১৭ হাজার হতদরিদ্র পরিবার পেল বিনামূল্যে স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৫৭
আমানুর রহমান খোকন, কুড়িগ্রাম: আর নয় খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগ, ঘরে ঘরে তৈরি করে দেয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যকর পাকা টুইন পিট ল্যাট্রিন। এবারে কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় ১৭ হাজার হতদরিদ্র পরিবার পেয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে পাকা ল্যাট্রিন। এতে জেলার ৭৩ ইউনিয়নের প্রায় সোয়া লাখ মানুষ স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিনের সুফল পেলেও এই জেলার চরাঞ্চলের মানুষের জন্য এই ল্যাট্রিনের চাহিদা রয়েছে আরো অনেক। জানা যায়, দেশের দশমিক ৯৪ শতাংশ পরিবারের সদস্য উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগ করতেন। ২০২২ সালের জরিপ মোতাবেক দেশের দশমিক ৭৭ শতাংশ মানুষ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করেন। এই জরিপে সীমান্তঘেঁষা চরাঞ্চলে ভরপুর কুড়িগ্রাম জেলার অবস্থান সবার উপরে। বাড়িতে টয়লেট না থাকায় এই জেলার মানুষ মাঠ, বন, খাল, রাস্তা বা অন্যান্য খোলা জায়গায় মলত্যাগ করেন। যার ফলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। সেই সাথে বৃদ্ধি পায় নানা রোগবালাই। মানুষকে খোলা জায়গায় মলত্যাগের ক্ষতিকর অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাজ শুরু করা হয়েছে, যা শেষ করা হবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। মানবসম্পদ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ঘরে ঘরে টুইন পিট ল্যাট্রিন তৈরি করে দেয়ার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।এর বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ। কুড়িগ্রাম জেলার ৭৩টি ইউনিয়নে ২২৯টি করে সর্বমোট ১৬ হাজার ৭১৭টি পাকা ল্যাট্রিন তৈরির কাজ চলমান আছে। এতে ব্যয় হবে ৫৬ কোটি টাকা। জেলার স্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন তৈরিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ৭৬ জন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে রিং- স্লাব, সিরামিক, পানি সংযুক্ত মেঝে পাকা টিনশেড ল্যাট্রিনের নির্মাণকাজগুলো সুন্দরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সদরের উত্তর নওয়াবশ গ্রামের মো. ইসমাঈল হোসেন ঘোড়াচালক বলেন, আগে আমার বাড়িতে কোন ল্যাট্রিন ছিলো না। আমার বাড়ির সদস্য সংখ্যা ১০ জন। আমরা সবাই খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করতাম। সরকারিভাবে আমার বাড়িতে ল্যাট্রিন তৈরি করে দেয়ায় আমাদের আর খোলা জায়গায় যেতে হয় না। পাঁচগাছী ইউনিয়নের মাঝের চরের আর্জু বেগম বলেন, আমার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। বাড়িতে সদস্য সংখ্যা ৭ জন। সরকারি ল্যাট্রিন পেয়ে আমরা অনেক আনন্দিত হয়েছি। আমার ছোট ছোট সন্তানরাও এখন স্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করে। যাত্রাপুর ইউনিয়নের নওয়ানীপাড়া গ্রামের অটোরিকশা চালক সুলতানের স্ত্রী আমিনা বেগম বলেন, আগে আমরা নদীর তীরের খোলা জায়গায় মলমুত্র ত্যাগ করতাম। এখন আমার সব ছোট বাচ্চাটাও টয়লেটে বসে মলত্যাগ করেন। স্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করে রোগবালাই এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের সামাজিক মর্যাদাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। একই কথা বলেন কাঁঠুরিয়া সোলাইমান মিয়ার স্ত্রী সুমী বেগম। ৩য় শ্রেণির ছাত্রী মৌসুমি আক্তার বলে, আমি আর বাহিরে যাই না, এখন আমি ল্যাট্রিনে যাই। আমি অনেক ভালো আছি, আপনারা সবাই ল্যাট্রিনে যাবেন, ভালো থাকবেন। যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. মাহবুর রহমান বলেন, এই এলাকার অনেক বাড়িতেই স্বাস্থ্যকর টয়লেটের ব্যবস্থা ছিলো না। সবাই আগে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতো। এতে পরিবেশের অনেক ক্ষতি হতো। সরকারি পাকা ল্যাট্রিন পেয়ে সকলেই আনন্দিত হয়েছে। আরো বরাদ্দ এলে শতভাগ স্যানিটেশন সম্ভব হবে। ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান বলেন, আমার ইউনিয়নে ২২৯টি পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় ল্যাট্রিন পেয়েছে। কিছু কাজ শেষ হয়েছে। কিছু ল্যাট্রিনের নির্মাণকাজ চলমান আছে। বাড়ি বাড়ি এই ল্যাট্রিন করতে পারলে আর কেউ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করবে না। কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদ বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রাম জেলার ৭৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১৭ হাজার পরিবার বিনামূল্যে স্বাস্থ্যকর টুইন পিট ল্যাট্রিনের সুবিধা পাবে। এই ল্যাট্রিন চরাঞ্চলবান্ধব। সিরামিক বসানো মেঝে পাকা ল্যাট্রিন হওয়ায় বন্যার পানি এর কোনো ক্ষতি করতে পাবে না। যারা এই ল্যাট্রিন পেয়েছেন, তাদের বাড়িতে আগে ল্যাট্রিন না থাকায় তারা খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতেন। এতে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন হতো। যারা এই প্রকল্পের আওতায় ল্যাট্রিন পেয়েছেন, তাদের পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমেছেএ সেই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের সামাজিক মর্যাদা। আমরা এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য শতভাগ সফল করতে মাঠপর্যায়ে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাজের গুনইগতমান সঠিকভাবে তদারকি করছি।