জুলাই বিপ্লব এবং চাওয়া-পাওয়া
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:৩৪
॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
নির্মমতার পাষণ্ড হাতিয়ার আর
অস্ত্রবিহীন জনতার অসম যুদ্ধে
বিজয় এসেছে আজ মহীয়ান গরিয়ান হয়ে।
রাত কেটেছে বন-বাদাড়ে,
মুক্তি পাগল জনতার দলে
মামলা, হামলা, গুম, খুনের মগের মুল্লুকে।
গায়েবি মামলার ঢলে,
আয়নাঘরের অন্ধ প্রকোষ্ঠে,
নিরাপরাধ নেতৃত্ব সব ফাঁসির কন্ডেমসেলে।
পৈশাচিক নির্যাতনের নির্মম ইতিহাস
সমগ্র বিশ্ব স্তম্ভিত হলো,
জেনে সব অকল্পনীয় উপন্যাস।
▪ ২৪-এর জুলাই বিপ্লব একটি জাতীয় চেতনার নাম। ২৪-এর জুলাই বিপ্লব স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপামর ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণের নাম। ৩৬ জুলাইয়ের স্বাধীনতা নতুন বলয়ে, নতুন অক্ষরে লিখা। ’৭১ দেখেনি যে নতুন প্রজন্ম, রক্তের বিনিময়ে দেখেছে ২৪-এর বিজয়গাঁথা। শত শত আবু সাঈদ আর মুগ্ধের আত্মদান, ২৪-এর স্বাধীনতায় পেয়েছে এক নতুন প্রাণ।
▪ বিষ্ময়কর গণ অভ্যুত্থান
৩৬ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন, বিশ্বের বুকে একটি বিষ্ময়কর গণ অভ্যুত্থানের নাম। ৩৬ জুলাই কোটি কোটি মানুষের বুকে নূতন আশার সঞ্চার করেছে। ২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রক্তাক্ত গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিগত ১৬ বছরের স্বৈরাচার, ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। ঐতিহাসিক এ বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পরে স্বৈরাচারের কঠোর অবস্থানের কারণে এ আন্দোলন আরো প্রবল থেকে প্রবল হয়ে ২৪ এর ৫ আগস্ট চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। দু’হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যার পরও ক্ষমতার মসনদে টিকতে না পেরে জনতার রোষে অবশেষে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ইতিহাসের অত্যাচারী ক্ষমতালোভী লেডি হিটলার।
▪ বিপ্লব ও তার লক্ষ্য
সাধারণত বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে একটি মৌলিক সামাজিক পরিবর্তন, যা তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত সময়ে ঘটে এবং জনগণ চলমান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জেগে ওঠে। জুলাই বিপ্লব শব্দটা শুনলেই যেন চোখে ভেসে ওঠে ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লবসহ, পারস্য বিপ্লবের চিত্র।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রথম ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান দেখেছিল ১৯৯০ সালে, স্বৈরাচার এরশাদ পতনের সময় এবং প্রায় ৩৫ বছর পর ২০২৪-এর জুলাইয়ে এসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হলো। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘বাংলা ব্লকেড’ শব্দটির সাথে জনমনের একাত্মতাকে, স্বৈরাচার সরকারের দমিয়ে রাখার প্রয়াসে, নতুন ট্যাগ লাগানোর উদ্দেশ্যে রাজাকারের নাতি পুতি বলে সম্বোধন করায় তীব্র প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে দেশের ছাত্রসমাজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী হলে থালা বাসনের বাদ্যযন্ত্রের হুংকারে হাজারও তরুণ সুর মিলাল- ‘তুমি কে, আমি কে রাজাকার, রাজাকার কে বলেছে, কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।
জেগে উঠলো জেনারেশন জেন জেড : ২৪-এর গণ অভ্যুত্থানে ‘অনলাইনে আসক্ত জেনারেশন’ হিসেবে গালি খাওয়া তরুণ ছাত্র সমাজকে যেভাবে জেগে উঠতে দেখেছি, সেটা ছিল সত্যিই বিস্ময়কর!
শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে যাওয়া শিক্ষকদের ভূমিকাও ছিল অনবদ্য। তাদের মাঝে অনেকেই হয়ে উঠেছিলেন এ আন্দোলনের এক একজন রোল মডেল। কারাবন্দি ছাত্রের জন্য শিক্ষক সমাজের উদ্বিগ্নতা, ছাত্র নেতাদের মুক্তির জন্য বলিষ্ঠ কণ্ঠে কথা বলা, পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, আহত ছাত্রদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যাওয়া, পুলিশের হাতে বন্দি ছেলের পিঠ চাপড়ে মায়ের সাহস দেয়া প্রভাবিত করেছিল শিক্ষার্থীসহ গোটা ছাত্রসমাজকে।
শিক্ষক সমাজের একজন অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৮ জুলাইয়ে লিখেছিলেন-
“স্টপ জেনোসাইড!
