পলাশীর পটভূমিতে কয়েকটি বড় ঘটনা : আজকের শিক্ষা


১৯ জুন ২০২৫ ১২:২৬

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান
দক্ষিণ এশিয়া তথা হিমালয়ান উপমহাদেশে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ‘বণিক’ থেকে ‘শাসকে’ পরিণত হওয়ার ঘটনা আশ্চর্য কৌতূহলোদ্দীপক। সেই সাথে নিঃসন্দেহে শিক্ষাবহ।
পলাশী ও বখশার যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও এড়ানো যাবে না। বাংলায় পাল শাসনের অবসানে এ জনপদ থেকে বৌদ্ধ সভ্যতার গৌরবচিহ্নগুলো মুছে যায়। মুসলমানরা কুরআন ও সুন্নাহর অধিকারী না হলে তাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিশানাগুলো পলাশীর পর মুছে যাওয়ার কথা ছিল। কোম্পানি শাসনের একশ বছর আর ব্রিটিশ শাসনের নব্বই বছরে বাংলার মুসলমানরা নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত বিপুল সম্পদ হারিয়েছেন। তা ফিরে পাওয়া বেজায় কঠিন। এ কারণেও সময়ের নানা বাঁকে পলাশীর কার্যকারণ নিয়ে প্রশ্ন জাগবেই।
পলাশীর পটভূমি আলোচনায় ক্রুসেডের কথা আসে। এগারো-বারো-তেরো শতকে প্রাচ্যের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপের জাতীয়তাবাদী খ্রিস্টানরা লড়াই করে। তারা মুসলিম প্রভাব ঠেকাতে ধর্মযুদ্ধের নামে ‘ক্রস’-এর পতাকাতলে খ্রিস্টান শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে। সে অভিযান ঠেকাতে মুসলিম শক্তি সংঘবদ্ধ হয় ‘ক্রিসেন্ট’ বা বাঁকা চাঁদ খচিত নিশানের নিচে। ১০৯৫ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত তিনশ বছরের এ যুদ্ধকে খ্রিস্টান পাদ্রীরা ‘ক্রুসেড’ বলেন। ১০৯৫ থেকে ১১৪৪ সাল পর্যন্ত প্রথম পঞ্চাশ বছর খ্রিস্টানরা যুদ্ধে এগিয়ে থাকে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে খ্রিস্টানদের ভাগ্যে পরাজয় লেখা হয়।
ক্রুসেডের শেষ পর্যায়ে মধ্য-এশিয়ায় মোঙ্গলদের ধ্বংসকাণ্ড শুরু হয়। খ্রিস্টানরা চেঙ্গিস খানের বংশধর তাতারি বা মোঙ্গলদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উসকানি দেয়। মোঙ্গলরা ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে হানা দেয়। মামলুক সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুতমিশ (১২১০-৩৬) তাদের মোকাবিলা করেন। কিন্তু খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের প্ররোচনায় চেঙ্গিস খানের বংশধর হালাকু খানের বাহিনী ১২৫৬-৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংস করে। ১২৫৮ সালে আব্বাসীয় শাসকদের শক্তিকেন্দ্র ধ্বংস হয়। তাতারিরা বাগদাদে মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার ধ্বংস করে। তারা সিরিয়ায় দামেস্কের সদর দরোজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এর পর ইরাক থেকে মুসলমানদের কেন্দ্র প্রথমে মিশরে যায়। এরপর তুরস্কে স্থানান্তরিত হয়।
মধ্য-এশিয়ায় বিপর্যয়ের পর তখনকার বিশ্ব মানচিত্রে মুসলমানদের বড় শক্তিকেন্দ্র ছিল হিন্দুস্তান। ইউরোপের জাতীয়তাবাদীরা মুসলিম সভ্যতার এ শক্তিকেন্দ্রটির পতনের খোয়াব দেখছিল। সে সময় পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা ক্রুসেডীয় খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদের উগ্র অগ্রবর্তীরূপে প্রচণ্ড মুসলিমবৈরী মনোভাব নিয়ে দিল্লির লোদী সুলতানদের শাসনামলে (১৪৫১-১৫২৬ খ্রি.) ১৪৯৮ সালের ২০ মে ভারত মহাসাগরের মালাবার উপকূলে পৌঁছেন। সাগরের বাণিজ্যে তখন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল মুসলমানদের। তারা ভাস্কো ডা গামাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কালিকটের হিন্দু রাজা জামুরিন তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং তার প্রাসাদে আশ্রয় দেন। ভাস্কো ডা গামা ছয় মাস মালাবারে থাকার পর রাজা জামুরিনের চিঠি নিয়ে পর্তুগালে ফিরে যান। জামুরিন তার চিঠিতে ভারতীয় উপকূলে বাণিজ্য করতে পর্তুগিজ বণিকদের দাওয়াত দেন।
