সম্পাদকীয়

কঠোর হাতে আওয়ামী জঙ্গিবাদের মোকাবিলা করতে হবে


২১ আগস্ট ২০২৫ ১৫:১৫

ফ্যাসিবাদ কতটা ভয়ঙ্কর- জার্মানি ও ইতালি খুব ভালোভাবেই চিনেছে। সাথে সাথে তারা ইউরোপ-আমেরিকাকেও চেনাতে পেরেছে। তাই তারা ফ্যাসিবাদের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত বরদাশত করে না। ফ্যাসিজমের গন্ধ পেলে তাকে কোনো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যন্ত ছাত্র হিসেবে রাখে না। কিন্তু আমরা পরপর দুবার (স্বাধীনতার পর সাড়ে তিন বছর এবং ২০০৮ থেকে ২০২৪- এ দেড় দশক) ফ্যাসিবাদী শাসনের অত্যাচার নির্যাতনের স্টিমরোলার সহ্য করার পরও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছি কিংবা অন্যদের এর ভয়াবহতা বুঝাতে পেরেছি, এমনটা মনে হয় না। কারণ সদ্য পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট শাসনের মূল হোতারা ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে হুমকি দিচ্ছে, জঙ্গি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করছে। চাকরিরত সেনাবাহিনী ও পুলিশের কর্মকর্তারা জঙ্গি ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ধরা পড়ছে। তারপরও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পক্ষে একশ্রেণির সাংবাদিক, সংবাদপত্র, সুশীল পরিচয় দেয়া পরজীবী, রাজনৈতিক দল কথা বলার দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তারা এ দুঃসাহস দেখাতে পারছে, কারণ সরকার এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন নয়। তারা বিষয়টিকে নিছক রাজনৈতিক বলে মনে করছে। কিন্তু আসলে ফ্যাসিস্টদের দর্শনে কোনো রাজনীতি নেই। তাদের দর্শন হলো, ‘যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আমার চাই’। এক্ষেত্রে তারা নীতি, নৈতিকতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাধারণ স্বতসিদ্ধ নিয়মকানুন মানার তোয়াক্কা করে না। খুন, গুম, জুডিশিয়াল কিলিং, দুর্নীতি, চাঁদাবজি, ঘুষ, মিথ্যাচার এবং সন্ত্রাসই তাদের হাতিয়ার।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস এবং বর্তমান ষড়যন্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে বিনা যুক্তিতেই দলটি একটি প্রমাণিত ফ্যাসিস্ট। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন (১৯৭৩) থেকে নিয়ে আওয়ামী লীগের আমলের প্রতিটি নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে কোনোদিন সরকার গঠন করেনি। ভোটার লিস্ট জালিয়াতি থেকে শুরু করে কেন্দ্র দখল এবং মিডিয়া ক্যু করে ফলাফল পাল্টে দিয়েই সরকার গঠনের মতো আসন নিশ্চিত করেছে। একবার সরকার গঠন করলে তাদের স্বাভাবিকভাবে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানো খুব কমই সম্ভব হয়েছে। ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন থেকে জনগণকে বাঁচাতে ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনী এগিয়ে এসে সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বিপ্লবী ভূমিকা দেশকে গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়েছে। ফ্যাসিস্ট অপশক্তি মানুষের চোখের সামনে ঘটা এসব নির্মম ঘটনা নিয়ে মিথ্যাচার করছে। ফিরে এসে বিপ্লবীদের দেখে নেয়ার হুমকিই শুধু দিচ্ছে না, জঙ্গি কার্যক্রমও শুরু করেছে। রাজধানীর বসুন্ধরায় প্রশিক্ষণরত অবস্থায় সেনা কর্মকর্তাসহ ধরা পড়েছে। রাজশাহীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযানে সাবেক সিটি মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান লিটনের চাচাতো ভাইসহ তিনজনকে সেনাবাহিনী বিপুল অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছে। আটকরা হলেন- মোন্তাসিরুল আলম অনিন্দ্য, তার সহযোগী মো. রবিন ও মো. ফয়সাল। তাদের মধ্যে অনিন্দ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। ওইসময় তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। আসলে জঙ্গিবাদের সাথে সুশীলরা ইসলামকে জড়িয়ে মিথ্যাচার করলেও এর মূল হোতা আওয়ামী লীগ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত হলো এর মদদদাতা। তারা ইসলামের নাম ও লেবাস ব্যবহার করে নিজেদের আড়াল করে অপকর্মের দায় দেশের আলেম-ওলামার ওপর চাপানোর অপকৌশল হিসেবে। এ কথা ২০২১ সালের চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে একাধিকবার প্রমাণ হওয়ার পরও কিছু মিডিয়ার মিথ্যাচারের কারণে আসল সত্য আড়ালেই থেকে গেছে।
মোন্তাসিরুল আলম অনিন্দ্য ডক্টর ইংলিশ নামের কোচিং সেন্টারের মালিক। তিনি সাবেক সিটি মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা খায়রুজ্জামান লিটনের চাচাতো ভাই। তার মানে কোচিং সেন্টারের আড়ালে তারা সীমান্তের ওপার থেকে আসা আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিল। ভারতের কলকাতায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলা এবং দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার হুমকির সাথে যে উল্লেখিত ঘটনাগুলোর যোগ আছে, তা সেনা অভিযানে উদ্ধার অস্ত্রগুলোই বলে দিচ্ছে। অভিযানে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি, সামরিক মানের দুরবিন ও স্নাইপার স্কোপ, ছয়টি দেশীয় অস্ত্র, সাতটি বিদেশি ধারালো ডেগার, পাঁচটি উন্নতমানের ওয়াকিটকি সেট, একটি সামরিক মানের জিপিএস, একটি টিজার গান, বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি কার্টিজ, বিপুলসংখ্যক অব্যবহৃত সিম কার্ড, বিস্ফোরক বোমা বানানোর সরঞ্জামাদি, ছয়টি কম্পিউটার সেট, নগদ ৭ হাজার ৪৪৫ টাকা, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি মদ ও ১১টি নাইট্রোজেন কার্টিজ উদ্ধার করা হয়।
আমরা মনে করি, একাধিকবার প্রমাণিত সত্য আওয়ামী লীগ একটি জঙ্গি সংগঠন। তারা গণতান্ত্রিক আদর্র্শ নয়, অস্ত্রের মাঝেই ক্ষমতার উৎস তালাশ করে। এবারও তার ব্যতিক্রম করছে না। সীমান্তের ওপারে বসে দেশকে অস্থিতিশীল করতে জঙ্গি হামলার ছক আঁকছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব- ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদকে মদদ দেয়ার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে তোলা এবং আওয়ামী লীগের জঙ্গি তৎপরতা বিস্তারিত তাদের অবহিত করা। তা না হলে দেশ বিপদে পড়বে। ফ্যাসিজমের বিপদের ভয়াবহতা মোকাবিলা করতে এখনই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। আওয়ামী জঙ্গিবাদের মোকাবিলায় আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কঠোর হাতে তাদের মোকাবিলা করতে হবে।