কূটনৈতিক সমঝোতায় যাচ্ছে বাংলাদেশ
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:১৪
॥ উসমান ফারুক॥
অস্ত্র ও ক্ষমতার পর সব দেশকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নিতে এবার নয়া বিশ্ব বাণিজ্যনীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। এ ব্যবস্থায় প্রধান হাতিয়ার হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য প্রবেশে অতিরিক্ত শুল্কনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বিশেষ করে অস্ত্র, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ অন্য দেশে রপ্তানি বাড়াতে বড় ধরনের বাঁক নেবে নতুন এ নীতি। সম্পর্ক উন্নয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্রেতা বাজার ধরে রাখতে সব দেশই ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে মেনে নিয়েই সমঝোতার পন্থায় যাচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলত উদীয়মান চীনকে আর্থিক ও কূটনৈতিকভাবে দুর্বল করার পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির। অন্যদিকে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা দেবে ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের বাঁক বদলের মধ্য দিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে দেশটি থেকে আমদানি বাড়ানো ও শুল্কহার কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, তৈরি পোশাকের ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম ও চীনের ওপরও একই ধরনের শুল্কারোপ করায় বাংলাদেশের খুব একটা প্রভাব পড়বে না। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের টিকফা চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির সূত্র ধরে বাংলাদেশ সমঝোতার উদ্যোগ নিতে পারবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নতুন শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক কূটনীতি আরো দৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখনো দেশটি থেকে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে।
এছাড়া শ্রম অধিকারে দেশটি সোচ্চার হওয়ায় বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা পোশাকশ্র্রমিকের মজুরি ও নিরাপত্তা বাড়াতে বাধ্য হবে। ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি প্রস্তুত করার সময় থেকে অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিষয়টি জেনেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তখন থেকে বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তৈরি পোশাকের জন্য তুলা আমদানি বাড়ানো ও বাণিজ্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি করতে যুক্তরাষ্ট্রে একটি প্রতিনিধিদল যাবে বাংলাদেশ থেকে। আরো প্রস্তুতি নিতে আগামী তিন মাসের জন্য শুল্কনীতি স্থগিত রাখতে অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছে সরকার।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছেন গত ২ এপ্রিল। হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন সম্পূরক শুল্কহার ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ নীতির অংশ হিসেবে শতাধিক দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্কারোপের ঘোষণা দেন, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় ৩৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের মুখোমুখি হবে। এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে হল মোট ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দিতে হবে ৫২ টাকা, এতদিন যা ছিল গড়ে ১৫ টাকা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র হিসাব কষেছে, বাংলাদেশে রপ্তানির সময়ে দেশটি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দেয়। কিন্তু টিকফা চুক্তি থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এ হিসাব কষেছে, তা বুঝতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, তাদের সঙ্গে আমাদের টিকফা চুক্তি আছে। সেখানেও তথ্য আছে। আবার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছেও এ তথ্য আছে। সেখান থেকে দেখলেও ৭৪ শতাংশ শুল্কারোপের বিষয়টি হয়তো টিকবে না।
আদৌ প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যা মোট পোশাকের ২০ শতাংশ। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যার মধ্যে তৈরি পোশাকের পারিমাণ ৭৩৪ কোটি ডলার। বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা এসেছে। কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪ শতাংশ, পাকিস্তানের পণ্যে ২৯ শতাংশ এবং মিয়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ শুল্কারোপ করা হয়েছে।
এতে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের খুব একটা সমস্যা হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। ২০ বছর আগে তৈরি পোশাক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিল। তারা হংকংয়ে একটি সেমিনারও করেছিল। সেই সেমিনারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি বলেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বে। এখন নতুন শুল্কনীতিতে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি সামাল দিতে হবে।
প্রধান রপ্তানি উৎস তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী বেশিরভাগ দেশের ওপরও কাছাকাছি অংকের শুল্ক বসায় প্রতিযোগিতায় তেমন পিছিয়ে থাকার শঙ্কা দেখছেন না সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এ শুল্কহার আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপরেও বসছে। সুতরাং রিলেটিভ সেন্সে ইউএস মার্কেটে আমাদের প্রতিযোগিতার দিক থেকে বড় ধরনের কিন্তু পরিবর্তন হবে না।
