নেতাকর্মীদের দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত করুন


১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:৫৬

একেএম রফিকুন্নবী

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
আজকে বাংলাদেশে দিনে-দুপুরে বন্ধুকে বন্ধু টাকার ভাগাভাগির উছিলায় টেনে-হিঁচড়ে উলঙ্গ করে পাথর মেরে নিথর শরীরের ওপর নাচানাচি করা যেন আইয়্যামে জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছে। ঘটনা ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে গত ৯ জুলাই বুধবারের। যদিও মিডিয়ায় আসে ২ দিন পর। পাথর মেরে হত্যার ভিডিও তারা জনসম্মুখে প্রকাশ করে, কী নিষ্ঠুর ঘটনা। ব্যবসার টাকা নিয়ে বা চাঁদা দাবির ঘটনায় এ নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়। নিহতের স্বজনদের করুণ আর্তনাদে আকাশ-বাতাস তোলপাড় হয়ে যায়। আমরা কোন যুগে বাস করছি। দিনে-দুপুরে কেউ এগিয়ে এলো না এমন নিষ্ঠুর ঘটনা দেখেও। এমন নিষ্ঠুর ঘটনা এর আগেও ঘটেছিলÑ ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে শিবিরের মিছিলে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সন্ত্রাসীরা হামলা করে পল্টনে ৬ জন ছাত্রকে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মেরে লাশের ওপর নাচানাচি করেছিল প্রকাশ্য দিবালোকে। হাসিনার সরাসরি নির্দেশে লগি-বৈঠা নিয়ে মিছিল করে এ ঘটনা ঘটিয়েছিল। এর কোনো বিচার হয়নি। মামলা পুনরায় চালু হওয়া দরকার।
মিটফোর্ডের ঘটনা আর ২০০৬-এর ঘটনা একজনরাই করেনি। সময়ের ব্যবধানে লোকবল ভিন্ন হয়েছে। নিহত ও খুনি সবাই বিএনপি নেতা অবশ্য বলছে, মিটফোর্ডের ঘটনা তাদের লোক ঘটায়নি। আবার এ ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। কী আজব ঘটনা! এটা কি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো? আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি। দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি চাই।
এই কিছুদিন পূর্বে নীলফামারীতে একটি থানায় আক্রমণ করে বিএনপির লোকেরা তাদের দুজন আসামিকে ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এ ঘটনা ব্রিটিশ আমলে ঘটলে আশপাশে ১০ গ্রাম পুড়িয়ে দিত। আমরা পোড়ানো চাই না, তবে স্বচ্ছ বিচার চাই। লোকমুখে বাতাসে উড়ছে একদল লুটপাট করে খেয়ে পালিয়েছে, আরেক দল খাওয়ার জন্য ওত পেতে বসেছিল, তারা এখন নিজেরাই চাঁদাবাজি, লুটপাট, দখলবাজিতে আগের দলের চেয়েও তৎপর। গত ১৬ জুলাই বুধবার গোপালগঞ্জের উলিপুরে পুলিশের গাড়ি পোড়ানো হয়েছে। পতিত সরকারের লোকেরা এখনো কিভাবে এ সাহস পেল। অতিসত্বর এদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখি, হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি লেগেই আছে। এমনকি বাজারে ছোট ছোট খুচরা দোকানেও চাঁদা না দিলে দোকান বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। কোনো কোনো লোক আওয়ামী চাঁদাবাজদের ডিঙিয়ে অধিক পরিমাণ চাঁদা আদায় করছে। এরা কারা- এলাকার লোকেরা সবাই জানে। প্রশাসনও জানে, কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। যা দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। আগের লোকেরা ক্ষমতায় থেকে চাঁদাবাজি করেছে। এরা ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বেই মনে হচ্ছে ক্ষমতায় চলে গেছে ভেবে চাঁদাবাজি করছে। এতে যে তাদের ভোট কমছে, তা মনে করছে না। মানুষ কিন্তু পূর্বের তুলনায় অনেক সচেতন। কারা ক্ষমতায় এলে সুখে-শান্তিতে বসবাস করা যাবে, তা কিন্তু মানুষ বুঝতে পারছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী দলগুলো মাঠে নামার কারণে মানুষ সৎলোক কে, তা আন্দাজ করতে পারছে! এরা যে খাওয়া পার্টি না বা চাঁদাবাজ দল না- তা ইতোমধ্যেই সমাজে জানাজানি হয়ে গেছে।
