ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য : সোনালি শিখায় নবকিরণ
৩ জুলাই ২০২৫ ১২:১৮
আলহামদুলিল্লাহ। গত বছরের ৫ আগস্ট ফ্যাসিজমের কবল থেকে দেশ মুক্ত হওয়ার পর রাজনীতির গতি-প্রকৃতিতে জাতীয় চেতনার উন্মেষে জনমনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলামের অনুসারী। তারা চায় দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে এ সুমহান আদর্শের সৌন্দর্য প্রতিফলন। কিন্তু বিগত দেড় দশকে হাসিনার শাসনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল ইসলামী আদর্শের বদলে কথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নামে পৌত্তলিকতার ছাপ। ইসলামপন্থি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে দলটিকে কার্যত জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র সর্বশেষ পতনের আগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল ফ্যাসিস্ট সরকার। জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতাদের জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে এবং কারাগারে নির্যাতন করে হত্যা করেছে তারা। অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল, এমনকি অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদেরও নির্বিচারে হত্যা, খুন ও গুম করা হয়েছে। নিরীহ এতিম হাফেজদের রাজধানীর শাপলা চত্বরে ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ নাম দিয়ে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা। স্বজনহারা মানুষ স্বৈরাচার-ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসরদের ভয়ে কান্না করতে পর্যন্ত পারেনি। গুম হওয়া স্বজনদের লাশের সন্ধানে থানায় জিডি করার সাহস পায়নি। তাই আজও অজানা রয়েছে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হাসিনা সরকারের বর্বরতায় শহীদের সংখ্যা। হাসিনার শাসনামলকে তুলনা করা চলে রাজা শশাঙ্কের মাৎস্যন্যায় দুঃশাসনের সাথে। কারণ এমন কোনো হকপন্থি আলেম নেই, যিনি হাসিনার নির্যাতনের শিকার হননি। সেই দুঃস্বপ্ন আর অন্ধকার কাটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সোনালি সূর্য উঠেছে। এ সোনালি শিখায় নবকিরণ হিসেবে জাতি দেখছে সম্প্রতি চলমান ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের প্রয়াস।
আমাদের এ বিশ্লেষণের প্রতিধ্বনি ইসলামপন্থি দলের নেতাদের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। গত শনিবার (২৮ জুন) বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আয়োজিত মহাসমাবেশে চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, ইসলামপন্থিদের ঐক্যের ব্যাপারে গণআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে। জোটবদ্ধ ইসলামী দলগুলো হবে আগামী দিনের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। পিআর পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই দাবি করে রেজাউল করীম বলেন, জনগণের ভোটের অবমূল্যায়ন রুখতে সংসদ নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি চালু করতে হবে। এ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ঐক্যের পক্ষে বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন রাজী, নেজামে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশির উল্লাহসহ দেশের উল্লেখযোগ্য সব ইসলামপন্থি দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হয়ে ঐক্যের পক্ষে তাদের মতামত দিয়েছেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব এডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দয়াল কুমার বড়ুয়া, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিওসহ অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসী নেতারাও সমাবেশে অংশ নিয়ে ইসলামের মহান ভ্রাতৃত্বের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।
ইসলাম একটি সর্বজনীন আদর্শ। এ আদর্শের সৌন্দর্য গ্রহণ করে পৃথিবীর অনেক আধুনিক অমুসলিম দেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য বিভাগের প্রফেসর হুসেইন আসকারি ইসলামের বিধান মেনে চলার ব্যাপারে একটি গবেষণাকর্মে উল্লেখ করেছেনÑ আয়ারল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে ও বেলজিয়াম তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এর আগে ২০১০ সালেও এক গবেষণায় ইসলামী বিধান মেনে চলা দেশগুলোর তালিকার শীর্ষে ইসলামী রাষ্ট্রের নাম ছিল না। ওই গবেষণায় নিউজিল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং নেদারল্যান্ডস ছিল তালিকার শীর্ষে। আল্লাহর সৃষ্টি চন্দ্র-সূর্য, বাতাস, পানি যেমন ধর্ম-বর্ণ সবার জন্য প্রয়োজন, তার প্রেরিত আদর্শ ইসলামও তাই। এ আদর্শের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিকগুলো কোনো রাষ্ট্র গ্রহণ করলে সে দেশের অধিবাসী মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সবাই এর সুফল পায়।
ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলের নেতারা সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে সাম্য (ইনসাফ), মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের সঙ্গে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির পুনঃস্থাপন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা, মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার পর সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ‘লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় দেশ এগিয়ে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে সুখী-সমৃদ্ধ মানবিক, গোটা জাতি সেই প্রত্যাশা করছে।
আমরাও চাই দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণে ইসলামী ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনুসারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে যাবে। ছোট-খাটো মতপার্থক্য ভুলে ফ্যাসিবাদ ও সকল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান অটুট রাখতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হবে না।