বিগত ৫৪ বছরে বিভিন্নি দল ও ওলামায়ে কেরামের অবদান


২৬ জুন ২০২৫ ১০:৪৫

॥ ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাদানী ॥
(গত সংখ্যার)
# ‘ইসলাম রক্ষা জাতীয় কমিটি’: ২০০৭ সালে ‘নারী উন্নয়ন নীতিমালা’ যাতে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী অনেক ধারা উপধারা সংযোজিত ছিল। অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নিলে এদেশের শীর্ষ আলেমদের নেতৃত্বে ইসলাম রক্ষা জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। ১০ নভেম্বর ২০০৭ পল্টনস্থ মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবের অফিসে। এদেশের পরিচিত সকল ইসলামী দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল উক্ত কমিটিতে এবং কমিটির কার্যক্রম পরিচালনায় পরিচিত সকল ইসলামী সংগঠনসমূহের সামগ্রিক সহযোগিতা ছিল। নারীনীতি, ফতোয়ার ওপর হস্তক্ষেপ, ইসলাম ও বিশ্ব নবী (স.) এর বিরুদ্ধে নানামুখী অপপ্রচারের মোকাবিলায় উক্ত কমিটি মিছিল, মিটিং, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন, গোলটেবিল বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। উল্লেখ্য যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে উক্ত কমিটির প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে তাদের লিখিত বক্তব্যও তুলে ধরেন।
# ‘ইসলামী শিক্ষা রক্ষা জাতীয় কমিটি’: ২০০৯ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের আদলে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু হলে মাওলানা মুহিউদ্দিন খানসহ শীর্ষ ইসলামী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে ‘ইসলামী শিক্ষা রক্ষা জাতীয় কমিটি’ গঠন করা হয়। এ আন্দোলনেও এদেশের সকল ইসলামী দল ও পরিচিত প্রসিদ্ধ সংগঠনসমূহের সামগ্রিক সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল। তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করে উক্ত শিক্ষানীতির মৌলিক ত্রুটিসমূহ লিখিত আকারে সরকারের নিকট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
উক্ত শিক্ষানীতির মৌলিক ত্রুটিসমূহ চিহ্নিত করে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে তা জাতির সামনে পেশ করা হয়। পরবর্তীতে তা পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা হয়।
# ‘সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ পরিষদ’: ২০১০ সালের ২৯ জুন বেশ ক’জন শীর্ষ ইসলামী নেতৃবৃন্দের গ্রেফতারের পর সকল স্তরের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, ইসলামী দলসমূহের মাঝে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তাই এ বছরই ২০১০ সালের ১ জুলাই মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ. ও কামরাঙ্গীচর নুরিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক মাওলানা শাহ আহমাদ উল্লাহ আশরাফ রহ. (হাফেজ্জী হুজুরের বড় সাহেবজাদা) এর আহ্বানে এদেশের প্রায় সকল ইসলামী দল এক পরামর্শ বৈঠকে মিলিত হয়। ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনার পর ‘সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ’ নামে এক অরাজনৈতিক ইসলামী প্লাটফর্ম যাত্রা শুরু করে। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ.কে সভাপতি ও মাওলানা শাহ আহমাদ উল্লাহ আশরাফকে কো-সভাপতি করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ৭ জুলাই ২০১০ উক্ত সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ পরিষদ বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে সারা দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরামদের সমন্বয় করে ১০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করে ।
‘ইসলামী সমমনা ১২ দল’
কয়েকটি ইসলামী দলের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ পরিষদের কলেবর বৃদ্ধি করা হয়। তারই প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে ১৩ মার্চ মদীনা ভবনে মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.)-কে আহ্বায়ক করে ‘ইসলামী সমমনা ১২ দল’ গঠন করা হয়। ইসলামী সমমনা ১২ দল বিভিন্ন ইসলামী ইস্যুতে ধারাবাহিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফীকে উক্ত সমমনা ১২ দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব দেয়া হয়।
# ‘সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ’: বিভিন্ন ইসলামী দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পল্টন মোড়ে বিভিন্ন মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হয়। প্রশাসনের অনুমতি না পেয়ে উক্ত সমাবেশে আগত তাওহীদি জনতা বাংলাদেশ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমবেত হয়। ঈমানী দায়িত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সারা দেশ থেকে উলামা, পীর-মাশায়েখবৃন্দ সেখানেই একত্রিত হতে থাকেন। পুলিশ প্রশাসনের বাঁধার মুখে উক্ত সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। প্রেস ক্লাবের ভেতর থেকেই শীর্ষ ইসলামী নেতৃবৃন্দ মাওলানা আহমাদ উল্লাহ আশরাফ, মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী ও পরবর্তীতে মাওলানা জাফরুল্লাহ খানসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হন। তারই প্রতিবাদে এবং ইসলামী দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে পরের দিন এক ঐতিহাসিক হরতালের ডাক দেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান (রহ) । পরবর্তীতে এ সকল ইসলামী ইস্যুতে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ধারাবাহিক কর্মসূচি চলতে থাকে। বৃহত্তর পরিসরে আন্দোলন গড়ে তুলতে কতিপয় দলের পরামর্শে ‘সম্মিলিত ইসলামী দলসমূহ’ নামে বিভিন্ন মারকায, মাকতাবের ওলামায়ে কেরাম দীনি কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।
# ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’: ২০১৩ সালের ৯ মার্চ হেফাজতে ইসলামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। ইতোপূর্বে ২০১০ সালে লালদীঘী ময়দানে হেফাজতে ইসলামের নামেই একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও পরবর্তীতে ২০১৩ সালের পূর্বে কোনো কর্মসূচি দেখা যায় না।
# শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ গঠন: কতিপয় বিপথগামী যুবক-যুবতি নির্ধারিত ইস্যু নিয়ে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে গণজাগরণ মঞ্চ গঠন করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে তারা নির্ধারিত এজেন্ডা বাদ দিয়ে নবুয়্যত, ওহি, মৌলিক ইবাদতসমূহ, হাশর-নশর, বেহেশত ও দোজখ প্রভৃতি ইসলামের মূল আকিদা-বিশ্বাসসমূহ বিদ্রুপের বস্তুতে পরিণত হয়। একপর্যায়ে ইসলাম বিরোধী ব্লগাররা অব্যাহতভাবে ইসলাম, ইসলামী বিধানবলি, মহানবী (সা.)-কে নিয়ে বিভিন্ন ব্যঙ্গ ও কটূক্তি করতে থাকে এবং বিভিন্ন ওয়েব পেইজের মাধ্যমে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা করতে থাকে। গণজাগরণ মঞ্চে তা অশ্লীল ভাষায় প্রচার করতে থাকে।
# ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সর্বদলীয় মতবিনিময় সভা রাজধানীর পীরজঙ্গী মাজার মাদরাসায় অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের (র.) সভাপতিত্বে আল্লামা আহমদ শফী (রহ.) উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। উক্ত সভা থেকেই ব্লগারদের বিরুদ্ধে কার্যকরী কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
# ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ব্লগার এবং গণজাগরণ মঞ্চের ইসলামবিরোধী কার্যক্রমের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। আল্লামা আহমদ শফীর কাছে ১২৮ পৃষ্ঠা এক ডকুমেন্টরি পৌঁছে দেওয়া হয়।
# শাহবাগীদের সাথে প্রচলিত রাজনৈতিক দলসমূহের একাত্মতা! শাহবাগীদের ইসলামবিরোধী ও দেশবিরোধী এসব জঘন্য কর্মকাণ্ডের পরও দেশের প্রায় সকল সরকারি-বেসরকারি লোকজন একমিনিট দাঁড়িয়ে নির্লজ্জ সমর্থন ব্যক্ত করেন। অপর দিকে প্রচলিত রাজনৈতিক দলসমূহের কতিপয় শীর্ষ নেতা এসকল উৎশৃংখল মহলের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে স্বাধীন দেশকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।
# উক্ত রাজনৈতিক দলসমূহের হাই কমান্ড থেকে ইসলামী সংগঠনসমূহকে বলা হয় ‘স্রোতের বিপরীতে চলা যাবে না।’ এরই প্রেক্ষিতে এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে সারা দেশের কওমী আলিয়ার আলেমদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করা হয়। ইসলামবিরোধী এসব কার্যক্রম ফুটিয়ে তোলার জন্য সারা দেশের বড় বড় কওমী মাদরাসায় অনুষ্ঠিত খতমে বুখারীর অনুষ্ঠানসমূহে ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে উম্মাহকে একত্রিত করার কাজ ত্বরান্বিত হয়।
# ১ মার্চ ও ৯ মার্চ ২০১৩ চট্টগ্রাম হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফীর (র.) ডাকে সর্বদলীয় ব্লগারদের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নির্ধারণের লক্ষে হাটহাজারী মাদরাসায় পরামর্শ সভা ও সর্বোবৃহৎ খতমে বোখারী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। উক্ত সভা থেকে ‘হেফাজতে ইসলামের’ আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ৯ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সারা দেশে শানে রেসালাত সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয়। সারা দেশের সম্মেলনসমূহ শেষে ৪ এপ্রিল রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পরবর্তীতে ৪ মে পর্যন্ত সারা দেশে পুনরায় গণসংযোগ ও শানে রেসালাত সম্মেলন ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন হয়। আল্লামা আহমদ শফী (র.) ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী (র.)সহ এদেশের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম সারা দেশের সম্মেলনসমূহে উপস্থিত হয়ে উম্মাহকে দেশের পক্ষে ও প্রিয় নবীর (সা.)-এর সম্মান, মুসলিম উম্মাহর স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের ডাক দেন এবং ৫ মে নবী (সা.)-এর সম্মানে হেফাজত ও নিছক ইসলামী ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকার সকল প্রবেশদ্বারে অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সারা দেশ থেকে ইসলামপ্রিয় ও দেশপ্রেমিক শান্তিপ্রিয় জনতার ঢল নামে ঢাকার সকল প্রবেশদ্বারে। ৪ মে রাত থেকেই সুশৃংঙ্খলভাবে চলতে থাকে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি। কিন্তু এক অজানা কারণে হঠাৎ করে অবরোধ কর্মসূচি বাদ দিয়ে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ঘোষণা আসে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে বিভিন্ন জেলা থেকে সফর করে আসা ক্লান্ত-শ্রান্ত রাত জাগা, খাওয়া নেই, নাওয়া নেই, নাঙা পায়ে তাওহীদি জনতার ঢল নামে শাপলা চত্বরে। এরপরের ঘটনা ইতিহাস। আজো অজানাই রয়ে গেলো অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশের সিদ্ধান্ত কারা নিলেন! কেন নিলেন!