আর ইউএস তো পোশাক উৎপাদন করে না। তারা অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে কীভাবে পোশাক কিনবে। কিনবে তো আমদানি হওয়ার পরই। সুতরাং সেই ইমপোর্টের কম্পিটিটিভ এনভারমেন্ট কিন্তু তেমন চেঞ্জ হয়নি অর্থাৎ আমদানিতে অন্যান্য দেশ যেরকম সমস্যা দেখবে বাংলাদেশও সমানুপাতিক হারে একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে। তবে শুল্কের ধাক্কায় বাণিজ্যযুদ্ধ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমার শঙ্কা দেখছেন এ অর্থনীতিবিদ।
যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য কেমন
বাংলাদেশ যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে, তার মধ্যে রয়েছে খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, তুলা, গম, ভুট্টা, গ্যাস, ভোজ্যতেল, রেফ্রিজারেটর, যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত পণ্য। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের মতো অর্থের কেবল তুলা আমদানি করা হয়।
আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল সামগ্রী ও কৃষিপণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে কেবল পোশাকেরই বাজার হিস্যা ৯০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা বেশিরভাগ পণ্যে শূন্য বা ১ শতাংশ শুল্ক রয়েছে বাংলাদেশের। গ্যাস আমদানিতে রয়েছে ৩১ শতাংশ, আর ভোজ্যতেলে এখন শুল্ক কমানো হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে নিশানা করে বা কান্ট্রি অব অরিজিন ধরে শুল্কারোপ করে না। এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যনীতির ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে মনে করেন এনবিআরের কাস্টমস নীতি শাখার জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সব ধরনের শুল্ক হার বসে এইচএস কোডের ওপর, যা সব দেশের জন্য প্রযোজ্য।
পণ্যের শ্রেণিকরণ ও চিহ্নিতকরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এইচএস কোড বা হারমোনাইজড সিস্টেম কোড ব্যবহৃত হয়। এই আন্তর্জাতিক মান ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানিতে শুল্কহার ঠিক করা হয়, যা ডব্লিউটিও ঠিক করে দেয়। তবে বিভিন্ন পণ্যের ওপর ‘প্যারা ট্যারিফ’ থাকায় সাকুল্যে শুল্ক বেড়ে যায়। যেমন তুলা, রেফ্রিজারেটর, যন্ত্রপাতিতে শূন্য ও ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট রয়েছে ১৫ শতাংশ। অগ্রিম আয়কর ও আগাম কর রয়েছে ১০ শতাংশ। ফলে শুল্কের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২৬ শতাংশে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন শুল্কহার নির্ধারণে কোন দেশ কতটা আরোপ করেছে, তা আমলে নেয়নি। বরং ওই দেশের সঙ্গে যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তাকে ভাগ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের রপ্তানির পরিমাণ দিয়ে। সেই ভগ্নাংশকে পূর্ণ সংখ্যা ধরে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, সেটিই ‘মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কহার’। আর ট্রাম্পের ‘দয়ার’ নিদর্শন হিসেবে তার অর্ধেক শুল্কারোপ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানি করে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা ভাগ করলে দাঁড়ায় প্রায় শূন্য দশমিক ৭৪, যাকে ৭৪ শতাংশ শুল্কহার হিসেবে দেখিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তার অর্ধেক হিসেবে ৩৭ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে বাংলাদেশের জন্য। তবে এ হিসাবে ‘গলদ’ দেখছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, এখন একটা জিনিস দেখেন, আরো যে ইনফরমেশন বের হচ্ছেÑ দেখাচ্ছে যে, যেভাবে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফগুলো ক্যালকুলেট করা হয়েছে, এগুলোয় বেশ ভালো রকমের গলদ আছে।
বাংলাদেশের জন্য যে ৭৪ শতাংশ ক্যালকুলেট করা হয়েছে, সেটা দেখছি টোটাল যে ট্রেড ডেফিসিট আছে বাংলাদেশের- ইউএস এর সাথে, সেটার সঙ্গে বাংলাদেশ ইউএসএ মার্কেটে যে রপ্তানি করে সেটাতে ভাগ করে করা হয়েছে। এটা সব দেশের জন্য তাই।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজ বলেন, আমরা মেইন যা ইম্পোর্ট করি তা হলো কটন। তারপর আমরা ইম্পোর্ট করি স্ক্র্যাপ আয়রন। আর হল পেট্রোলিয়াম গ্যাস। তুলায় আমাদের (শুল্ক) শূন্য; স্ক্র্যাপ আয়রনÑ ওখানে ডিউটি শূন্য। শুধুমাত্র পেট্রোলিয়াম গ্যাসে আমাদের ডিউটি আছে ৩১ শতাংশ। তারা হয়তো কেবল ইমপোর্ট ডিউটি হিসাব করে নাই। তারা এক্সচেঞ্জ রেট হিসাব করছে, ট্রেড পলিসি হিসাব করছে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার ২৫ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন পণ্য আমদানি করেছে; যেখান থেকে আমদানি পর্যায়ে রাজস্ব আদায় করেছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে এসব পণ্যে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ শুল্ক আদায় করেছে।
ওই অর্থবছর বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করেছে স্ক্র্যাপ আয়রন। ৬ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ আয়রন আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ শুল্ক আদায় করেছে ২১০ কোটি টাকা।
আড়াই হাজার সিসির বেশি এবং তিন হাজার সিসির বেশি বা সমান নয় এমন ইঞ্জিনের ১১১টি গাড়ি আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ খরচ করেছে ৮০ কোটি টাকা; শুল্ক আদায় করেছে ১৫৪ কোটি টাকা। ডিজেল বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ আমদানি করা হয়েছে ৫২৪ কোটি টাকার; শুল্ক আদায় করা হয়েছে ১০৮ কোটি টাকা।
