অসম্পূর্ণ আলো
১৯ জুন ২০২৫ ১২:১৬
॥ নাসীমুল বারী ॥
-এই চল্ আলো না জ্বালিয়ে রাতে ছবি আঁকি।
-আলো না জ্বালিয়ে…!
একটু চমকে ভাবতে থাকে রাসেল। মারুফ ভাবছে কি না বোঝা যায়নি। হঠাৎই চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে- ইউরেকা…ইউরেকা…।
তাহসান চমকে বলে, ইউরেকা…! মানে কোন্ সূত্র আবিষ্কার করলি?
রাসেল ততোধিক চমক নিয়ে মারুফকে বলে, তুই তো এখনো ল্যাংটা হয়ে দৌড়াসনি। তা হলে সূত্র আবিষ্কার করলি ক্যামনে?
মারুফ নিজেকে সামেলে নিয়ে বলে, সবাই কি আর্কিমিডিস যে গোছল শেষ না করেই ল্যাংটা হয়ে ইউরেকা বলে দৌড়াবে?
-তবে!
দুজনেই বলে।
-এটা আধুনিক যুগ। ভদ্র যুগ। শিষ্টাচারের যুগ। আর্কিমিডিসের যুগও অবশ্য তেমন ছিল। অসভ্য, আদিম যুগ ছিল না তখন। আর্কিমিসডিস যে তখন ল্যাংটা হয়ে দৌড়িয়েছে- এটার সত্যতা কী? বাস্তবতা কতটুকু? আর্কিমিডিসের সমকালীন যুগের কে কোন্ বইতে তা লিখেছে, দেখাতে পারবি? একজন সম্মানিত বিজ্ঞানীকে হেয় করতে এ নোংরা ইতিহাস। যত্তসব বাজে ইতিহাস।
-বাহ্… বিগ ফিলসফার! সভ্য ফিলসফার! যাক ফিলসফার সাহেব কী আবিষ্কার করলেন আপনি ইউরেকা বলে!
-এই, ফিলোসোফাররা কি কিছু আবিষ্কার করে? মনে হয় কিচ্ছু জানিস না! শুন, আবিষ্কার না, এটা একটা মজার প্ল্যান- আলো ছাড়া আলোতে ছবি আঁকা!
মারুফের এ কথা শুনে তাহসান ও রাসেল দুজনেই থমকে যায়। একটু চুপ থাকে দুজনেই। তারপর শান্ত কণ্ঠে তাহসান বলে, জি ফিলসফার বলে ভুল হয়েছে। আচ্ছা শিল্পী সাহেব আলো ছাড়া আলোতে ছবি আঁকা আপনার এ প্ল্যানটা বুঝলাম না একটুও।
রাসেল মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, ঠিক আমিও…!
মারুফ বিজ্ঞের মতো বলে- আলো ছাড়া আলোতে ছবি আঁকব। এটা অতি স্বাভাবিক বিষয়। শুধু কথাটা আমার মতো করে বলেছি। তোরা কথাটা ধারণ করতে পারলি না, এই আর কী!
-দ্যাখ, প্যাঁচাবি না। আমরা এখানে জিলাপি বানাচ্ছি না। সহজ-সরলভাবে বলে ফেল কথাটা।
মারুফ গম্ভীরতা নিয়ে বলে, তোদের মাথা এতো ঢিলা; কিছুই বুঝিস না। আরে চাঁদনি রাতে শুধু চাঁদের আলোতে কোনো মাঠে ছবি আঁকব। দানবের ছবি আঁকব। ডাকাতের ছবি আঁকব। হীরক রাজার ছবি আঁকব। এসব এঁকে মানুষকে দেখাব, জানাব। ব্যাপারটা কী দাঁড়াল- আলোতে আলো ছাড়া ছবি আঁকা নয় কি? এটা ভাবতে ফিলসফি লাগে?
