হযরত মুহাম্মদ সা. ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান
৭ আগস্ট ২০২৫ ১৪:২৭
॥ ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান ॥
(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাসূল (সা.)-এর অনুসরণকৃত স্বাস্থ্য বিধিমালা
রোগের প্রতিকারের চেয়ে রোগের প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা- এই ছিল রাসূল সা. প্রবর্তিত স্বাস্থ্য বিধির মূলকথা। রাসূল (সা.) প্রবর্তিত স্বাস্থ্যবিধি ছিল অতীব বাস্তবধর্মী, বিজ্ঞান সম্মত, সুদূরপ্রসারী ও ফলপ্রসূ। গভীর অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় এভাবে যে, রাসূল সা. প্রবর্তিত সাবধানতা অবলম্বন মানুষকে রোগমুক্ত ও সুখ সমৃদ্ধ জীবনযাপনে অধিকতর সুফল দিয়েছে। নবীজির আমলে প্রবর্তিত স্বাস্থ্যবিধির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নমুনা নিম্নে প্রদত্ত হলো-
১. ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে আছে দশটি নীতিমালা যেগুলোকে স্বভাব বা প্রকৃতিগত সুন্নত অর্থাৎ দীনে হানিফের অংশ বলা হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেন-
‘‘১. গোঁফ ছাঁটা, ২. দাড়ি লম্বা করা, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. নাকে পানি দেয়া, ৫. নখ কাটা, ৬. আঙুলের জোড়াগুলো ধৌত করা, ৭. বগলের পশম উপড়ে ফেলা, ৮. নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করা, ৯. এস্তেনজা করা, ১০. কুলি করা।’’
২. পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
১. মানববসতিকে সর্বপ্রকার দূষণমুক্ত রাখা, মলমূত্র ত্যাগের পর ময়লাগুলো ভূগর্ভস্থ রাখার ব্যবস্থা করা, মানববসতী ও চলাচলের পথ থেকে দূরে মল-মূত্র ত্যাগ ও ময়লা আবর্জনা ফেলা, ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি।
২. দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে নবীজি বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের প্রতিও জোর তাগিদ দিয়েছেন। চলাচলের পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু ও ময়লা-আবর্জনা দূরীভূত করাকে নবীজি ঈমানী দায়িত্ব বলে ঘোষণা করেছেন। ৩. নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত খাবার গ্রহণ। ৪. পরিমিত বিশ্রাম ও নিদ্রা। ৫. পরিমিত পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীর চর্চা। ৬. স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করা। ৭. পানপাত্রে ও খাবারে নিশ্বাস ত্যাগ থেকে বিরত থাকা। ৮. পচা ও বাসি খাবার পরিত্যাগ করা। ৯. নোংরা ও হারাম খাদ্যবস্তু বর্জন। ১০. রুচি সম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ। ১১. মদ ও নেশাজাতীয় বস্তু বর্জন। ১২. সমকামিতা, বহুগামিতা, ঋতুস্রাবাবস্থায় স্ত্রীগমনে নিষেধাজ্ঞা। ১৩. খাদ্য ও পানীয় ঢেকে রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ। যেমন নবীজি সা.-এর ভাষ্য হচ্ছে-
‘‘তোমরা বরতন ঢেকে রাখবে, পান পাত্রের মুখ বন্ধ করবে, দরজার অর্গল বন্ধ করবে এবং ঘুমানোর পূর্বে চেরাগ নিভিয়ে দেবে।’’
নবীজি (সা.)’র প্রস্তাবিত রোগ নিরাময় ব্যবস্থা
বিভিন্ন হাদীস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে নবীজির রোগ নিরাময় ব্যবস্থা হিসেবে ৫টি পদ্ধতির প্রয়োগবিধি উল্লেখ পাওয়া যায়।
১. হাজামাত
রক্তমোক্ষণপদ্ধতি। রাসূল সা. এ ব্যাপারে এরশাদ করেন-
‘‘তোমরা যে পদ্ধতি চিকিৎসা করে থাক, রক্তমোক্ষণ তার মধ্যে অধিক ফলপ্রসূ।’’
