অসভ্যতা দিয়ে সভ্য জাতি গড়া যায় না
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৯
॥ মাহবুবুল হক ॥
কালচার আর সিভিলাইজেশন নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-ঝাঁটি, বিবাদ-বিসম্বাদ, মারামারি, খুনাখুনি, গৃহযুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধ সবকিছু এ পৃথিবীতে সংঘটিত হয়ে গেছে। কোনো কিছুই বাদ থাকেনি। কালচার আগে, না সিভিলাইজেশন আগে এ নিয়েও চিন্তাভাবনা ও জ্ঞান-গবেষণার এখনো ইতি হয়নি। এসব বিষয় নিয়ে যারা জানে, পৃথিবীতে তারা একদলভুক্ত নয়, যারা জানে না এবং যারা স্বল্প জানে, তাদের মধ্যেও মিল মুহব্বত নেই। যারা জানে, তারা প্রকৃতপক্ষে আসমানী জ্ঞান থেকে জানে। প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞান থেকে জানে। রিভিল্ড নলেজ থেকে জানে। এই জানাটা এক নম্বর বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞানোদীপ্ত করার জন্য, মানুষকে সত্য পথের পথিক বানানোর জন্য, ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে সৈনিক বানানোর জন্য, যুগে যুগে কালে কালে দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে রাসূল পাঠিয়েছেন। যাঁরা মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম প্রতিনিধি। তাঁরা পৃথিবীতে আসবে এবং আল্লাহর বাণী ও তাঁর নিয়মকানুন ও বিধিবিধান মানুষের সমাজে কায়েম করবে- এটাই ছিল মহান আল্লাহর একমাত্র অভিপ্রায়। এ কারণে তিনি শতাধিক আসমানী কিতাব বা শত শত স্ক্রিপ্ট দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়। তার মধ্যে প্রধান হলো তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও কুরআন। যবুর নাজিল হয়েছে রাসূল দাউদ আ.-এর কাছে। তাওরাত নাজিল হয়েছে রাসূল মূসা (আ.)-এর কাছে। ইঞ্জিল নাজিল হয়েছে রাসূল ঈসা (আ.)-এর কাছে। আর সর্বশেষ কুরআন নাজিল হয়েছে সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে।
প্রত্যাদিষ্ট সকল গ্রন্থেই খুব স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, মানুষ সৃষ্টির পর প্রথমেই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কৃষ্টির জ্ঞান দিয়েছেন। প্রথম মানুষ আদম (আ.)-কে মহান আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের যত জ্ঞানের প্রয়োজন হবে, তার সবই তিনি একই সাথে একই সময় প্রদান করে দিয়েছেনÑ যাতে মানুষের পথচলা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে না পড়ে। মানুষ সহজ-সরল ও স্বাভাবিকভাবে জীবনের গতিপথ খুঁজে নিতে পারে। এখানে বলা হয়নি প্রথমে তোমরা বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি বানাও বা তোমরা পড়াশোনার জন্য স্কুল-কলেজ খোল। মানুষ সৃষ্টি করে মহান আল্লাহ তায়ালা প্রথম মানব ও মানবী অর্থাৎ পুরুষ আদম (আ.) ও নারী বিবি হাওয়াকে জান্নাতে জায়গা দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে বলেছেন, মহান আল্লাহ তোমাদের একমাত্র উপাস্য। তিনি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা। তিনি তোমাদের রব অর্থাৎ পালনকর্তা এবং তিনি তোমাদের একমাত্র হুকুমদাতা, নির্দেশদাতা, আইনদাতা, সুতরাং তার গুণগান ও প্রশস্তি ঘোষণা করো। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। এখানে থাকো এবং এখানকার ফল ফলাদি খাও। একটি গাছকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ওই গাছের নিকট যেও না। ওই গাছের ফল খেও না। এটা আমার হুকুম। এই হুকুম বা নির্দেশ অমান্য করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা এখানে শুধু ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছি। হুবহু কথাগুলো বিবৃত করার চেষ্টাও করছি না। কারণ প্রত্যেকের কাছেই ওই বিষয়গুলো বিবৃত করা আছে। হয় প্যান্টের পকেটে, না হয় শার্ট বা পাঞ্জাবির পকেটে। সামাজিক যোগাযোগের জন্য যে ডিভাইসটা রয়েছে, তার মধ্যেই সবকিছু বলা আছে। নতুন করে বলার কিছু নাই। এখানে দেখা যাচ্ছে সভ্যতার কথা বলা হয়নি। বলা হয়েছে চিন্তার কথা। মহান সৃষ্টিকর্তাকে একমাত্র মাবুদ বলে স্বীকার করার কথা। বলা হয়েছে তাঁর আদেশ ও নির্দেশ পালন করার কথা। অন্যথায় সতর্ক ও সাবধান করা হয়েছে এই বলে যে, যদি তোমরা আমার কথা না শোন, তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে মহান আল্লাহর কথা অস্বীকার করার কারণে জিন ইবলিসকে তিনি তাঁর উচ্চতর অবস্থান থেকে বরখাস্ত করলেন। ইবলিস মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এমন শক্তি ও ক্ষমতা দাও- যাতে আমি তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করতে পারি। মহান আল্লাহ তাকে সেই অপকর্ম করার শক্তি ও ও সামর্থ্য প্রদান করার সময় বললেন, তবে যতই তুমি চেষ্টা করো না কেন, আমার একনিষ্ঠ বান্দাদের বিভ্রান্ত করতে পারবে না। ইবলিস এ কথা বিনয়ের সাথে স্বীকার নিয়ে তার কাজ শুরু করে দিল। যে গাছের ফল খেতে মহান আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে নিষেধ করেছেন, ইবলিস আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে সেই গাছের ফল খেতে উৎসাহ প্রদানের চেষ্টা করতে থাকলো। অবশেষে ইবলিস বিজয়ী হলো। দুনিয়ার প্রথম মানব ও মানবী ইবলিসের কথা বিশ্বাস করল এবং ইবলিসের ওপর আস্থা রাখল। তারা দুজন নিষিদ্ধ ফল খেলেন। সাথে সাথেই তাঁরা বিবস্ত্র হয়ে পড়লেন। তার মানে তাঁরা কিছুক্ষণের জন্য অসভ্য হয়ে গেলেন। মহান আল্লাহর কথা না শুনলে যুগে যুগে কালে কালে মানুষ অসভ্য হয়ে গেছে এবং অসভ্য হওয়ার কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের নানাভাবে কঠিন শাস্তি দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সভ্য জীব হিসেবে। দুনিয়ায় সে সভ্য জীব হিসেবে অবস্থান করবে এবং সৃষ্টিজগৎকে সভ্য রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। উলঙ্গ হওয়ার সাথে সাথে তাঁদের মাথায় বুদ্ধি এল গাছের লম্বা লম্বা পাতা দিয়ে শরীর ঢাকা যাবে। তাই তাঁরা করলেন। মুহূর্তেই তারা আবার সভ্য হয়ে গেলেন। তারা তাদের ভুল বুঝতে পারলেন। তাদের উপলব্ধিতে এসে গেল তারা ইবলিসের কথা শুনে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধকে অস্বীকার করেছে। তাঁরা সিজদায় নত হলেন এবং তওবাসহ ক্ষমা চাইলেন। ক্ষমার ভাষাটাও মহান আল্লাহ শিখিয়ে দিলেন, ‘রাব্বানা জালামনা আনফুসিনা ওয়াইল্লাম তাগফিরলানা ওয়াতারহাম না, লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।’
