খেলাফতের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:১৮
॥ মুফতী মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম ॥
আল্লাহ তায়ালার অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে মানুষ সেরা সৃষ্টি। তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে খলিফা করে। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম আ. প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে চাই। (সূরা আল বাকারা : ৩০)। হযরত দাউদ আ.-কে বলেছেন, হে দাউদ! আমি তোমাকে (এই) জমিনে (আমার) খলিফা বানালাম। অতএব তুমি মানুষদের মাঝে ন্যায়বিচার করো। (সূরা সোয়াদ : ২৬)। শেষ নবীর উম্মত প্রসঙ্গে বলেছেন, তিনি সেই মহান সত্তা, যিনি তোমাদের এ জমিনে তাঁর খলিফা বানিয়েছেন এবং তোমাদের একজনকে অন্যজনের ওপর মর্যাদা দান করেছেন। (সূরা আল আন’আম : ১৬৫)। আরো এরশাদ করেন, অতঃপর পূর্ববর্তী জাতি-সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার পর আমি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত বানিয়েছি এবং পৃথিবীর খেলাফত তোমাদের হাতে অর্পণ করেছি। (সূরা ইউনুস : ১৪)। হযরত নূহ আ.-এর প্রসঙ্গে এরশাদ করেন, আর আমি তাদের (পূর্ববর্তীদের) স্থলাভিষিক্ত করেছি। আর তাদেরকে ডুবিয়ে মেরেছি যারা আমার কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। (সূরা ইউনুস : ৭৩)। সব মানুষকে লক্ষ করে বলেন, তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে স্বীয় প্রতিনিধি করেছেন। (সূরা ফাতির : ৩৮)। হযরত হুদ আ.-এর জাতিকে লক্ষ করে বলেন, আর তোমরা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে (আদ জাতিকে) নূহ জাতির (ধ্বংসের) পর (পৃথিবীর) খলিফা করেছেন। (সূরা আল আরাফ : ৬৯)। হযরত সালেহ আ.-এর সম্প্রদায়কে লক্ষ করে বলেন, আর স্মরণ কর, যখন তোমাদেরকে আদ জাতির পরে প্রতিনিধি করেছেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে ঠিকানা দিয়েছেন। (সূরা আল আরাফ : ৭৪)। সমগ্র মানবজাতিকে লক্ষ করে বলেন, কে নিঃসহায়ের ডাকে সাড়া দেন, যখন সে তাকে এবং কষ্ট দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে পূর্ববর্তীদের স্থলাভিষিক্ত করেন। (সূরা আল নমল : ৬২)।
খেলাফতের পরিচিতি : খেলাফত আরবী শব্দ, বাবে এর মাসদার। মূল অক্ষর। অর্থ-প্রতিনিধিত্ব, উত্তরাধিকার, শাসন, কর্তৃত্ব ইত্যাদি। পরিভাষায় খেলাফত বলা হয়, রাষ্ট্র কিংবা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূলের আইনগত কর্তৃত্ব স্বীকার করে, সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহর বলে মেনে নিয়ে কুরআন ও হাদীসে ঘোষিত আইন ও বিধানের চৌহদ্দির মধ্যে সীমিত থেকে আসল শাসক আল্লাহ তায়ালার অধীনে প্রতিনিধি হওয়া বা প্রতিনিধিত্ব গ্রহণ করা। থেকে গঠিত হয়েছে। এর বহুবচন অর্থ প্রতিনিধি উত্তরাধিকারী, স্থলাভিষিক্ত। মোদ্দাকথা- আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সা.-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করার প্রতিনিধিত্বই খেলাফত।
খলিফা হওয়ার শর্ত : খলিফা হওয়ার জন্য নিম্নবর্ণিত-
নেতৃত্বের গুণাবলি আবশ্যক :
১। মুসলমান হওয়া : আল্লাহ এরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো আল্লাহর, আনুগত্য করো রাসূলের এবং সে লোকদের যারা তোমাদের মধ্যে পরিচালক সামগ্রিক দায়িত্ব সম্পন্ন। (আল কুরআন)। এক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের পরপরই যার আনুগত্য অবশ্যম্ভাবী, তাকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। আরো এরশাদ করেন, আল্লাহ্ তায়ালা মুমিন লোকদের ওপর কাফির লোকদের কর্তৃত্ব করার কোনো পথই রাখেননি। (সূরা নিসা : ১৪১)।