বর্তমানে এ পদ্ধতি কিছু পরিবর্তিত হয়ে চীনা পদ্ধতিতে আকু পাংচার চিকিৎসা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পাকিস্তানেও এ পদ্ধতিতে বহুল প্রচলিত। এছাড়া বর্তমানে আমেরিকান হাসপাতালসমূহে এ ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, হুজুর সা. বলেন, শিংগা বা রক্তমোক্ষণের জন্য চন্দ্রমাসের ১৭, ১৯ এবং ২১ তারিখকে উত্তম বলেছেন। তবে বুধবার শিংগা লাগানো অনুপযোগী বলেছেন। নবীজি পাগল, কুষ্ঠরোগী, মৃগীরোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহার করতেন। হুযূর সা. বলেছেন- ‘‘শিংগা লাগালে জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ও স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়।’’ হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘‘হুজুর সা. শিংগা লাগানোর ফলে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং পিঠ হাল্কা হয়।’’
অন্যত্র নবীজি সা. বলেছেন-
‘‘শিংগা মানুষের বুদ্ধি ও মুখস্থ শক্তি বৃদ্ধি করে।’’
বিভিন্ন হাদীস শাস্ত্র গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়, নবীজি কাঁধ, কাঁধের মাঝে, গ্রীবা বা ঘাড়, মাথা, পিঠ, রান, চিবুক ইত্যাদিতে শিংগা বা রক্তমোক্ষণ চিকিৎসা নিতেন। প্রাচীন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ডাক্তারগণ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, চিবুকের নিচে শিংগা লাগালে চেহারা, গলা ও দাঁতের ব্যথা উপশম হয় এবং মাথা ও হাত-তালুতে আরাম বোধ হয়।
‘‘পায়ের গোড়ালিতে শিংগা লাগানোর দ্বারা রান, পায়ের গোছায় ব্যথা নিরাময় হয় এবং খোস- পাঁচড়া জাতীয় চর্মরোগ ভালো হয়। সীনার নিচে শিংগা লাগালে ফোঁড়া, পাঁচর, খুজলী, দুম্বল, চর্মরোগ, নুকরস, অশ্বরোগ ও স্থূলবুদ্ধি দূর হয়।’’
২. লাদূদ
মুখ দিয়ে ওষুধ ব্যবহার করা। রাসূল সা. উম্মে কায়স রা.কে কয়েকটি নিরাময় ব্যবস্থা দিয়েছিলেন তন্মধ্যে জাতুল জানব বা পাঁজরের ব্যথা নিরাময়ের জন্য ‘কোস্তেহিন্দী’ পিষে মুখে খাওয়ানোর জন্য বলেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
‘‘তোমরা কোস্তে হিন্দী (ভারতীয় আগর কাঠ) দিয়ে চিকিৎসা কর, কেননা তাতে সাত ধরনের রোগের নিরাময় রয়েছে।’’
৩. সাঊত
নাক দিয়ে ওষুধ ব্যবহার করা। আলাজিহ্বা ফুলে উঠা রোগের জন্য রাসূল সা. ওপরে বর্ণিত কোস্তেহিন্দী ঘষে পানিসহ ফোঁটা করে নাকে ভেতর দিতে বলেছেন।
৪. মধু পান
পেট পরিষ্কার ও ডায়রিয়া বন্ধ করার জন্য রাসূল সা. মধু পানের পরামর্শ দিয়েছেন। এতে খুব দ্রুত পেট পরিষ্কার হয় এবং ডায়রিয়া রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। নবী করীম সা. বলেন, ‘‘মধু ও কুরআনের মাধ্যমে তোমাদের চিকিৎসা নেয়াউচিত।’’
৫. কাওয়া রাসূলে করীমের নিকট অপছন্দনীয়
লোহা গরম করে ছ্যাঁক দেয়া। রাসূল সা. বলেছেন- ‘‘তোমাদের ওষুধসমূহের মধ্যে যদি কোন নিরাময় থাকে তা রয়েছে মধু গ্রহণে, রক্তমোক্ষণে এবং গরম লোহার দ্বারা ছ্যাঁক দেয়ার মধ্যে। তবে তা (ছ্যাঁক দেয়া) আমি পছন্দ করিনা।’’ নবীজি সা.-এর ভাষ্য হচ্ছে-
রাসূল (দ.) যে সব রোগের চিকিৎসা করতেন
১. মাছি বাহিত রোগ ও এর চিকিৎসা, ২. গলগণ্ড রোগের চিকিৎসা, ৩. জ্বরের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র, ৪. নিউমোনিয়া রোগের চিকিৎসা ও চিকিৎসাপত্র, ৫. মাথা ব্যাথার চিকিৎসা, ৬. অন্যান্য ব্যাথা-বেদনার চিকিৎসা, ৭. ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ার চিকিৎসা, ৮. চক্ষুরোগের ব্যবস্থাপত্র, ৯. চর্মরোগের চিকিৎসা, ১০. বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক ও চিকিৎসা, ১১. জীবাণু ধ্বংস চিকিৎসা, ১২. জখমের চিকিৎসা, ১৩. সর্প ও সরীসৃপ দংশন চিকিৎসা, ১৪. উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা, ১৫. সাইটিকা বেদনার চিকিৎসা, ১৬. পক্ষাঘাতের চিকিৎসা, ১৭. যাবতীয় মানসিক রোগ, ১৮. অশ্বরোগ, ১৯. বিভিন্ন প্রকার গ্রন্থিসন্ধি।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে নবীজির ব্যবহৃত ওষুধসমূহ
রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর প্রতিটি কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা, প্রভৃতি ছিল বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ। নবীজির সমুদয় কাজ-কর্মকে আখ্যায়িত করা হয় সুন্নত হিসেবে। আর নবীজির অনুসারী তথা উম্মত মাত্রই তা অনুসরণে বদ্ধপরিকর। নবীজির সুন্নাত ছিল, তিনি স্বীয় পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীদের বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগে প্রাজ্ঞপূর্ণ চিকিৎসা সেবা দানে আত্মনিয়োগ করতেন। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ ও দিতেন আবার কখনো রোগ অনুসারে ওষুধপত্র সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতেন। রোগ-ব্যাধিতে তাঁর ব্যবহৃত ওষুধপত্র প্রায় সবগুলোই অমিশ্র বা একক উপকরণ বিশিষ্ট ছিল। অবশ্য তিনি কখনো যৌগিক ওষুধ ব্যবহার করতেন এবং প্রয়োগ করতেন। তাঁর ব্যবহৃত কয়েকটি ওষুধের উপাদান হলো-
১. মধু
আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত, মানবদেহের জন্য যত প্রকার ভিটামিন আবশ্যক, তার বার আনা মধুর মধ্যে বিদ্যমান গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে, মধু অপেক্ষা শক্তিশালী ভিটামিনযুক্ত আর কোনো পদার্থ নেই। রাসূল সা. বলেছেন, ‘‘দুটি আরোগ্যদানকারী বস্তুকে তোমরা অপরিহার্য করে নাও একটা মধু অন্যটা আল্ কুরআন।’’
আল্লাহ্ পাক বলেন-
‘‘আল্লাহ্ পাক মধুমক্ষিকার উদর থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় এবং মধু বের করে থাকেন, যার মধ্যে মানুষের জন্য অসংখ্য রোগের প্রতিকার রয়েছে।’’
মধুর গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজি বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি প্রতিমাসে তিনবার সকাল বেলায় মধু চেটে সেবন করে, তার কোনো কঠিন ও জটিল রোগ হবে না।’’
মধু, ফোড়া, পাঁচড়া, আমাশয়, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য পেটের রোগ তথা কোষ্ঠকাঠিন্য, বাতের ব্যথা, মুখের পক্ষাঘাত, শরীরের পক্ষাঘাত, মানসিক রোগ চক্ষুরোগ ও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির মহৌষধ।
২. কালোজিরা
কালোজিরাকে ফার্সিতে বলা হয় ‘শোনিজ’ ইংরেজিতে (নষধপশ পঁসরহ) আর আরবিতে বলা হয় ‘হাব্বাতুস্ সাউদা’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে কালোজিরা পেট, ব্যথা, শুলবেদনা, মস্তিষ্ক দুর্বলতা, শিরা, অকর্মন্যতা, অর্ধাংগকাঁপুনি রোগ বিশেষত ঠাণ্ডাজনিত রোগ-ব্যাধি যেমন সর্দি, কাশি, কফ ইত্যাদি উপশমে অত্যন্ত উপকারী। নবীজি সা. বলেন, ‘‘কালোজিরা ব্যবহার করা তোমাদের জন্য অপরিহার্য। কেননা এতে মৃত্যু ছাড়া সকল রোগের আরোগ্যতা বিদ্যমান।’’
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এর অনেক ব্যবহার রয়েছে। যৌনব্যাধি, বুক ব্যথা, পাকস্থলিতে বায়ু বৃদ্ধি, প্রসূতি রোগ, ভ্রুণ শক্তিশালী করণ, মূত্রথলির পাথর, অধিক ঋতুস্রাব ও মাত্রাতিরিক্ত পেশাব তথা ডায়াবেটিস এবং ক্রিমিনাশক ইত্যাদি ক্ষেত্রে খুবই উপকারী।
৩. কুসত