ভাস্কো ডা গামা ১৫০২ সালে আবার ভারতীয় উপকূলে ফিরে আসেন। তার পেছনে ১৫০৫ সালে পর্তুগিজ নাবিক ফ্রান্সিককো দ্য আলমেডিয়া দেড় হাজার লোক-লশকর নিয়ে ভারতীয় উপকূলে নোঙর করেন। এরপর ইউরোপের নানা দেশের বণিকরা এদেশে আসেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের ইংরেজ খ্রিস্টান সিভিলিয়ান কর্মকর্তা উইলিয়াম হান্টার নিজেই ইউরোপীয় এসব বণিকের ক্রুসেডীয় পটভূমিতে মুসলিমবিরোধী মনোভাবের কথা ১৮৬৮ সালে স্বীকার করেছেন। ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ এসব ইয়োরোপীয় কোম্পানির বণিকদের তিনি আমাদের কাছে ‘নব্য ক্রুসেডার’ হিসেবেই পরিচিত করেছেন। ‘এক হাতে বাইবেল আর অন্য হাতে তরবারি’ নিয়ে মূলত ক্রুসেডার হিসেবে এ ‘নব্য ক্রুসেডার’ খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদীরা ‘খ্রিস্টের রাজ্যবৃদ্ধি’র মনোভাব নিয়ে এখানে আসেন। তাদের পরিচয় হান্টার স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। তিনিই বলছেন, ‘They were not traders, but Knight-errant and Crusaders… Their national temper had been formed in their contest with the Moors (Muslims) at home. (ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকেরা নিছক ‘বণিক’ ছিলেন না; তারা আসলে ছিলেন ‘নাইট-এরেন্ট’ বা দুঃসাহসিক বীরব্রতী অভিযাত্রী ও ‘ক্রুসেডার’।… স্বভূমিতে মুর বা মুসলমানদের সাথে (স্বসৃষ্ট) দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে তাদের জাতীয় মানস বা মেজাজ গঠিত হয়েছিল। ( W.W. Hunter: A Brief History of the Indian People, 1868, p-167)। মেরিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারি অনুযায়ী, ‘knight-errant’ মানে: ‘A knight travelling in search of adventures in which to exhibit military skill, prowess, আর ‘Crusader’ মানে: ‘A person who participated in any of the military expeditions undertaken by Chirstian powers in the 11th, 12th and 13th centuries to win the Holy Land from the Muslims.’
এই ‘বণিক’রা তরবারি নিয়ে নৌপথে ডাকাতি ও সন্ত্রাস করেন। আর স্থলভূমিতে তারা বাইবেল প্রচারের জন্য গির্জা কায়েম করেন। মালাবার উপকূলে বণিক ও হজযাত্রীদের জাহাজগুলো পর্তুগিজ নৌদস্যুদের হামলার শিকার হয়। ১৫০৯ সালে আল ফানসো দ্য আল বুকার্ক মালাবার উপকূলে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে ১৫১০ সালে গোয়া দখল করেন। সেখানে তিনি প্রথম ইউরোপীয় কলোনি বা উপনিবেশ কায়েম করেন। ১৫১০ থেকে ১৫১৫ সালের মধ্যে পর্তুগিজরা কোচিন, দমন, দিউ দখল করেন। তাদের ‘তরবারি’ তখন হিন্দুস্তানের দক্ষিণ উপকূলে ছোট জায়গায় আটকে ছিল। তবে বাইবেল প্রচারের মিশন পৌঁছেছিল বিস্তীর্ণ এলাকায়। সে আমলেই নানা স্থানে তাদের গির্জা কায়েম হয়েছিল। খ্রিস্টানদের সাংস্কৃতিক প্রভাব শিগগিরই দিল্লির মোগল দরবারকেও অনেকটা গ্রাস করেছিল। মোগল সম্রাটের ছেলেদের শিক্ষার দায়িত্ব এ খ্রিস্টানদের হাতে ছেড়ে দেয়ার মতো ঘটনার ফলে সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসকদের বনভূমিও মুসলিম বৈরী ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের চাষাবাদের ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছিল।
