চাই উদ্ভাবনের বাস্তব প্রয়োগ


৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৩০

॥ ডা. সৈয়দ আনোয়ারুল আবেদীন ॥
মারণাস্ত্র বা যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কোনো কিছুর আবিষ্কার, উদ্ভাবন বা উৎকর্ষ সাধন সাধারণত মানুষের জন্য কল্যাণই বয়ে আনে। গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজে বাংলাদেশের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এমন কিছু বিষয়, জিনিস বা যন্ত্র আমাদের দেশে উদ্ভাবিত হয়েছে, যা সত্যিই চমকপ্রদ ও আশাব্যঞ্জক। উদাহরণ হিসেবে কয়েকটিকে তুলে ধরা যায়-
১. সনো আর্সেনিক ফিল্টার : ড. আবুল হুস্সাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনের জন্য টঝঅ গমন করেন। সেখানে গবেষণাকালে তিনি বাংলাদেশের পানির আর্সেনিকের ভয়াবহতা উপলব্ধি করেন এবং পানিকে আর্সেনিকমুক্ত করার উপায় বের করার বিষয়ে সংকল্পবদ্ধ হন। দেশে ফিরে এসে তিনি তার ভাইয়ের সহায়তায় নিজ বাড়িতে একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই ল্যাবে পানির আর্সেনিকের পরিমাণ নিরূপণ ও তা দূরীকরণ ফিল্টার উদ্ভাবন করেন। এটি একটি সুলভ, সহজ এবং ঘড়হ পযবসরপধষ ফিল্টার। আর্সেনিকের ভয়ঙ্কর ক্ষতি থেকে মানুষকে রক্ষায় খুবই কার্যকরী।
২. জুটিন : মোবারক আহমেদ খান ২০০৯ সালে পাটের তৈরি ঢেউটিন উদ্ভাবন করেন, যা ‘জুটিন’ নামে পরিচিত। ‘জুটিন’ তৈরিতে তিনি পাটের সাথে ব্যবহার করেন পলিমারের মিশ্রণ।
৩. জুটন : ৭০ ভাগ পাট ও ৩০ ভাগ তুলার সংমিশ্রণে ড. মোহাম্মদ সিদ্দিকুল্লাহ আবিষ্কার করেন ‘জুটন’।
৪. সোনালি ব্যাগ : ‘জুট পলিমার’ বা পরিবেশবান্ধব ‘পলিব্যাগ’ নামেও পরিচিত। এটি একটি সেলুলোজভিত্তিক বায়োডিগ্রেডেবল বায়োপ্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ব্যাগ। পাট থেকে এ সেলুলোজকে সংগ্রহ করা হয়। বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমেদ খান ২০১৬ সালে পাট থেকে তৈরি করেছেন এ সোনালি ব্যাগ। দেখতে পলিথিনের মতো হলেও আসলে পলিথিন নয়। এটি পচনশীল, কোথাও গিয়ে জমাট বাঁধে না। ফলে পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। এসব তৈরির উপকরণ ও কাঁচামাল আমাদের দেশীয় ও সহজলভ্য। প্রক্রিয়াজাত দ্রব্য ও যন্ত্র দ্বারা একাধারে যেমন সর্বসাধারণ উপকৃত হবে, পরিবেশ উন্নত হবে; অপরদিকে কাঁচামাল উৎপাদনকারী কৃষকও উপকৃত হবে।
৫. পঞ্চ ব্রিহি ধান : জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী উদ্ভাবন করেছেন পঞ্চ ব্রিহি ধান। বোরো হিসেবে বপন করা এ ধানগাছ থেকে বছরে পাওয়া যাবে পাঁচবার ফলন। অর্থাৎ এক বপন খরচে পাওয়া যাবে পাঁচটি ফলন।
৬. বাই বিফস্টেক টমেটো-১ : সম্প্রতি বাকৃবির গবেষক অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান ‘বাই বিফস্টেক টমেটো-১’ নামে টমেটোর একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। জাতটি নাকি শুধু আকৃতেই বড় নয়, স্বাদে ও পুষ্টিগুণে অনন্য। এ জাত হেক্টরপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টন ফলন দিতে সক্ষম। প্রস্টেট, কলন ও পাকস্থলির ক্যানসার প্রতিরোধে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। (আমার দেশ : ৫ এপ্রিল ২০২৫)।
৭. গোটলি মাছের কৃত্তিম প্রজনন : বিলুপ্তপ্রায় ‘গোটলি’ মাছের কৃত্তিম প্রজননে সাফল্য পেয়েছেন বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক। (নয়া দিগন্ত : ১২ মার্চ ২০২৫)।
৮. মেটিং ডিসপারসন প্রযুক্তি : বেগুন চাষে কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে ‘মেটিং ডিসপারসন প্রযুক্তি’ ব্যবহারে সফলতা বাকৃবির আরো একটি সাফল্য। এ প্রযুক্তিতে কীটের বংশ বৃদ্ধি রোধ করে ক্রমে ধ্বংসাত্মক কীটকে নির্বংশ করে দেয়া হয়। (নয়া দিগন্ত : ১১ মার্চ ২০২৫)।
এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া যেমন facebook, youtube ইত্যাদির মাধ্যমেও মাঝেমধ্যে আমরা বাংলাদেশিদের কিছু চমকপ্রদ উদ্ভাবন দেখে থাকি। যেমন- মানিকগঞ্জের জুলহাসের তৈরি হেলিকপ্টার। তিনি একজন সাধারণ ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। নিজ প্রচেষ্টায় দেশীয় প্রযুক্তির সহায়তায় স্বল্প শিক্ষিত এ যুবক একটি হেলিকপ্টার তৈরি করে নিজেই সেটার চালক হয়ে উড্ডয়ন করে দেখিয়েছেন।
পত্রপত্রিকায় এ ধরনের বিভিন্ন গবেষণা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনের আশাব্যঞ্জক সফলতার খবর আমরা পেয়ে থাকি। কিন্তু এসব সাফল্যের কথা শুধুমাত্র গল্প গাথা হিসেবে সীমিত থাকলে তা সমাজের কোনো কল্যাণ সাধনে ভূমিকা রাখবে না। প্রয়োজন এসবের বাস্তব প্রয়োগ। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান, মানুষের কল্যাণে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করুন।
লেখক : শিশু বিশেষজ্ঞ, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ঢাকা।