আমরা শোকাহত জাতি শোকে স্তব্ধ
২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:৪১
আমরা শোকাহত। জাতি শোকে স্তব্ধ। গত ২১ জুলাই সোমবার রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ভবনের ওপর একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এ সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত মোট ২৭ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দেড় শতাধিক মানুষ। এদের অধিকাংশই মাইলস্টোন স্কুলের শিশু ও কিশোর শিক্ষার্থী। এছাড়া কয়েকজন অভিভাবক, শিক্ষক, স্কুলের স্টাফ ও সাধারণ নাগরিকও আছেন। প্রতিটি জীবনই মহামূল্যবান। তবে শিশু-কিশোরদের মৃত্যু আমাদের সবার হৃদয়েই সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ ঘটায়। ফুলের মতো সুন্দর প্রাণোচ্ছল শিশুদের এমন নির্মম মৃত্যুÑ নিছক দুর্ঘটনায় হয়েছে এমন ভেবে বসে থাকা হবে আত্মপ্রতারণা। আমরা জানি, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনে দেশের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা আমাদের বৈষম্যমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু আমরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলাম না। কেন আমরা ব্যর্থ হলাম? কারণগুলো অবশ্যই তদন্ত করে বের করতে হবে। বিমান দুর্ঘটনায় এমন বিস্ফোরণ বিরল ঘটনা। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় বিস্ফোরণ ও এত প্রাণহানির ঘটনা শুধু দেশের নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
আমরা জানি, গত ২১ জুলাই দুর্ঘটনার শিকার বিমানটি চীনের তৈরি এফটি-৭ বিজিআই মডেলের। ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ‘আমাদের যে ফাইটার জেটগুলো আছে, তার বেশিরভাগই আউটডেটেড। যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে, সেটার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে ২০১৩ সালেই। আমরা এগুলো আর কতদিন চালাব? তার ওপর যথাযথ মেইনটেইন করা হয় কিনা, সন্দেহ। শুনেছি এখানে অনেক অনিয়ম রয়েছে। যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে এ এয়ারক্রাফটগুলো একেকটা ফ্লাইং কফিন। এটাই প্রমাণ করে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কোন দশায় আছে, আমরা কতটা আনপ্রিপেয়ার্ড।’ একটি পরিসংখ্যান বলছে, ৩৪ বছরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ৩২টি বড় বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা প্রশিক্ষণ চলাকালেই ঘটেছে, যা পিটি-৬, ইয়াক-১৩০, এল-৩৯ বা এফ-৭ টাইপ বিমানের ক্ষেত্রে বেশি দেখা গেছে। প্রায় প্রতি দশকেই ফ্লাইট ক্যাডেট এবং স্কোয়াড্রন লিডারদের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। একদিনেই ৪৪টি বিমান বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু তারপরও এত ব্যাপক প্রাণহানি হয়নি।
আমরা জানি, প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা কোনো নতুন ঘটনা নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এমন দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু প্রাণহানি এড়ানোর ব্যবস্থা থাকে। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম হয় অনেকটা জনমানবহীন খোলা জায়গায়। শিক্ষানবিশ পাইলটের প্রাণরক্ষার জন্যও রাখা হয় বিশেষ ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও এ বিষয় বিবেচনা করা উচিত মন্তব্য করে মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য দেশেও প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। তবে সেগুলো তেমন আলোচনায় আসে না, কারণ তার অধিকাংশই হয় জনমানবহীন এলাকায়। সেক্ষেত্রে ঢাকার আশপাশে অপেক্ষাকৃত কম জনবহুল এলাকায় একটা পৃথক ফাইটার বেজ প্রস্তুত করা যায় কিনা, সেটা সরকারের ভেবে দেখা উচিত।’
আমরা মনে করি, উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ভবনে বিমান বিধ্বস্ত এবং বিস্ফোরণের ঘটনার নিরপেক্ষ ও যথাযথ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অবশ্যই জোর দিতে হবে বিস্ফোরণের মতো বিরল ঘটনা কেন ঘটল। সাধারণ ফুয়েল সরবরাহ লাইন অথবা ট্যাংকে ছিদ্র থাকলে অথবা বিস্ফোরণ জাতীয় অন্য কোনো পদার্থ থাকলে বিস্ফোরণ হয়। এখানে কী কারণে হয়েছে এবং সেই কারণ কেন উড্ডয়নের আগে শনাক্ত করা হলো না, এক্ষেত্রে কে দায়ী বের করতে হবে। ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ দিয়ে নতুন মডেলের প্রশিক্ষণ বিমান ক্রয়সহ গোটা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো জরুরি। সাথে সাথে বিগত ২১ জুলাই সংঘটিত দুর্ঘটনায় আহতদের সরকারি খরচে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। আহত এবং নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণে ব্যবস্থা করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের এ শোক কাটিয়ে ওঠার তাওফিক দিন। আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং নিহতের জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। আমীন।