সম্রাট আওরঙ্গজেব তার প্রায় আধাশতকের শাসনালে এ প্রভাব থেকে সমাজকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন। ১৭০৭ সালে তার ইন্তেকালের পঞ্চাশ বছরের মধ্যে দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। কেন্দ্র ও প্রদেশের নেতৃত্ব অনেটাই ছিল দিকভ্রষ্ট। শাসকদের ক্ষমতার চর্চা ছিল লক্ষ্যহীন। দিকনির্দেশনাহীন এ শাসনামলে প্রাসাদ চক্রান্ত প্রভাব বিস্তার করে। ইসলাম প্রচারকগণ মুসলিম শাসক ও জনগণের মাঝে শত শত বছর সেতুবন্ধরূপে কাজ করেছিলেন। পলাশীর আগের কিছু সময়ে সেই সূত্রটি ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ফলে শাসক ও জনগণের বিচ্ছিন্নতা বেড়েছিল। দেশের ঘটনাপ্রবাহের ব্যাপারে জনগণ তখন আগ্রহ হারিয়েছিলেন। রাজনীতিও হয়ে পড়েছিল রাজার কাজ। এসবের সাথে সম্পর্কহীন জনগণ পলাশী কিংবা বখশারে কী ঘটছে তা টেরও পাননি। রাজ-রাজড়াদের চিরাচরিত গোলযোগ ভেবেছেন। এ কারণে পলাশী রণাঙ্গনের পাশের জমির চাষিও দেশের আজাদীর এ সওদাবাজিকে মনে করেছেন রাজায় রাজায় যুদ্ধ।
বাংলার মুসলিম সালতানাতের প্রথম দু’শ বছর শেষে পনেরো শতকের শুরুতেও মুসলিম রাজত্ব ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছিল। দিনাজপুরের ভাতুরিয়ার জমিদার গণেশ তখন গিয়াস-উদ-দীন আযম শাহসহ চারজন সুলতানকে একের পর এক চক্রান্তের মাধ্যমে শহীদ করে বাঙলার মসনদে বসেন। তিনি রাজ্যময় অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে মুসলিম শাসনামলের বহু কল্যাণময় কীর্তি একে একে ধ্বংস করেন। তার হাতে শত শত আলেম শহীদ হন।
এ পরিস্থিতি অত্যন্ত সাহস ও প্রজ্ঞার সাথে মোকাবিলা করেন সে সময়ের বড় আলেম নূর-কুতুব-উল-আলম। তিনি বাবা শায়খ আলাউল হকের খানকার একজন সাধারণ খাদেম হিসেবে কাজ করে জনগণের বন্ধুতে পরিচিত হয়েছিলেন। তিনি দেশের আলেম সমাজ ও জনগণকে সাথে নিয়ে গণেশের প্রতিবিপ্লব মোকাবিলা করেন। ফলে বাংলায় মুসলিম শাসনের ধারাবাহিকতা ফিরে আসে।
গণেশ ও নূর কুতুবের ঘটনার প্রায় একশ বছর পর ষোল শতকের শুরুতে আলাউদ্দীন হুসাইন শাহের আমলে সাংস্কৃতিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুসলিম সালতানাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন শ্রীচৈতন্য। তিনি তখন সিলেটের গৌরাঙ্গ নামে পরিচিত ছিলেন। আলাউদ্দীন হুসাইন শাহের দরবারের দুই মন্ত্রী রূপ গোস্বামি ও সনাতন গোস্বামি ছিলেন গৌরাঙ্গের শিষ্য। বাঙলার আলেম সমাজ সে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করেন। সুলতানকেও সতর্ক করেন। তার দুই মন্ত্রী ও গৌরাঙ্গ পালিয়ে গিয়ে নবদ্বীপে আশ্রয় নেন। তখন থেকেই সিলেটের গোড়াঙ্গ পরিচিত হন নবদ্বীপের চৈতন্য নামে।
ষোলো শতকের শেষ ও সতেরো শতকের শুরুতে আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ মতবাদ জাতির সামনে ভয়াবহ ফিতনা হয়ে দেখা দেয়। জৌনপুর প্রদেশের কাজী বা প্রধান বিচারপতি মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াজদী এবং বাংলার প্রধান কাজী এ মতবাদের জন্য সম্রাট আকবরকে ‘ধর্মত্যাগী’ ঘোষণা করেন। এই ঐতিহাসিক ফতওয়া প্রতিরোধের শক্তি তৈরি করে। বাংলায় ঈসা খানের নেতৃত্বে বারো ভূইয়াগণ দিল্লির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও তা প্রেরণা যোগায়। মুজাদ্দিদে