জুলাই বিপ্লবে উজ্জীবিত তারুণ্যের প্রেরণা কবি আল মাহমুদের কবিতা


১৭ জুলাই ২০২৫ ১৩:৫২

॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
কবি আল মাহমুদের ৯০তম জন্মদিন উপলক্ষে পৃথক আয়োজনে দিনটি পালন করেন ভক্ত-অনুরাগীরা। রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলা সাহিত্যের যে কয়জন কবির কবিতা বিপ্লবীদের উজ্জীবিত করেছে, আল মাহমুদ তাদের মধ্যে অন্যতম। তার কবিতা মুক্তিকামী গণমানুষকে প্রাণীত করেছে, তিনি সবুজের কবি আল মাহমুদ। দ্রোহ, প্রেম, প্রকৃতি ও প্রার্থনার কবি আল মাহমুদের ৯০তম জন্মদিন ছিল ১১ জুলাই শুক্রবার। ১৯৩৬ সালের এ দিনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মৌড়াইলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আর সাহিত্যের ষোলকলা পূর্ণ করে ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে চলে গেছেন মহান রবের সান্নিধ্যে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা রাজধানীতে তাকে সমাহিত করতে দেয়নি। তাকে দাফন করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল কবরস্থানে।
কবি আল মাহমুদ ইন্তেকাল করলেও তার কাব্যপ্রভা এখনো সাহসী মানুষের প্রেরণা। তিনি ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই বিপ্লবেও প্রবলভাবে উপস্থিত ছিলেন। ফ্যাসিস্ট শাসক আর কর্তৃত্ববাদীরা ব্যক্তি ও সমষ্টির সম্ভাবনাকে তিলে তিলে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। জনগণের প্রতিবাদের ভাষাকে দমিয়ে রাখতে চাই ফ্যাসিস্ট সরকারগণ। আর জনগণকে সোচ্চার করে তোলেন কবিরা। তাঁদের সম্বোহনী প্রতিবাদী লেখনী সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। সমাজের শক্তি ও সামর্থ্যরে প্রতীক জনগণ। কবিদের সাধনায় তাঁরা উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন, সাহসী হয়ে ওঠেন, প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর প্রতিটি সংগ্রামের ইতিহাসে এ সত্যই উদ্ভাসিত। শোষণের নির্দয়তার হাতিয়ার রূপে কবিদের লেখা হয়ে দাঁড়ায় এক একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। কবির কবিতায় এ দৃষ্টান্তই উপস্থাপিত। জাতীয় জীবনে নানা সংকটে কবি আল মাহমুদের কবিতা জাতিকে পথ দেখিয়েছে, সংগ্রাম ও বিপ্লবে প্রেরণা জুগিয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্য আবার আল মাহমুদের দিকে প্রত্যাবর্তন করছে স্বমহিমায়। এটাই কল্যাণকামী মহত্তম কবির শক্তিমত্তা। সময়ের প্রয়োজনে কবির সাহিত্যকীর্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল জুলাই-আগস্টের বিপ্লবে ছাত্র-জনতার মাঝে। জুলাই বিপ্লবে আল মাহমুদের কবিতা তরুণদের বিশেষভাবে উজ্জীবিত করেছিল। কারণ তার কবিতাগুলোয় বিদ্যমান দ্রোহের ধারণা বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। আল মাহমুদের কবিতা মানুষের মনে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল, যা সেই সময়ের তরুণ সমাজের বিপ্লবী চেতনার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর বিপ্লব, যা মূলত স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন ছিল, তাতে আল মাহমুদের কবিতা তরুণদের সাহস জুগিয়েছিল এবং তাদের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তার কবিতাগুলোয় সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা প্রকাশিত হওয়ায় তরুণ সমাজ নিজেদের সংগ্রামের সঙ্গে তার কবিতার বিষয়বস্তুর মিল খুঁজে পেয়েছিল। শত শত তরুণের আত্মত্যাগের এ অভ্যুত্থানের মাঠে প্রতিবাদি স্মারক হিসেবে এসেছে আল মাহমুদের কবিতা। কবি লেখেনÑ আমাদের এ মিছিল নিকট অতীত থেকে অনন্তকালের দিকে।/আমরা বদর থেকে ওহুদ হয়ে এখানে/শত সংঘাতের মধ্যে এ কাফেলায় এসে দাঁড়িয়েছি।/আমরা আজন্ম মিছিলেই আছি।/এর আদি বা অন্ত নেই।/পনেরশত বছর ধরে সভ্যতার উত্থান-পতনে আমাদের পদশব্দ একটুও থামেনি।/‘আমাদের মিছিল’ কবি আল মাহমুদের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হাসিনাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে প্রবলভাবে জনপ্রিয়তা পায়। আন্দোলনের ভিডিও এবং বিভিন্ন ছবি দিয়ে এ কবিতাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা হয়েছে।