২। পুরুষ হওয়া : যেমন আল্লাহর বাণী, পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল। এ কারণে যে, আল্লাহ তাদের মধ্যে একজনকে অপরের ওপর অর্থাৎ পুরুষকে নারীর ওপর গুণগত বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। (সূরা নিসা : ৩৪)।
রাসূল সা. বলেছেন, যে জাতি তাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নারীর ওপর ন্যস্ত করেছে, সে জাতি কখনো কল্যাণ লাভ বা সফলকাম হতে পারবে না। (বুখারী)।
৩। সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন ও পূর্ণবয়স্ক হওয়া : যেমন আল্লাহর বাণী, তোমাদের ধন-সম্পদ যাকে আল্লাহ তোমাদের অস্তিত্ব রক্ষার উপকরণ বানিয়েছেন তা নির্বোধ লোকদের হাতে সোপর্দ করো না। (সূরা নিসা : ৫)।
৪। জ্ঞানের অধিকারী এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য হওয়া : আল্লাহর বাণী, তিনি (নবী) বলেন, আল্লাহ তায়ালা শাসনকার্যের জন্য তোমাদের ওপর তাকে (তালুতকে) নিযুক্ত করেছেন এবং তাকে বিদ্যা-বুদ্ধি ও দৈহিক শক্তিতে সমৃদ্ধি দান করেছেন। (সূরা বাকারা : ২৪৭)।
৫। আল্লাহভীরু ও নেককার হওয়া : যেমন আল্লাহর বাণী, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক মুত্তাকি-পরহেজগার। (সূরা হুজুরাত : ১৩)।
ইসলামী রাষ্ট্রের আইনের উৎস
এরূপ রাষ্ট্রের শাসন হবে খেলাফত বা আল্লাহ্ তায়ালারই প্রতিনিধিত্বশীল শাসন। ফলে ইচ্ছামাফিক কোনো কাজ কিংবা আইন প্রণয়ন করার অধিকার সরকারের নেই। বরং সরকার আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত আইনের প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকর করবে। এ মূলনীতি অনুযায়ী ইসলামী আইনের উৎস হল চারটি।
১। আল্লাহর কিতাব বা আল-কুরআন : ইসলামের সংবিধিবদ্ধ আইনের প্রথম প্রধান উৎস হলো আল-কুরআন। যেমন আল্লাহর বাণী, হে নবী! আমরা এ কিতাব (কুরআন) পূর্ণ সত্যতা সহকারে তোমার প্রতি নাজিল করেছি। যেন আল্লাহ তোমাকে যে সত্য পথ দেখায়েছেন সে অনুসারে লোকদের মধ্যে যথাযথ বিচার-ফয়সালা করতে পার। (সূরা নিসা : ১০৫)।
২। সুন্নাহ : ইসলামের সংবিধিবদ্ধ আইনের দ্বিতীয় উৎস হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ বা কর্মনীতি । যেমন আল্লাহর বাণী, রাসূল সা. তোমাদেরকে যা কিছু দেন, তা তোমরা গ্রহণ কর। আর যা থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখেন তা হতে তোমরা বিরত থাকো। (সূরা হাশর : ৭)।
রাসূল সা. বলেছেন, আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না, তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাহ্ । (মুয়াত্তা, কানযুল উম্মাল)।
৩। ইজমা বা সম্মিলিত অভিমত : ইসলামী সংবিধিবদ্ধ আইনের তৃতীয় উৎস হচ্ছে ইজমা অর্থাৎ কোন বিষয়ের ওপর সমকালীন শরিয়তের অভিজ্ঞ মুজতাহিদগণের মতৈক্য বা একমত হওয়া।
রাসূল (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা আমার উম্মতকে কখনো গোমরাহির ওপর একমত বা একত্রিত করবেন না এবং জামায়াত (ঐকমত্যের) ওপর আল্লাহর রহমত অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে। যে ব্যক্তি দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে সে অবশেষে জাহান্নামে যাবে। (তিরমিযী)।
