সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইন্টারনেটের ভূমিকা
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:২৮
॥ সাইদুর রহমান ॥
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসছে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রভাব উল্লেখ করার মতো। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো মাধ্যমগুলোর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিনই সেখানে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবহারকারী। আসলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এখন মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সব দেশেই একই চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতিতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব বেশি লক্ষণীয়। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতি তাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। তারা এখন এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছে।
আইডেনটিটি বা আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে বাল্যকাল থেকে। আর এ আত্মপরিচয় গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে পরিবার। একটি ছেলে বা মেয়ে যখন নতুন পরিস্থিতি বা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় তখন তার পারিবারিক শিক্ষাটিই প্রথম কাজে লাগে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনেক অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েই অনেক সময় ধর্মের প্রয়োজনীয়তা ইস্যুতে দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায় এবং অসহায়ত্ব বোধ করে। পরিবার থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না পাওয়ার আগেই ধর্মবিরোধী চক্রের কবলে পড়লে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতে শিশু-কিশোরদের নিয়ন্ত্রণহীন প্রবেশ এ আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজ ও সংস্কৃতিতে ইন্টারনেটের ভূমিকা অপরিহার্য ।
আসলে যেকোনো প্রযুক্তিরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক থাকে। উদ্দেশ্যের ওপরই এর ফলাফল নির্ভর করে। একজন ব্যক্তি বা একটি রাষ্ট্র ইচ্ছে করলে তথ্য ও যোগাযোগের এ প্রযুক্তিকে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যও ব্যবহার করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো, এ মাধ্যমে যেকোনো তথ্য বা উপাদান প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন ব্যবহারকারী সে সম্পর্কে পছন্দ-অপছন্দের কথা জানাতে পারে, নিজস্ব মন্তব্য, অভিমত তাৎক্ষণিক প্রকাশ করতে পারে। কর্তৃপক্ষের সেগুলো অপছন্দ হলে ঝেড়ে ফেলতে পারে নিজস্ব গণ্ডি থেকে। এছাড়া মূলধারার গণমাধ্যমের ওপরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রভাব বিস্তার করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ প্রভাবই অনেক ক্ষেত্রে তরুণ সমাজের জন্য ক্ষতি বয়ে আনছে এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এসব কারণে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিকে সহজেই মেনে নেয়ার প্রবণতা গড়ে উঠছে। যদিও তা সব সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষের জন্য কখনোই উপযোগী হতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সহযোগিতায় মুসলিম সমাজেও পাশ্চাত্যের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার স্বীকৃতি নেই। একজন মুসলমান তা মেনে নিতে পারে না। মুসলমানের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি কাজের জন্য পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। এর ফলে পাশ্চাত্যের অনেক কিছুই মুসলিম দেশগুলোর জনগণের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর প্রভাবে এখন অনেক অপসংস্কৃতিই মুসলিম যুবসমাজের কাছে সহনীয় হয়ে যাচ্ছে। বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের মতো নানা পশ্চিমা আচার-আচরণ ইসলামী সংস্কৃতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শুধু তাই নয়, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার ও খাদ্যাভাসে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধও কমে যাচ্ছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের সেকেলে মনে করার প্রবণতা বাড়ছে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে অনেকেই স্বাভাবিক হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগৎ।
পাশ্চাত্যের ধনী পরিবারগুলোতে হয়তো ভোগবাদ আপাতত বড় ধরনের কোনো সমস্যা সৃষ্টি করছে না। কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখুন, একটি দরিদ্র পরিবারে যদি ভোগবাদী সংস্কৃতি প্রবেশ করে তাহলে এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ভোগবাদী সংস্কৃতির কবলে পড়ে এ ধরনের পরিবারের সদস্যরা নানা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বেমানান বিজাতীয় সংস্কৃতি কখনোই মানুষের মনে সুখ আনতে পারে না। এর ফলে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই কেবল বেড়ে যায়। শুধু মুসলিম দেশ নয়, সব অনুন্নত দেশই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে ক্রমেই নিজস্ব সংস্কৃতি হারাচ্ছে।
ভার্চুয়াল জগৎকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এই অবস্থায় এ জগৎকে মেনে নিয়েই নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও স্বার্থকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করতে হবে। বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা নতুন প্রজন্মের সামনে যুক্তি দিয়ে তুলে ধরতে হবে। ইন্টারনেটেও নিজস্ব সংস্কৃতির প্রভাব বাড়াতে হবে। মুসলিম সংস্কৃতি যে প্রতিটি মানুষের জন্যই চিরস্থায়ী কল্যাণ নিশ্চিত করে, তা তুলে ধরতে হবে। ইসলামবিরোধী সংস্কৃতি মোকাবিলার জন্য নিজেদের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।