জান্নাত মানে কোনো ঘর, বাড়ি, ইমারত, নিকেতন, অট্টালিকা, ভবন- এসব নয়। জান্নাতের অর্থ হলো বাগান। যে অলৌকিক বাগানের তলদেশ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত হয়। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) জান্নাতের বাগানে ছিলেন। তাঁদের পরনে জান্নাতি পোশাক ছিল। আল্লাহর হুকুম অস্বীকার করার সাথে সাথে সেই জান্নাতি পোশাক তাদের দেহে থাকলো না। তাঁরা পোশাকহীন অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলেন। এ বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে। অনেকে বিষয়টিকে সভ্যতা ও অসভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার চেষ্টা করেছেন। আবার অনেকে জান্নাতের কৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। এ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি, জান্নাতের পোশাক নিশ্চয়ই আলাদা হবে। সুতরাং এটা কৃষ্টির বিষয়। সিভিলাইজেশন বলতে যত কিছু বোঝা যায়, সভ্যতা বলতে ততটুকু বোঝায় না। অর্থাৎ আমরা বোঝার চেষ্টা করি না। জান্নাতে কৃষ্টির বিষয়টি আছে। সভ্যতার বিষয়টি নেই। সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন সম্পূর্ণত দুনিয়ার বিষয়। কৃষ্টি দুনিয়া ও আখিরাতের বিষয়। আমরা যাকে সংস্কৃতি বলি, কৃষ্টি কিন্তু তা নয়, কৃষ্টির গন্তব্য আরো গভীরে। সংস্কৃতির একটি শাখার নাম বিনোদন। সেই বিনোদনকেই এখন সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা সে গভীর আলোচনায় যাচ্ছি না।
বসনিয়ার সাবেক ধীমান প্রেসিডেন্ট আলিয়া আলি ইজতবিগভিজ ‘ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতা’র ওপর বিশ্বজোড়া নন্দিত একটি বই লিখেছেন। সেখানে তিনি সভ্যতা ও কৃষ্টি বলতে কী বোঝায়, তার বিশদ ও বিস্তৃত বর্ণনা করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, রাস্তাঘাট, রোড, হাইওয়ে, স্ট্রিট, গাড়ি, বাড়ি, স্টেশন, উড়োজাহাজ, বিমানবন্দর, নদীবন্দর সবই সভ্যতার অংশ। কৃষ্টির সঙ্গে এর যোগসাজশ কম।
এটি একটি জনপদের, একটি দেশের বা একটি মহাদেশের উন্নয়নের বিষয়। উন্নতির বিষয়। জীবনের মানোন্নয়নের বিষয়। দুনিয়ার সব দেশ, সব জাতি এ উন্নয়নের জন্য ছোট বড় মাঝারি কত রকম প্রজেক্ট গ্রহণ করে, যাতে সাধারণ জীবনে কষ্ট কমে যায়। দুঃখ কমে যায়। যাতে তারা কমফোর্ড লাইফ লিড করতে পারে। তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছে মানুষের জীবনে উন্নতি ঘটানোর জন্য। তারা বলে বা স্লোগান দেয় এডুকেশন ইজ এ কী টু সোসিও ইকোনমিক প্রগ্রেস। লেখাপড়া শিখলে মানুষ বড় হবে। ধনী হবে। টাকা-পয়সাওয়ালা হবে। সমাজের উন্নতিতে তারা অবদান রাখতে পারবে। দেশের উন্নতিতে এবং বিশ্বের উন্নতিতে বড় ধরনের অবদান প্রসারিত করতে পারবে। এ প্রসারণ বা উন্নতি কৃষ্টির উন্নতি নয়। এ উন্নয়ন স্রেফ কিছু মানুষের উন্নতি।
মধ্যযুগে মুসলিমরা জ্ঞানে বিজ্ঞানে যে উন্নতি করেছিল, তার মধ্যে সভ্যতা এবং কৃষ্টি দুটিরই সংমিশ্রণ ছিল।