৪। কিয়াস বা ইজতেহাদী সিদ্ধান্ত : ইসলামের সংবিধিবদ্ধ আইনের চতুর্থ উৎস হচ্ছে কিয়াস বা ইজতেহাদী সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ মুসলিম উম্মাহর মুজতাহিদগণের সে সব ফয়সালা যা তারা (কুরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে) নিজেদের জ্ঞান- বুদ্ধি ও দূরদৃষ্টির আলোকে বিভিন্ন নীতিগত সমস্যার সমাধান পেশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা. যখন হযরত মুআজকে ইয়ামেনের গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে মু’আজ! তুমি কিসের সাহায্যে বিচার ফয়সালা করবে? তিনি উত্তরে বললেন আল্লাহর কিতাবের সাহায্যে। রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, যদি এতে না পাও? তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহর রাসূলের (অর্থাৎ আপনার) সুন্নাহর সাহায্যে। রাসূলুল্লাহ সা. আবার প্রশ্ন করলে, তাতেও যদি না পাও? তিনি উত্তরে বললেন, তাহলে (কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে) আমি ইজতেহাদ করে ফয়সালা করতে চেষ্টা করবো। তার উত্তর শুনে রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহর শোকর তিনি যে তাঁর রাসূলের প্রতিনিধি মু’আজকে এমন সিদ্ধান্তে আসার তাওফীক দান করেন, যাতে তাঁর রাসূল খুশী হন। (মুসনাদে আহমদ)।
ইসলামী সরকারের দায়িত্ব ও জবাবদিহি
ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা কিংবা রাষ্ট্র প্রধান এবং সরকারের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ জন সাধারণের খাদেম বা সেবক। তারা নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে জনসাধারণের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেন। দায়িত্ব ও কাজ কর্মের ব্যাপারে তাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহর বাণী, তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞাবাদ করা হবে। (সূরা নহল : ৯৩)।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জাতীয় কর্মকর্তাগণ হলো জাতির সেবক। মহানবী সা. বলেন, সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই (বিভিন্ন স্তর ভেদে) কর্মকর্তা ও দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় নেতা বা কার্যনির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী যিনি তিনিও বড় দায়িত্বশীল । তাঁকেও তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (বুখারী)।
আরো বলেন, যিনি মুসলিম জনসাধারণের কাজ কর্মের প্রধান দায়িত্বশীল, কোনো শাসক যদি তাদের সাথে প্রতারণা ও খেয়ানতকারী অবস্থায় মারা যান, তাহলে তার জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করে দেবেন। (বুখারী)।
আরো বলেন, মুসলিম রাষ্ট্রের কোনো পদাধিকারী শাসক যিনি নিজের পদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রাণপণ চেষ্টা সাধনা করেন না, নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন না; তবে তিনি কখনো জান্নাতে যাবেন না।
ইসলামী সরকারের প্রথম কাজ
এ রাষ্ট্রের সরকারের প্রারম্ভিক কাজ হবে চারটি। যেমন আল্লাহর বাণী, এরা সেই লোক তাদেরকে আমি যদি জমিনে ক্ষমতা দান করি, তাহলে তারা (১) নামায কায়েম করবে। (২) জাকাত ব্যবস্থা চালু করবে (৩) সৎ কাজের নির্দেশ দেবে। (৪) অন্যায় কাজে নিষেধ করবে। (সূরা হজ : ৪১)। উল্লেখিত চারটি কাজই হলো রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, আর্থিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, পুরা জাতিকে গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করা এবং ভাঙন ও নাশকতামূলক কাজ থেকে বিরত রাখার একমাত্র সঠিক পন্থা ।
নাগরিকদের অধিকার
ইসলামী রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনায় বসবাসকারী মুসলিম অমুসলিম সকল নাগরিকদের নিম্নোল্লিখিত মৌলিক অধিকারগুলো সরকার যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে বদ্ধ পরিকর।
১। জানমালের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ : যেমন আল্লাহর বাণী, যে জীবনকে আল্লাহ হারাম করেছেন, হক ব্যতীত (বিনাবিচারে) তাকে হত্যা করো না। (সূরা বনি ইসরাঈল : ৩৩)।