২০০১ থেকে ২৫০০ সিসি ইঞ্জিনের ৭০টি গাড়ি আমদানি করতে খরচ হয়েছে ৩১ কোটি টাকা; বিপরীতে শুল্ক আদায় হয়েছে ৪১ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ২ হাজার মেট্রিক টনের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এসব পণ্যের আমদানি মূল্য ছিল ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা; বিপরীতে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক আদায় হয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এসব পণ্যের বিপরীতে গড়ে ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ শুল্ক আদায় করেছে বাংলাদেশ।
সবচেয়ে বেশি শুল্ক আদায় করা পণ্যের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে স্ক্র্যাপ আয়রন। ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ আয়রন আমদানির বিপরীতে ২৩৬ কোটি টাকা শুল্ক আদায় হয়েছে। একই অর্থবছরে ৭০২ কোটি টাকার তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করেছে বাংলাদেশ; বিপরীতে শুল্ক আদায় হয়েছে ১০৫ কোটি টাকার।
পেট্রোলিয়াম তেল ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে ২৯৯ কোটি টাকার; শুল্ক আদায় হয়েছে ৬২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মার্চ মাস পর্যন্ত প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ২৭ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টনের পণ্য। এর আমদানি মূল্য ছিল ২২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা এবং শুল্ক আদায় হয়েছে ১ হাজার ১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে শুল্ক আদায় হয়েছে ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
কতটা দুর্বল হবে চীন
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষিত নতুন ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ প্ল্যান’ মূলত বিশ্ব বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার নতুন একটি পরিকল্পনা বা বাণিজ্যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা। এর মাধ্যমে শতাধিক দেশকে নিয়ন্ত্রণ ও চীনকে দুর্বল করার পরিকল্পনা দিন দিন ধরা দিচ্ছে। যদিও এ পরিকল্পনা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্বের সকল দেশকেই বিশ্ব বাণিজ সংস্থা অনুমোদিত নীতিতে বাণিজ্য পরিচালনা করতে হয়। ট্রাম্পের এ ঘোষণা ডব্লিউটিও এর অস্তিত্ব ও কার্যকরিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
তথ্যানুযায়ী নয়া শুল্কনীতি ঘোষণার সময়ে চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক বাসায় ট্রাম্প প্রশাসন। কয়েক দিনের ব্যবধানে চীনও পাল্টা ৩৪ শতাংশ শুল্কারোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যর ওপর। এর জবাবে গত ৮ এপ্রিল মঙ্গলবার ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দিয়ে বলে, চীন ৩৪ শতাংশের নতুন শুল্ক না সরালে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক বসাবে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প যদি নিজের হুমকি অনুযায়ী আদেশ দেন, তাহলে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে চীনা পণ্য আমদানিতে ১০৪ শতাংশ শুল্ক গুনতে হতে পারে। কারণ মার্চেই ২০ শতাংশ এবং গত সপ্তাহে ৩৪ শতাংশÑ মোট ৫৪ শতাংশ শুল্ক ইতোমধ্যে রয়েছে। নতুন করে ৫০ শতাংশ বসলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এতে চীনা পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগের চেয়ে প্রতি একশ টাকায় ৮৪ টাকা বেশি দিতে হবে অর্থাৎ মার্চে চীনা যে পণ্য যুক্তরাষ্ট্র কিনতো ১০০ টাকায় তা কিনতে হবে ১৮৪ টাকায়। এ থেকেই বোঝা যায়, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি মূলত বিশ্বে চীনকে আর্থিকভাবে দুর্বল করা।
এমন ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শেয়ার বাজার পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার যতটা পড়েছে, তার চেয়ে বেশি পড়েছে চীনের। দেশটির হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ একদিনেই ১০ শতাংশ দর হারিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেছেন, কার শেয়ারবাজার কতটা পড়ল তা দেখবে না যুক্তরাষ্ট্র।
প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যেই চিঠি দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনকে। আগামী মাসেই তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি টাক্সফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। টাস্কফোর্স যুক্তরাষ্ট্র ও বড় রপ্তানি বাজারের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কগুলো নিয়মিত তদারকি করে দেখবে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে আদৌ কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা বিশ্লেষণ করে দেখবে। পাশাপাশি নতুন এ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো পক্ষ যেনো রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে না পারে, পোশাক খাত নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্র না করে সে বিষয়েও সরকারকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। পোশাক বানানোর উপকরণগুলোর বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে বা ভারত হয়ে। পরিবহন ব্যবস্থায় সুবিধা দিতে পারলে সিংহভাগ উপকরণ যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আনা সম্ভব। সেটি করলে বাংলাদেশের পোশাক খাত একটি টেকসই বাজারের দিকে যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দেখা দেবে।