ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা : সমস্যা ও সম্ভাবনা
২১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:২৪
॥ প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী ॥
প্রত্যেকটা আদর্শই তার অনুসারীদের কাছে দাবি করে, তার পছন্দের আদর্শ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা লাভ করুক এবং সর্বদা বিজয়ী থাকুক। একজন সমাজতন্ত্রী চায় যে, তার আদর্শ ‘সমাজতন্ত্র’ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সমাজতন্ত্রকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে সে সর্বদা সচেষ্ট থাকে। তার সব চেষ্টা-সাধনা জারি থাকে লোকজনকে সমাজতন্ত্রে দীক্ষিত করার কাজে। অন্য কোনো ব্যবস্থাপনার অধীনে সে কখনোই সন্তুষ্ট থাকে না এবং তার কাছে সমাজতন্ত্র ছাড়া অন্যসব আদর্শ মূল্যহীন। দুনিয়ায় প্রচলিত সব বিধান; বিশেষ করে ইসলাম ও পুঁজিবাদকে ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সে প্রধান বাধা মনে করে। প্রকৃত সমাজতন্ত্রী নিজেকে একজন নাস্তিক বা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে জানে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ইসলামকে সে মোটেই সহ্য করে না। তাই সুযোগ পেলেই ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাদের অন্তরায় মনে করে, তাদের সমালোচনা করে। এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক। ইসলামও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের অনুসারী একজন মুসলিম মনুষ্যসৃষ্ট সব মতবাদ বা ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে। এ অস্বীকৃতির মাঝেই রয়েছে তার ঈমানের পূর্ণতা। আল্লাহপাকের নিকট মনোনীত একমাত্র দীন হলো ইসলাম (আলে ইমরান-১৯)। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন তা যে নামেই আসুক, আল্লাহপাক গ্রহণ করবেন না। ফলে একজন মুসলমান ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থাপনার অধীন মোটেই সন্তুষ্ট জীবনযাপন করে না। এটি ঈমানের দাবি এবং প্রকৃতিরও দাবি।
আল্লাহপাক তাঁর বান্দাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, তাঁর কাছে ফিরে আসতে হলে অবশ্যই মুসলিম অবস্থায় আসতে হবে। তাঁর বাণী, ‘হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত এবং মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২)। এখন প্রশ্নÑ মুসলিম কাকে বলে? মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে জন্মলাভ করলেই কি মুসলিম হওয়া যায়? এ প্রশ্নের জবাবে সবাই বলবে, না, বরং যে ব্যক্তি ইসলামকে বিশ্বাস করে ও ইসলাম অনুসারে জীবন পরিচালনা করে এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালায় ও মনেপ্রাণে ইসলামের বিজয় কামনা করে তাকেই বলা হয় মুসলিম। একজন ব্যক্তি কালেমা তাইয়্যেবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই) ঘোষণা দিয়ে ইসলামে প্রবেশ করে অর্থাৎ মুসলিম হয়। আল্লাহপাকের আনুগত্য ও তাগুতের আনুগত্য পাশাপাশি মেনে চলার নাম শিরক। আর আল্লাহপাকের দাবি হলো, সকল প্রকার আনুগত্য অস্বীকার করে কেবল আল্লাহকেই মেনে চলা। তাঁর বাণী, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাগুতকে অস্বীকার করো।’ (সূরা নাহল : ৩৬)।
আল্লাহপাক প্রদত্ত দীন ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। চেতনা লাভের পর থেকে মৃত্যু বা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় সমগ্র জীবন পরিচালনার বিধান হলো ইসলাম। আল্লাহর বাণী, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’ (সূরা বাকারা : ২০৮)। এটি স্পষ্ট যে, জমিনে দীন প্রতিষ্ঠিত না থাকলে পুরোপুরি ইসলাম মানা যায় না এবং যেখানে দীন মানা যায় না, সেখানে শয়তানের দেয়া নিয়মই মানতে হয়। দীনের কিছু অংশ মানা এবং কিছু অমান্য করা কালেমা তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান আনার সাথে সাংঘর্ষিক। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমরা কি দীনের কিছু অংশ মানবে এবং কিছু অংশ অমান্য করবে, তাহলে দুনিয়ার জীবনে রয়েছে জিল্লতি ও আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ আজাব।’ (সূরা বাকারা : ৮৫)। আজ আমাদের জীবনে জিল্লতির পেছনে মূল কারণ জমিনে দীন প্রতিষ্ঠিত না থাকা।
