মহররমের ইতিহাস, তাৎপর্য ও আমল


২৬ জুন ২০২৫ ১১:১৫

॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
মহররম হিজরী (ইসলামী) বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। এ মাসের প্রথম দিন হিজরী নববর্ষ শুরু। ইসলামের ইতিহাসে এ মাসটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। চারটি পবিত্রতম মাসের মধ্যে এটি একটি। মহররম শব্দটি আরবি, যার অর্থ পবিত্র, সম্মানিত। প্রাচীনকাল থেকে মহররম মাস পবিত্র হিসেবে গণ্য। মহররমের ১০ তারিখ বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন দিন, যাকে আশুরা বলা হয়ে থাকে। বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এ মাসটি। মহররম মাসের পরবর্তী মাসের নাম সফর।
পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআনে সূরা তাওবার ৩৬নং আয়াতে বর্ণিত যে চারটি মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তার মধ্যে মহররম অন্যতম। প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) এ মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রমজানের পরে সর্বোত্তম সাওম হলো মহররম মাসের সাওম এবং ফরজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হলো তাহাজ্জুদের সালাত।’ হিজরী বর্ষপঞ্জি একটি চন্দ্রপঞ্জিকা এবং এ বর্ষপঞ্জির মাসগুলো শুরু হয়Ñ যখন পশ্চিম আকাশে নতুন চাঁদ উদিত হয়। যেহেতু ইসলামী চন্দ্রভিত্তিক বর্ষপঞ্জিটির বছর পূর্ণ হয় সৌরপঞ্জিকা অপেক্ষা ১০ থেকে ১১ দিন আগেই, ফলে প্রতি বছর মহররম মাসের শুরুর দিনটি প্রচলিত সৌরভিত্তিক গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সঙ্গে একই দিনে মেলে না।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য চন্দ্রমাসের হিজরী সন গণনার সূচনা হয়। আরবি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি ও ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান সর্বোপরি ইবাদত-বন্দেগির বিষয়টি সরাসরি সম্পৃক্ত। হিজরী সন ইসলামের ইতিহাসের একটি মৌলিক ও গৌরবোজ্জ্বল দিক এবং মুসলমানদের ঐতিহ্যের অবদানে মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়ায় পৃথিবীর সর্বত্র সমানভাবে সমাদৃত। প্রিয়নবী (সা.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় হিজরত করেন। কিন্তু এর প্রস্তুতি ও আকাবার শেষ বাইয়াতের পরবর্তী সময়ে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম যে চাঁদটি উদিত হয়েছিল, তা ছিল মহররম মাসের। অন্য সাহাবায়ে কেরামের হিজরত মহররম থেকে শুরু হয়েছিল, তাই হিজরী সনের প্রথম চন্দ্রমাস মহররম থেকে ধরা হয়।
আরবি চন্দ্রবর্ষ তথা হিজরী সনের সঙ্গে মুসলমানদের বিশেষ ঐতিহ্য নিহিত রয়েছে। যদিও হিজরতের সময়কাল থেকে হিজরী সন বা চন্দ্রবর্ষ গণনা আরম্ভ হয়, কিন্তু এ পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে চন্দ্রমাসের গণনা শুরু হয়েছে। আসমান ও জমিন সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস ১২টি, তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত, এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’ (সূরা আত-তাওবা : ৩৬)। ইসলামে মহররম মাসটি অত্যন্ত মর্যাদাবান ও ফজিলতময়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা যে চারটি মাস সম্মানিত বলে ঘোষণা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর মুখনিঃসৃত অমিয় বাণীর মাধ্যমে তা সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে সম্মানিত মাসগুলোকে চিহ্নিত করে তিনি বলেছেন, ‘তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক জিলকদ, জিলহজ ও মহররম এবং অপরটি হলো রজব।’ (সহীহ বুখারি)।
পৃথিবী সৃষ্টির আদিকাল থেকেই চন্দ্রমাসের হিসাব মহান আল্লাহর গণনায় রয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ চন্দ্রমাসের হিসাব করে চলেছে। প্রাচীনকাল থেকে পূর্ববর্তী সব নবী-রাসূলের (সা.) শরিয়তে ১২ চন্দ্রমাসকে এক বছর গণনা করা হতো এবং তন্মধ্যে জিলকদ, জিলহজ, মহররম ও রজব- এ পবিত্র চারটি মাসকে বরকতময় ও সম্মানিত মনে করা হতো। এ মাসগুলোকে ‘আশ-শাহরুল হারাম’ বা অলঙ্ঘনীয় পবিত্র মাস বলা হতো। এ চারটি মাসে যেকোনো ইবাদতের সওয়াব বৃদ্ধি পায়। তেমনি এ সময়ে পাপাচার করলে এর ভয়াবহ পরিণাম ও কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়। পূর্ববর্তী শরিয়তসমূহে এ মাসগুলোয় সব ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মারামারি, খুনোখুনি প্রভৃতি নিষিদ্ধ ছিল।