কুসতকে ফার্সিতে ‘কুস্তাই’ হিন্দিতে গোঠ আর ইংরেজিতে (ঈঁংঃঁং ৎড়ড়ঃ) বলা হয় যার বাংলা নাম হলো গিরিমল্লিকা ফুলগাছের কাঠ বা আগরকাঠ। তা দু’ধরনের যেমন কুসতে বাহরি বা কালো রঙের আগর কাঠ। সাদা কুসত এবং অন্যটি কুসতে হিন্দী বা কালো রঙের আগর কাঠ। নবীজি সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত গলনালীর আবদ্ধতা, গলগণ্ড, হাঁপানী, এজমা, নিউমোনিয়া, শ্লেষ্মা, হৃদযন্ত্র, মস্তিস্ক, যকৃৎ, অন্ডকোষের রোগের জন্য তা ব্যবহার করতেন। যেমন নবীজি সা. বলেছেন, ‘‘তোমাদের বাচ্চাদের গলগ্রহ হলে গণ্ডদেশ মালিশ ও দাবিয়ে কষ্ট দিওনা। বরং তোমরা কুসত ব্যবহার কর।’’
৪. মেহেদী
রাসূল সা. আঘাত জনিত ক্ষত, ঘা ও চর্মরোগে মেহেদী ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। যেমন রাসূল সা.-এর খাদেমা সালমা বিনতে উম্মে রাফি থেকে বর্ণিত-
‘‘যখন নবী করীম সা.-এর ফোঁড়া-পাঁচড়া বের হতো অথবা কাঁটা বা এ প্রকারের কিছু শরীরে ঢুকে যেত তখনি তিনি আমাকে বলতেন এর ওপর মেহেদী লাগিয়ে দাও।’’
অপর এক হাদীসে ইবনে মাযাহর বরাত দিয়ে আল্লামা ইবনে কায়্যিম নকল করেছেন-
‘‘যখন রাসূল সা.-এর মাথা ব্যথা দেখা দিত তখন তিনি মাথায় মেহেদী লাগাতেন আর বলতেন এটা আল্লাহর হুকুমে মাথা ব্যথার আরোগ্য দানকারী।
৫. খেজুর
সুস্বাদু ফল হিসেবে খেজুরের কোনো জুড়ি নেই। এর মধ্যে রয়েছে পেটের গ্যাস, শ্লেষ্মা, কফ, শুষ্ক কাশি, এজমা এবং হৃদরোগের জন্য মহৌষধ। উল্লেখ্য যে, ‘‘নবী করীম সা. হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা.কে দেখতে গিয়ে তিনি তাকে মদীনার আজওয়া খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। আবু সাঈদ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত।’’ অন্যত্র আছে ‘‘খেজুর বীচিও পাতলা পায়খানা বন্ধ করে, পোড়া খেজুর বিচি চূর্ণ রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে ও ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে এবং চূর্ণ দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত পরিষ্কার হয়।’’ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন- ‘‘সকাল বেলা যে ব্যক্তি মদীনার সাতটি আযওয়া খেজুর খাবে, কোনো বিষ বা জাদু তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’’ হাদীস শরীফটি হলো- নবীজি সা. আরো বলেন, ‘‘আজওয়া জান্নাতের ফল। এর মধ্যে বিশেষ নিরাময় আছে।’’
৬. যাইতুন
যাইতুন তেলের উপকারিতা অপরিসীম। শরীরের ছোট ছোট গ্রন্থি, বিশেষ আঙ্গুল, হাঁটু, গোড়ালি ও হাতের কবজির সন্ধিতে তীব্র ব্যথায় যাইতুন তেল মালিশ করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। ইউনানী পরিভাষায় এ রোগকে বলা হয় ‘নিকরেস’ বা গেঁঢেবাত। ‘‘নবীজি সা. বলেন, তোমরা যাইতুন তেল খাও এবং তা মালিশ কর, কেননা এটা একটি বরকতময় বৃক্ষ থেকে উৎপন্ন।’’
‘‘নবীজি সা. ফ্লুরিসি বা পাঁজরের ব্যাথায় যাইতুন ও ওয়ারস ব্যবহার করতেন।’’
৭. তিন
তিন অর্থ বিলাতি ডুমুর, ফার্সিতে বলা হয় হয় ‘আনযীর’ ফল। অশ্বরোগ ও গেটে বাত-ব্যথার জন্য রাসূল সা. বিলাতি ডুমুর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে- ‘‘একাদা হাদীয়া হিসেবে নবী করীম সা.-এর নিকট আনযীর আসলে তিনি সাহাবাদের বললেন, খাও। আমি যদি বলতাম যে জান্নাত থেকে ফল এসেছে, তবে আমি নিশ্চয় বলতাম এ জান্নাতি ফল হল আনযীর। এটা অশ্বরোগ দূর করে এবং গেটে বাতের ব্যথার জন্য উপকারী।’’
আল্লাহ্ পাক উপরোক্ত দুটো ফলের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের শপথ করেছেন এভাবে- ‘‘শপথ তিন (ডুমুর) এবং যাইতুনের।’’
কুরআনের পাশাপাশি এর বর্ণনা পাওয়া যায় ইঞ্জিলের ইরমিয়া, অধ্যায় ২৪ ও মথি অধ্যায়: ২১ ইত্যাদি।
