ময়লা বাণিজ্যে পকেট কাটছে নগরবাসীর
২৬ জুন ২০২৫ ১১:০৭
দক্ষিণে অনুমোদন থাকলেও উত্তরে নিয়ন্ত্রণহীন প্রভাবশালীরা
আদায় করা হচ্ছে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের নিয়মিত ব্যয়ের সঙ্গে বাড়তি ব্যয় হিসেবে যুক্ত ‘ময়লা’ বিল। বাসাবাড়িতে প্রত্যহ কাজকর্মে যেসব ময়লা-আবর্জনা তৈরি বা বের হয়, সেগুলো অপসারণে নির্ধারিত পয়সা ব্যয় করতে হয় নগরবাসীকে। ঢাকার দুই সিটিরই নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থাপনার সরাসরি ছোঁয়া পায় না নগরবাসী। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং দুই সিটি কর্তৃপক্ষ বাসাবাড়ির ময়লা অপসারণে নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। নাগরিক ও সিটি কর্তৃপক্ষের মাঝে রয়েছে দুটি সুবিধাভোগী শ্রেণি। এ দুই শ্রেণির একটি শ্রেণি বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি ময়লা নিয়ে এসে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) রাখেন। এরা স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে এবং কায়িক পরিশ্রম করেন, কিন্তু পারিশ্রমিক পাচ্ছেন নামমাত্র; যা দিয়ে তাদের সংসার ঠিকভাবে চলছে না। অন্যদিকে আরেকটা শ্রেণি- যারা সমকালীন ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে মহল্লাভিত্তিক ময়লা অপসারণের অনুমোদন নেন, এরপর নিজেদের ইচ্ছামাফিক ফি নির্ধারণ করে প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে আলাদা আলাদাভাবে টাকা আদায় করে পকেটস্থ করেন। এরা মাসে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছেন প্রভাব খাটিয়ে।
চাইলে ঢাকার দুই সিটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা অপসারণ করতে পারে। এ কাজে জনবলের কমতি থাকলে নিয়োগ দিয়ে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে পারে। এতে বেশ কয়েকটি লাভও রয়েছে। এসটিএসের ময়লা পৌঁছাতে করপোরেশন যদি নতুন লোক নিয়োগ দেয়, তাহলে বেশকিছু লোকের কর্মসংস্থান বাড়লো। সিটি করপোরেশন ময়লা বাসা থেকে নিজেরা নিয়ে এক্ষেত্রে প্রতি বাসা থেকে ময়লা অপসারণের জন্য নির্ধারিত ফি গ্রহণ করতে পারবে। এতে কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনা ব্যয় সম্পন্ন করেও বাড়তি যোগ হবে মূল রাজস্ব ভাণ্ডারে। তাছাড়া ঠিকাদাররা এখন যেভাবে ইচ্ছামাফিক পয়সা আদায় করছে, সেটিও বন্ধ হবে। কারণ সিটি কর্তৃপক্ষ সরাসরি ময়লা অপসারণের কাজ করলে যে ফি ধরা হবে, তা নিশ্চয়ই ওয়ার্ড বা মহল্লার ঠিকাদারদের চাইতে কম হবে। ফলে রাজধানীবাসী এমনটিই চাচ্ছেন। আর দেশের অন্য বড় দুটি সিটিতে এমন ব্যবস্থাপনার নজিরও রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সরাতে কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিকে টেন্ডার দেয় না। তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি বাসা থেকে ময়লা নিয়ে যায়। এজন্য নামমাত্র একটি ফি নিয়ে থাকে।
ডিএসসিসি এলাকার হোল্ডিং ট্যাক্স বিষয়ক তথ্যে দেখা যায়, সেখানে হোল্ডিং ট্যাক্সের সংখ্যা ২,৭১,৯৭৭টি। প্রতিটি ট্যাক্স হোল্ডিংয়ের বিপরীতে একাধিক ফ্ল্যাট থাকে। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৭ হাজার ১৫৭টি ট্যাক্স হোল্ডিং আছে। দুই সিটিতে ২ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৪ ট্যাক্স হোল্ডিং রয়েছে। প্রতি ট্যাক্স হোল্ডিংয়ের বিপরীতে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এসব বাসাবাড়ি থেকে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) মূলত দুটি পদ্ধতিতে ময়লা অপসারণ করে বলে জানা গেছে। এ সিটি কর্তৃক পরিচালিত নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। চসিকের কর্মীরা নিয়মিতভাবে বাসাবাড়ি, অফিস ও অন্যান্য স্থান থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যায়। এছাড়া কিছু এলাকায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা ক্লাবের মাধ্যমে ময়লা সংগ্রহ ও অপসারণ করা হয়ে থাকে। চসিকের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বাসাবাড়ি, অফিস এবং অন্যান্য স্থান থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ করে। সংগৃহীত বর্জ্য নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যায়। কিছু এলাকায় চসিক কর্মীরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকি করে এবং প্রয়োজনে সহায়তা করে। আর ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও চলে চসিকে। এ সিটির কিছু এলাকায় স্থানীয় ক্লাব বা সংস্থা নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে তারা তাদের নিজস্ব গাড়ি বা কর্মীদের মাধ্যমে ময়লা অপসারণ করে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন চসিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো সরাসরি ‘কর’ আরোপ করে না। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ মেটাতে কিছু ক্ষেত্রে হোল্ডিং ট্যাক্সের (বাড়ি বা সম্পত্তি কর) সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চার্জ অন্তর্ভুক্ত থাকে। যারা ব্যক্তি বা সংস্থার উদ্যোগে ময়লা সরান, তারা পয়সা নেন, যার পরিমাণ ৫০ থেকে এলাকা ও ময়লার ধরন এবং পরিমাণ অনুযায়ী আরেকটু বেশি হয়।
কলকাতা সিটি
কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (কেএমসি) বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে শহর থেকে বর্জ্য অপসারণ করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ, রাস্তার পাশে রাখা কনটেইনার থেকে বর্জ্য সংগ্রহ এবং সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা। সংগৃহীত বর্জ্য পরে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে কিছুটা নতুনত্ব রয়েছে। যেমন- কলকাতা শহর এলাকার বাড়ি বাড়ি থেকে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে। এসব বর্জ্য পৃথকীকরণ করে থাকে কর্মীরা। পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য পৃথক করার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা হয়। এর জন্য সবুজ এবং নীল রঙের বালতি ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সংগৃহীত বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে পাঠায়। সেখানে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সার তৈরি করা হয়। এছাড়া কেমএসি অবৈধ হোল্ডিং, ব্যানার এবং কিয়স্ক অপসারণের মাধ্যমে শহর পরিষ্কার রাখার জন্য নিয়মিত অভিযান চালায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এ পৌর কর্তৃপক্ষও হোল্ডিং ট্যাক্সের বাইরে আলাদাভাবে নাগরিকদের কাছ থেকে পয়সা নেয় না।
এখন বাণিজ্য করছে কারা?
হাসিনার পতনের এক সপ্তাহের মধ্যে রাজধানীর সব এলাকার ময়লা বাণিজ্যে হাতবদল হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের জায়গায় এখন ময়লা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন বিএনপি নামধারী স্থানীয় নেতারা। আগে যেখানে ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজ করা প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের পদধারী নেতারা। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। রাজধানীর ময়লা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে মাসে তারা তুলতেন অন্তত কয়েক কোটি টাকা। শুধু বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁর বর্জ্য সংগ্রহের নামে রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে অর্থ লুটপাটের একটি চক্র গড়ে উঠেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। এ চক্রে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ছিলেন। এখন তারা নেই, তবে তাদের কারবার রয়েছে ঠিকই। এ কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা।
ময়লা সংগ্রহকর্মীরা নামমাত্র মূল্যে কাজ করেন, রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
প্রভাবশালীরা ময়লার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করলেও বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহের মূল কাজটি করেন সংগ্রহকারীরা। এ দরিদ্র ব্যক্তিরা বর্জ্য সংগ্রহ করে ভ্যানগাড়িতে করে ময়লার পাত্র বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) পর্যন্ত নিয়ে যান। সেখান থেকে সিটি করপোরেশনের গাড়ি বর্জ্য ভাগাড়ে নিয়ে যায়। অথচ এ সংগ্রহকারীরাই নানাভাবে বঞ্চিত। ন্যায্য মজুরিও পান না বর্জ্য সংগ্রহকারী কর্মীরা। জানা গেছে, যারা বর্জ্য সংগ্রহ করেন, তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। তাই বর্জ্য সংগ্রহকারীদের নিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় কর্মশালার আয়োজন করা হয়। ময়লা সংগ্রহকারী সংগঠনগুলোকে