জনতার ঢল দেখে রিকশাচালকের প্রশ্ন

‘এক কোটি মানুষ তো হবেই, না স্যার?’


২৪ জুলাই ২০২৫ ০৯:১৪

মাজহারুল ইসলাম, জাতীয় সমাবেশ রমনা পার্ক থেকে : ‘এক কোটি মানুষ তো হবেই, না স্যার?’ রিকশাচালক কলিমউদ্দিনের প্রশ্ন। অবাক চোখে সে এ প্রতিবেদকের কাছে জানতে চায়। কলিমউদ্দিনের বাড়ি সিরাজগঞ্জের একটি চর এলাকায়। ঢাকায় রিকশা চালায় দশ বছরের বেশি সময় ধরে। গত ১৯ জুলাই শনিবার রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় তার সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে জনতার স্রোত দেখে সে এ প্রশ্ন করে।
রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় সমাবেশে অংশ নিতে সারা দেশের ৬৪ জেলা থেকে লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ গত ১৯ জুলাই শনিবার ঢাকায় এসেছিল।
এ সমাবেশে অংশ নেওয়া মানুষের ঢল নামে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে বিশৃঙ্খলা বা যানজট সৃষ্টি না হয়ে সমাবেশটি হয়েছে শান্তিপূর্ণ ও সুসংগঠিতভাবে।
সমাবেশস্থলে পৌঁছাতে নেতাকর্মীদের বহনকারী শত শত বাস, মাইক্রোবাস এবং অন্যান্য যানবাহন রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে থামিয়ে রাখা হয়। সমাবেশের স্বেচ্ছাসেবক ও ট্রাফিক পুলিশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় গাড়িগুলোকে শহরের ভেতরে না এনে নির্দিষ্ট ১৫টি পার্কিং স্পটে রাখা হয়। বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে বনানী পর্যন্ত, মহাখালী থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত, আমিনবাজার হয়ে সংসদ ভবনের আশপাশে, কাঁচপুর থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় যানবাহন। এসব গাড়ি থেকে নেতাকর্মীরা শহরের দিকে হেঁটে আসেন ব্যানার, স্লোগান ও দলীয় পতাকা হাতে। সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তার এক পাশ দিয়ে হাঁটার দৃশ্য ছিল নজরকাড়া। অন্য পাশে চলছিল যানবাহন। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেনি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকাল থেকেই জনসমাগম শুরু হয়। দুপুরের মধ্যে পুরো উদ্যান ছাড়িয়ে জনতা ছড়িয়ে পড়ে রমনা পার্ক, শহীদ মিনার, পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকাজুড়ে। দীর্ঘদিন পর এমন কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে এ মাত্রার অংশগ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করেন অনেকেই।
জনতার কণ্ঠে ৭ দফার বার্তা
জামায়াতে ইসলামীর ৭ দফা দাবি নিরপেক্ষ নির্বাচন, পিআর পদ্ধতি চালু, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সমাবেশের মূল প্রতিপাদ্য ছিল।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে সমাবেশে এসেছেন রিফাত হাসান। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে ফুড প্রডাক্ট বিভাগে চাকরি করেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল, যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনার স্বপ্ন দেখে। আমি বিশ্বাস করি, যদি জামায়াত ক্ষমতায় আসে, তাহলে দেশে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থানার জসীম উদ্দিন বলেন, জামায়াতের যে সাত দফা দাবি, তা শুধু দলীয় নয়, এটি একটি জাতীয় দাবি। প্রতিটি দলের, প্রতিটি মানুষের দাবি। যতদিন এ দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হবে, ততদিন আমাদের আন্দোলন চলবে। নোয়াখালীর ইব্রাহিম হোসেন মুজাহিদ বলেন, আমি জামায়াতের একজন কর্মী, যদি আমি কর্মী না-ও হতাম, তবুও সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ সমাবেশে অংশগ্রহণ করতাম। কারণ জামায়াত যে সাত দফা দিয়েছে, নিরপেক্ষ নির্বাচন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এসব পুরো জাতির দাবি। একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে এসব দাবি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
রাজবাড়ীর রেজাউল হোসেন মুন্নু বলেন, আমরা চাঁদাবাজ মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত একটি বাংলাদেশ চাই। কর্মসংস্থান চাই। চাই কুরআনের আলোকে পরিচালিত একটি রাষ্ট্র। জামায়াতের ৭ দফা এসব দাবিরই প্রতিফলন।