৮. মাশরুম
এটা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে উদগত এক প্রকার ছত্রাক। এটি একটি সুস্বাদু খাদ্য এবং চোখের নানা রোগে প্রতিষেধক হিসেবে অতীব পরিচিত। রাসূল সা. বলেন- ‘‘ব্যাঙের ছাতা (মাশরুম) মান্নার তো অনায়াসে লব্দ মহান আল্লাহর নিয়ামত বিশেষ। এর রস চোখের জন্য ওষুধ বিশেষ।’’ যেমন নবীজি সা. বলেন, তবে উল্লেখ্য যে, ‘‘তিন ধরনের মাশরুম রয়েছে যথা সাদা, লাল ও কাল। তন্মধ্যে সাদা ও লাল ঔষধি মাশরুম হিসেবে প্রসিদ্ধ কিন্তু কালোটা অতীব বিষাক্ত।’’
৯. ওয়ারস
‘হলদে এক প্রকার ঘাস বিশেষ। প্লারিসি (পাঁজর) ব্যথায় তা খুবই উপকারী। নবীজি এ ধরনের ব্যথায় ‘ওয়ারস’ ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন।’’
১০. লবণ
লবণ খাদ্যের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। তা হজম শক্তি ‘পরিপাক বর্ধক, ক্ষুধানিবারণকারী ও মন প্রফুল্লকারী। চুকা ঢেকুর, পেটের বায়ু পরিশোধন, রক্ত দুষণ, যকৃত ও প্লীহা রোগে খুবই উপকারী। এছাড়া বিষাক্ত বিচ্ছু ও কীট-পতঙ্গের বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে রাসূল সা. লবণ ব্যবহার করতেন। দংশিত ক্ষতস্থানে পানি সহকারে লবণের ব্যবহার করলে অনেক উপকারিতা অর্জিত হয়। হাদীসে বর্ণিত আছে, একদা নবীজিকে নামাজরত অবস্থায় একটি বিচ্ছু কামড় দেয়। নবীজি নামাজান্তে বিচ্ছু দংশনের চিকিৎসা করলেন এভাবে- ‘‘অতঃপর নবীজি সা. লবণ ও পানি চাইলেন এবং তা একটা পাত্রে ঢাললেন। তারপর ঐ দ্রবণে আগুন ডুবিয়ে ক্ষতস্থানে মালিশ করলেন। অবশেষে পবিত্র কুরআনের শেষোক্ত দুটি সূরা ফালাক ও নাস তিলাওয়াত করলেন।’’
১১. ইছমিদ
এন্টামনি বা এক প্রকার সুরমা বিশেষ। রাসূল সা. সুরমা লাগানোর ব্যাপারে নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেন এভাবে যে, ‘‘তোমরা সুরমা ব্যবহার কর। কেননা তা দ্বারা ভ্রƒ উদগত হয় এবং চোখের দৃষ্টি শক্তি প্রখর হয়।
১২. তালবীনা
দুধ, বার্লি ও মধুর সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার (হালুয়া) বিশেষ। তা পেটের পীড়া, ক্ষুধামন্দা শরীরিক দুর্বলতা নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকরী একটি মহৌষধ।
নবীজি সা. বলেন, ‘‘কোনো ব্যক্তির পেটের পীড়া হলে তাকে তালবীনা খাইয়ে দাও। অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, এটা তোমাদের পেটকে এমনভাবে পরিষ্কার করে, যেমনিভাবে কোনো ব্যক্তি স্বীয় চেহারা ময়লা হতে পরিষ্কার করে থাকে।’’ নবীজি সা. অন্যত্র বলেন, ‘‘তালবীনা রোগীর প্রাণে শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মানব মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে।’’
১৩. শিবরাম
এক ধরনের বীজ দানা। এটা সিদ্ধ করে পান করা হলে পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীভূত হয়। তবে এটা অত্যন্ত গরম বিধায় তার পরিবর্তে নবীজি কালোজিরা এবং ‘সানা ও সোনামুখী গাছের ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
১৪. সিনা বা সানা
সিনা বা সানা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এক মহৌষধ। সিনা অনেক প্রকারের হয়ে থাকে যেমন সিনায়ে মাক্কী বা হিজাজী, সিনায়ে রোমী, সিনায়ে মিশরী, সিনায়ে আসকারী এবং সিনায়ে হিন্দি। সিনা ব্যবহারে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর, মস্তিষ্ক পরিষ্কার হয়, কোমর ব্যথা, পার্শ্ববেদনা, নিউমোনিয়া, ওরুর ওপর অংশ ব্যথা, গিটবাত এবং কালাজ্বরসহ সর্বপ্রকার মাথা ব্যথানাশক ও মৃগী রোগীর জন্য খুবই উপকারী। তাই নবীজি বলেন-