ইসলামে মহররম মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিভিন্ন কারণে মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। প্রাক-ইসলামী যুগেও মহররমের ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। অফুরন্ত বরকত ও তাৎপর্যমণ্ডিত মহররম মাসে বহু নবী-রাসূল ঈমানের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে মুক্তি ও নিষ্কৃতি লাভ করেছিলেন। কারবালাসহ অসংখ্য তথ্যবহুল ঐতিহাসিক ঘটনা এ মাসে সংঘটিত হয়েছিল। ১০ তারিখ আশুরার সঙ্গে পুরো মহররম মাসের বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে। রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার আগে পবিত্র আশুরার দিনে রোজা রাখা ফরজ ছিল। পরে তা রহিত করে মাহে রমজানের রোজা ফরজ করা হয়। ইসলাম-পূর্বকালে বিভিন্ন জাতি নানা কারণে আশুরার দিন রোজা রাখত।
রাসূল (সা.) মদিনায় হিজরত করে দেখতে পেলেন- ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখ আশুরা দিবসে রোজা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কোন দিন; যাতে তোমরা রোজা রেখেছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস, যেদিন আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন, ফেরাউনকে তার সম্প্রদায়সহ ডুবিয়ে মেরেছিলেন। তাই হযরত মূসা (আ.) শুকরিয়া হিসেবে এদিন রোজা রেখেছেন, এজন্য আমরাও রোজা রাখি। এ কথা শুনে প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) বললেন, ‘তোমাদের চেয়ে আমরা হযরত মূসা (আ.)-এর অধিকতর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী।’ অতঃপর তিনি রোজা রাখলেন এবং অন্যদের রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বাকি জীবনে এদিন রোজা রাখতেন। মদিনায় আগমনের পর রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পর তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আমি আশুরার দিন রোজা রাখতে আদিষ্ট ছিলাম, অতএব এখন তোমাদের কারো যদি ওইদিন রোজা রাখতে ইচ্ছা হয়, তবে তা রাখতে পারো।’ আশুরার দিন রোজা রাখলে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যায়, বিধায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগের দিন বা পরের দিন আরেকটি রোজা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুমিন মুসলমান ১০ মহররম আশুরা দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে এদিন ঐচ্ছিক রোজা পালন করে। আশুরার দিন নফল রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে রাসূল (সা.)-কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘এ রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে থাকে।’ (মুসলিম ও তিরমিযী)।
অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘যে ব্যক্তি আশুরার রোজা রাখবে, আল্লাহ তায়ালা তার এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হচ্ছে রাত্রিকালীন নামাজ। (সহিহ মুসলিম)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে রমজান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য সময় তা দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি)।
একটি হাদীসে আছেÑ হযরত আলী (রা.)-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন, রমজানের পর আর কোনো মাস আছে; যাতে আপনি আমাকে রোজা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এ প্রশ্ন রাসূল (সা.)-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তার খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন, ‘রমজানের পর যদি তুমি রোজা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখো। কারণ এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যেদিনে আল্লাহ তায়ালা একটি জাতির তাওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তাওবা কবুল করবেন।’ (জামে তিরমিযী)।
আসুন, আমরা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে বিনীত প্রার্থনা করিÑ তিনি যেন মহররম মাসের ইসলামী ঐতিহ্য, গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুধাবন করে ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে অশেষ সওয়াব হাসিলের তাওফিক দান করেন এবং ঐতিহাসিক কারবালার মর্মস্পর্শী ঘটনা স্মরণে প্রতিটি মুসলমানকে ঈমানী চেতনাশক্তিতে বলীয়ান ও তেজোদীপ্ত হওয়ার মানসিকতা দান করেন।
লেখক : সাংবাদিক।