ওরা সন্তান আপনার,
আমার, আমাদের,
গোটা বাংলাদেশের!”
আহত হলো স্বপ্নরা-
বুলেটের আঘাতে উড়ে গেল কত প্রাণ
কত চোখ…
কত স্বপ্ন…॥
পুলিশি বুলেটে আবু সাঈদের অটল বিশ্বাসে ভরা বুকটা যখন ঝাঁঝরা হয়ে যায়, পানি লাগবে পানি বলে বন্ধুদের পানি খাওয়ানোরত অবস্থায় উচ্ছল উদীয়মান যুবক মুগ্ধের গুলিবিদ্ধ হওয়া, পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর থেকে এমআইএসটির মেধাবী ছাত্র ইয়ামিনকে ফেলে দেয়ার দৃশ্য এ আন্দোলনে নতুন গতির সঞ্চার করে। শুরু হয় বাংলা বসন্ত। অত্যাচারী শাসক তখন পতঙ্গের মতো পতন আগুনের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ঠুরতা, অপেশাদারি আচরণ ও মন্ত্রী-আমলাদের বিতর্কিত ন্যারেটিভ পাল্টে দিলো আন্দোলনের গতিধারা। বিক্ষোভে ফুঁসে উঠল সারা দেশের হাজারো তরুণ। ভাষা এবং শব্দের ব্যবহারে মতাদর্শের প্রতিফলন কীভাবে ঘটে এবং তার প্রতিবাদ কেমন হওয়া উচিত, জেন-জেড/জেন জি তার প্রতিক্রিয়া দেখালো ব্যতিক্রম ধারায়। যার ফলে অকুতোভয় ছাত্র-জনতা মৃত্যুকে আলিঙ্গনের নেশায় ঝাঁপিয়ে পড়লো একে একে।
রাজপথ রক্তে প্লাবিত হলো। স্লোগান উঠে ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’ ।
আসছে ফাগুন আমরা হবো দ্বিগুণ : প্রবল আন্দোলনের মুখে কোটা আন্দোলনের দাবি এসে দাঁড়িয়েছিল ৯ দফায়। রাষ্ট্রের সর্বত্র অরাজকতা, অব্যবস্থাপনা, দমন-পীড়ন, গুমের রাজনীতি দংশন করল রিকশাচালক, চা বিক্রেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্পীসমাজ, শিক্ষকসমাজসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে। এ গণ অভ্যুত্থানকে আর কারফিউ দিয়েও থামানো যায়নি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল একে একে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্কুল-কলেজের অগণিত শিক্ষার্থী। দেয়াল ছেয়ে যায় প্রতিবাদী গ্রাফিতি এবং দেয়াল লিখনে। প্রতিবাদের ভাষা গায়ে ফুটল শব্দের চাবুক হয়ে।
একটা দেশের রাজা চুপ অথচ রাজপথ কথা বলে। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না।’
‘আসছে ফাগুন আমরা হবো দ্বিগুণ!’
“ব্লাডি জুলাই, ‘আমি মেট্রোরেল হতে চেয়েছিলাম,
আল্লাহ আমাকে ছাত্র বানাল!”
‘তুই মোর ছাওয়াক চাকরি না দিবু না দে, কিন্তু মারলু ক্যানে?’