-তাই তো! দারুণ…। দারুণ…।
দুজনেই একসাথে বলে।
সে পরিকল্পনাতেই এখন এ রাতে মাঠে আসে ওরা।
ওদের বিশ্ববিদ্যালয় আর হল এলাকা ছাড়া আশপাশের এলাকা গ্রাম এলাকা। গ্রামবাসীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়েও চলাফেরা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে গ্রামেরই এক মাঠ। ছবি আঁকার যাবতীয় সরঞ্জাম, ফ্রেম ক্যানভাস, ক্যানভাস স্ট্যান্ড ইত্যাদি নিয়ে আসে ওরা। ছবি আঁকবে। রাতের এ সৌন্দর্যে রাতের আলোতে ভিন্ন এক অনূভূতিতে ছবি আঁকবে ওরা।
চাঁদটা মধ্যগগনে। স্নিগ্ধ আলোয় কী ফকফকা। বড় মাঠ। মাঠের চারিধার ফলজ আর কাঠের বড় বড় গাছে ঘেরা। বেশ চমৎকার। এ মাঠেরই মধ্যখানে ওরা এসে থামে। রাতের স্নিগ্ধতা অসম্ভব মোহনীয়। দাঁড়িয়ে চারদিক দেখে নেয়। ফ্ল্যাক্সে চা এনেছে। এনেছে কয়েক স্বাদের বিস্কুটও।
তৈল রংয়ে ছবি আঁকবে ওরা।
ফাইন আর্টসের শিক্ষার্থী ওরা তিন বন্ধু। নতুনত্বই ওদের নিত্য ভাবনা। মেধা আর মননের সৃষ্টিশীলতা ক্যানভাসে তুলে ধরে মনের অনুভব প্রকাশ করাটাই ওদের নেশা, পেশা, সখ- সবই। চাঁদনি রাতের এমন মোহনীয় পরিবেশে কখনো ছবি আঁকেনি। প্রকৃতির প্রকৃতিতে সৃষ্টিশীল মেধাকর্ম- সে এক ভিন্ন অনুভূতি।
মানুষ সৃষ্টির সেরা- সে কারণেই চিন্তায়, চেতনায় নতুন নতুন ভাবনার উদ্রেক হয়। সৃষ্টিকর্ম তৈরি হয়। আবিষ্কার হয়। সভ্যতার গতিশীলতাকে মানুষের সৃষ্টিশীল চেতনাই গুরুত্ববহ করে তোলে। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা নানা উপকরণকে নানা সৃষ্টিশীলতায় সভ্যতার কাছে, মানুষের কাছে তুলে ধরে মানুষই। মারুফ চিন্তায় তেমনই একজন। রাতের নিরালায় চাঁদের আলোয় ছবি আঁকার চিন্তাটা তেমনই এক চিন্তা।
ছবি আঁকার আগে গোল হয়ে বসে। এটা সেটা গল্প করে। চা খাওয়া শুরু করে। হঠাৎ শেয়ালের ডাক শোনে। মুহূর্তেই আরো কয়েকটিসহ একঝাঁক শেয়ালের ডাক। রোমাঞ্চকর এক অনুভূতিতে কাপ হাতে ওরা দাঁড়িয়ে এদিক-সেদিক দেখে। পুলকও অনুভব করছে ওরা। ওদের দেখেই কি শেয়ালরা একসাথে রা করে উঠেছে? ওদের ছবি আঁকতে দেবে না? কিন্তু ছবি তো ওদের আঁকতেই হবে।
চা খাওয়া শেষ হয়।
এবার ছবি আঁকার পালা। চাঁদের আলোয় ভালোই লাগছে। ছবি আঁকছে গল্প করছে। হঠাৎই খটকায় পড়ে মারুফ। কালো, সবুজ, গাঢ়নীল- তিনটা রংই দেখতে প্রায় একই রকম। মনে হয় সবগুলোই কালো। চট করে দেখলে পার্থক্য করা মুশকিল। ভালো করে দেখলে রংয়ের পার্থক্য চিহ্নিত করা যায়। আঁকতে গিয়ে মারুফ কয়েকবার হোঁচট খেয়েছে রং নিয়ে। একটু বিরক্ত হয়ে বলে, রংয়ের রং নিয়ে তো আমি গুলিয়ে যাচ্ছি। কোনটা কালো, কোনটা গাঢ়নীল, কোনটা সবুজ ঠাওর করতে সমস্যা হয়রে দোস্ত…।
-আমিও।
তাহসান বলে।
-হা হা হা…বিজ্ঞজনরা আঁকা-আঁকি চালিয়ে যান। চা চলবে…?