‘‘তোমরা অবশ্যই সিনা ব্যবহার করবে, কেননা এটা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের আরোগ্য দানকারী।’’
১৫. সফরজাল
সফরজালের বাংলা পরিভাষা হলো ‘বিহিদানা’ এবং ইংরেজি ভাষা হলো ‘কাউস’। তা একপ্রকার টক মিষ্টি জাতীয় ফল। বিহিদানা শরবত ও মোরাব্বা তৈরি করে খেলে পেট, যকৃত, হৃদকম্পন ও মানসিক দুর্বলতা দূর করে। নবীজি সা. বলেন, ‘‘নিশ্চয় একটা (বিহিদানা) অন্তরের শক্তি সঞ্চার করে, মন প্রশান্ত করে এবং দম বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্বাসকষ্ট দূর করে।’’
১৬. মাদুরের ছাই
ক্ষত স্থানের প্রবহমান রক্ত প্রতিরোধে মাদুর বা চাইয়ের ছাই অতীব উপকারী, যা পরীক্ষিত একটা চিকিৎসা। নবীজি সা. তা ব্যবহার করতেন। ‘‘উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ সা. আহত হলে অবিরত ধারায় রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল আর হযরত ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ক্ষতস্থান পানি দিয়ে পরিষ্কার পূর্বক চাটাই পুড়ে ছাইগুলো ক্ষতস্থানে লাগালে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়।’’
১৭. দুম্বার নিতম্বের মাংস
সিয়াটিক পেইন (ঝপরধঃরপ চধরহ) এক প্রকার কঠিন ব্যথা যা মেরুদণ্ডের হাড় হতে রগের মধ্য দিয়ে পায়ের গিট পর্যন্ত নিম্নভাগে অসহনীয় পর্যায়ে সঞ্চারিত হয়। সাধারণ দুর্বলতা ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের শুষ্কতা এ রোগের কারণ। এ রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে নবীজি সা. বলেন, (আল্লাহর নামে যবেহকৃত) ‘‘দুম্বার নিতম্ব মাংসের মধ্যে বেদনা রোগের মহৌষধ রয়েছে। এটাকে দ্রবণ করে (পিশে বা গলিয়ে) তিনভাগ করবে এবং তিনদিন সেবন করবে।’’
১৮. ঠাণ্ডা পানি
জ্বর একটা প্রসিদ্ধ রোগ। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মাত্রই জ্বরের সাথে সুপরিচিত। গ্রীষ্ম প্রধান দেশে জ্বরের প্রকোপ এতই বেশি অনুভূত হয়, এ সব দেশে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পদ্ধতি স্বরূপ বরফের সেল দ্বারা তা ঠাণ্ডা করা হয়। অথচ নবীয়ে সা. পনের শত বছর পূর্বে এ রোগের চিকিৎসা ঠাণ্ডা পানির মাধ্যমে করেছিলেন। জ্বর সম্পর্কে নবীজি সা. বলেন, ‘‘জ্বর জান্নামের একটা উত্তপ্ত পাত্র বিশেষ, তোমরা ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তা দূর কর।’’
অন্যত্র আছে-
‘‘জ্বর জাহান্নামের উত্তাপের অংশ বিশেষ, সুতরাং ঠাণ্ডা পানি দিয়ে তা দূর কর।’’
১৯. রেশমি কাপড় পরিধান
ইসলাম যদিও নারীদের ব্যাপারে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং রেশমি কাপড়ের অনুমতি দিয়েছে পুরুষের বেলায় তার ব্যতিক্রম। কিন্তু যখন পুরুষ ত্বকাচ্ছদন প্রদাহ বা চুলকানি রোগে আক্রান্ত হয় তখন তার জন্য এ নির্দেশের ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। যেমন হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, ‘‘হযরত রাসূল সা. চুলকানি রোগের কারণে হযরত যুবায়র রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.কে রেশমি কাপড় পরিধান করার অনুমতি দিয়েছেন।’’
কেননা রেশমি পোশাক ঠাণ্ডা ও কোমল হওয়ায় চুলকানি রোগীদের জন্য খুবই আরামদায়ক হয়।
২০. মুসাব্বর
মুসাব্বর একটি বিস্বাদ ও অত্যন্ত তিক্ত কাল রঙ্গের গুড়ো বিশেষ। তবে এর প্রভাব গরম ও শুষ্ক। চিকিৎসকগণ এটাকে বিরোচক, পাকস্থলী ও হার্টের শক্তি বর্ধক বলে থাকেন। অধিক বায়ু নির্গম ও মস্তিষ্ক বিকৃতির জন্যও তা ফলদায়ক। যেমন নবীজি সা. অন্যত্র বলেন, ‘‘তা (মুসাব্বর) চেহারাকে অতীব সতেজ তেজোদীপ্ত ও উজ্জ্বল করে তা রাত্রে ব্যতীত দিনে ব্যবহার করো না।’’
