মনোমুগ্ধকর সাতক্ষীরার রূপসী ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:৪৬
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: দর্শণার্থীদের বিনোদন নিশ্চিত করতে নানা প্রস্তুতিতে নতুন রূপে সাজানো হয়েছে দেবহাটা উপজেলা তথা সাতক্ষীরার অন্যতম নান্দনিক ও মনোমুগ্ধকর পিকনিক স্পট রূপসী ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। ইছামতি নদীর কোল ঘেঁষে এ পর্যটন কেন্দ্রটি ঈদ উপলক্ষে অপরূপ সাজে সাজানো হয়েছে। উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত নদী ইছামতির কোল ঘেঁষে মিনি সুন্দরবন নামে পরিচিত পর্যটন কেন্দ্রটি দর্শণার্থীদের কাছে পূর্ব থেকেই বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ম্যানগ্রোভের মধ্যে কেওড়া, গোল, বাইন, নিম, সুন্দরী, হরকচাসহ নানা প্রজাতির গাছ-গাছালির মধ্যে হরেক রকমের হাঁস, মুরগি, খরগোশ, বানর, পাখি এনে দিয়েছে এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ। নদী ভ্রমণের জন্য আছে নৌকা। স্থলে বেড়ানোর জন্য আছে ঘোড়া। বাচ্চাদের আনন্দ উপভোগ করার জন্য ট্রেন, দেখার জন্য আছে বিভিন্ন কার্টুন বা ফেস্টুন আর তার সাথে আছে বাগান ভর্তি ফুল।
জেলা সদর হতে প্রায় ৩০কিলোমিটার দূরে ইছামতি নদীর তীরে শিবনগর মৌজায় অবস্থিত এ বনটি। এটি উপজেলার ‘রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র’ নামে পরিচিত। ইছামতি নদীর তীরে ২০১২ পরবর্তী তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট গোলাম মোস্তফা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম তরিকুল ইসলামের উদ্যোগে সরকারি খাস জমিতে সুন্দরবনের আদলে গড়ে তোলা হয় এ রুপসী ম্যানগ্রোভকে। ১৮৬৭ সালে টাউনশ্রীপুর গ্রামটিই এক সময় পৌরসভা ছিল। এখানে বাস করতো প্রায় ১৮জন জমিদার ও বিখ্যাত ব্যক্তি। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর টাউনশ্রীপুর পৌরসভা বিলুপ্ত হয়। জমিদারিত্বের অবসানের পর বিখ্যাত ব্যক্তিরা কোলকাতা বা অন্যান্য বড় শহরগুলোয় চলে যান। ফলে টাউনশ্রীপুরের সেই শ্রী আর ধরে রাখা যায়নি। তবে সেইসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাসস্থান ও অন্যান্য স্থাপনাগুলো এখনো এ এলাকার প্রত্নতত্ব নিদর্শন হিসেবে থেকে গেছে। এসব কারণে শুধু ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট নয় টাউনশ্রীপুর এলাকা ঘিরে রয়েছে পর্যটনের ব্যাপক সুযোগ।
এবারের ঈদে একটু লম্বা ছুটি থাকার কারণে মিনি সুন্দরবন দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন বিনোদনপ্রেমী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। কেউ আসছেন পরিবার-পরিজনসহ আবার কেউ আসছেন বন্ধু বা প্রিয় কোনো মানুষকে সাথে নিয়ে। এখানে আছে গেস্ট হাউস, নামাজের জায়গা। মহিলাদের নামাজের জন্য আলাদা স্থান আছে। দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে লোকজনের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। ঈদের দিন থেকে দুপুরের পরপরই এ বিনোদন কেন্দ্রে শতশত মানুষের ভিড় পড়ে যাচ্ছে। এখানে বিভিন্ন জাতের কবুতর, লাভ বার্ড, কোকাটেল, পাজেরিকা, টিয়া, কালিম পাখি, তোতাপাখি, ইমু পাখিসহ বহু পাখির আবাসস্থল হয়ে উঠেছে এ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। উপজেলার সদর ইউনিয়নের শীবনগর এলাকায় তিন নদীর মোহনায় ১৫০ বিঘা জমিতে অবস্থিত এ বনের বুক চিরে প্রায় ৩০বিঘা জমিতে রয়েছে অনামিকা লেক, পিকনিক স্পট, শিশুপার্ক, কনফারেন্স রুম, পাকা ট্রেইল, সেলফি পয়েন্ট, প্যাডেল চালিত বোট। ইছামতির পাড়ে বসে সূর্যাস্ত উপভোগের দারুণ সুযোগও এখানে পাচ্ছেন আগত মানুষেরা। সুপেয় পানির ব্যবস্থা ছাড়াও নতুনভাবে যোগ হচ্ছে রাত্রিযাপনের জন্য কটেজ। নানামুখি বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি করা বনটিতে বর্তমানে এ এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, বনটি ইছামতি নদীর পাড়ে হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। এপাশে বাংলাদেশ, অপরপাশে ভারত আর মাঝখানে নদী। জায়গাটি অত্যন্ত নিরিবিলি হওয়ায় সব বয়সী মানুষের কাছে প্রিয়। তাছাড়া বিভিন্ন দিবস বা ছুটির দিনে বেশি দূরে না গিয়ে দেবহাটায় এসে সুন্দরবন ভ্রমণেরও স্বাদ পান তারা। নারী ও শিশুদের জন্য স্থানটি খুবই নিরাপদ বলেও দাবি দর্শণার্থীদের। এ স্পটটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া ছুটি ও বিভিন্ন উৎসব ঘিরে দিনে ৩-৪ হাজার দর্শণার্থীদের পদাচারণা ঘটে এ বিনোদন কেন্দ্রে। দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আসাদুজ্জামান জেলার মধ্যে এ রুপসী ম্যানগ্রোভটি সকল শ্রেণির মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ও অন্যরকম অনুভূতির জায়গা উল্লেখ করে জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় এ বিনোদন কেন্দ্রটির নানারকম রূপ দেয়া হচ্ছে এবং আরো অনেক কাজ চলছে। তিনি বলেন, সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় প্রশাসনের বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখানে এসে যেমন বিমোহিত হন ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষও এখানে এসে প্রশান্তি পান।
সবদিক বিবেচনা করেই ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে এ বিনোদন কেন্দ্রটির আকর্ষণ অন্যরকম বলে ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান জানান। বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার সোহেল বলেন, বিনোদন কেন্দ্রে এসে যাতে কেউ কোনো প্রকার হয়রানি না হয় সে ব্যাপারে তাদের স্টাফরা নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শণার্থীদের বিনোদনের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।