শিল্পবিপ্লবের পর মানুষ যখন ধীরে ধীরে ধর্মবিমুখ হয়ে গেল, তখন আর কৃষ্টি থাকলো না। সব উন্নতি সভ্যতার খাতায় বন্দি হলো। এভাবে মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সাধনা সভ্যতার দিকে চলে গেল। এ ধারণাটাই মানুষকে দারুণভাবে দুনিয়াদারি শেখালো। মানুষের মধ্যে দুনিয়ার সকল সুখ, সম্পদ শান্তি আহরণের প্রতিযোগিতা চলতে লাগলো। মানুষ ভুলে গেল তার আত্মার কথা। তার নফসের কথা। তার ভবিষ্যতের কথা। আখিরাতের কথা। মানুষ শুধু নিজের কথা ভাবতে লাগলো। পরিবারের কথা। সমাজের কথা। রাষ্ট্রের কথা ভাবতে থাকলো। এ ভাবনা থেকেই তাদের মনে জাগ্রত হলো, গির্জার কোনো প্রয়োজন নেই। অযাচিতভাবে গির্জার শাসন বন্ধ করতে হবে। তাই তারা ইংল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে খ্রিস্ট ধর্মকে ভাগ করে ফেলল। তারা বলল, আমরা প্রোটেস্ট্যান্ট। আমরা আর ক্যাথলিক থাকবো না। আমরা প্রয়োজনে গির্জায় যাব। আবার প্রয়োজনে গির্জায় যাব না। এভাবে প্রোটেস্ট্যান্টদের গির্জা আলাদা হয়ে গেল। খ্রিস্টান ধর্মের ক্যাথলিকরা স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের দিকে চলে গেল। এসব গবেষণায় নিমগ্ন হতে গিয়ে ধর্মগ্রন্থ থেকে মানুষ বলতে গেলে মুখ ফিরিয়ে নিল। বিজ্ঞানের ওপর বা বিজ্ঞান গবেষণার ওপর মানুষ চূড়ান্তভাবে আস্থা পোষণ করতে শুরু করলো। এ প্রসেসের মাধ্যমে মানুষ বলতে গেলে সেক্যুলার হয়ে গেল। মানুষ পার্থিবপন্থি হয়ে গেল। পাশ্চাত্য এ পন্থায় ইহকালীন হয়ে গেল। তাদের অধিকাংশের জীবনে পরকাল থাকলো না। মানুষ সুখসম্ভোগের মধ্যে বিলীন হয়ে গেল। এরই পরম্পরায় পাশ্চাত্যের মানুষ নানা আদর্শে আবদ্ধ হয়ে পড়ল। এসব প্রক্রিয়ার কারণে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মানবতার।
এসবই সভ্যতার উন্নতি মানবতার উন্নতি নয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করলো আমরা যে অবস্থায় পৌঁছে গেছি, তাতে আমাদের যুদ্ধ দরকার। যুদ্ধের জন্য অস্ত্র দরকার। শুধু সাধারণ অস্ত্র নয়। পারমাণবিক অস্ত্র। যুদ্ধ যদি দুনিয়ায় না থাকে, তাহলে আমরা বড় হব কীভাবে? কেউ তো কারো দেশ অন্যকে দিয়ে দিবে না। জোর করে দখল করতে হবে। দখল করতে হলে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র লাগবে। সে কারণে দেশে দেশে অস্ত্রশস্ত্রের কারখানা বসে গেল। এখন এ জাগতিক উন্নতি কোন জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, এখন কে কত উন্নত অস্ত্র তৈরি করতে পারছে? কে কত কম সময়ে মানুষ ও জাতি ধ্বংস করতে পারছে? কে কত কম খরচে কত মানুষ খুন করতে পারছে, সেটাই হলো এখনকার যুগের সভ্যতার উন্নতি।
যেসব হলো কৃষ্টি তথা মানবতাবিরোধী। বাহ্যিকভাবে দেখা যায়, যারা কৃষ্টির পক্ষে এবং যারা সভ্যতার পক্ষে উভয় পক্ষই দুনিয়ায় সুখ, শান্তি ও স্বস্তি চায়। কিন্তু বাস্তবে আমরা দুটির গন্তব্য দুই দিকে একটির গন্তব্য মানবতার দিকে। মনুষ্যত্বের দিকে। স্নেহ-প্রেম-প্রীতি ভালোবাসার দিকে। আর আরেকটি হলো অল্প কিছু মানুষ দুনিয়ায় অবারিতভাবে সুখ, শান্তি, সম্ভোগ করবে আর বেশিরভাগ মানুষ তাদের ক্রীতদাস হয়ে বেঁচে থাকবে। আজ সারা দুনিয়ায় দেশ দখলের চেষ্টা চলছে। এক দেশ আরেক দেশকে দখল করতে চাচ্ছে। আমেরিকা জাপানে নাপাম বোমা ফেলে নিরীহ মানুষকে যে কারণে হত্যা করেছিল, এখন ইসরাইল ফিলিস্তিনে সেই একই কারণে মানুষ মারছে। ইতোমধ্যে শিশুসহ ৭০ হাজার মানুষ তারা খুন করে ফেলেছে। তাদের লক্ষ্য ফিলিস্তিনে নতুন সভ্যতা গড়ে তোলা।
এখানে অবশ্য কৃষ্টির বিষয়টি উচ্চকিত হয়ে আছে। তারা শুধু একটি সভ্যতার বিনাশ চায় না। একটি কৃষ্টি ও সংস্কৃতির বিনাশ চায়। তারা এই এলাকা চায়।