দুই. আল মাহমুদের কবিতার কয়েকটি দিক, যা বিপ্লবে তরুণদের উজ্জীবিত করেছিল। কারণ গণঅভ্যুত্থানের সময় তরুণদের দেশভাবনা প্রকাশিত হয়েছে নানা মাধ্যমে। যেমন- গানে, স্লোগানে, ফেস্টুনে, গ্রাফিতিতে কিংবা কবিতায়। এ প্রজন্মকে বুঝতে হলে তাদের দেশভাবনার গভীরতা অনুধাবন ও হৃদয়ে ধারণ করেই ৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পর্যালোচনা করতে হবে। কীভাবে তরুণরা গান, কবিতা ও সেøাগানের মাধ্যমে উজ্জীবিত হয়ে স্বৈরাচারের পতনের জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, কিংবা বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে, সাহস থাকলে গুলি কর ‘‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’’। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শত শত প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশের ভয়ংকর নিষ্ঠুর স্বৈরাচার গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে, সে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো আন্দোলনেই এত বিপুল প্রাণহানি ঘটেনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অনেক তরুণকেই বিনা অপরাধে জেলে নেয়া হয়েছে। যদিও তাদের মনে প্রাণে ধ্যানে জ্ঞানে ছিলো বৈষম্যহীন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন। কবি-লেখকরা তরুণদের এ আশা-আকাক্সক্ষাকে পথ দেখান, তারা থাকেন পথপ্রদর্শকের কাতারে। আল মাহমুদের কবিতায় জুলাই বিপ্লবে তরুণদের উজ্জীবিত করেছিল এভাবে, আমাদের দেহ ক্ষতবিক্ষত।/আমাদের রক্তে সবুজ হয়ে উঠেছিল মুতার প্রান্তর।/পৃথিবীর যত গোলাপ ফুল ফোটে তার লাল বর্ণ আমাদের রক্ত।/তার সুগন্ধ আমাদের নিঃশ্বাস বায়ু। (আমাদের মিছিল)। যখন আবু সাঈদের বুক বিদীর্ণ করে দেয় ঘাতক পুলিশের বুলেট। তখন রংপুর থেকে ঢাকা পুরো দেশের দেয়ালে-গ্রাফিতিতে প্রতিবাদী স্লোগানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কবি আল মাহমুদের এ পঙতিগুলো। কবি আল মাহমুদ জীবনকে দেখেছেন কবিতার ভেতর, কবিতাকে করে তুলেছেন জীবনের ভাষ্য। প্রতিদিনের উচ্চারিত শব্দসমবায় থেকে সংগ্রহ করেছেন শব্দ। ফলে তার জটিল চিন্তাও হয়ে উঠেছে সহজবোধ্য। তার লেখনীতে যেমনি এসেছে সময়ের গল্প, তেমনি স্বাদেশিকতা ও আন্তর্জাতিকতা বোধও এনেছেন শব্দের গাঁথুনিতে। রাজনৈতিক চেতনা তাকে করে তুলেছে জনবান্ধব।
তিন. আল মাহমুদ মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বার বার চেতনাকে জাগ্রত এবং প্রতিবাদী ভূমিকায় নিজেকে অবতীর্ণ করেন। এক্ষেত্রে নিজ জন্মভূমি ও ভিন্ন দেশের মানুষের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য বিবেচনায় আনেননি। ফলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং স্বাধীনতা বিপন্ন হয়েছে, সেখানেই কবি কবিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। কেননা তিনি রুশোর মতো বিশ্বাস করেন, মানুষের প্রজন্ম জন্মগতভাবে স্বাধীন। তাদের স্বাধীনতা, তাদের নিজেদের অবিচ্ছেদ্য সত্তা। সে-সত্তাকে প্রদান করার অধিকার তাদের নিজেদের ব্যতীত অপর কারোরই হতে পারে না। অপর কারোর স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করার অধিকার প্রাকৃতিক বিধানেরই বিরোধী। ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে ছাত্র-জনতার প্রতিবাদী মিছিলে অনেকটাই প্রাসঙ্গিক ছিলেন আল মাহমুদ। এমনকি দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদী স্লোগান ও গ্রাফিতিতে আল মাহমুদের কবিতা শোভা পেয়েছে। মঞ্চে-মিছিলেও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
চার. আমাদের মিছিল কবিতাটি হলোÑ আমাদের এ মিছিল নিকট অতীত থেকে অনন্ত কালের দিকে/ আমরা বদর থেকে ওহুদ হয়ে এখানে,/শত সংঘাতের মধ্যে এ শিবিরে এসে দাঁড়িয়েছি। কে প্রশ্ন করে আমরা কোথায় যাবো?/আমরা তো বলেছি আমাদের যাত্রা অনন্ত কালের। উদয় ও অস্তের ক্লান্তি আমাদের কোনদিনই বিহবল করতে পারেনি। আমাদের দেহ ক্ষত-বিক্ষত,/আমাদের রক্তে সবুজ হয়ে উঠেছিল মুতার প্রান্তর। পৃথিবীতে যত গোলাপ ফুল ফোটে তার লাল বর্ণ আমাদের রক্ত,/তার সুগন্ধ আমাদের নিঃশ্বাস বায়ু। আমাদের হাতে একটি মাত্র গ্রন্থ আল কুরআন,/এই পবিত্র গ্রন্থ কোনোদিন, কোন অবস্থায়, কোন তৌহিদবাদীকে থামতে দেয়নি। আমরা কি করে থামি?
দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে-কবি আল মাহমুদের বখতিয়ারের ঘোড়া কবিতার এ লাইন দিয়ে চমৎকার একটি গ্রাফিতি এঁকেছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই কবিতার প্রসঙ্গে একবার “আল মাহমুদ বলেছিলেন”-‘কবিতার সংক্রাম থেকে মানুষ আত্মরক্ষা করতে পারে না’- প্রথম আলো/১১ জুলাই।
একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক নিজের জন্য ভাবেন না, তারা তোমাকে এ কথাই বলবে।’ ‘জেলগেটে দেখা’ কবিতায় উপস্থিত সেই দেশপ্রেমিক আল মাহমুদ; যিনি চিন্তারে সক্রিয়তা দিয়ে স্বদেশকে দেখেছেন। যখন নাহিদ-আসিফদের আয়নাঘরে নিয়ে নিপীড়ন করা হয়, সে সময়ের কষ্ট যেন অনুরণিত হয়েছে একজন আল মাহমুদের কবিতায়। সেই কথার সত্যকে জীবনের সত্যে সমীকৃত করে দিয়েছেন কবি। যেমন কবি আল মাহমুদের ভাষায়; আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি চেপে ধরেছি।/হায় স্বাধীনতা,/অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম।/আর আমাকে ওরা রেখেছে বন্দুক আর বিচারালয়ের মাঝামাঝি/যেখানে মানুষের আত্মা শুকিয়ে যায়।/যাতে আমি আমরা উৎস খুঁজে না পাই।/কিন্তু তুমি তো জানো কবিদের উৎস কি?/আমি পাষাণ কারার চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি।’/কবির কবিতায়ও ছিল সরব শক্তির মোকাবিলা। এ আত্মবিশ্বাসই আল মাহমুদকে ভিন্ন মানুষে রূপান্তরিত করেছে। তিনি জানতেন প্রার্থনার শক্তির সমান্তরালে থাকে দ্রোহের শক্তি।
পাঁচ. গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী আওয়ামী সরকারের গুম, খুন, লুটপাট, অন্যায়, অবিচার আর দুঃশাসনের বিপরীতে ছাত্রজনতার যে গণঅভ্যুত্থান হলো, সেখানেও কবি আল মাহমুদ হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী উৎস। ফ্যাসিবাদবিরোধী এ আন্দোলনে ধর্ম-বর্ণ, মত-পথ ও ব্যবসা-পেশা ব্যতিরেকে সকল প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে আল মাহমুদের কবিতা। ভার্চুয়াল মাধ্যমে, পোস্টারে, প্ল্যাকার্ডে, দেয়াল লিখনে ও গ্রাফিতিতে আল মাহমুদের প্রতিবাদী ও প্রতিরোধী বাণীগুলো যেন ইট-পাথরকেও জাগিয়ে তোলে। আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে সর্বস্তরের মানুষ। শত শত তরুণের আত্মত্যাগের এ অভ্যুত্থানের মাঠে প্রতিবাদী স্মারক হিসেবে এসেছে আল মাহমুদের কবিতা।
কবিরা অনেক আগেই বলেছেন, আমরা তো শাহাদাতের জন্যই মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে পা রেখেছি।/আমাদের মিছিল ভয় ও ধ্বংসের মধ্যে বিশ্রাম নেয়নি, নেবে না।/শুধু কী তাই? স্বৈরশাসকের পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গেও যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে আল মাহমুদের কবিতা- তিনি বলেছিলেন/আমরা জানি।/আমাদের ভয় দেখিয়ে শয়তান নিজেই অন্ধকারে পালিয়ে যায়।/আমাদের মুখাবয়বে/আগামী ঊষার উদয় কালের নরম আলোর ঝলকানি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার অনেক দেয়ালে যে কবিতার দেয়াল লিখন দেখা গেছে, তা হলো- আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা/মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।/বারুদই বিচারক।