রাসেল মজা করে বলে।
মারুফ ওর দিকে তাকিয়ে, তুই…!
-মুড নেই এখন…।
-মুড নেই! মিস করলি মুডটা। এমন আলো-আঁধারিতে ছবি আঁকার মজায় মজলিনারে অভাগা…!
-যা…! চিল্লাইস না। আঁকব পরে। চা দিব তোদের?
তানিম বলে- দে।
‘ধ্যাৎ…!’
ভীষণ বিরক্তি নিয়ে বলে মারুফ। তারপরই আবার বলে, এই রাসেলরে নিয়ে প্যাঁচাল পারতে পারতে রং ভুল করে ফেলেছি। এমনিতেই রং বোঝায় কম, তার মধ্যে আবার প্যাঁচাল। বেখেয়ালে সবুজের জায়গায় গাঢ়নীল দিয়ে দিয়েছি। ক্যামন হলো এখন…! ধ্যাৎ ছবির অবজেক্টটাই নষ্ট হয়ে গেল।
অনুশোচনার সুরে রাসেল বলে, দুঃখিত। যাক তুই এ রংয়ের মধ্যেই ছবির মুড চেঞ্জ করে অন্য ডাইমেনসনে চলে যা।
-গেলাম না হয়। কিন্তু…!
তাহসান এগিয়ে এসে বলে, আমিও ভুল করে ফেলেছি। লালের জায়গায় কালো রং দিয়ে দিয়েছি।
-হে…হে…
হেসে দেয় রাসেল। হেসেই বলে, রাতের এ ন্যাচারাল আলোতে কেন এমন হলো জানিস?
-বটে।
দুজনেই বলে।
চাঁদের আলো সূর্যের আলোরই অংশ। সূর্যের তেজোদীপ্ত আলো। সে আলোতে আলোর সাত রংয়ের সুষম বিন্যাস থাকে। থাকে না কোনো বৈষম্য। তাই সূর্যের আলোতে সব রং-ই যথাযথ সত্তা নিয়ে আমাদের সামনে ভাসে। কিন্তু চাঁদ সূর্যের আলোর রাত্রিকালীন কোটার বিশেষ সুযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসে। তাই চাঁদের আলোতে সব রংয়ের বিন্যাস যথাযথ নেই। পরিমিতিতে কিছুটা বৈষম্য থাকে। যোগ্যতাহীন কোটার আলো তো, চাঁদের আলোতে লালের মাত্রাটা বেশি থাকে। লালের মাত্রা বেশি বলেই সবুজ আর গাঢ়নীলকে আরও গাঢ় করে কালোর কাছাকাছি নিয়ে যায়।
বিভ্রান্তি এভাবেই তৈরি হয়।
মারুফ ওদের বলে, শোন রং খেলোয়াড়রা। আমরা তো রংয়ের খেলাই খেলি। মনে রাখিস সূর্যের আলো রংয়ের প্রকৃত ঠিকানা। শুদ্ধ সত্তা। চাঁদের আলো তো সূর্য থেকে নেওয়া বিকল্প আলো। বিকল্প রংসত্তা। তাই রাতের চাঁদের আলোতে প্রকৃত রং খুঁজে পাবি না। রংয়ের বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।
প্রকৃত রং, সত্যিকারের রং সূর্যর আলোতেই।
আমাদেরকে সূর্যের আলোতেই প্রকৃত আলো খুঁজতে হবে। ভিন্ন আলো যতই স্নিগ্ধ, মনোমুগ্ধকর হোক, তা সত্যিকারের আলো নয়। অসম্পূর্ণ আলো।
চাঁদের স্নিগ্ধ ফকফকা আলোও অসম্পূর্ণ আলো, বুঝলি…?