২২ জুন আগামী অর্থবছরের বাজেট পাস হচ্ছে
১৯ জুন ২০২৫ ১০:৪৫
সোনার বাংলা রিপোর্ট : আগামী ২২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাস হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গত ১১ জুন সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান। অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাজেট সম্পর্কে যেসব মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া আসবে, সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখে ২২ জুন বাজেট পাস হবে।
উল্লেখ্য, গত ২ জুন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। যার আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এটি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রণীত ৫৪তম, তবে মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই দৈনন্দিন ও অপরিহার্য ব্যয় নির্বাহে একটি বাজেট পেশ করেছিল। সেটিসহ এটি দেশের ৫৫তম বাজেট।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও অর্থ উপদেষ্টার প্রথম বাজেট। এটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির পর অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। প্রস্তাবিত এ বাজেট চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের (৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার হ্রাস পাওয়ার ঘটনা। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬২ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট : ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করলেও, জাতীয় সংসদ নেই। রাজনৈতিক দল পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত গঠনমূলক সমালোচনা এবং অনলাইনে পাঠানো জনগণের মতামত পর্যালোচনা করে উপদেষ্টা পরিষদে বাজেট পাস করার পর ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি অভিযোগ করেছে, ‘রাজনৈতিক দল ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়ায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি সব ক্ষেত্রে এ সরকারকে সহযোগিতা করছে। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য স্থাপনের মাধ্যমে বাজেট প্রণয়ন করবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিতে পারতো। বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, তরুণ প্রতিনিধিরাও অংশ নিতে পারতো। তাহলে বাজেট একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হতো। দেশের বিভিন্ন কণ্ঠের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারতো এ বাজেট। কিন্তু সেই সুযোগটি কাজে লাগানো হয়নি বা করা হয়নি। বাজেট প্রণয়ন একমুখী, অংশগ্রহণহীন ও গতানুগতিক ধারার হতো না, বরং নতুন চিন্তার প্রতিফলন ঘটতো।’
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের ওপর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম বাজেটে নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রত্যয় আশানুরূপভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদেশে পাচারকৃত অর্থ এবং অন্যান্য অবৈধ অর্থ উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনার স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা প্রস্তাবিত বাজেটে লক্ষ করা যায়নি, যা জাতিকে হতাশ করবে। এছাড়া কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ অপচেষ্টা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে এর কাছাকাছিও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এবারও রাজস্ব আদায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বাজেটে বিদেশনির্ভরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে বিবৃতিতে জামায়াত বলেছে, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেট বাড়িয়ে ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশ আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে। বিভিন্ন ধরনের পরোক্ষ কর বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যোগ দেখা গেলেও প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধির তেমন উদ্যোগ বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। সুতার আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করায় আরএমজি সেক্টরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কালো টাকা বিতর্ক : টিআইবির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে কালো টাকার পরিমাণ জিডিপির ১০ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো টাকার পরিমাণ যদি ৪০ শতাংশও হয়, তাহলে এর পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১০ থেকে ১২ লাখ কোটি টাকার মতো। সেখানে এনবিআর তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে সব মিলিয়ে অপ্রদর্শিত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে, যা কালো টাকার মোট পরিমাণের নগণ্য একটি অংশ। এ সামান্য পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের জন্য নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়াকে সমালোচনা করেছেন তারা।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ১০ মাসের মাথায় কালো টাকা সাদা করার সুবিধা পুনর্বহাল করায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারি নীতির এ আকস্মিক ইউটার্নে হতবাক হয়েছেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও সাধারণ করদাতারা। এ ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সমাজ ও অর্থনীতিবিদদের কড়া প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এ সিদ্ধান্তকে দুর্নীতিবান্ধব এবং কর ন্যায়বিচারের পরিপন্থি বলে আখ্যা দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখা ‘জুলাই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন হয়েছিল বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে। অথচ বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রেখে সেই প্রত্যয়কেই নস্যাৎ করা হয়েছে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকার দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের অঙ্গীকার উপেক্ষা করে রিয়েল এস্টেট লবির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।’ সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অনুপার্জিত আয় রাষ্ট্র দ্বারা বৈধ হতে পারে না। অথচ এ সুযোগ সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার সৃষ্টি করছে এবং ভবিষ্যৎ দুর্নীতিকে উৎসাহ দিচ্ছে। যদি সরকার সত্যিই দুর্নীতি প্রতিরোধে আন্তরিক হয়, তাহলে কালো টাকা সাদা করার মতো সুবিধা কোনোভাবেই দেওয়া যায় না। এটা জনআস্থার পরিপন্থি এবং আইনবহির্ভূত আয়ের প্রতি একটি নৈতিক বৈধতা তৈরি করে।’
সরকারের ব্যাখ্যা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, কোনো কারণে কারো অপ্রদর্শিত টাকা থাকলে সেগুলো প্রদর্শনের একটা বিধান রাখা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় তা পুনর্বিবেচনা করবে সরকার। এটি করে ফেলে আমরা খুব ভালো জিনিস করে ফেলেছি এমনটি নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই প্রশ্নের উত্তরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ‘গত বছর (আগস্ট ২০২৪) থেকে কালো টাকা বৈধ করার বিশেষ সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এবারও তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কেউ যদি অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়ে কোনো ফ্ল্যাট বা জমি কেনেন, তাহলে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কিছুটা বাড়তি হারে কর দিয়ে সেটি বৈধ করতে পারবেন। একইসঙ্গে যদি কেউ নিজের নামে থাকা জমিতে অপ্রদর্শিত অর্থে বাড়ি নির্মাণ করেন, তাহলে তাকে দ্বিগুণ হারে কর দিতে হবে। এ অতিরিক্ত কর পরিশোধ করলেই তার বিনিয়োগ আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এটা মূলত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়। বরং নির্দিষ্ট খাতে অতিরিক্ত কর দিয়ে যেকোনো অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের একটা পথ রাখা হয়েছে।’ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই দেশের জাতীয় বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২২ বার এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যদিও কালো টাকার পরিমাণের তুলনায় যৎসামান্য অংশই কর দিয়ে সাদা করা হয়। অনেকের বক্তব্য ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এটি ঠিক নয়। কালো টাকা পেলে বাজেট সহায়তার জন্য আইএমএফ’র কাছে যেতে হতো না। টাকা পাচারকারীরা অনেক বুদ্ধিমান। তারা বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে এসব টাকা পাচার করেছে। ইতোমধ্যে ১২টি মামলায় শনাক্ত হয়েছে, আরও একটু সময় লাগবে এসব অর্থ ফেরত আনতে। প্রস্তাবিত বাজেটে কথার ফুলঝুরি নেই, এটি জনবান্ধব-ব্যবসাবান্ধব বাজেট বলে উল্লেখ করেন। দেশ খাদের কিনারায় চলে গেছে, আর্থিক অবস্থা খুবই ভঙ্গুর, এমন ক্রান্তিকালে আমরা দেশের দায়িত্ব নিয়েছি, ক্ষমতা গ্রহণ করিনি। সংস্কার কার্যক্রম চলবে, এটি চলমান।’
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা এক বাজেটে সম্ভব হবে না। এর জন্য কয়েকটি বাজেটের প্রয়োজন। আমরা শুরুটা করে যাচ্ছি।