কবুল হজের বিনিময় জান্নাত


২৬ জুন ২০২৫ ১১:২০

॥ প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী ॥
আল্লাহর ঘরের মেহমানরা একে একে ফিরে আসছেন। সদ্যোজাত শিশুর মতো গুনাহমুক্ত হয়ে হাজী সাহেবরা দেশে ফিরছেন। হজ কোনো সাধারণ ইবাদত নয়। যেসব আমলের বিনিময়ে দুনিয়া থেকে জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করা যায়, তন্মধ্যে হজ একটি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ইহরামের কাপড় পরিধান করে যখন একজন হজযাত্রী উচ্চারণ করেন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’, তখনই আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা ঘোষণা করেন, হ্যাঁ তোমার হাজিরা (লাব্বাইক) গণনা করা হয়েছে এবং পুরস্কৃত করা হয়েছে। পুরস্কৃত করা অর্থ জান্নাতিদের তালিকাভুক্ত করা।
একজন ব্যক্তি যখনই হজের নিয়ত করেন, তখনই শুরু হয়ে যায় তার জীবনে পরিবর্তন। জীবনে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও নানাবিধ ত্রুটি-বিচ্যুতি তার সামনে ভেসে ওঠে, কাতরকণ্ঠে বার বার আল্লাহর কাছে ধরনা দেয় এবং বলে, পরোয়ারদিগার! তুমি আমাকে ক্ষমা করো’। লোকজনের কাছে দেনা-পাওনা থাকলে তা মিটিয়ে ফেলে এবং একটি পবিত্র শরীর ও মন নিয়ে দুনিয়ার সবকিছু থেকে নিজেকে পৃথক করে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ তালবিয়া পাঠ করতে করতে কাবার পানে অগ্রসর হয়। ‘আমি হাজির, আমি হাজির’ বলে কাবার মালিকের আতিথেয়তা গ্রহণ করে। লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক। আমি হাজির, হে আল্লাহ। আমি হাজির। আপনার কোনো অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সব প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং রাজত্ব আপনার। আপনার কোনো শরিক নেই।
তালবিয়া ও তাকবির পাঠের (হজযাত্রী ছাড়া সারা বিশ্বে মুসলমানরা ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত) মাধ্যমে (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ) মূলত আল্লাহপাকের শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব ও সার্বভৌমত্বের ঘোষণা প্রদান করে। সেই সাথে তাগুতের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা (শিরকমুক্ত হওয়া) এবং সকল প্রশংসা আল্লাহরই বার বার উচ্চারণ করেন। লিল্লাহিল হামদ বলে ব্যক্তিপূজা ও সৃষ্টিপূজার মূলোৎপাটন করেন। মুসলমানের মুখ থেকে কখনোই জয় মুহাম্মদ বা মুহাম্মদ জিন্দাবাদ স্লোগান উচ্চারিত হয়নি। স্লোগান একটিই এবং তা হলো নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার। চলতে, ফিরতে, উঠতে, বসতে কেবলই আল্লাহর গুণগান ও তাঁরই প্রশংসাÑ কখনো সুবহানাল্লাহ, কখনো আলহামদুলিল্লাহ, কখনো আল্লাহু আকবার আবার কখনো ইন্না লিল্লাহ- শুধুই আল্লাহর স্মরণ। প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর উম্মতদের কেবল আল্লাহরই ইবাদত করার তাগিদ প্রদান করেছেন এবং তা হতে হবে তাঁরই দেখানো পথে।
হজের আনুষ্ঠানিকতার মাঝে রয়েছে আল্লাহপাকের তিন বান্দা-বান্দির চরম আত্মত্যাগ ও কুরবানির স্মরণ। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবার একের পর এক পরীক্ষার মুখোমুখি হন এবং সাফল্যের সাথে সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সাফা ও মারওয়া দুটি পাহাড়ের মাঝে দৌড়াদৌড়ি, শয়তানের প্রতি কংকর নিক্ষেপ ও পশু কুরবানি সবই হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের আত্মত্যাগের স্মরণ এবং এ ত্যাগ ও কুরবানির বিনিময়ে তিনি লাভ করেন মুসলিম জাতির পিতা হওয়ার গৌরব। মিনায় তাঁবুতে জীবনযাপন, আরাফায় অবস্থান, মুজদিলাফায় রাত্রিযাপন, শয়তানকে প্রস্তর নিক্ষেপ, সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে প্রথম তিনবার রমল এবং কুরবানি সবই যেন মনে করিয়ে দেয়, মুসলমান মাত্রই আল্লাহর সৈনিক। এই সৈনিক আল্লাহর জন্য নিজের জীবন, মাতৃভূমি, পরিবার ও আপন সন্তানকে