আল্লাহপাক যুগে যুগে অসংখ্য নবী ও রসূল প্রেরণ করেছেন এবং সকলের জীবনের লক্ষ্য ছিল দীন কায়েম বা রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহর বাণী, ‘তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেসব নিয়মকানুন নির্ধারিত করেছেন, যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মদ) যা এখন আমি তোমার কাছে অহির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মূসা ও ইসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, দীন কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি করো না।’ (সূরা শুরা : ১৩)। জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কোনো মতপার্থক্য আল্লাহপাক মেনে নেবেন না। দীন কায়েমের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দীন কায়েমের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত কোনো জীবন না নবী-রসূলের আর না কোনো মুমিনের। দীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যেই মূলত রাসূল (সা.)-এর সকল কর্ম-প্রচেষ্টা জারি ছিল এবং আল্লাহর ঘোষণাও তাই। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কুরআন মজিদে তিন জায়গায় সূরা তাওবা (৩৩নং), সূরা ফাতাহ্ (২৮নং) ও সূরা সফে (৯নং) উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর বাণী, ‘তিনি আপন রসূলকে হিদায়াত ও সঠিক জীবনব্যবস্থা (দীনে হক) দিয়ে পাঠিয়েছেন; যাতে সকল জীবনব্যবস্থার ওপর একে বিজয়ী করে দিতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক।’ (সূরা সফ : ৯)।
দীন কায়েম বা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহপাক মুমিনদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন এবং এ জান্নাত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আল্লাহপাক তাঁর মুমিন বান্দাদের সাথে একটি চুক্তি করেছেন। তাঁর বাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহপাক মুমিনদের জান-মাল খরিদ করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে। তারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করে মারে ও মরে।’ (সূরা তাওবা : ১১১)। আবার আল্লাহপাক মুমিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য টেনেছেন জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ দ্বারা। আল্লাহর বাণী, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই শয়তানের সঙ্গী-সাথীদের সাথে লড়াই করো আর বিশ্বাস রেখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল।’ (সূরা নিসা : ৭৬)। আল্লাহর পথে জিহাদ মুমিনদের জন্য আল্লাহপাকের নির্দেশ এবং এ কাজের বিনিময়ে আল্লাহপাক মুমিনদের সকল গুনাহের ক্ষমা এবং জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন (সূরা সফ-১২)। একজন মুমিনের জন্য এটিই সবচেয়ে বড়ো সফলতা। আল্লাহপাক বাড়তি দেবেন, যা মুমিনরা খুবই আকাক্সক্ষা করেন, তা হলো আল্লাহর সাহায্য ও নিকটবর্তী বিজয় (সূরা সফ-১৩)।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা-প্রচেষ্টা (জিহাদ) করাকে আল্লাহপাক মুমিনদের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। এটা কোনো একক প্রচেষ্টার কাজ নয়, প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং আল্লাহপাক মুমিনদের সংঘবদ্ধ জীবনযাপনের তাগিদ দিয়েছেন। সূরা আলে ইমরানের ১০২নং আয়াতে আল্লাহকে ভয় করার মতো ভয় এবং মুসলমান অবস্থায় ছাড়া মৃত্যুবরণ না করার জন্য বলেছেন। এ আয়াতের পরবর্তী ১০৩নং আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না’। এখানে এটাও উপলব্ধি করা যায় যে জামায়াতবদ্ধ জীবনযাপনের মাঝে মুসলমান হওয়াটা নির্ভর করে। তিনি আরো বলেন, যারা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আল্লাহপাক তাদের খুব পছন্দ করেন। তাঁর বাণী, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরই ভালোবাসেন যারা আল্লাহর রাস্তায় সিসাঢালা প্রাচীরের মতো জামাতবদ্ধভাবে লড়াই করে।’ (সূরা আস সফ : ৪)। আল্লাহপাক মুমিনদের নেতৃত্বের আসনে দেখতে চান; যাতে সকল পাপাচার ও জুলুম-নির্যাতন সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব থেকে দূর হয়ে যায়। আল্লাহপাকের বাণী, ‘তোমরা সর্বোত্তম দল। তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য। তোমরা ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজে নিষেধ করবে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ছাড়া ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করা সম্ভব নয়।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বা জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার কোনো সুযোগ আল্লাহপাক রাখেননি। যেসব প্রিয়বস্তু আল্লাহর পথে জিহাদে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেগুলো একে একে উল্লেখ করে আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। তাঁর বাণী, ‘হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের পিতা ও ভাইকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে অধিক ভালোবাসে। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, তারাই হবে জালেম। হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ, যে ব্যবসায়ে মন্দ দেখা দেয়ার ভয়ে তোমরা তটস্থ থাকো এবং তোমাদের যে বাসস্থানকে খুবই পছন্দ করোÑ এসব যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা তোমাদের কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আল্লাহ ফাসেকদের কখনো হিদায়াত (সত্য পথের সন্ধান) দান করেন না।’ (সূরা তাওবা : ২৩-২৪)। ২৩নং আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দীন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপন পিতা ও ভাইও যদি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের সাথে আর বন্ধুত্ব-ভালোবাসা রাখা যাবে না, অর্থাৎ তাদের পক্ষ অবলম্বন করা যাবে না এবং ২৪নং আয়াতে মানুষের ভালোবাসার বস্তু যা দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা একে একে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ অপেক্ষা প্রিয় হলে তারা সত্য পথপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হবে।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সমস্যাসমূহ
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মুমিন জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং সেটি একক প্রচেষ্টায় কখনো সম্ভব নয়; প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এখন প্রশ্নÑ শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার পেছনে কারণ কী?
প্রথমত, অজ্ঞতা। দেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে স্রেফ কিছু আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব একটি ধর্ম মনে করে। তাই একজন ব্যক্তিকে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত পালনে যতখানি আন্তরিক দেখা যায় আল্লাহর পথে জিহাদের ব্যাপারে ততখানি আন্তরিক নয়, বরং বড় উদাসীন পাওয়া যায়। সে দীন ও দুনিয়াকে পৃথক করে নিয়েছে। আবার অতি দীনদার ব্যক্তিকেও তাগুতের সাহায্যকারী হিসেবে দেখা যায়। এরা ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সাহায্যকারী না হলেও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেই রাষ্ট্রের সুনাগরিক হবে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু বর্তমানে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। বর্তমান সমাজে তাদের অবস্থান ইসলামের জন্য তেমন মূল্যও বহন করে না।
দ্বিতীয়ত, ইসলামী আন্দোলনের পথটা বড়ো পিচ্ছিল। অনেকে এমন আছেন যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক তা মনেপ্রাণে চায়, কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের ঝুঁকি বহনে রাজি নয়। এরা আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আল্লাহপাকের বাণী, ‘আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার যোগ্য কেবল তারাই যারা পরকালের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবন বিক্রি করে দেয়।’ (সূরা নিসা : ৭৪)।
