আঁধার রাতের ভয়
৩১ জুলাই ২০২৫ ১৪:৫৮
॥ পি এম শরিফুল ইসলাম ॥
রাত বারোটা বেজে কিছু বেশি। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। গ্রামের অন্ধকার পথে হাঁটছি আমি। চিরচেনা গ্রামের মেঠোপথ। জাগতিক ও সাংগঠনিক ব্যস্ততা শেষে রাতবিরেতে কত যে এ পথে বাড়ি ফিরেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
কিন্তু আজ কেন জানি খানিকটা ভয়ে বুকটা ধুকপুক করছে আমার। এ কীসের ভয়? জিনের অনিষ্টতার ভয়, নাকি মনুষ্য অনিষ্টতার ভয়? ভূত বলতে দুনিয়ায় কিছু নেই, জানি। কিন্তু জিন তো সত্য। স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এ নিয়ে কুরআনে একটি সূরা নাজিল করেছেন। কুরআনের ৭২ নম্বর সূরা আল-জিন-এর ১-২, ১৪-১৫ আয়াতে জিনদের সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।
সূরা আস-সাফফাত-এর ৬-৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেÑ কিছু জিন আকাশে চুপিসারে কথা শোনার চেষ্টা করত, কিন্তু এখন তারা আগুনের গোলায় তাড়িত হয়।
সূরা আল-হিজর-২৭ এবং আর রহমান-১৫-এ বলা হয়েছে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ‘সামুম’ (লেলিহান আগুন) থেকে।
হঠাৎ মনে পড়লো সূরা আন-নাস-এর সর্বশেষ আয়াতটি। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জিন ও মানুষের মধ্য থেকে।” (আন-নাস: ৬)।
অর্থাৎ জিন ও মানুষÑ উভয়ই আমাদের অন্তরাত্মায় কুমন্ত্রণা দিতে পারে বা দিয়ে থাকে। ইবলিস শয়তান আমাদের কোমল মনে প্ররোচনা সৃষ্টি করে সেখানে কলুষতা তৈরি করে। এজন্য সূরা নাস ও সূরা আল-ফালাকে এ ওয়াসওয়াসা বা প্ররোচনা থেকে রাব্বুল আলামিনের কাছে পানাহ চাওয়ার বিধান অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা আল-ফালাকের প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন:
“বলো, আমি আশ্রয় চাচ্ছি প্রভাতের রবের নিকট।” “এমন প্রত্যেকটি জিনিসের অনিষ্টকারিতা থেকে যা তিনি সৃষ্টি করেছেন।” “এবং রাতের অন্ধকারের অনিষ্টকারিতা থেকে, যখন তা ছেয়ে যায়।” অর্থাৎ জিন-মানুষ থেকে শুরু করে এ পৃথিবীর সকল সৃষ্টির অনিষ্টতা থেকে মহান রবের নিকট পানাহ চাইতে বলা হয়েছে এবং বিশেষ করে রাতের অন্ধকারের অনিষ্টতা থেকেও। আঁধার রাতে যখন চারদিক ঘোর অমানিশায় ছেয়ে যায়, তখন চলার পথে সাপ কিংবা অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর কবলে প্রাণনাশের ভয় থাকে কিংবা চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় অনেকেই। ‘রাতের অনিষ্টতা’ বলতে মূলত এগুলোকেই বোঝায়।
আবার ইবলিস মূলত মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি ওয়াসওয়াসা দিয়ে থাকে, সে যখন একাকিত্বে থাকে। কেননা রাতেই মানুষ নিজেকে একাকিত্বে রাখতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায় এবং গুনাহের অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে রাতকেই বেছে নেয় অপরাধী মানুষগুলো। তাই শয়তানও রাতের অন্ধকারকে পারফেক্ট সময় মনে করে, মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে পাপাচারে লিপ্ত করতে।
আমার মনে হলো, জিনের অনিষ্টতা কিংবা মনের এ ভয় তাড়ানোর জন্য সূরা আন-নাস ও সূরা আল-ফালাক পাঠ করা উচিত। ধীর পায়ে হাঁটছি আর বিড়বিড় করে মু’আউইযাতাইন ও আয়াতুল কুরসি পড়তে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে একসময় বাড়ির একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছি। এমন সময় হঠাৎ দৃষ্টি চলে গেল কবরস্থানের দিকে। মসজিদের পাশেই তিন দিক থেকে তিনটি কবরস্থান। ততক্ষণে আমার ভয় উধাও হয়ে গেছে। এখন আর জিন কিংবা মানুষের অনিষ্টতার ভয় লাগছে না। তবে এখন অন্য কিছুর ভয় ঠাঁই নিয়েছে আমার মনের গহিনে। সে ভয় হলো- আখিরাতের। সে ভয় কবরের আজাবের ভয়। সে ভয় জাহান্নামের শাস্তির ভয়।
মসজিদের উত্তর পাশের কবরস্থানে চোখ পড়তেই বুকটা ধড়াস করে উঠলো। এখানে শুয়ে আছে কত প্রতিবেশী!