এভাবে আন্দোলনকারীদের ডাকে গণমিছিল ও দ্রোহযাত্রায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজপথ।
‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময় তার’- কবির ডাকে যৌবনের গান গেয়ে জীবন বাজি রেখে সাড়া দিয়েছিল বলেই অপ্রত্যাশিতভাবে এবং অনেকটা নাটকীয়ভাবেই স্বৈরাচারের গ্র্যান্ড মাদার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
দুনিয়ার কোনো বিপ্লব বা গণ অভ্যুত্থান আইন-কানুন বা সংবিধান মেনে হয়নি : বিগত ১০০ বছরের বিশ্ব রাজনীতি ও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এ সময়ের মধ্যে বিশ্বে বড় ধরনের প্রায় ৪০০ আন্দোলন হয়েছে। অনেক দেশেই আন্দোলন সফল হয়েছে। আবার অনেক আন্দোলনে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। দুনিয়ার কোনো বিপ্লব বা গণ অভ্যুত্থান আইন-কানুন, নিয়ম বা সংবিধান মেনে হয় নি। বাংলাদেশের ৫ আগস্টের পরিবর্তনও তাই। বিপ্লব বা গণ অভ্যুত্থানের পরের ঘটনাপ্রবাহও নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম মেনে চলে না। বাংলাদেশে গণ অভ্যুত্থান ঘটেছে ছাত্রদের নেতৃত্বে নানা মত ও পথের রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণে। মাফিয়ার গড মাদার পালিয়ে যাওয়ার পর গণ অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নানা আলোচনা ও তৎপরতার মধ্য দিয়েই একটি সমঝোতা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই প্রফেসর ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে।
সরকার এখন নানা চাপে : বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করা এ সরকার এখন নানা চাপে। বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমালোচনা ও দাবি উপস্থাপনের সুযোগ পেয়ে সকল পক্ষই যেন নানান দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তাঘাট অবরোধ করে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। এক্ষেত্রে আগে ঘরের আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে সরকারকে। শেখ সাদি বলেছেন, ‘একটি সাজানো বাগান ধ্বংসে একটি বানরই যথেষ্ট।’ এক গ্লাস দুধ এক ফোঁটা চনাই নষ্ট করে দিতে পারে। তেমনি দুই একজন ব্যক্তির অযোগ্যতা, ষড়যন্ত্র এবং উচ্চাভিলাষ একটি সরকারকে করতে পারে বিতর্কিত, বিপদগ্রস্ত। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রেও যেন এ কথাটি প্রযোজ্য।
একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির দিকে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে দেশ
বিপ্লবের পর প্রায় ১০ মাস অতিবাহিত হতে চললো। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির দিকে ক্রমশ ধাবিত হচ্ছে দেশ। নির্বাচনি রোড ম্যাপ ঘোষণায় বিলম্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে রাজনৈতিক দলের একটি বিশেষ অংশের সন্দেহ ও আস্থাহীনতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহ নিজেদের মাঝেও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। পরস্পর পরস্পরকে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলছে যা ২৪-এর বিপ্লবের চেতনা বিরোধী।
আবার দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব দ্রুততার সাথে একের পর এক পট পরিবর্তন হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন এ জন্যে যে, দেশটাকে স্ট্যাবল হতে না দেবার জন্য ভেতরে থাকা পতিত স্বৈরাচারের দোসররা সবসময়ই সক্রিয় আছে।
প্রয়োজন দায়িত্বশীল আচরণ : রাজনৈতিক দল, সেনাবাহিনী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, আন্তর্জাতিক অঙ্গন অর্থাৎ এ চারটি সেক্টরের মাঝে সমন্বিতভাবে কাজের ঘাটতি হলে দেশ একটি অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হতে পারে। তাই সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ ও বাস্তবতার নিরিখেই সমাধানমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ। দেশের এ সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বদলীয় বৈঠকের মাধমে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে আসতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। এ জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ঐকমত্য কমিশন মৌলিক বিষয়ে সকল দলের মাঝে ঐক্য গঠনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত বীর যোদ্ধারা : সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যাদের আত্মত্যাগ-তিতিক্ষা, রক্তপাত ও অঙ্গহানির মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লব সফল হয়েছিল তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে সীমাহীন উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শহীদ পরিবারগুলো আর্থিকভাবে কিছুটা সহায়তা পেলেও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে জুলাই অভ্যুত্থানে আহতরা। সম্প্রতি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চোখ হারানো ৪ তরুণের বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা তারই করুণ প্রকাশ। ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে শঙ্কায় দিন পার করছে তারা। পুনর্বাসনের পদক্ষেপ না নেওয়ায় রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন চার তরুণের মতো আহত ৫৫ জনও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। তাদের অভিযোগ- দীর্ঘ ৯ মাসেও উন্নত চিকিৎসা বা পুনর্বাসন বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জুলাই অভ্যুত্থানে আহত-নিহত জাতীয় বীরদের প্রতি সরকারি উদ্যোগে জরুরি মানসিক সাপোর্ট, চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ঐক্যের শক্তিকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র : ষড়যন্ত্র করে জুলাই ঐক্যের শক্তিকে বিভক্ত করে কিছু মহল রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা করছে। কিন্তু সেটা হতে দেয়া যাবে না। আবার অনেকেই দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। এর ফলেই তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ কারণেই রাজনৈতিক বিভক্তি বাড়ছে। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মৌলিক সংস্কার বাদ দিয়ে এ মুহূর্তে নারী সংস্কার কমিশন কেন গঠন করা হলো? এটার কি প্রয়োজন ছিল? এ ধরনের সরকারি পদক্ষেপে জনতার মাঝে নেগেটিভ ইম্প্রেশন গ্রো করছে। সুপারিশকৃত এ প্রতিবেদনগুলো জনগণকে বিভক্ত ও দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, পরিকল্পিতভাবে বর্তমানে জনপ্রশাসনেও বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে। যা নিয়ন্ত্রণে এ সরকারকে কৌশলী হতে হবে।
মনে রাখতে হবে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্যই ছিল স্বৈরাচার উৎখাত করা এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করা। এ জন্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কার। সরকার সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১১ টি কমিশন গঠন করেছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ব্যতীত নির্বাচনের জন্য তড়িঘড়ি করলে বিপ্লবের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। প্রকৃত অর্থে- এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিৎ অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়ন করা। আপাতত নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার- এ তিন কাজেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম।
ঐক্যশক্তির মাধমেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে পারে
‘জুলাই ঐক্য’-এর পক্ষে বৃহত্তর গণজাগরণ গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই কেবল সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে পারে। আমাদের আত্মপর্যালোচনা করতে হবে- ৪৭, ৫২, ৭১, ৯০ পেরিয়ে ২৪-এর আন্দোলনে এসে ইতিহাস কি ভুলে যাচ্ছি। নাকি ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছি। রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষুদ্র স্বার্থ, দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক অবিশ্বাস গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে বার বার ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। জুলাই ঐক্যের শক্তিকে বিভক্ত করে পতিত স্বৈরাচার অন্যের কাঁধে ভর করে আবারো সংগঠিত হবার চেষ্টা চালাচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের জন্য যেন এ ঐক্য বিনষ্ট না হয়। এখন প্রয়োজন যেকোনো পরিস্থিতিতে সর্বমহলের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংযম অবলম্বনপূর্বক পারস্পরিক মজবুত সম্পর্কের মাধ্যমে সহাবস্থান। রাজনৈতিক দলগুলো নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। প্রত্যেকটি দলই চায় সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা।
রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রথম পর্বের আলোচনা শেষে এখন দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার মধ্যদিয়ে জুলাই মাসের মধ্যেই একটি জাতীয় সনদ তৈরি করা সম্ভব হবে। এ জাতীয় সনদ তৈরি হবার পরই দেশে একটা নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই : যেকোনো সংকটকালে সকল ধরনের বিভেদ অতিক্রম করে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই আমাদের জাতীয় চরিত্র। আমরা অতীতেও যেকোনো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছি, এখনো হচ্ছি। গণঅভ্যুত্থানের সব দল, ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং দেশপ্রেমিক জনগণ মিলিতভাবে সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হবে। প্রয়োজন এখন ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে ঐকমত্যের রাজনীতি। যেটা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে সহজ করবে। আশাকরি, অন্তর্বর্তী সরকার সাহসের সাথে জনগণ প্রদত্ত দায়িত্বকে আমানত হিসেবে গ্রহণ করে শক্ত হাতে যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা দূর করবেন। সরকার পরিচালনায় জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের যাতে দূরত্ব না বাড়ে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এই সরকার সফল কি ব্যর্থ তার চূড়ান্ত মাপকাঠি হলো নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। সরকার যদি সেটি করতে পারে তাহলে এ সরকারকে ইতিহাসে সবাই সম্মান করবে। আর যদি সেটা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে বিপ্লবী জনগণ আবারও হয়তো রাজপথে নেমে আসবে।
ইতিহাসের এক যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ৩৬ জুলাই শুধু বাংলাদেশের জন্য নয় সমগ্র বিশ্বের কাছে রোলমডেল। স্বৈরাচারী শাসন, দুর্নীতি আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত এর অবিস্মরণীয় বিপ্লব। তাই জুলাই বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে এমন যেকোনো কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। জাতীয় চেতনায় জুলাইকে ধারণ করা ও চিরভাস্বর করে রাখার দায়িত্ব দল-মত নির্বিশেষে সকলের। ৩৬ জুলাই নতুন প্রজন্মের জন্য গর্ব ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ঐক্যবদ্ধ তারুণ্যের শক্তি যে, সমুদ্রে তরঙ্গের গতিকেও রুখে দিতে পারে, ৩৬ জুলাই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।