তৃতীয়ত, প্রতিকূল পরিবেশ। আল কুরআন সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে যত নবী-রসূলের আগমন ঘটেছে, সবাই প্রতিকূল পরিবেশ মাড়িয়েই সম্মুখে অগ্রসর হয়েছেন। কুরআনে হজরত নূহ (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ইসা (আ.) পর্যন্ত অনেক নবী-রাসূলের বর্ণনা রয়েছে এবং তাঁরা মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁদের মাঝে স্বল্পসংখ্যকই সফল হয়েছেন। সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ (সা.) দীর্ঘ তেরো বছরে মক্কায় স্বল্পসংখ্যক লোককে মুসলমান হিসেবে পেয়েছেন এবং এরা মদিনায় হিজরত করার পর একটি রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হওয়ার পরে দ্রুত ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা বেড়ে যায়।
চতুর্থত, সমাজতন্ত্রের পতনের পর সকল কুফরি শক্তি ইসলামের উত্থানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরূপ প্রচারণা দুর্বলমনা মুসলমানদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছে।
পঞ্চমত, সমাজে ইসলাম কায়েমের জন্য যারা তৎপর রয়েছেন তারা নানা ফেরকায় বিভক্ত। এ বিভক্তির পেছনে ফরজ-ওয়াজিবের মতো কোনো আমল নয়, বরং পার্থক্য রয়েছে সুন্নত-মুস্তাহাব নিয়ে। এটি শয়তানের চক্রান্ত। যারা উম্মাহর মাঝে মতপার্থক্য সৃষ্টি করে, দলাদলি ও ঝগড়া-ঝাঁটি করে এবং মসজিদ পৃথক করে তারা মূলত কুফরি করে। আল্লাহর বাণী, ‘মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা আল্লাহ তায়ালার শরিক বানিয়ে উপাসনা করে। তাদের মতোও হয়ো না, যারা দীনে মতভেদ সৃষ্টি, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয় আর প্রত্যেক দল উল্লাস করে যে, তারাই সঠিক ও সত্যের পথে আছে।’ (সূরা রুম : ৩১-৩২)।
ষষ্ঠত, ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে মানুষের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। আমাদের সমাজের মানুষের মাঝে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার সংখ্যা খুবই কম। সমাজে বেনামাজি ও পর্দাহীনতা প্রকট। মানুষের মাঝে ধারণা রয়েছে যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে নারী বাহিরে যেতে পারবে না এবং চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যও করতে পারবে না। এসবই অমূলক। আমরা দেখি, রমজান মাস আসলে মসজিদগুলো মুসল্লিতে পূর্ণ হয়ে যায় এবং মহিলারা চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে বাড়ির বাইরে গেলে শালীন পোশাকেই বের হয়। এটি শুধু রমজানের বরকতে। দেশে ইসলামপন্থিরা বিজয়ী হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ ইসলামী বিধিবিধান মেনে চলা শুরু করবে। সূরা নসরে আল্লাহপাক সেটিই বলেছেন (যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এলো, তখন দেখলে লোকে দলে দলে আল্লাহর দীনের মাঝে শামিল হচ্ছে)। জোরজবরদস্তি নয়, বরং মানুষের মাঝে মটিভিশন চালানো হবে এবং অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সুন্দর জীবন পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হবে।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা
মুসলমানের জন্য সম্ভব-অসম্ভবের প্রশ্ন একেবারে অমূলক। মুসলমান তার জীবনে সাফল্য খুঁজে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতপ্রাপ্তির মাঝে। সে জানে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ তাকে তার গুনাহের ক্ষমা ও জান্নাতের বাসিন্দা করবে (সূরা সফ-১২)। হ্যাঁ, সে এটিও জানে আল্লাহর পথে জিহাদের মাধ্যমে দুনিয়ার জীবনেও তাকে কর্তৃত্বদান করা হবে (সূরা সফ-১৩)। জমিনে মুমিনদের উপস্থিতি থাকলে দুনিয়ায় কর্তৃত্বদানের ক্ষমতা মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফের-মুশরিকদের দেয়া স্বাভাবিক নয়। আল্লাহপাকের প্রতিশ্রুতি, তোমরা নিরাশ হয়ো না ও বিষণ্ন হয়ো না এবং তোমরাই জয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও।’ (আলে ইমরান : ১৩৯)। তিনি আরো বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তাদের তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খেলাফত দান করবেন যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদের দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দীনকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যে দীনটি আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা যেন শুধু আমার ইবাদত করে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে। আর যারা এরপরও কুফরি করবে তারাই ফাসেক।’ (সূরা নূর : ৫৫)।