চট্টগ্রাম বন্দরের নূর উদ্দিন বলেন, সাত দফার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি হচ্ছে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন। অতীতে এ দেশের নির্বাচনে রাঘববোয়ালরা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে আর কেউ এসব অপকর্ম করে সংসদে যেতে পারবে না।
চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার রমজান হোসেন বলেন, আমি জামায়াতের আমীরের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছি। কারণ একটাই সাত দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ আন্দোলনে শরিক হওয়া।
চাঁদপুরের জাহিদুর রহমান বলেন, দির্ঘ ১৭ বছরে আওয়ামী লীগ শুধু ‘চেতনা’র কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। তারা জামায়াতে ইসলামীকে জনগণ থেকে দূরে রেখেছিল। আজকের সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াত প্রমাণ করেছে, তাদের সঙ্গে জনগণ আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেন বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে যত সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সবাই জাতিকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঠকিয়েছে। দুর্নীতি করেছে, দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এখন সময় এসেছে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠার যারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী দেশ চালাবে, জনগণের সেবক হয়ে কাজ করবে।
নোয়াখালী সদরের মো. আব্দুর রহিম জিহাদী বলেন, জামায়াত ও বিএনপি বহুবার আন্দোলন করেছে, কিন্তু সরকারকে সরাতে পারেনি। কিন্তু এবার দেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও যুব সমাজ রক্ত দিয়ে হলেও এ স্বৈরাচারী সরকারকে বিদায় জানায়। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম চলবে। আরিফ হোসেন রাজধানীর সবুজবাগ থেকে সমাবেশে এসেছেন, তিনি সবুজবাগের বাসাবো এলাকায় মোবাইল ফোনের ব্যবসা করেন।
তিনি বলেন, জামায়াতের যে ৭ দফা দাবি রয়েছে এ দাবি পূরণের জন্য এ সমাবেশে এসেছি। তিনি এসময় স্লোগান দিয়ে বলেন, সব দল দেখা শেষ, জামায়াতে ইসলামীর বাংলাদেশ।
জহিরুল ইসলাম রাজধানীর সবুজবাগের স্থানীয় বাসিন্দা। তিনি পেশায় একজন ব্যবসায়ী এবং জামায়াতে ইসলামীর রুকন। তিনি বলেন, ‎জামায়াতের ৭দফা দাবি বাস্তবায়নে জাতি একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্র উপহার পাবে, যা জাতিকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করে আমাদের আগামী প্রজন্মকে একটা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সহযোগিতা করবে- এ প্রত্যাশা নিয়ে আজকের এ সমাবেশে আমি যোগদান করেছি। তিনি আরো বলেন আগামীতে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে প্রত্যেক দল বৈষম্যের শিকার থাকবে না। প্রত্যেকের মতামতের মূল্যায়ন থাকবে। এ নির্বাচন জাতির জন্য কল্যাণকর হবে।
এ সমাবেশ জামায়াতে ইসলামীর জন্য শুধুই একটি কর্মসূচি নয়, বরং সংগঠনটির মাঠের রাজনীতিতে পুনঃপ্রবেশ এবং নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির জানান দেওয়ার একটি বার্তা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যা ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক টার্নিং পয়েন্টের সাক্ষী, সেই মঞ্চে জামায়াতের এমন সমাবেশ রাজনৈতিক মহলে নানা বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।
অনেকে মনে করছেন, এক যুগ ধরে মূলধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়া দলটি আবার মাঠে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সমাবেশে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে দলটি এখনো মাঠে জনভিত্তি ধরে রেখেছে।
সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশ শুধু একটি রাজনৈতিক দল বা কর্মসূচির পরিচয় বহন করেনি, এটি ছিল সংগঠন, শৃঙ্খলা ও জনসম্পৃক্ততার এক অনন্য প্রদর্শনী। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বক্তব্য শোনার প্রযুক্তিগত সুবিধা, চিকিৎসা সহায়তা- সবকিছুতেই ছিল পরিচ্ছন্ন প্রস্তুতি। অনেকের ভাষায়, এটা ছিল ‘জনতার ঈমানী শান্তিপূর্ণ জাগরণ।’