অন্যদিকে প্রত্যেক সংসদীয় এলাকায় বিএনপি সম্ভাব্য প্রার্থী ২ থেকে ১০ জন। নিজেদের মধ্যে কামড়া-কামড়ি শুরু হয়ে গেছে। টাকা ঢালাঢালি তো আছেই। সেদিন বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতাকে বললাম, পিআর পদ্ধতি আপনাদেরই জন্য বেশি প্রজোয্য। কারণ পিআর পদ্ধতিতে প্রত্যেক পার্টি থেকে একজনেরই নাম প্রস্তাব যাবে। তাই দলে একাধিক প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী দলের প্রার্থী মাত্র ১ জন করে। যখন ফাইনাল হবে, তখন মাত্র একজনই প্রার্থী থাকবে। নির্বাচনে জনগণের ভুল বোঝাবুঝি থাকবে না।
দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে-অপরকে আস্থায় নিতে পারছে না, যা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। আমাদের নীতির প্রতি আস্থা থাকবে, কিন্তু অন্য দলের লোকেরাও যে দেশের জন্য কল্যাণ কামনা করে, তার স্বীকৃতি দিতে হবে। আওয়ামী দুঃশাসন বিদায় নিয়েছে। প্রতিযোগিতা চলছে ক্ষমতার ভাগাভাগির। আমরা কেউ ধরতে পারছি না, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বেই বিএনপি নেতা-কর্মীরা রাস্তাঘাট, প্রশাসন তারা দখলে নিয়েছে। পুলিশও তাদের অন্যায় কাজে বাধা দিতে সাহস করছে না। আবার জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলের নেতারা দখল বাণিজ্যে অভ্যস্ত নয়। তাই জনগণ হতাশায় ভুগছে। এর প্রতিকার দরকার।
এখন দরকার একজন সাহসী ন্যায়পরায়ণ মানসিকতার নেতা। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথানত করবেন না। সত্যের পক্ষে অবিচল থেকে দিকনির্দেশনা দেবেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে থেকে। আমরা দেখতে পাই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানকে। তিনি একজন আল্লাহর প্রতি পাক্কা ঈমানদার হয়েও ধর্ম নিয়মে তুরস্ককে ধীরস্থিরভাবে দেশটাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছেন। তাকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের স্বীকার হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি ধীরস্থিরভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে সব বাধা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাচ্ছেন। আবার ইরানের কথাও আমরা আলোচনায় আনতে পারি। গত প্রায় ৫০ বছর সব পরাশক্তির বাধার মধ্যেও তারা তাদের এক আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে সব বাধা-বিপদ কাটিয়ে উঠছেন। এই কয়েকদিন পূর্বেও ইসরাইল ও আমেরিকার প্রত্যক্ষ সামরিক যুদ্ধে ইরান প্রমাণ করেছে তারা বীরের জাতি। কারও কাছে মাথানত করার জাতি ইরান নয়। ইরানের বুদ্ধি ও সামরিক হামলার কাছে পারমাণবিক শক্তিধর ট্রাম্প ও ইসরাইল মাথানত করে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
আমরা বলতে চাই, ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার সাহসী ভূমিকা নিতে পারেন। তার সাথে থাকা উপদেষ্টারা সবাই তত সাহসী নন। তবে তার সাথে বেশ কয়েকজন সাহসী ব্যক্তি আছেন। তারা সাহস করে দেশের জন্য, কল্যাণের জন্য যেকোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ এক বছরে বুঝতে পেরেছেন দেশের জন্য কোন দল বা ব্যক্তিরা আসলেই প্রাণপণে দেশকে ভালোবাসে। তাদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের এ মুহূর্তে একটি বড় কাজ করা দরকার। জুলাই সনদের কাজ দ্রুত শেষ করে এর ওপর গণভোট দিয়ে দেয়া। কে মানলো আর মানলো না, তা গণভোটেই প্রমাণ হবে, ইনশাআল্লাহ। এ দেশে গণভোট করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাই আপনি গণভোট করে ফেললে কারও আর কথা বলার সুযোগ থাকবে না। আপনারা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে র সরকার। আপনাদের ম্যান্ডেট অনেক ওপরে। জনগণের গণভোট করে