অন্যত্র এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অপর কোন ব্যক্তিকে হত্যার অপরাধ অথবা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া হত্যা করল, সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি তাকে বাঁচিয়ে রাখল সে যেন গোটা মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রাখলো। (সূরা মায়িদা : ৩২)।
আরো এরশাদ করেন, তোমরা নিজেদের সম্পদ পরস্পর অবৈধ পন্থায় ভক্ষণ করো না। (সূরা বাকারা : ১৮৮, নিসা-২৯)।
রাসূল সা. তাঁর বিদায় হজের সুপ্রসিদ্ধ ভাষণে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা তথা রাষ্ট্রনীতির মূলনীতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, “তোমাদের একের জান ও মাল তোমাদের অপরের প্রতি (সকল দিনে, সকল মাসে, সর্বস্থানে) হারাম, যেভাবে এই দিনে, এই মাসে, এই শহরে আজ হারাম।” (মুসলিম)।
২। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান : অভাবী ও বঞ্চিত ব্যক্তিদের জীবন ধারণের অত্যাবশকীয় দ্রব্যসামগ্রী অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। আল্লাহ তায়ালার বাণী, আর তাদের সম্পদে সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতের হক (অধিকার) রয়েছে । (সূরা জারিয়াত : ১৯)।
রাসূল সা. হযরত মু’আজকে ইয়ামন দের্শে গভর্নর করে পাঠানোর সময় যে সব ফরমান দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তন্মধ্যে অর্থনৈতিক ফরমান ছিল- তাদেরকে জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তাদের ওপর তাদের ধন সম্পত্তিতে জাকাত ফরজ করেছেন। ঐ জাকাত ধনীদের কাছ থেকে সংগৃহীত হয়ে দরিদ্রের মাঝে বিতরণ করা হবে (বুখারী)
৩। মান-সম্মান সংরক্ষণের অধিকার : মান-সম্মান বা ইজ্জত-আব্রু মানুষের স্বাভাবিক মৌলিক অধিকার। কারো উপস্থিতে কিংবা অনুপস্থিতে তাকে কোনোরকমের ঠাট্টা-বিদ্রƒপ অথবা ব্যঙ্গ করা যাবে না। যেমন আল্লাহর বাণীÑ একদল অপর দলকে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করতে পারবে না। (সূরা হুজুরাত : ১১)। যেমন আল্লাহর বাণী, একজন আর একজনের ওপর দোষারোপ করো না, একে অপরকে নিকৃষ্ট উপাধিতে ডেকো না। (সূরা হুজুরাত : ১১)। যেমন আল্লাহর বাণী, একে অপরের দোষ চর্চা করবে না। (সূরা হুজুরাত : ১১)।
৪। জুলুমের প্রতিবাদ : কারো ওপর কোনো রকম জুলম হয়ে থাকলে মজলুম জালেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারবে। মানুষ খারাপ কথা বলুক তা আল্লাহ পছন্দ করেন না। তবে কারো প্রতি জুলুম করা হয়ে থাকলে ভিন্ন কথা। অর্থাৎ জালেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারবে। (সূরা নিসা : ১৪৮)।
৫। ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ : ইনসাফ ব্যতীত ও বিনা প্রমাণে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না । যেমন আল্লাহর বাণী, এমন কোন ব্যাপারে পেছনে পড়ো না, যে সম্পর্কে তোমার জানা নেই। (সূরা বনী ইসরাইল : ৩৬)।
৬। সরকারি কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অধিকার : মহিলাদের ব্যাপারে ইসলামের মূলনীতি হলো সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে নারী-পুরুষ সমান, নৈতিক মানের বিচারেও সমান এবং আখিরাতের কর্মফলেও সমান। যেমন আল্লাহর বাণী, আমি তোমাদের মধ্যে কারো কাজকে বিনষ্ট করে দেব না, পুরুষ হোক কিংবা নারী, তোমরা সবাই সমজাতের লোক। (সূরা আলে ইমরান : ১৯৫)।
যেমন আল্লাহর বাণী, যে ব্যক্তিই সৎকাজ করবে, সে পরুষ হোক বা নারী, যদি সে মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমরা দুনিয়ায় পবিত্র জীবনযাপন করাবো, আর (আখিরাতেও) এ ধরনের লোকদের তাদের উত্তম কাজ অনুপাতে প্রতিফল দান করবো। (সূরা নহল : ৯৭)।