কর্মীদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলা হয়ে থাকে। বিশেষ করে গ্লাভস, মাস্ক, হাঁটু পর্যন্ত জুতা ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা চোখে পড়ে না। মাঠপর্যায়ের বর্জ্য সংগ্রহকারীরা জানান, তাদের কখনো এমন নিরাপত্তাসামগ্রী দেওয়া হয়নি। খালি হাতে ময়লা থেকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী খুঁজতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই হাত কেটে যায়। ময়লা সংগ্রহকারী মরিয়ন বেগম জানান, বাসাবাড়ি থেকে ময়লা এনেই মাটিতে ঢেলে ফেলছেন তারা। সেখান থেকে প্লাস্টিকের বোতল, লোহা ও কাচের তৈরি সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্সের বাতিল সামগ্রী, মুঠোফোনের চার্জার, পলিথিন আলাদা করে বস্তায় ভরে রাখেন। ময়লা সংগ্রহের কাজ করে বেতন পান আট হাজার টাকা। ময়লা থেকে বেছে রাখা জিনিসপত্র ভাঙাড়ির দোকানে বিক্রি করে আরো কিছু আয় হয়। তা দিয়ে মোটামুটি চলে যাচ্ছে তার সংসার।
যেভাবে ঠিকাদারি দেওয়া হয়
বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পেতে হলে ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে বার্ষিক ২০ লাখ টাকা দিতে হবে। এর মধ্যে অফেরতযোগ্য ফি ১০ লাখ টাকা। বাকি ১০ লাখ টাকা ফেরতযোগ্য জামানত। কাজের চুক্তির আগেই এ টাকা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা দিতে হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড, অর্থাৎ পুরোনো ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করতে গেলে এ টাকা দিতে হবে। আর নতুন (৩৭-৫৪ নম্বর) ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের কাজে জামানত ও বার্ষিক ফি বাবদ ৬ লাখ করে মোট ১২ লাখ টাকা দিতে হবে। গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহে সম্প্রতি উত্তর সিটি করপোরেশন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন-সংক্রান্ত নীতিমালা বা সংশোধিত টার্মস অব রেফারেন্সে (টিআর) বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভ্যান প্রতিষ্ঠান ময়লা সংগ্রহের বিনিময়ে এলাকাভেদে বাসাপ্রতি ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা নিতে পারবে। নীতিমালার শর্তানুযায়ী, ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান সন্তোষজনক সেবা দিতে না পারলে জামানত থেকে টাকা কাটা হবে। এক্ষেত্রে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ টাকা কাটা হবে। ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানগুলো বাসাবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে তা এসটিএসে নেয়। ধীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছেমতো ময়লার বিল আদায় করছিল তারা। এলাকাভেদে বাসাবাড়ি থেকে ৮০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিল নেয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় নেওয়া হয় দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। নতুন এ নীতিমালা করা হলেও এটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি ডিএনসিসি। ফলে এখন যে যার ইচ্ছামাফিক এলাকা দখল করে টাকা তুলছে। সিটি করপোরেশনের কোনো অনুমোদনই নেই এসব স্থানীয় ময়লা সংগ্রহকারী ঠিকাদারের। অবশ্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি ঠিকাদারদের (ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান) কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ দিয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে একজন বাড়ির দারোয়ানের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি জানান, তার বাসাবাড়িতে প্রতি ফ্ল্যাটে ময়লা বিল ছিল ৪০ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে নেওয়া হয় ১২০ টাকা। এই বিল যারা ময়লা নেন তারা পাচ্ছেন না, পাচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এ প্রভাবশালীরাই সংগ্রহকারী কর্মীদের সামান্য বেতন দিয়ে থাকেন। ঢাকার উত্তর সিটির ৩৫নং ওয়ার্ড বাসিন্দা রুবিনা ইসলাম জানান, ময়লা একসময় নিজেরাই এসটিএস-এ ফেলে দিয়ে আসতেন তিনি। এরপর স্থানীয়রা মাত্র ১০ টাকায় মাসব্যাপী ময়লা নিয়ে যেত। কয়েক বছর আগেও এ টাকার পরিমাণ ছিল ৪০ টাকা। আর এখন দিতে হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদারের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এমন