উৎসর্গ করতে পিছপা হয় না। সে সদা প্রস্তুত এবং সন্তুষ্টচিত্তে ঘোষণা দেয়, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি ও যাবতীয় ইবাদত অনুষ্ঠান এবং আমার জীবন ও মরণ আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। একজন হাজী হজ করার মধ্য দিয়ে তাগুতের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহতে সঁপে দেয়ার এক প্রেরণা নিয়ে ঘরে ফেরেন। হজ মূলত আল্লাহপাকের নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষকরণ এবং বাতিলের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্নকরণের এক বড় শিক্ষা। জমজম কূপের সৃষ্টি এবং চার হাজার বছর পর্যন্ত প্রবহমান থাকা আল্লাহপাকের এক অপূর্ব নিদর্শন। লাখ লাখ হাজী সাহেব সেই কূপ থেকে পানি পান করছেন এবং সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে বহন করে নিয়ে আসছেন অথচ সেই পানির কোনো ঘাটতি নেই। শেফা হিসেবে মানুষ পান করছে ও পরিতৃপ্ত হচ্ছে। হেদায়াত পাওয়ার জন্য এক জমজম কূপের পানিই যথেষ্ট হতে পারে।
হজ কবুল তখনই হতে পারে, যদি হজ সম্পন্ন হওয়ার পর হাজী সাহেবের মাঝে পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়। হাজী সাহেবরা পূর্বে ঘটে যাওয়া সকল অপরাধের জন্য তাওবা করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নেন। এখন প্রয়োজন সেসব গুনাহের যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং শিরক ও কবিরা গুনাহ থেকে দূরে থাকা ও ফরজ-ওয়াজিব নিষ্ঠার সাথে পালন করা। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাগুতের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্নকরণ। ইসলাম ছাড়া অন্য যা কিছুর দিকে ছুটবে, সেটা হবে তাগুতের পথে ছুটা এবং তা যত নিকটাত্মীয় হোক না কেন? আল্লাহপাকের বাণী, ‘হে ঈমানদার লোকেরা! তোমাদের পিতা ও ভাইকেও বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না যদি তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরকে অধিক ভালোবাসে। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে, তারাই জালেম’। সূরা তাওবা : ২৩। ইসলাম আল্লাহপাকের মনোনীত একমাত্র দীন এবং এর বাইরে সবই কুফর।
আল্লাহপাক ঈমানদার ও কাফেরের মাঝে পার্থক্য টেনেছেন নামাজ দিয়ে। আবার জিহাদ দিয়েও পার্থক্য করেছেন। আল্লাহর বাণী, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করেছে, তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করেছে, তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই শয়তানের সঙ্গী-সাথীদের সাথে লড়াই করো আর বিশ্বাস রেখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’। সূরা নিসা : ৭৬। ঈমানদার মাত্রই আল্লাহর পথের সৈনিক (জিহাদকারী) এবং এই জিহাদ হতে হবে জীবনের সবকিছু অপেক্ষা মূল্যবান। আল্লাহপাকের বাণী, ‘হে নবী! বলে দাও, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের উপার্জিত সম্পদ, যে ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়ার ভয়ে তোমরা তটস্থ থাকো এবং তোমাদের যে বাসস্থানকে খুবই পছন্দ করোÑ এসব যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয়, তাহলে আল্লাহর ফয়সালা তোমাদের কাছে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আল্লাহ ফাসেকদের কখনো হেদায়াত (সত্য পথের সন্ধান) দান করেন না’। সূরা তাওবা : ২৪।
আল্লাহপাক যাদের হজ করার তাওফিক দান করেছেন, তারা বড়ই ভাগ্যবান। আল্লাহর দীনের ওপর টিকে থাকা সহজ ব্যাপার নয়। শয়তান মানুষকে নানাভাবে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে। এজন্য হেদায়াতের ওপর অবিচল থাকার জন্য সবসময় কাতরভাবে আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওফিক কামনা করতে হবে। আমরাও দোয়া করি, হে আল্লাহ! সকল হাজীর হজ তুমি কবুল করো এবং নতুনভাবে যেন তারা আর গোমরাহ না হয়।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।