সমগ্র বিশ্বজাহানের রাজত্ব আল্লাহর হাতে। মানুষ তাঁর প্রতিনিধি (আব্দুল মালেক)। জমিনে রাজত্ব দান একান্তভাবে আল্লাহর মর্জি। কাউকে রাজত্ব দান এবং কারো হাত থেকে কেড়ে নেয়া তাঁরই ইচ্ছাধীন। তাঁর বাণী, ‘বলো, হে আল্লাহ! তুমি রাজত্বের মালিক, যাকে চাও রাজত্ব দান করো, আর যার থেকে চাও রাজত্ব কেড়ে নাও এবং যাকে চাও সম্মান দান করো। আর যাকে চাও অপমানিত করো, তোমার হাতেই কল্যাণ, নিশ্চয়ই তুমি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।’ (সূরা আলে ইমরান : ২৬)। রাজত্ব দানের ক্ষেত্রে আল্লাহপাকের একটি নিয়ম রয়েছে। দশজন একশো জনের ওপর আবার স্বল্পসংখ্যক মুমিন অধিকসংখ্যক কাফের-মুশরিকের ওপর বিজয়ী হওয়ার কথা আল্লাহপাক বলেছেন। আল্লাহপাক বিজয়ী হওয়ার শর্ত দিয়েছেন মুমিন হওয়ার সাথে সাথে নেক আমল করার। আবার বিভিন্নভাবে মুমিনের গুণাবলিও উল্লেখ করেছেন। সূরা আল মুমিনূন প্রথম ১১টি আয়াতে প্রকৃত মুমিনদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। ইসলামের মৌলিক ইবাদত-বন্দেগি পালনের সাথে সাথে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, প্রতিশ্রুতি পালন, আমানত সংরক্ষণ, সদাচরণ ইত্যাদি মৌলিক মানবীয় গুণাবলি যা থাকা দরকার সবই একজন মুমিনের মাঝে থাকতে হবে। সর্বোপরি তাকে হতে হবে আল্লাহর পথে প্রচেষ্টাকারী (সূরা নিসা-৭৬)।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একদল যোগ্য নেতা এবং সেই জনপদের মানুষ ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন দান করলে মহান আল্লাহপাক সেখানে ইসলামপন্থিদের খেলাফত দান করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) পবিত্র মক্কা নগরীতে ইসলামের জন্য উৎসর্গকৃত একদল নেতা তৈরি করতে সক্ষম হলেও মক্কার সাধারণ জনতা ইসলামের পক্ষে ছিল না। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে গড়া সাহাবীগণ মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে অনুকূল পরিবেশে মদিনায় একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে উঠে এবং সেই রাষ্ট্রটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না হলে ইসলামের সৌন্দর্য ও কল্যাণকারিতা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশের সকল ওলামায়ে কেরাম এবং ইসলামী দলসমূহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে মোটামুটি ঐকমত্য পোষণ করেছে। ইতোপূর্বে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার হেফাজতে ইসলাম, আলেম সমাজ এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতি চরম জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে। কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠী নয়, বরং প্রতিপক্ষ বানিয়েছিল ইসলামকে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ইসলামপন্থি সব দল এবং আলেম সমাজ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি সুযোগ লাভ করেছে। ইতোপূর্বে জামায়াতের দুজন মন্ত্রী এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একজন আলেমের সুষ্ঠুভাবে মন্ত্রণালয় পরিচালনা প্রমাণ করে যে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করলে তা পরিচালনার মতো সৎ ও দক্ষ জনশক্তি ইসলামী দল ও আলেম সমাজ সরবরাহ করতে সক্ষম। এখন প্রয়োজন জনসমর্থন। ইসলামের বাইরে আর কিছু চাওয়ার এখতিয়ার মুসলমানের নেই। শতকরা নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী দলসমূহ একমঞ্চে উঠতে পারলে জনতার সমর্থন তাদের পক্ষেই যাবে এবং আশা করা যায়, গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব.), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।