মনে পড়লো- প্রতিবেশী আবুল হোসেন দাদা, বারেক দাদা, রশিদ জেঠার কথা। আর মসজিদের পূর্বদিকের কবরস্থানে আছেন রজ্জব আলী ভাই, আবদুল বারী দাদাসহ বেশ কয়েকজন প্রতিবেশীর কবর। সবশেষে মসজিদের দক্ষিণ পাশের কবরস্থানটা হলো আমাদের পারিবারিক কবরস্থান। এখানে চিরশায়িত আছেন আমার দাদা, দাদি, দাদার বড় ভাই ও তাঁর স্ত্রী বেলী দাদি, ২০১৩ সালে পুকুরে ডুবে মারা যাওয়া স্নেহের চাচাতো বোন ইতি, আমার যমজ দুই কাকা, চাচাতো জেঠা ও জেঠী।
শত বছর আগে হয়তো এখানে আরও অনেকের কবর ছিল, যাদের নাম-পরিচয় আমার অজানা। কবরে শায়িত প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের কথা মনে পড়তেই চোখ দুটি অশ্রুতে ছলছল করে উঠলো। শৈশব-কৈশোরে তারা কত আদর-স্নেহ করেছেন আমাকে। অথচ আজ তারা কেউ-ই এই দুনিয়ায় নেই। অন্ধকার কবরের বাসিন্দা এখন তারা।
প্রথমে কবরবাসীদের সালাম দিলাম। অতঃপর তাদের সবার জন্য দোয়া করলাম। হাউমাউ করে কান্না করলাম কতক্ষণ। হঠাৎ উপলব্ধি করলাম আহারে, দু’দিনের দুনিয়া! আমিও তো এ নশ্বর দুনিয়া থেকে বিদায় নেব একদিন। চিরতরে হারিয়ে যাব অন্ধকার জগতে, যেখান থেকে আর ফেরা যায় না। আমাকেও তো এ পৃথিবীতে করা প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব দিতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে। আমাকেও তো প্রতিটি মুহূর্ত সময়ের জবাবদিহি করতে হবে মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট।
আমি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামের অন্য মৌলিক বিধিবিধানগুলো মেনে চলার সর্বাত্মক চেষ্টা করি। কিন্তু তবুও কত সময় নিজের অজান্তেই কত গুনাহ করে ফেলি আমি, অধম।
আমি যদি আজ বা এখন মারা যাই, এই দুনিয়া থেমে থাকবে না। পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাই হয়তো আমার জন্য কিছু সময়ের জন্য কষ্ট পাবে, কান্না করবে। কিন্তু দুনিয়ার কাজকর্ম, ব্যস্ততায় একসময় ঠিকই আমাকে ভুলে যাবে সবাই।
আমার এখন মৃত্যু হলে আমার কবরটা কেমন হবে? ফুল বিছানো প্রশান্তিময় ঘর হবে- যার সংযুক্ততা স্বয়ং ফিরদাউসের সাথে? নাকি সেখানে জ্বলবে আগুনের লেলিহান শিখা?
ইয়া রাব্বুল আলামিন, আপনি আমাকে ও আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করুন। আমিন।