আলফেসানী নামে পরিচিত দিল্লির শায়খ আহমদ সরহিন্দী ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ মতবাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করেন। আকবরের মৃত্যুর পর সম্রাট জাহাঙ্গীর ব্যাপক গণজাগরণের মুখে নতি স্বীকার করে এ মতবাদ থেকে বের হয়ে আসেন। মুজাদ্দিদে আলফেসানীর একজন খলিফা ইসলাম খান চিশতিকে জাহাঙ্গীর বাংলায় সুবাদার নিযুক্ত করলে ঈসা খানের ছেলে মুসা খান তাকে মেনে নেন। তখন ঢাকাকে রাজধানী করে বাঙলায় মোগল শাসন কায়েম হয়।
১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেব ইন্তেকাল করেন। এর পঞ্চাশ বছরের মধ্যে দিল্লির শাসনকেন্দ্রে প্রদেশগুলোয় শাসন-সংস্কৃতির অবক্ষয় ও দুর্বলতা দেখা দেয়। আলেম সমাজের সাথে শাসকদের ঐতিহ্যগত সম্পর্কের সূত্রটি আকবরের সময় থেকেই দুর্বল হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের সময় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু তার ইন্তেকালের পর দুর্বল শাসকদের অসচেতনতার কারণে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। আলেমগণও তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ফলে পলাশীর আগের কয়েক দশকে মুরশিদাবাদ দরবারের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় আলেমদের কোনো ভূমিকা চহ্নিত করা যায় না।
আঠারো শতকে সংস্কৃত পাণ্ডিত্বের কেন্দ্রভূমি নবদ্বীপের আসমানে নতুন করে কালোমেঘ জমা হয়। ষোল শতকের চৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলনের অনুসরণে নতুন করে মুসলিমবিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হয়। এই পরিস্থিতি ছিল ভবিষ্যত বিপদের বড় আলামত। কিন্তু এ ব্যাপরে শাসক ও জনগণকে সচেতন করার ব্যাপারে বাংলায় তখন কোনো মুজাফ্ফর শামস বলখী বা কোনো নূর কুতুবের দেখা মেলে না। এই সমুদয় দিক থেকেই নওয়াব সিরাজ-উদ-দৌলা বা মীর কাসিম তাদের প্রতিরোধের ময়দানে নিসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন।
বাংলার বর্ণহিন্দু ‘অভিজাত’ গোষ্ঠীর কিছু লোক সব সময় মুসলিম রাজত্ব ধ্বংসের জন্য ষড়যন্ত্র করেছেন। এই শ্রেণির লোকেরা সমরনিপুণ ছিলেন না। তবে চক্রান্তের কূটকৌশলে তারা কুশলী ছিলেন। তারা মসনদে পরিবর্তন চেয়েছেন। তবে নিজেরা মসনদে বসার হিম্মত দেখাতে পারেননি। কোন না কোন ‘সহযোগী সরকার’কে ক্ষমতায় বসাতে তারা চেষ্টা করেছেন।
বর্ণহিন্দু বিশেষ শ্রেণির লোকেরা পলাশীর আগে আরো অন্তত তিনটি ‘সহযোগী সরকার’ নিয়ে খেলা করেছেন। তারা বাঙালি পাল রাজাদের দুর্বল করে কর্ণাটি সেনদের মসনদে বসাতে মদনপালের স্ত্রী ও বিজয়সেনের মাঝে বোঝাপড়া তৈরি করেন। বাঙালি পালদের বিরুদ্ধে ‘প্রাসাদ বিপ্লব’ ঘটিয়ে কর্ণাটি সেনদের তারা ক্ষমতায় বসান। কর্ণাটি সেনরা ছিলেন বর্ণহিন্দু বিশেষ শ্রেণিটির ‘প্রথম সহযোগী সরকার’। এ সরকার কায়েমের ফল হিসেবে বাংলায় জনজীবনে অন্তহীন দুর্ভোগ নামে। গৌরবময় বৌদ্ধ সভ্যতার পতন ও বিনাশ ঘটে।
বাঙালি বর্ণ হিন্দু ‘অভিজাত’গণ এর পর লক্ষণসেনের ছেলের সাথে মিলে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খিলজীকে সহায়তা করেন। ফলে বাংলায় তাদের ‘দ্বিতীয় সহযোগী সরকার’ কায়েম হয়। তৃতীয় ঘটনায় তারা তুর্কি মুসলিম শাসকদের হটাতে কাজ করে। তারা প্রতাপাদিত্যের আত্মীয় কচু রায় ও অন্যান্যের সাথে মিলে ‘তৃতীয় সহযোগী সরকার’ হিসেবে মোগলদের ক্ষমতায় বসাতে চক্রান্ত করেন। এই শ্রেণিটি এরপর নওয়াব সিরাজ-উদ-দৌলাকে হটিয়ে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দিয়ে ‘চতুর্থ সহযোগী সরকার’ গঠনে কাজ করেন। সামরিকভাবে দুর্বল ও ভীরু, ষড়যন্ত্রপটু এ বিশেষ শ্রেণিটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেছিল। এরপর তাদের শাসন টিকিয়ে রাখতেও ঢাল হিসেবে কাজ করেন। (ড. নজরুল ইসলাম (উদ্ধৃত): বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৪০২, পৃ. ১০৯) ।
