশে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীরা সম্পৃক্ত ছিল। সেই সম্পৃক্ততার জন্যই ধারাবাহিকতার কারনেই আমরা কমিটিটা করতে পারি নাই বা বিলম্বিত হচ্ছে। তার অর্থ এই নয়, কমিটি আসবে না। অবশ্যই যেহেতু এ মুহুর্তে দেশে যে তার অর্থাৎ আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাহেব, তিনি খুবই ব্যস্ত। আশা করি উনি সময়সুযোগ করে ঠিকই কমিটি দিয়ে দেবেন ।
আমাদের প্রতিনিধর এক প্রশ্নের প্রশ্নের জবাবে এম এ তাহের বলেন, না, আমাদের কমিটি গঠনে কোনো বাধা বিপত্তি নেই। আমাদের এখানের সবাই একটি সুন্দর কমিটি প্রত্যাশা করছে। সেক্ষেত্রে দলের চেয়ারম্যান যাকে ভাল মনে করেন তিনি তাদেরই বেছে নিয়ে কমিটি দেবেন এতে কারোরই কোনো আপত্তি আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না।’
এদিকে ২০১৪ সালে সর্বশেষ সৈয়দ সাইফুর রহমানকে সভাপতি এবং এম এ তাহেরকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্র থেকে ফ্রান্স বিএনপির কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। সে সময় ইউরোপ অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে সাইফুর রহমান ও এম এ তাহেরের নেতৃত্বে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাদের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
তবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রের নির্দেশে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও ফ্রান্স বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকন বিদ্যমান কমিটি ভেঙে দেন। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান দীর্ঘদিন ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক বিষয় তদারকি করতেন। তাঁর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ছিলেন বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকন এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আবু সায়েম। মাহিদুর রহমান বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠনের চেষ্টা করলেও স্থানীয় পর্যায়ের অনৈক্য, গ্রুপিং ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
পরবর্তীতে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব পান সাবেক ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন খোকন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই নেতা দায়িত্ব গ্রহণের পর সংগঠন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তাঁর কার্যক্রম মূলত অনলাইন বৈঠক ও জুম সভার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতে, ফ্রান্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে সাংগঠনিক সংকট নিরসনে সরাসরি মাঠপর্যায়ে এসে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁকে ফ্রান্সে এসে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফ্রান্স বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “আমরা প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ দলের জন্য ব্যয় করি। পরিবার-পরিজনের সময় থেকে সময় বের করে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিই। অথচ আমাদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় নেতারা শুধু আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছেন। আমাদের নিয়ে আর তামাশা করা উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “ফ্রান্স বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী বছরের পর বছর ধরে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটির অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না।”
কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর রাজনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার লক্ষ্যে এক জুম সভায় সাবেক সভাপতি আহসানুল হক বুলুকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে ১৬ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অসহযোগিতা ও সমন্বয়ের অভাবে কমিটিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
এদিকে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর ফ্রান্সে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, পদ-পদবি ও সাংগঠনিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সংগঠনের সামগ্রিক কার্যক্রমে।
সম্প্রতি কয়েকটি দলীয় কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনায় সাধারণ নেতাকর্মীরা যেমন বিব্রত হচ্ছেন, তেমনি সংগঠনের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একসময় ফ্রান্স বিএনপির কর্মসূচিগুলোতে ব্যাপক নেতাকর্মীর উপস্থিতি দেখা গেলেও বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, দলীয় কর্মসূচি ও স্মরণসভায় অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার বিষয়টি এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা।
এরই ধারাবাহিকতায় দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীও এবার সম্মিলিতভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। অতীতে এ উপলক্ষে ফ্রান্স বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এক মঞ্চে উপস্থিত হলেও এবার সেই ঐক্যের চিত্র দেখা যায়নি।
গত ১০ জুন সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদের নেতৃত্বে একটি স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানে সংগঠনের অনেক শীর্ষ নেতা ও কর্মীর অনুপস্থিতি বর্তমান বিভক্তির চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, “ফ্রান্স বিএনপির বর্তমান অবস্থার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তাই অনেকাংশে দায়ী। শুরু থেকেই কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না।”
এদিকে ফ্রান্স যুবদল নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফ্রান্স যুবদলের সভাপতি আহমেদ মালেক বলেন, কমিটি গঠনের পর একটি ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অমান্য করার অভিযোগে সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ফ্রান্স বিএনপির নতুন কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রবাসে দল পরিচালনার ক্ষেত্রে কেন্দ্র অনুমোদিত কমিটি ছাড়া অন্য কোনো কাঠামো কমিউনিটির কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। কী কারণে কেন্দ্র কমিটির অনুমোদনে বিলম্ব করছে, তা আমার বোধগম্য নয়।”
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি সিরাজুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্স বিএনপির কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছে।
সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুব আলম রাঙ্গা বলেন, “একটি কার্যকর কমিটি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। দলীয় কর্মীদের চাঙা রাখতে কেন্দ্রের উচিত দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা।”
সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা বলেন, “যোগ্য, ত্যাগী ও দলের প্রতি নিবেদিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য কমিটি দ্রুত গঠন করা হলে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হবে।”
অন্যদিকে সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদ বলেন, “ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্ব নিশ্চিত না হলে ফ্রান্সে অবস্থানরত বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা তা মেনে নেবেন না। প্রায় তিন দশক ধরে প্রবাসে দলের দুর্দিনে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছি। ইউরোপের এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে আমরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিইনি।”
তিনি আরও বলেন, “দল আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। এ সময় বহির্বিশ্বে বিএনপির আদর্শ ও কর্মসূচি মানুষের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছে রাষ্ট্রের সেবা পৌঁছে দেওয়ার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। সে জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব।”
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মহিলা দল কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শামীমা আক্তার রুবী টেলিফোনে বলেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি অত্যন্ত জরুরি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাংগঠনিক তৎপরতা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কমিটি গঠনে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দই ভালো বলতে পারবেন। তবে সংগঠনের শৃঙ্খলা ও কার্যক্রমের স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ বলেন, তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংগঠনের শৃঙ্খলার স্বার্থে অনেক বিষয় প্রকাশ্যে বলতে চান না বলেও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সমাজ ও সংগঠনের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে কেন্দ্রের নির্দেশনায় একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ফ্রান্স বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ার হোসেন খোকনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফ্রান্স বিএনপির আগামী নেতৃত্বে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুবুল আলম রাঙ্গা, সাবেক সহ-সভাপতি কবির আহমেদ পাটোয়ারী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রেজাউল করিম রেজা, জুনেদ আহমেদ এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ।
ফ্রান্স বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা থাকলেও অধিকাংশ নেতাকর্মীর প্রত্যাশা একটাই দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বিভক্তি ও সাংগঠনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিএনপির আন্তর্জাতিক সাংগঠনিক কাঠামোর জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম ফ্রান্সের প‍্যারিস থেকে

সম্পর্কিত খবর