অভিযোগ আমরা পাই। অনেক সময় আমাদের কাছে অভিযোগ আসে। অভিযোগ পেলে আমরা নিয়ম অনুযায়ী ওই ঠিকাদারকে শোকজ করি। শোকজে আমরা বলি যে, আপনার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করার ব্যাপারে একটা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার এখতিয়ার আপনার নেই, সম্পূর্ণ চুক্তি লঙ্ঘনের লক্ষণ এভাবে আমরা বলি। এরই প্রেক্ষিতে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকে শোকজ নোটিশের পরবর্তী তিন দিনের ভেতরে ব্যাখ্যা প্রদান করতে বলা হয়। শোকজে বলা হয়, যদি আপনি যথাযথ জবাব দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে আপনার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এভাবে আমরা তাকে শোকজ করি। তারপর সে আমাদের একটা ব্যাখ্যা দেয়। এরপর সে সশরীরে আমাদের এখানে আসে। দুবার যদি কেউ শোকজ খায় তৃতীয়বার আমরা তার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, আমরা যখন যেটা অভিযোগ পাই সাথে সাথেই আমরা তা নিয়ে তৎপর থাকি। আমরা নির্দেশনা দেই যে, বাসাবাড়ি থেকে কোনোভাবেই অতিরিক্ত টাকা যাতে নেওয়া না হয়। তিনি জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপরপোশনে বাসাবাড়িতে ধার্য ১০০ টাকা। এর বেশি যদি কেউ নেয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিচ্ছি আমরা।
নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সরানোর কোনো উদ্যোগ ডিএসসিসির রয়েছে কিনাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের একটা নীতিমালাই করা হয়েছে, এটা সরকার কর্তৃক। আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এ কাজ করতে হলে ৮ হাজার কর্মী দরকার অথচ বর্তমানে আছে পৌনে ৫ হাজার কর্মী। এর মধ্যে ৩০ শতাংশের বয়স ৬০ বছর ছুঁইছুঁই, তারা আগামী এক বছরের মধ্যে অবসরে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমরা সঠিকভাবে পাচ্ছি ৩ হাজার থেকে ৩২’শ লোক। কাজের জন্য প্রতি কিলোমিটারে একজন লোক দরকার রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার জন্য। সেই হিসেবে রাস্তা ঝাড়ু, ড্রেন পরিষ্কার এবং ট্রাকে মাল উঠানো বিভিন্ন ক্যাটাগরি মিলিয়ে আমাদের লোক দরকার ৮ হাজার। অথচ এখন আমরা ইফেক্টিভ চেইন অনুযায়ী আমরা পাচ্ছি মাত্র ৩ হাজার থেকে ৩২’শ কর্মী। আমরা সরকারকে বলেছি, আমাদের এটলিস্ট ১ হাজার কর্মী নিয়োগ দেন। কিন্তু ১-২শ জনের বেশি নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। যেখানে আমাদের ৩ হাজার কর্মী প্রয়োজন, সেখানে আমি ২০০ দিয়ে কি করতে পারবো? তিনি এও জানান, ২০০৮ সালে বলা হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কর বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি, নতুন লোক নেওয়া সহজ নয়।
মাহাবুবুর রহমান তালুকদার আরও বলেন, এখানে সমস্যা হলো দুটি- এক. আমাদের ম্যানপাওয়ার নিয়োগ করতে হতো, অথচ আমরা ম্যানপাওয়ার নিয়োগের অনুমোদন করাতে পারছি না। ২০২০ সালে আমাদের সুয়ারেজ ড্রেনগুলো হ্যান্ডওভার করা হয়েছে ঢাকা ওয়াসা থেকে, কিন্তু তারা এ কাজ করাতে তাদের পক্ষ থেকে কোনো ম্যানপাওয়ার দেয়নি। ওই বড় ড্রেনগুলোয় আমার লোক নামতে পারে না, তারা কিন্তু এক্সপার্ট না। এর জন্য এক্সপার্ট ১৫০ জন লোক যখন আমরা চেয়েছি, তখন বলা হলো এ মুহূর্তে নয়।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর এ বি এম সামসুল আলম এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের ব্যাপারে এ মুহূর্তে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে কাউকে অনুমতি দেওয়া নেই। সর্বশেষে ২০২২ সালের দিকে যে অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছিল। এরপর এখন পর্ডন্ত কমিউনিটি কালেকশনের জন্য কাউকে এ মুহূর্তে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। মেয়র আতিকুল ইসলাম থাকা অবস্থায় এ ব্যাপারে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই উদ্যোগ ফেইল করেছে। গত মাস চারেক আগে একবার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটাও মাস ২ আগে ফেইল করেছে। এ মুহূর্তে আমাদের সিটি করপোরেশন অনুমতি দেবে এমন কেউ নেই। যেটা হচ্ছে, এটা লোকাল কমিউনিটি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করছে। আর আমাদের সিটি করপোরেশনের কাজ শুরু হয় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস)।