ফেললে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সবার জারিজুরি শেষ হয়ে যাবে। কাউকে তুড়ি মেরে বিদায়ের প্রশ্ন আসবে না। ফখরুল সাহেবদের এক দাবি, ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন। আমরা বলি, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে স্থানীয় নির্বাচন দিন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন মার্কা ছাড়া, জনগণ এলাকার ভালো লোককে ভোট দেবে। যারা এই এক বছর চাঁদাবাজি করেছে, দখল বাণিজ্য করেছে, জনগণ তাদের চেনে। মানুষ এখন অনেক সচেতন। তাই জনগণের কল্যাণেই জনগণ সৎ, চরিত্রবান দেশের প্রতি দরদওয়ালাদেরই ভোট দিয়ে তাদের নেতা বানাবে, কারো রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা করবে না।
সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পর্কে আমার নিজস্ব মত হলো, প্রশাসনে শক্ত লোক লাগবে। যারা দলের কাছে মাথানত করবে না। জেলার প্রধান ব্যক্তি জেলা প্রশাসক। জেলা প্রশাসক এমন ব্যক্তি হতে হবে, যিনি সৎ, দেশের প্রতি দরদ আছে, যিনি ন্যায়ের পথেই থাকবেন, কাউকে অন্যায় সুবিধা দেবেন না। এমন ৬৪ জন লোক বাছাই করতে হবে, যারা ৬৪ জেলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। এরা বর্তমান লোকের মধ্যেই হতে পারে অথবা নির্বাচন কমিশন বিশেষ দায়িত্বের জন্য সাবেক বা অন্য ক্যাডারের লোকও হতে পারে। এরা অবশ্যই দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি আস্থাশীল লোক হতেই হবে। আমাদের লোক গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট হাসিনার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজের স্বাধীন চিন্তা করতে ভুলে গেছে। তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের ক্যাডার সার্ভিসের লোক ভালো আছে, তাদের মধ্য থেকেই সৎ, মানবতায় শ্রদ্ধাশীল দায়িত্বের প্রতি অবিচল এদেরই বাছাই করতে হবে।
অন্যদিকে পুলিশপ্রধান একটি বড় স্টেকহোল্ডার। পুলিশ বিভাগেও ৬৪টি জেলায় ৬৪ জন এসপি বা সমমর্যাদার লোক বাছাই করতে হবে। যারা কোনো দলের প্রতি আনুগত্যপরায়ণ হবে না। দেশের ১৮ কোটি মানুষের সেবার জন্য কাজ করবে। কোনো দুর্নীতির সাথে তাদের সংশ্রব থাকবে না। সুষ্ঠু ভোটের জন্য ৬৪ জন সৎ অফিসার পুলিশের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। আমরা অবশ্যই আমাদের পুলিশপ্রধানের নেতৃত্বে ৬৪ জন কর্মকর্তা খুঁজে বের করতে সক্ষম হব। এখন থেকেই গোটা পুলিশ প্রশাসনের কাজ হবে সৎ, দেশের প্রতি দরদ এবং ভয়ভীতিতে মাথানত না করার মতো লোক বাছাই করতে হবে। আমরা অবশ্যই আমাদের পুলিশ বিভাগ থেকে ৬৪ জন সৎ অফিসার খুঁজে পাব। এদের বাছাই করে তাদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। গত ১৬ বছরের ভেঙে পড়া প্রশাসনে নতুন করে সততার স্বাক্ষর রাখা লোক পেতে হবে।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে সততা ন্যায়নীতির মধ্যে আনতে হবে। পত্রিকায় দেখলাম, হাসিনার প্রশ্রয়ে ডিবি হারুন যেভাবে দানবে পরিণত হয়। মানুষ যদি তার জন্মের কথা স্মরণ করে আর মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, তবে দলের হতে পারে না, আবার স্বৈরাচারও হতে পারে না। মহান আল্লাহ আমাদের এ ১৮ কোটি লোকের দেশকে গত জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালে রাহুমুক্ত করেছেন। তাই আসুন, কোনো দেশের দালালি করে এ দেশে রাজনীতির স্বপ্ন বাদ দিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করি। জনগণের কাছে যান, আপনাদের কথা জনগণকে বলেন। যাদের কথা জনগণ বিশ্বাস করবে, তাদেরই জনগণ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনবে। কারো দয়ায় ক্ষমতায় যাওয়ার আশা ছেড়ে দিন। নেতাকর্মীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত করুন।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।