# ৫ মে ঢাকার সকল প্রবেশদ্বার অবরোধ পরবর্তীতে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ ও শাপলা চত্বরে ট্র্যাজেডি এক ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন।
# উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদরে বিরুদ্ধে ওলামায়ে কেরামের বলিষ্ঠ ভূমিকা-ইসলামী অনুশাসন শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ও সহমর্মীতায় পরিপূর্ণ। যেকোনো ধরনের উগ্রতা, অজ্ঞতা, হঠকারিতা ফিতনা-ফাসাদ ও বিশৃংঙ্খলা ইসলামে একেবারেই নিষিদ্ধি ও হারাম ঘোষিত। এতদসত্ত্বেও ২০০৫ সালে কতিপয় বিপথগামী গোষ্ঠী ইসলামের শত্রুদের হাতের ক্রীড়নক হিসেবে এদেশে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতা শুরু করে। একযোগে সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা চালায়। সাথে সাথেই এদেশের সকল মুহাক্কিক ওলামায়ে কেরাম, পরিচিত প্রসিদ্ধ সকল ইসলামী দল ও ইসলামী নেতৃবৃন্দ কঠোর প্রতিবাদ শুরু করেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ কুফল বিষয়ক পুস্তিকা প্রকাশ, কুরআন-হাদীসের উদ্ধৃতি সম্বলিত পোস্টার, লিফলেট ব্যাপকহারে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়। এদেশের সকল মসজিদে মসজিদে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ড যে ইসলাম আদৌ সর্মথন করে না, সে ব্যাপারে ইমাম খতিবগণ ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন। বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের আহ্বানে রাজধানীর গুলিস্তানস্থ ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে চার সহস্রাধিক ইমাম-খতিবদের নিয়ে “সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে ইমামদের কাক্সিক্ষত ভূমিকা” শীর্ষক এক ঐতিহাসিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সেমিনারের পর থেকে সারা দেশের মসজিদে মসজিদে আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখ ও ইমাম-খতিবদের বিশেষ বয়ানে অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের জনগণ, তাওহীদি জনতা সন্ত্রাসবাদ বনাম ইসলাম এর আসল চেহারা সম্পর্কে সচেতন হতে সক্ষম হন এবং যারা ইসলামিক জিহাদকে অপব্যাখ্যা করে সন্ত্রাস এর সাথে গুলিয়ে ফেলার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল উক্ত সন্ত্রাসী-জঙ্গিগোষ্ঠী চিহ্নিত হয়ে যায় এবং তাদের উপযুক্ত শাস্তি তথা ফাঁসি কার্যকর করা হয়। যা দুনিয়ার যেকোনো দেশের সন্ত্রাসী-জঙ্গি দমনের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
অপরাধ ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে উলামায়ে কেরামের অবদান
সমাজের আনাচে-কানাচে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় মাদকের সর্বনাশা বিস্তার রোধে ওলামায়ে কেরাম মিছিল-মিটিং, মানববন্ধন, সেমিনার ও মতবিনিময় সভা করে জাতিকে এর কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য নানামুখী কর্মসূচি পালন করে। এছাড়াও দেশে যখন ধর্ষণ, নারী নির্যাতন নারীর প্রতি সহিংসতা ও শিশু নির্যাতন মহামারি আকার ধারণ করে, তখনই এদেশের সর্বশ্রেণির আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখগণ অভিন্ন ইস্যুতে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করে দেশ, জাতি ও উম্মাহকে উদ্ধার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। আয়োজন করে সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, মতবিনিময় সভা, মানববন্ধন ইত্যাদি।
কতিপয় সমস্যা চিহ্নিত করে প্রতিকার হওয়া জরুরি
১. ইসলামী বিধান রক্ষার ক্ষেত্রে আপসকামিতা একেবারেই পরিত্যাজ্য।
২. কোনো বিষয়ে মতান্তর হতে পারে তাই বলে মতান্তর আদৌ কাম্য নয়।
৩. “আল ইত্তিহাদ মা’য়াল ইখতিলাফ”-অর্থাৎ খুঁটিনাটি মাসায়ালাগত মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইসলামী বিভিন্ন ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।