পুরুষ এবং নারী মান-মর্যাদার দিক দিয়ে এক সমান, কিন্তু উভয়ের কর্মক্ষেত্র এক নয়, নারীর জন্য ঘরোয়া পরিবেশই সবচেয়ে উত্তম এবং নিরাপদ। যেমন আল্লাহর বাণী, নিজেদের ঘরে অবস্থান কর এবং পূর্বতন জাহেীি যুগের মতো সাজগোজ দেখায়ে বেড়াইও না। (সূরা আহযাব : ৩৩)।
৭। অমুসলিম নাগরিকদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার : ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিম ও অমুসলিমদের নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নাগরিক অধিকার সকলে সমানভাবেই ভোগ করবে। আর এটাই হলো এ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসূল সা. বলেছেন, …হ্যাঁ যে ব্যক্তি অমুসলিম নাগরিকদের ওপর জুলম-অত্যাচার করে অথবা তাদের ওপর অবিচার বা তাদের অধিকার হরণ করে কিংবা তার শক্তির বাইরে তার ওপর কেনো বোঝা চাপায় অথবা তার সম্মতি ব্যতীত জোরপূর্বক কোনো জিনিস তার নিকট থেকে ছিনিয়ে নেয়, তবে আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে ঐ অমুসলিম নাগরিকের পক্ষে উকিল হয়ে দাঁড়াবো। (আবু দাউদ)।
অনুরূপভাবে পরধর্ম সহিষ্ণুতার ব্যাপারেও এ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো নিম্নরূপ
আল্লাহকে বাদ দিয়ে যারা অন্যকে উপাস্য বানিয়ে ডাকে, তোমরা তাদেরকে গালি দিও না। (সূরা আন-আম : ১০)। অর্থাৎ আল-কুরআনের শিক্ষা হলো বিভিন্ন ধর্ম ও আকিদা বিশ্বাসের ওপর যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করা যায়, যৌক্তিক পন্থায় সমালোচনা বা মতভেদ ব্যক্ত করা যায় ঠিক, তবে কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এমনভাবে অভদ্র ভাষায় কোনো কথা বলা মোটেও সমীচীন নয়। অপরদিকে দীন গ্রহণ বা মুসলমান হবার জন্য কাউকে বাধ্য করাও ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, দীনের ব্যাপারে কোনো জোর জবরদস্তি নেই। (সূরা বাকারা : ২৫৬)। আল্লাহর বাণী, তুমি কি লোকদের মুমিন হবার জন্য বাধ্য করবে? (সূরা ইউনুস : ৯৯)। অর্থাৎ মুসলমান হবার জন্য কাউকে বাধ্য করা যাবে না।
৮। শ্রমিক কর্মচারীর অধিকার সংরক্ষণ : আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রয়োজনেই মানুষকে মর্যাদাগত পার্থক্য নিরূপণ করে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং যার দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরের তুলনায় যতো বেশি, তার প্রাপ্য এবং অধিকারও ততো বেশি। এ মূল্যবোধের ভিত্তিতে এই রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মধ্যে কর্মচারী ও শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণ করে। যেমন আল্লাহর বাণী, আমরাই তাদের পার্থিব জীবনের জীবনযাপন সামগ্রী তাদের মধ্যে বণ্টন করেছি, আর তাদের মধ্যে কিছু লোককে অপর কিছু লোকের ওপর আমরাই প্রাধান্য দিয়েছি, যেন এরা একে অপর হতে কাজ নিতে পারে। (সূরা যুখরুফ : ৩২)। প্রত্যেকের মান-মর্যাদা নিরূপীত হবে তার কাজের ওপর। (সূরা আহকাফ : ১৯)।
ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পন্থা
ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা ইসলামী পদ্ধতির মাধ্যমেই সম্ভব। পাশ্চাত্য হতে আমদানি করা শিরকী পদ্ধতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হলো দুটি। যেমন ১. দাওয়াত ও ২. জিহাদ। কেননা পৃথিবীতে প্রেরিত সকল নবী ও রাসূল তাদের সুদীর্ঘ জীবনে শুধুমাত্র দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করে গেছেন। পরিধিগত তারতম্যের ধারাবাহিকতায় প্রত্যেক নবী ও রাসূলের দাওয়াতি মিশন ছিল এক ও অভিন্ন। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যেকোনো বিপ্লব সংঘটিত করতে হলে উদ্দিষ্ট বিষয়ের জোরালো প্রচার-প্রচারণা চালানের কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া নীতি, আদর্শ আর কর্মসূচি অক্ষুণ্ন রেখে জনমত সৃষ্টি করতে হয়। যাতে করে মানুষের চিন্তা জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, যা সকল আম্বিয়ায়ে কিরাম করে গেছেন। মহানবী সা. স্বীয় আদর্শ প্রচার করে একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মীবাহিনী তৈরি করেছিলেন। তাদের ত্যাগ ও পবিত্র মানসিকতায় ইসলাম মক্কা-মদীনার গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলমানদের কাংখিত খেলাফত। আজকের দিনেও ঐ একই পদ্ধতি অনুসরণ করলে আবারও খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। সুতরাং প্রথমোক্তটির মাধ্যমে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করা। তাদের চিন্তাধারায় বিপ্লব আনয়ণ করা। কথা, কাজ ও সংগঠনের মাধ্যমে এবং সেই সাথে যাবতীয় আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিজ দেশ ও বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াত পেশ করা। যেন ইসলামী খেলাফতের কল্যাণকারিতা সম্পর্কে মানব জাতির সকল স্তরে স্পষ্ট ধারণা ও মঙ্গল চেতনা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়টির জন্য ব্যাপক বস্তুগত যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করা আবশ্যক। এজন্য ইসলামবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রথমে সিসাঢালা সাংগঠনিক শক্তি অর্জন করতে হবে। এটাই হবে জিহাদের সর্বপ্রধান হাতিয়ার। সমাজের প্রতিটি স্তরে, গ্রামে ও মহল্লায় যখন একদল সচেতন আল্লাহভীরু ও যোগ্য মুজাহিদ তৈরি হয়ে যাবেন এবং স্রেফ আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের নিয়োজিত করবেন। তখন সংখ্যায় যত নগণ্যই হৌক না কেন, আল্লাহর সাহায্যে তারাই জয়লাভ করবেন। এভাবে সাংগঠনিক শক্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে; এমনকি তিনজন মুমিন একস্থানে থাকলেও তাদেরকে একজন আমীরের অধীনে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য হাদীস শরীফে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ)। এই ইমারতের মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে দেশব্যাপী দাওয়াত ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই ধরনের সাংগঠনিক ও জিহাদী ইমারতের পথ বেয়েই একদিন জাতীয়ভিত্তিক ‘খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।’ যদিও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী খেলাফত কেবলমাত্র ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের পরেই সম্ভব হবে। (তথ্য: ইসলামী খেলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন, পৃ. ১৮-১৯)।
সুতরাং শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি এবং শরিয়তভিত্তিক বিশুদ্ধ আইন-কানুনসহ যাবতীয় দিক ও বিভাগের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণপূর্বক সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী খেলাফত ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই সর্বোত্তম ও আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও নিরঙ্কুশ আনুগত্যের ঘোষণা দিয়ে সর্বত্র ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সুবিচারের মাধ্যমে সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। তাছাড়া ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধনী-গরিব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষসহ প্রত্যেক নাগরিকের পূর্ণ কল্যাণ নিশ্চিত করণের বিধান পূর্ণাঙ্গরূপে রয়েছে।
ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য
কুরআন মাজিদ ও হাদীস শরীফের আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো-
১. একটি স্বাধীন জাতি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার রাব্বুল আলামিনের সামনে আত্মসমর্পণ করবে, তাঁর অধীনে কর্তৃত্ব-সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে খেলাফতের ভূমিকা গ্রহণ করে সে সব বিধিবিধান এবং নির্দেশাবলি কার্যকরী করবে, আল কুরআন এবং রাসূলের মাধ্যমে তিনি যা দান করেছেন। একটি স্বাধীন জাতির পক্ষ থেকে বুঝেশুনে এহেন ঘোষণার মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র অস্তিত্ব লাভ করে।
২. সার্বভৌমত্বকে আল্লাহর জন্য বিশেষিত করার সীমা পর্যন্ত সে রাষ্ট্র থিয়াক্রেসি এর বুনিয়াদী দর্শনের সাথে একমত। কিন্তু সে দর্শন কার্যকরী করার ব্যাপারে থিয়াক্রেসি থেকে তার পথ ভিন্ন হয়ে যায়। ধর্ম যাজকদের কোনো বিশেষ শ্রেণিকে আল্লাহর বিশেষ ক্ষমতার ধারক বাহক করা এবং হিল ও আকদ-এর সব ক্ষমতা এ শ্রেণির হাতে ন্যস্ত করার পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্র দেশের সীমার মধ্যে বসবাসকারী সব ঈমানদারকে আল্লাহর খেলাফতের ধারক-বাহক প্রতিপন্ন করে। ‘হিল ও আকদ’-এর চূড়ান্ত ক্ষমতা সামগ্রিকভাবে তাদের হাতে ন্যস্ত করে।
৩. রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, পরিবর্তন, পরিচালন সম্পূর্ণভাবে জনগণের রায় অনুযায়ী হতে হবেÑ জমহুরিয়াতের এ নীতিতে ইসলামী রাষ্ট্র গণতন্ত্রের সাথে একমত। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণ লাগামহীন নয়। রাষ্ট্রে আইনকানুন, জনগণের জীবনযাপনের মূলনীতি, অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতি, রাষ্ট্রের উপায়-উপকরণ সবকিছু জনগণের ইচ্ছানুযায়ী হবে, এমন নয়। এমনও হতে পারে যে, যেদিকে জনগণ ঝুঁকে পড়বে, ইসলামী রাষ্ট্রও সেদিকেই নুয়ে পড়বে। বরং আল্লাহ-রাসূলের ঊর্ধ্বতন আইন তার নিজস্ব নিয়মনীতি, সীমারেখা, নৈতিক বিধিবিধান এবং নির্দেশাবলি দ্বারা জনগণের ইচ্ছা-বাসনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে। রাষ্ট্র এমন এক সুনির্দিষ্ট পথে চালিত হয়, তার পরিবর্তন সাধনের ক্ষমতা-ইখতিয়ার, শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ কারোই নেই। সামগ্রিকভাবে গোটা জাতিরও নেই সে ক্ষমতা- ইখতিয়ার। তবে হ্যাঁ, জাতি যদি তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ঈমানের বৃত্ত থেকে দূরে সরে যেতে চায়, তা স্বতন্ত্র কথা ।
৪. ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্র পরিচালনা স্বভাবতই তাদের কাজ হতে পারে, যারা তার মৌলিক দর্শন এবং বিধিবিধান স্বীকার করে। কিন্তু তা স্বীকার করে নাÑ এমন যত ব্যক্তিই সে রাষ্ট্র সীমায় আইনের অনুগত হয়ে বাস করতে রাজী হয়, তাদেরকে সেসব নাগরিক অধিকার পুরোপুরিই দেয়, যা দেয় রাষ্ট্রের আদর্শ এবং মূলনীতি মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নাগরিকদের।