২১. মাছিবাহিত রোগের প্রতিষেধক
মাছি একটা উড্ডয়নশীল তুচ্ছ ও ঘৃণিত প্রাণী বিশেষ। মাছি বাহিত রোগ প্রতিরোধে নবীজি সা. বলেন, ‘‘তোমাদের কারো পানির পাত্রে মাছি পতিত হলে তাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দাও। কেননা মাছির এক পাখায় রোগ ও অপর পাখায় রোগের প্রতিষেধক রয়েছে।’’
২২. ডায়েরিয়া নিরাময়ে ওরাল স্যালাইন
আধুনিককালে ডায়েরিয়া পাতলা পায়খানা নিরাময়ে ওরাল স্যালাইন একটি যুগান্তকারী চিকিৎসা। অনেকের ধারণা তা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান উদ্ভাবন করেছে। অথচ এ চিকিৎসার উদ্ভাবক ছিলেন স্বয়ং নবী করীম সা.। তাঁর একান্ত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রা. ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে নবীজি তাঁকে চিনির স্যালাইন পান করার পরামর্শ দিয়েছেন।
২৩. রাসূল (দ.)-এর যুগে প্লাস্টিক সার্জারি
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ভঙ্গুর ও অকেজো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপসারণ পূর্বক কৃত্রিম প্রত্যঙ্গ স্থাপন করার নাম প্লাস্টিক সার্জারি। রাসূল সা.-এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর অনুমতি নিয়ে ভাঙা ও অকেজো অঙ্গ অপসারণ পূর্বক কৃত্রিম অঙ্গ স্থাপন করেছেন। সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফের দাদা আরফাযা ইবনে আসআদ ছিলেন একজন বীর মুজাহিদ। এক যুদ্ধে তাঁর নাক কেটে গেলে তিনি একটি রৌপ্যের নাক সংযোজন করেন। পরবর্তীতে এতে দুর্গন্ধের উদ্রেক হলে নবী করীম সা.-এর আদেশে তিনি একটি স্বর্ণের নাক সংযোজন করেন।
২৪. রাসূল (সা..) ও দন্ত চিকিৎসা
দাঁত আল্লাহ্ পাকের অন্যতম নিয়ামত। এ দাঁত তথা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গের যত্ন করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। অযত্নে-অবহেলায় সৃষ্টি হয় অসংখ্য মারাত্মক রোগ-ব্যাধি। দন্ত রোগ তন্মধ্যে অন্যতম। দন্তরোগের অন্যতম কারণ হচ্ছে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যাংশ, এর মাধ্যমে নানা রোগ জীবাণু সৃষ্টি হয় যা দাঁত ও দাঁতের মাড়ির চরম ক্ষতিসাধন করে। তাই দাঁত, দাঁতের মাড়ি, মুখ, কণ্ঠনালী ও পাকস্থলীর সুরক্ষার জন্য রাসূলে করীম সা. প্রত্যহ পাঁচবার নামাজের পূর্বে অজুতে এবং ঘুম থেকে উঠে, রাত্রে শয়নকালে, আহারের পূর্বে ও পরে মিসওয়াক ও কুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর প্রতি জোর তাকিদ প্রদান করেছেন।
২৫. ডেন্টাল সার্জারি
সাহাবায়ে কেরাম নবীজির অনুমতি নিয়ে ডেন্টাল সার্জারিসহ দাঁতের অসংখ্য চিকিৎসা করাতেন। জিহাদের ময়দানে অনেক সাহাবীর দাঁত ভেঙ্গে গেলে নবী করীম সা. তাদেরকে স্বর্ণের কৃত্রিম দাঁত, দাঁতের ক্যাপ ইত্যাদি চিকিৎসার অনুমতি প্রদান করেন। যারা দাঁতের চিকিৎসা নিয়েছিলেন তন্মধ্যে মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ্, হযরত উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা, রাসূল সা.-এর একান্ত খাদেম হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রমুখ।
২৬. এইডস প্রতিরোধে নবীজির বাস্তব পদক্ষেপ
বর্তমানকালে অপরাধ ও বিকৃত যৌনাচারের ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে আমাদের দয়াল নবী পনেরশ’ বছর পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এভাবে যে, ‘‘যখন তোমরা ব্যাপকভাবে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে তখন তোমাদের মধ্যে এমন সকল ভয়ংকর রোগ ব্যাধি দেখা দিবে, যা তোমাদের পূর্বপুরুষগণ কখনো দেখেনি।