৪. যুগ ও রাজনীতি সচেতন হতে হবে।
৫. তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হওয়া।
৬. সর্বাধুনিক প্রক্রিয়াসমূহ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকা ও ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া।
৭. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন ও ইলমি মাহারাত ও বিচক্ষণতা অর্জন করা।
৮. নিজেদের সামর্থ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা।
৯. গুণীজন, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবী মহলের সাথে সমন্বয় সাধন করা।
১০. পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি ও সমালোচনা বন্ধ করা।
১১. সামাজকি যোগাযোগ মাধ্যম, মিডিয়া ও গণমাধ্যমে সক্রিয় হওয়া।
১২. সর্বাবস্থায় চরমপন্থা, হটকারিতা ও উগ্রতা পরিহার করা।
১৩. খুঁটিনাটি মাসআলা-মাসায়েলসমূহ মুহাদ্দিস, মুফতি ও বিজ্ঞ আলেমদের পড়ার টেবিলেই রাখা।
উপসংহার : দেশ গঠন, দীনি চেতনা লালন, ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আযাদি আন্দোলনে মুজাদ্দিদে আলফে সানী পরবর্তীতে আল্লামা শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. আল্লামা শাহ আব্দুল আজীজ (রহ.) যে জিহাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.) যে জিহাদ পরিচালনা করেছিলেন, তা এ দেশের আলেম সমাজ অব্যাহত রেখেছেন তাদের বুকের রক্ত দিয়ে। স্বাধীনতা আন্দোলনে এ দেশের আলেম সমাজের অবদান অবিস্মরণীয় ও অতুলনীয়। ওলামায়ে কেরামের আন্দোলনের ফলেই উপমহাদেশ ব্রিটিশমুক্ত হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম হয়। ওলামায়ে কেরামের এসব আন্দোলনের ফলেই ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয় এবং ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত নামে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হয়। উক্ত ধারাবাহিক দেশ রক্ষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনেরই সুফল স্বরূপ ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে।
আল্লাহ তায়ালার ভাষায়-
ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ: অনেক নবী-রাসূলগণ আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করেছেন, জিহাদ করেছেন। তাঁরা ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রাণান্তকর প্রচষ্টা চালিয়েছেন। তাঁদের সাথেই ছিলেন অনেক অনুসারী, আল্লাহ ওয়ালা নেককার, মুত্তাকি ও ভালো একদল জনগোষ্ঠী। আর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে যেসব বিপদ-মুসবিত,পরীক্ষা, নির্যাতন-নিপীড়ন এসেছে তাতে তাঁরা আদৌ দুর্বল ও বিচলিত হননি এবং উক্ত জালিমগোষ্ঠী, শত্রুবাহিনী ও প্রতিপক্ষের কাছে মাথানত করেননি, আশ্রয়-প্রশ্রয় চাননি অথবা সমঝোতার পথ বেছে নেননি। মূলত: ইসলামের দুশমন, প্রতিপক্ষ ও বাতিলের এসকল নির্যাতন-নিপীড়ন সবরকারীদেরকেই আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন। আর সব সময়ই এ সকল সাচ্চা ঈমানদারদের কথা ছিল এই যে, হে আমাদের রব আপনি আমাদের সকল গুনাহ মাফ করুন, আমাদের ভুলসমূহ ও ত্রুটি মার্জনা করুন এবং আমাদের ইসলামের ওপর সাবেত অটল ও অবচিল রাখুন। সর্বোপরি জালিম কাফির গোষ্ঠীর ওপরে আমাদের সাহায্য করুন। (সূরা আলে ইমরান : ১৪৬-১৪৭)।
এ দেশের উলামায়ে কেরাম, পীর-মাশায়েখবৃন্দ দেশের, স্বাধীনতা রক্ষা ও দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতীতের ন্যায় সবসময়ই যেকোনো ত্যাগ ও কুরবানি করতে প্রস্তুত আছে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে ওলামায়ে কেরাম সবসময়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে বদ্ধপরিকর। (চলবে)

কবি সৈয়দ আলী আহসান
২৭ জুলাই ২০২৬ ১৬:০১