/আর স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা। (বখতিয়ারের ঘোড়া)। আল মাহমুদ আজীবন লোক ঐতিহ্যের সঙ্গে আত্মীয়তা করেছেন; কখনো এ পথ থেকে সরে আসেননি। তাঁর কবিতায় নিছক শিল্পসৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়নি; গভীর জীবনবোধ, গণসচেতনা, জাতির আত্মপরিচয়, প্রাণ ও স্রোত প্রতিবেশকে নগর সভ্যতার বিপরীতে স্থাপন এবং বর্তমান জীবন ও সময় বাস্তবতার সঙ্গে শেকড়ের সম্বন্ধসূত্র সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো তা নির্মাণ থেকে পুনর্নির্মাণে শিল্পরূপ হয়ে উঠেছে।
ছয়. আল মাহমুদ কোনো প্রথাবিরোধী, দ্রোহী বা উদ্ধত ধাঁচের কবি-লেখক বা চিন্তক ছিলেন না। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং এর ঘাত-প্রতিঘাত সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন। কবি বলতেন তিনি তার ঐতিহ্য ধর্মকে পরিত্যাগ করে এসেছেন, এটা তারা কখনোই প্রমাণ করতে পারেনি। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে তারা গালিগালাজ করে। আল মাহমুদ আরও বলেন, ‘অনেকে অপব্যাখ্যা করেন আমি নাকি সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছি! এসব কুৎসা রটনায় আমার কিছু যায় আসে না! আমার কেন, কোন কবির কিছু যায় আসে না! রাজনীতি ও ধর্মকে, ধর্ম মানে ধর্মীয় উপমাকে আমি কবিতার দৃষ্টান্ত করে তুলেছি! যেমন উপকথা বা প্রবচনকেও আমি কবিতায় নিয়ে এসেছি!’ তাই ৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনআকাক্সক্ষার প্রেক্ষিতে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের প্রধানতম কবি আল মাহমুদ। আল মাহমুদ বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে ক্ষমতাসীনদের নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হন। গত চার দশক ধরে আল মাহমুদ সাংস্কৃতিক স্বৈরাচার ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেতনাবিরোধী তৎপরতার বিপক্ষে যে আমৃত্যু লড়াই অব্যাহত রেখেছিলেন, ২৪ এর সফল গণঅভ্যুত্থান তারই ধারাবাহিকতা। তাই নতুন বাংলাদেশে আল মাহমুদ অবশ্য পাঠ্য কবিসত্তা। তিনি বামপন্থি রাজনীতিকে চেতনাকে বাদ দিয়ে নিজস্ব ধর্মীয় মননে সাম্যবাদের মন্ত্রে জারিত ও দীক্ষিত হয়েই তার লেখালেখিতেও এ প্রভাব ছায়া পাত করে সুস্পষ্টভাবেই।
আল মাহমুদ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ঝুলন্ত জীবনের ঝুঁকিময় ক্ষণ গণনা করেছেন। যৌবনে সাম্যবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত যৌবন কাটিয়েছেন। আল মাহমুদ সময়ের কঠিন বাস্তবতার গড্ডালিকা অতিক্রম করে নিজেকে চিরায়ত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সমকালীন সতীর্থ লেখক-সাহিত্যিকদের নির্ভীক ও সাহসী উচ্চারণের পথ দেখিয়ে গেছেন। আল মাহমুদ প্রগতিশীলতার নামে বাম বুদ্ধিজীবীদের ইসলামবিরোধী তৎপরতার প্রধান সমালোচক ছিলেন। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আল মাহমুদকে আজীবন আবিষ্কার করা গেছে প্রতিবাদীদের প্রথম কাতারে। এজন্য কবিকে সইতে হয়েছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক লাঞ্ছনা। কিন্তু ঈমানের ঐশ্বর্যে প্রাণবন্ত কবি এতে অবদমিত ছিলেন না। তার অবস্থান ছিল ঈমান ও ইসলামের পক্ষে। তিনি ছিলেন বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পুরোধা।
লেখক: সাংবাদিক, ২০২৪ বিপ্লব গবেষক।