ইসলাম এমন একটি জীবন ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা মানুষের সভ্যতা ও কৃষ্টির উন্নতি চায়। মানুষের কষ্ট দূর করতে চায়। মানুষের জীবনে শান্তি নিয়ে আসতে চায়। কিন্তু যুদ্ধের ঝনঝনানি আণবিক শক্তির উল্লম্ফন সবকিছুকে বাধাগ্রস্ত করছে। ব্যক্তি মানুষ থেকে শুরু করে বড় বড় রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ সবাই এখন সভ্যতার নগ্ন দীপ্তি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এ চেষ্টা মানবতাকে অবশ্যই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। এ চেষ্টার মধ্যে দয়া নাই। মায়া নাই। স্নেহ নাই। ভালোবাসা নাই। আছে শুধু ভার্টিকালি উপরের দিকে উঠে যাওয়া। এ চেষ্টা ও প্রচেষ্টা যদি হরাইজন্টাল হতো, তা হলো পৃথিবীর কিছু মানুষের জীবনে সুখ-শান্তি ফিরে আসতো। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখন সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত হয়ে গেছে।
এক প্রখ্যাত বিজ্ঞানী দার্শনিক বলেন, পৃথিবীতে এখন চলছে সভ্যতার সংকট।
ঈৎরংরং ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হ. কিন্তু খুব গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করলে দেখা যায়, আসলে সভ্যতার কোনো সীমারেখা নেই। সভ্যতার কোনো গন্তব্য নেই। কিছু দেশ ও কিছু মানুষের জন্য তথাকথিত সভ্যতা এখন বিরাজ করছে। তারা রাজা হয়ে থাকবে। আর দুনিয়ার সকল মানুষ তাদের প্রজা হয়ে থাকবে। কিন্তু কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উন্নতি মানে সারা দুনিয়ার সকল মানুষের কল্যাণ ও উন্নতি। মানুষ শুধু ইহকালে সুখ-শান্তি ও স্বস্তি উপভোগ করবে না পরকালেও সুখ-শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করবে। কিন্তু যারা নিজেদের সিভিলাইজড মনে করে এবং অপর সকলকে আনসিভিলাইজড মনে করে, তারা তো অনেকটা ধর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের বেশিরভাগ মানুষ এগনস্টিক হয়ে পড়েছে। তারা অনুভব করছে সৃষ্টিকর্তা আছেন কি নেই, সে গবেষণা করে আমাদের কী লাভ? তারা সংশয়বাদী হয়ে পড়েছে। তারা এখন শুধু জাগতিক উন্নতি চায়। বৈশ্বয়িক উন্নতি চায়। পার্থিব উন্নতি চায়। এ চাওয়ার মধ্যে অন্যায় রয়েছে। অবিচার রয়েছে। নৃশংসতা রয়েছে। রয়েছে চরম স্বার্থপরতা। শুধু নিজের জন্য চায় এবং বড় জোর নিজের জাতি ও নিজের রাষ্ট্রের জন্য চায়। সবার জন্য চায় না। এই না চাওয়াটাই অন্যায়, অবিচার, নিষ্ঠুরতা এবং নির্মমতা। এখন আমরা আমাদের দেশের দিকে মুখ ফেরাই। শুধু অন্যদের দোষ দিয়ে আমরা আর কতকাল ভণ্ডামির মধ্যে বেঁচে থাকব। শতকরা ৮৫ জন মুসলিমের দেশ হলো বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশে গত ৫৪ বছর ধরে সভ্যতার চর্চা চলছে। কৃষ্টির চর্চা একদম বন্ধ হয়ে গেছে। যাদের আমরা সভ্যতার দেশ বলছি, আমাদের জীবনের সবকিছুই ছেড়ে দিয়ে তাদেরই অনুকরণ ও অনুসরণ করছি। ফলে একদিকে আমরা না থাকছি প্রকৃত মুসলিম, না থাকছি প্রকৃত সেক্যুলারদের অনুরাগী বা অনুসরণকারী। আমাদের দ্বন্দ্বের শেষ নেই। বর্তমান সভ্যতার ক্ষতিকর দিকগুলো যেখানে প্রকট, এ প্রকট বিষয়গুলো আমরা আমাদের জীবনে টেনে আনার চেষ্টা করছি। আমরা মনে করছি বিজ্ঞান সবকিছুই দেবে। বিজ্ঞানকে অনুসরণ করেই তো পাশ্চাত্য উন্নতি লাভ করেছে। সুতরাং আমাদেরও বিজ্ঞানমনষ্ক হতে হবে। আমাদেরও আণবিক বোমার মালিক হতে হবে। আমাদেরও যুদ্ধ করার জন্য বিপুল সৈন্যবাহিনী পুষতে হবে, আমাদের ঘরে ঘরেও পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে। এভাবেই আমরা শক্তিশালী দেশ ও জাতিতে পরিণত হতে পারব।