৫. তা এমন এক রাষ্ট্র, যা বংশ, বর্ণ, ভাষা এবং ভৌগোলিক জাতীয়তার পরিবর্তে শুধু নীতি আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চলের মানবজাতির যে কোনো সদস্য ইচ্ছা করলে সেসব মূলনীতি স্বীকার করে নিতে পারে; কোনো প্রকার ভেদ-বৈষম্য ছাড়াই সম্পূর্ণ সমান অধিকার নিয়ে সে ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ আদর্শের ভিত্তিতে বিশ্বের যেখানেই কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, নিশ্চিত তা হবে ইসলামী রাষ্ট্র, তা আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত হোক বা এশিয়ায়; সে রাষ্ট্রের পরিচালকমণ্ডলী কালো হোক বা সাদা বা হরিদ্র। এ ধরনের একটি নিরঙ্কুশ আইনভিত্তিক রাষ্ট্রের বিশ্বরাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার কোনো প্রতিবন্ধকা নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলেও যদি এ ধরনের অনেক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তাও হবে ইসলামী রাষ্ট্র। কোনো জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিবর্তে সেসব রাষ্ট্রের মধ্যে পরিপূর্ণ ভ্রাতৃসুলভ সহযোগিতা সম্ভব। কোনো একসময় তারা একমত হয়ে বিশ্ব ফেডারেশন ও প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
৬. রাজনীতিকে স্বার্থের পরিবর্তে নীতি-নৈতিকতার অনুগত করা এবং আল্লাহভীতি-পরহেজগারীর সাথে তা পরিচালনা করা সে রাষ্ট্রের মৌল প্রাণশক্তি। নৈতিক-চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বই সেখানে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তিÑ একক মানদণ্ড। সে রাষ্ট্রের পরিচালকমণ্ডলী এবং ‘আহলুল হিল ওয়াল আকদ’-এর নির্বাচনের ব্যাপারেও শারীরিক মানসিক যোগ্যতার সাথে নৈতিক পবিত্রতাও সর্বাধিক লক্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার সকল অভ্যন্তরীণ প্রশাসন বিভাগকেও পরিচালিত হতে হবে দিয়ানাত-আমানত সততা-বিশ্বস্ততা পক্ষপাতমুক্ত নির্ভিক ইনসাফ-সুবিচারের ভিত্তিতে। আর তার বৈদেশিক নীতিকেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে সম্পূর্ণ সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা, চুক্তি-অঙ্গীকারের প্রতি আস্থা, শান্তিপ্রিয়তা, আন্তর্জাতিক সুবিচার এবং সদাচরণের ভিত্তির ওপর।
৭. নিছক পুলিশের দায়িত্ব পালন করার জন্য এ রাষ্ট্র নয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের সীমান্ত রক্ষা তার কাজ নয়; বরং তা হচ্ছে একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র। সামাজিক সুবিচার, ন্যায়ের বিকাশ আর অন্যায়ের বিনাশ সাধনের নিমিত্ত তাকে নেতিবাচকভাবে কাজ করতে হবে।
৮. অধিকার, মর্যাদা এবং সুযোগ-সুবিধার সাম্য, আইনের শাসন, ভালো কাজে সহযোগিতা, খারাপ কাজে অসহযোগিতা, আল্লাহর সামনে দায়িত্বের অনুভূতি, অধিকারের চেয়েও বড় করে কর্তব্যের অনুভূতি, ব্যক্তি সমাজ এবং রাষ্ট্র সকলের এক লক্ষে ঐকমত্য, সমাজের কোনো ব্যক্তিকে জীবনযাপনের অপরিহার্য উপাদান-উপকরণ থেকে বঞ্চিত থাকতে না দেয়া এসব হচ্ছে সে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যমান।
সারকথা : মানবজাতিকে পৃথিবীর খিলাফত কেবল ভোগ-বিলাসের জন্য প্রদান করা হয়নি। বরং প্রদান করা হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য। সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বশীল হয়ে সে কি সেবক হয় নাকি প্রভু হয়? যদি সে রাষ্ট্রের সত্যিকার খাদেম হয়, তবে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানী। আর যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তবে উভয় জাহানে হবে লাঞ্ছিত। মহানবী সা. বলেছেন- হাশরের মাঠে যে সাত শ্রেণির মানুষ আরশের ছায়ায় ছায়া পাবে, তন্মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হলোÑ ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। আর হাশরে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে- চার শ্রেণির মানুষের। তার হলো- ১. পথ হারা শাসক, ২. ভাস্কর্য তৈরিকারী, ৩. যে নবীকে হত্যা করেছে এবং ৪. নবী যাকে হত্যা করেছে। (মুসনাদে আহমদ)।
লেখক : প্রধান ফকীহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।