মহানবী সা.-এর এ ভবিষ্যদ্বাণী আজ বিশ্ব পরিস্থিতিতে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত। মানুষ আজ ব্যাপকভাবে এইডস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ তার নিরাময়ে বরাবরই ব্যর্থ, চরমভাবে হতাশ হয়ে মহানবী সা.-এর এ অমোঘ বাণীকে একমাত্র প্রতিষেধক মেনে নিচ্ছে।
২৭. সুষ্ঠু চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা
চিকিৎসা হচ্ছে মূলত ‘খিদমাতে খালক্ব’ বা আল্লাহর সৃষ্টজীবের সেবা যা একটা ইবাদত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসার-প্রচারে নবীজির অবদান অত্যন্ত অনবদ্য। যেকালে সভ্যতা ও আধুনিকতা ছিল অকল্পনীয়, তদানীন্তনকালে নবীজি চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। নবীজি স্বয়ং স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় গুরুত্ব অনুধাবন করে মদীনায় মসজিদে নববীর পার্শ্বে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।
হাসপাতালে নবীজি সা.-এর আদেশে যুদ্ধাহতসহ অন্যান্য অসুস্থরোগীদের চিকিৎসা দিতেন প্রখ্যাত চিকিৎসক সায়্যিদা নুসায়বা বিনতে কা’ব আল আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। এ ছাড়া নবী করীম সা. প্রতিটি জিহাদের ময়দানের পার্শ্বে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যোপযোগী স্থানে চিকিৎসা দেয়ার নিমিত্তে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র (গড়নরষব গবফরপধষ ঈবহঃবৎ) প্রতিষ্ঠা করতেন।
২৮. চিকিৎসকদের উৎসাহ দান
চিকিৎসা সেবাকে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে এবং আপামর জনসাধারণের জন্য এ সেবাকে সহজতর করার লক্ষ্যে নবীজি সা. মুসলিম-অমুসলিম প্রত্যেককে সমগুরুত্ব দিয়েছেন। রাসূল সা. কর্তৃক উৎসাহিত হয়ে যারা এ পেশায় আসেন তারা হলেন যথাক্রমে-
১. হারিসবিন কালাদা- প্রখ্যাত অমুসলিম চিকিৎসক, ২. আবু হাফসা ইয়াজিদ-ইহুদি চিকিৎসক। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, ৩. ইবনে উবাই আততামীমি- প্রখ্যাত ক্ষত ও অস্ত্রোপাচার বিশেষজ্ঞ, ৪. যায়নাব- মহিলা চিকিৎসক যিনি ছিলেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ৫. রুফায়দা বা নুসায়কা- যিনি ছিলেন আনসারী সাহাবী তিনি মদীনার মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় স্থাপিত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
পরিসমাপ্তি
পরিশেষে আমরা বলতে পারি, আখেরী নবী হুজুর সা. বিশ্ব মানবতার উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। রূহানী চিকিৎসার পাশাপাশি রাহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে তিনি উম্মাতের দৈনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যেসব তথ্য দিয়ে গেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উন্নতির অধুনা এ যুগেও তার পরিবেশিত অন্যান্য সকল তথ্যের ন্যায় চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্যাবলিও এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত যে, সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ আজও তা থেকে কেবল উপকৃতই হচ্ছে না; বরং এসব তথ্যাবলিকে তারা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাপকাঠি রূপে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সময় যতই অতিবাহিত হচ্ছে, এর বাস্তবতা ততই দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।