আমি যা বলতে চাচ্ছি, তার সবকিছু আপনারা জানেন। তারপরেও কিছু কিছু ছোট ছোট জিনিস রয়েছে, যেসব হয়তো আমরা খেয়াল করতে পারি না। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করতে গিয়ে স্কুলের শিক্ষার্থীরা হঠাৎ স্লোগান দিল পুলিশকে আমরা চু…। হঠাৎ এ ধরনের স্লোগান কেন উঠলো? সমাজ বিজ্ঞানীরা বললেন, এর অর্থ হলো আমরা পুলিশ কে কেয়ার করি না। ভালো এবং সুন্দর ব্যাখ্যা। কিন্তু কেউ কেউ বললেন, এটা একটা বিরাট ষড়যন্ত্র। কারণ যে ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়ে, যারা যে কাজটি করে না, জানে না, তারা কী করে এই স্লোগান দিতে পারে! তারা বললেন, খুব সন্তর্পণে ভারতসহ সেক্যুলার বিশ্ব এ কাজটি করেছে। দেখবেন সামনের দিকে এর উলঙ্গ চর্চা আরো অনেকগুণ বেশি বেড়ে গেছে। এখন দেখছি, শেষোক্তরাই সঠিক।
২০১৮ থেকে সরকারবিরোধী যে আন্দোলন শুরু হলো, তার প্রতিটি মিছিলে এ ধরনের নগ্ন, উলঙ্গ, অশোভন ও অশ্লীল স্লোগান শুধু অব্যাহত ছিল, সে কথা বললে খুব কম বলা হবে। উত্তরোত্তর এ ধরনের হারাম স্লোগান নানামাত্রায় বৃদ্ধি পেতে লাগলো। এসব স্লোগান নাকি শিক্ষার্থীদের মনে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে তুলছিল। এসব নোংরা অপবিত্র জঘন্য স্লোগান থেকেই নাকি তারা উৎসাহ ও উদ্দীপনা পেয়েছিল। যুদ্ধের দামামা চলছিল। সেই দামামার পাশে কে কী উচ্চারণ করছে, সেদিকে কারো সেদিন খেয়াল ছিল না। যারা নিজ কানে শুনেছেন, তারাও বাধা দেননি। কারণ সবার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে হবে। যুদ্ধের ময়দানে গালাগালি করা যায়।
অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা যায়। এ ধরনের কথা আমাদের দেশে চালু আছে। সে কারণে এসব অনাচার ও দুরাচারকে বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টি হিমালয় লগ্ন হয়ে গেছে। এখন শুধু স্লোগানে, মানববন্ধনে, সমাবেশে এসব নোংরা কথা উচ্চারণ করা হচ্ছে না। এখন সর্বক্ষেত্রে; বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব শব্দের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। বড়রা ছোটদের বলছে। ছোটরা আবার বলছে বড়দের। কোথাও কোনো ফাঁকফোকর নেই। সবকিছু অবারিতভাবে চলছে। একটা মুসলিম সমাজে মেয়ে ও মাকে নিয়ে এমন হারাম কথা বছরের পর বছর অব্যাহত থাকবে, তা ভাবা যায় না।
এ বিষয়ে তেমন কেউ কিছু বলছেন না। ফেসবুকে দু-একজন সাংবাদিক হালকাভাবে কিছু কথা বলছেন। এতে কিছু লাভ হচ্ছে না। বরং যারা এসবের বিরোধিতা করছেন, তাদের মোল্লা-মৌলবাদী এসব বলে গালাগালি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সরকারের বক্তব্য আসা উচিত। আলেম-ওলামা ও শিক্ষকসহ সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কথা বলা উচিত।
একসময় পুরান ঢাকায় এসব শব্দের ব্যবহার আমরা দেখেছি বা শুনেছি। এখন সেখানে এত নোংরা শব্দ ব্যবহার করা হয় না। অনেক কমে গেছে।
কিন্তু আন্দোলনের নামে, বিপ্লবের নামে, গণঅভ্যুত্থানের নামে, আমরা নগ্ন ও অশ্লীল হারাম শব্দ ব্যবহার করব, তা তো হতে পারে না। মহান আল্লাহ কি এসব মেনে নেবেন?
ভুলে গেলে চলবে না। অভদ্র হয়ে ভদ্র সমাজ গড়া যায় না।