হিন্দুস্তানে সাতশ বছরের মুসলিম শাসন শেষ হওয়ার পেছনে শ্রেণিবিশেষের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়ে মতানৈক্য নেই। বিমলানন্দ শামল লিখেছেন: বৌদ্ধযুগে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম যেভাবে নবউত্থানের সুযোগ খুঁজছিল, মুসলমান যুগেও সাধারণভাবে বর্ণহিন্দু মারাঠা ও রাজপুত্ররা মুসলিম শাসনের শেষ দেখতে চাইছিলেন। বাণিজ্য কুঠিগুলোকে কেন্দ্র করে এ বর্ণ হিন্দু শ্রেণিটির সাথে ইংরেজ বণিকদের জানাজানি ও বোঝাপড়ার সুযোগ তৈরি হয়। তারা পারস্পরিক উৎসাহ, প্ররোচনা ও প্রেরণায় মুসলিম শাসন খতম করতে মিলিতভাবে অগ্রসর হয়। এই হিন্দুরা ইংরেজ প্রভুত্বকে স্বাগত জানান। তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন আত্মস্থ করতেও ক্ষীপ্রতার সাথে প্রস্তুত হন। (বিমলানন্দ শাসমল: ভারত কী করে ভাগ হলো, হিন্দুস্তান বুক সার্ভিস, কলকাতা, ১৯৯১, পৃ. ১৬-১৭)। এম. এন. রায় দেখিয়েছেন কীভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ ইংরেজদের বাংলায় উপনিবেশ কায়েমে স্বাগত জানান। তিনি মন্তব্য করেন: ‘ÔIt is historical fact that a large section of Hindu community welcomed the advent of the English power.’ (M. N. Roy: India in Transition). রমেশচন্দ্র মজুমদারও বলেছেন, হিন্দুদের কোনো বিরোধিতা ছাড়াই ব্রিটিশ শক্তি এদেশে রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করতে পেরেছে। তিনি লিখেছেন, ‘British could winover political authority without any opposition from the Hindus.’ (Ramesh Chandra Majumder: British Paramountcy and Indian Renaissance. Part-II, P-4).
ইউরোপীয় খ্রিস্টান বণিকদের ক্রুসেডীয় জাতীয়তাবাদী মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আঠারো শতকের দিল্লি ও মুরশিদাবাদের শাসকগণ সজাগ ছিলেন বলে মনে হয় না। প্রতিবেশী সমাজের বিভিন্ন অংশের ইতিহাস-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যভিত্তিক মনোভাব ও মনস্তত্ব সম্পর্কেও তারা বেমালুম বেখবর ছিলেন বলেই মনে হয়। তাই জাতীয় প্রতিরক্ষার ব্যাপারে তারা এতটা অসতর্ক ও অবিবেচক হয়ে প্রতিটি পদক্ষেপে অমার্জনীয় দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন। আঠারো শতকে ইউরোপ আধুনিক যুদ্ধ কৌশলে অগ্রসর হয়ে নতুন সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। মুর্শিদাবাদের নওয়াবগণ তখন সতেরো শতকের ঢাকার সুবাদারদের তুলনায় সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে পড়েছিলেন। আলীবর্দী খান ইংরেজদের নৌশক্তির হুমকি সম্পর্কে সচেতন থেকেও মারাঠা বর্গীদের বিরামহীন হাঙ্গামা ও গোলযোগ মোকাবিলায় ব্যস্ততার কারণে এ বিষয়ে জরুরি কিছুই করতে পারেননি। নওয়াব সিরাজ-উদ-দৌলা পদাতিক শক্তিতে প্রবল থেকেও ইংরেজদের নৌশক্তিতে কাবু করতে পারেননি। আর ষড়যন্ত্র মোকাবিলার কূটকৌশলের মোকাবিলায় জনগণকেও তিনি কাছে পাননি।
পলাশীর পটভূমি এমনি বহু কারণে বহু দিনে সৃষ্টি হয়েছিল। আজকের সময়েও সে সকল বিষয় বিবেচনায় রেখে পথ চলার প্রয়োজন আদৌ ফুরিয়ে যায়নি।