রাতের কৃষক
৩ জুলাই ২০২৫ ১২:৩৭
গাজী আবদুস সালাম : আমার গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার পাইকগাছা থানায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চল হওয়ায় আমাদের জীবিকার প্রধান উৎস হলো চিংড়ির ঘের। আমার আব্বা তখন চিংড়ির ঘের করতেন। আমাদের বাড়ি থেকে চিংড়ির ঘেরটির অবস্থান বেশ দূরে। চিংড়ি ঘেরে পৌঁছাতে হলে রায়পুর, পুঁটিমারী এবং নাথেরকুড় এ তিনটি জায়গা অতিক্রম করতে হয়। তারপরে পড়ে উঁচু ওয়াপদা। ওয়াপদার নিচেই আমাদের বড় ঘের।
ঘেরের ওপাশে বিশাল শালতা নদী। এই নদীর সাথেই অধিকাংশ ঘেরের সংযোগ আছে পানি ওঠানো এবং নামানোর জন্য। জোয়ার-ভাটার সময় নদীর পানি পার্শ্ববর্তী খাল দিয়ে ঘেরে ঢোকে বিশেষ ঢাকনাযুক্ত গেটের নিচ দিয়ে। এ সময় ছোট ছোট মাছের সাথে অনেক বড় বড় মাছও ঢুকে পড়ে ঘেরে।
যাঁরা চিংড়ি ঘের করেন, তাঁরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে মাছ ধরার কাজে ব্যস্ত থাকেন। ঘেরের বাঁধের কোথাও কোনো গর্ত হলো কি না, কোনো মাছ বেরিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটাও দেখতে হয় ভালো করে। বিশেষ করে কিছু বেপরোয়া কাঁকড়ার দল বাঁধের নিচ দিয়ে গর্ত খুঁড়তে বেশ পারদর্শী বটে। এসব কাঁকড়া খালি হাতে ধরতে যাওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তাতে পাল্টা আক্রমণের শঙ্কা একশভাগ।
সেদিন ছিল পূর্ণিমার রাত। চারদিকে জোছনার আলো ঠিকরে পড়ছে। আকাশের চাঁদ নদীর পানিতে স্বর্ণের থালার মতো দোল খাচ্ছে। ঘেরের পানিতে বাগদা এবং গলদা চিংড়িসহ বেশকিছু ছোট মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে ইচ্ছেমতো।
রাত ১টা কী ২টা বাজবে তখন। আব্বা ঘেরের মধ্যে গোলপাতার তৈরি বাসায় হালকা করে চোখ দুটো একটু বন্ধ করেছেন। হঠাৎ পানিতে লাফালাফির বিশাল শব্দ শুরু হলো। সে কী শব্দ! মনে হলো পানিতে যুদ্ধ বেধেছে। ঘেরের প্রবেশমুখে আগেই বড় জাল পাতা ছিল মাছ ধরার জন্য। প্রচণ্ড শব্দে আব্বার ঘুম ভেঙে গেলো। তিনি তড়িঘড়ি করে জালের কাছে গেলেন। বিশাল এক বোয়াল মাছ ধরা পড়েছে জালে। আব্বা তো ভীষণ খুশি। এত বড় মাছ আগে কখনো দেখেননি তিনি।
আব্বা ভাবলেন, মাছটি এখনি বাড়িতে নিতে হবে। তাহলে বাড়ির সবাই খুব খুশি হবে মাছটি দেখে। ভোর পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চাইলেন না। ওই রাতেই বিশাল মাছটি কাঁধে নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন। মাছটি বহন করতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল তাঁর।
ঘের থেকে লোকালয়ে আসতে রাস্তার দুই পাশে শুধু পানি আর পানি। একসময় ঘেরের রাস্তা শেষ হয়। শুরু হয় লোকালয়ের ভেতর দিয়ে পথ চলা। লোকালয় বলতে সেরকম নয়। দূরে দূরে দুয়েকটা বাড়ির দেখা মেলে। সেসব বাড়িতে কোনো সাড়া মেলে না গভীর রাতে।
বড় বড় বাগান আর বটগাছ পেরিয়ে আব্বা বাড়ির দিকে আসতে লাগলেন। পেত্নীঘোলার মাঠ থেকে আমাদের বাড়ি আর বেশি দূরে নয়। এ মাঠের পাশেই বহু পুরাতন বড় এক বটগাছ। আব্বা যখন মাঠটি পার হবেন, ঠিক তখনই চমকে উঠলেন।
তাঁর চোখ দুটো মাঠের দিকে চলে গেল। এ কী! ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর পাগড়ি পরিহিত শত শত অচেনা মানুষ কাঁচি দিয়ে ধান কাটছে মাঠজুড়ে। অথচ তখন ধানের মৌসুম ছিল না। গতকালও তো ওইখানে বিরান মাঠ ছিল। তবে… তবে… কারা ওরা, ভাবতে লাগলেন আব্বা।
জোছনার আলো যেন ঝরে পড়ছে পেত্নীঘোলা মাঠের ওপর। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ধবধবে সাদা পোশাকের ঔজ্জ্বল্য। না, এটা কোনো মনের ভুল বা চোখের ভুল নয়। ওই তো লোকগুলো কেমন একমনে অপরূপ ছন্দে ধান কেটে চলেছে। কিন্তু কারও আশপাশে তাকানোর নামমাত্র নেই।
এই নিশ্চুপ পূর্ণিমার রাতে খোলা মাঠে এত পরিপাটি ধবধবে সাদা পোশাক পরিহিত কাদের আগমন, তা আর বুঝতে বাকি থাকে না কারও।
যদিও আব্বা অনেক সাহসী ছিলেন, তারপরও এমন নিশীথের কৃষক দেখে তাঁর আত্মা কিছুটা কেঁপে উঠল। কাঁধের মাছটি তখন আগের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি ওজন মনে হতে লাগল। পা আর চলতে চাইল না মোটেও। মনে মনে মহান আল্লাহর নাম জপতে লাগলেন তিনি। বিভিন্ন দোয়া পড়তে লাগলেন।
না, এখানে আর এক মুহূর্ত নয়। কোনোরকম মাথা ঝিমুনি আর অস্বস্তি নিয়ে বাড়ি পৌঁছালেন তিনি। এত বড় মাছ দেখে বাড়ির সবাই খুবই খুশি হলো। কিন্তু আব্বার শরীরে ভীষণ জ্বর শুরু হলো। বিছানায় শায়িত হয়ে গেলেন তিনি।
মাঠের ঘটনাটি মাকে খুলে বললেন। একপর্যায়ে তাঁর শরীরে প্যারালাইজড হওয়ার উপক্রম হলো। যথারীতি চিকিৎসা চললো। কিন্তু পুরোপুরি সেরে উঠতে অনেক সময় লেগে গিয়েছিল। আব্বা একটা সময় সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। তবে বাড়ির সবাই শালতা নদীর সেই বিশাল বোয়াল মাছটি খেতে পারলেও আব্বার কপালে জোটেনি মাছটির কোনো টুকরো।