সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষ
২৭ মার্চ ২০২৫ ১৫:৫৫
স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৩১ মার্চ অথবা ১ এপ্রিল উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ইতোমধ্যে ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। গত ২৫ মার্চ মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখার দিনে কয়েক লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়েছেন। এখন (২৫ মার্চ) পর্যন্ত ঈদযাত্রায় কোনো দুর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। যাত্রা নির্বিঘ্ন হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয় হয়নি। সড়ক, নৌ ও আকাশপথেও নিরাপদে চলাচল করছেন ঈদযাত্রীরা।
রেলপথে ঈদযাত্রা শুরু : গত ২৪ মার্চ সোমবার ভোর ৬টায় ঢাকা রেলস্টেশন থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরুর মাধ্যমে এবারের ঈদুল ফিতরের ট্রেনযাত্রা শুরু হয়েছে। সকাল থেকে বেশ নির্বিঘ্নে রেলপথে ঢাকা ছেড়েছেন যাত্রীরা। এছাড়া ঈদুল ফিতর-পরবর্তী ফিরতি ট্রেনযাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী ৩ এপ্রিলের আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি হয় গত ২৪ মার্চ। এবারের প্ল্যাটফর্ম এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় খুশি যাত্রীরা। যদিও ঈদের বাড়তি ট্রেনের সংখ্যা নিয়েও শঙ্কায় আছেন অনেকেই। সাধারণ যাত্রীদের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে নানা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বিনা টিকিটের যাত্রী প্রতিরোধে ঢাকা, বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ সকল বড় বড় স্টেশনে জিআরপি, আরএনবি, বিজিবি ও স্থানীয় পুলিশ এবং র্যাবের সহযোগিতায় সার্বক্ষণিক প্রহরার ব্যবস্থা। নাশকতা প্রতিরোধে চলন্ত ট্রেনে, স্টেশনে বা রেললাইনে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আরএনবি, জিআরপি ও রেলওয়ে কর্মচারীদের কার্যক্রম আরও জোরদার। এছাড়া র্যাব, বিজিবি, স্থানীয় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় নাশকতাকারীদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।
সড়কপথে ঈদযাত্রা শুরু
সড়কপথেও ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে গত ২৪ মার্চ। তবে ২৫ মার্চ এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত যাত্রীচাপ লক্ষ করা যায়নি। জানা গেছে, যাত্রী অপেক্ষায় মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনালের কাউন্টারগুলো। স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রা করতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী। আর পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লম্বা ছুটির কারণেই এবার যাত্রী খরা। তবে তাদের আশা দুই দিন পর থেকে কিছুটা বাড়তে পারে যাত্রীচাপ।
৫০ রুটে চলবে ১৭৫ লঞ্চ
নদীপথেও শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। রাজধানীর সদরঘাট থেকে ৫০টি রুটে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে ১৭৫টি লঞ্চ। ভোগান্তিহীন ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত বন্দর কর্তৃপক্ষ। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কিছুটা যাত্রী সমাগম শুরু হলেও আগের মতো জৌলুস নেই রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। নেই চিরচেনা রূপ, তবুও ঈদ উপলক্ষে রয়েছে বাড়তি প্রস্তুতি। অপেক্ষমাণ ১৭৫টি লঞ্চ, যা ছেড়ে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে। ২৬ মার্চ থেকে যাত্রী নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঈদযাত্রা শুরু করেছে লঞ্চগুলো।
৩ রুটে বিমানের বিশেষ ফ্লাইট
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা সহজ করতে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে রাজশাহী, সৈয়দপুর ও বরিশাল রুটে নির্ধারিত ফ্লাইটের পাশাপাশি অতিরিক্ত ফ্লাইট চালু করছে সংস্থাটি। গত ১৭ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানায়, ঈদে যাত্রীদের বাড়ি ফেরার বিষয়টি মাথায় রেখে ঢাকা-রাজশাহী-ঢাকা রুটে ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০ মার্চ অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালিত হবে। একইভাবে ঢাকা-সৈয়দপুর-ঢাকা রুটেও ২৬ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন বিশেষ ফ্লাইট থাকবে। এছাড়া ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে ২৭ মার্চ একটি অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। বিমান জানায়, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ এ ফ্লাইটগুলো যুক্ত করা হয়েছে। যাত্রীদের আগে থেকেই টিকিট বুকিং করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত ফ্লাইটে যাত্রা নিশ্চিত করতে পারেন।
পরিবহন মালিকদের ১০ দফা দাবি
চাঁদাবাজি, টিকিট কালোবাজারি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করে সড়কপথে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন এবং নিরাপদ করতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কাছে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। মালিকদের দাবিগুলো হচ্ছেÑ ঈদের ৫ দিন আগে থেকে ঈদের ১ সপ্তাহ পর পর্যন্ত ঢাকার সব বাস টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের টহল জোরদার করতে হবে; ঢাকার চারপাশের চিহ্নিত স্থানগুলো যেমনÑ চন্দ্রা, বাইপাল, গাজীপুর বাইপাস, সাইন বোর্ড, শনির আখড়া, কেরানীগঞ্জ, ভুলতা, গাউছিয়া, মদনপুর, সাভার, নবীনগর, হেমায়েতপুর এলাকায় স্থানীয় ও হাইওয়ে পুলিশের মাধ্যমে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে যানজটমুক্ত রাখতে হবে; ২৫ মার্চ থেকে ঈদ পর্যন্ত এবং ঈদের পরের ৩ দিন পণ্যবাহী পরিবহন বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে; সড়ক ও মহাসড়কে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বন্ধসহ সড়কপথে যেকোনো নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করার লক্ষ্যে সারা দেশের থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের বিশেষ টহলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে যাত্রীদের যাত্রাপথে সহযোগিতার জন্য ঢাকার সব টার্মিনালে একটি ‘হেল্পডেস্ক’ থাকবে। এছাড়া স্ব-স্ব কোম্পানি/কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখতে হবে। এর ব্যতয় ঘটলে বা বেশি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে যাত্রীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে; কোনো অবস্থাতেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি রাস্তায় যাত্রী বহন করিতে পারিবে না। এ বিষয়ে প্রশাসনকেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; ঢাকা সিটিতে চলাচলরত গাড়ি দূরপাল্লায় যাত্রী নিয়ে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া; লাইসেন্সবিহীন/অপেশাদার চালককে কোনো যাত্রীবাহী বাস না চালানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া; কোনো অবস্থাতেই যেন ঈদ বকশিশ বা অন্য যেকোনো নামে যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া বন্ধ করা।
ঈদযাত্রায় সড়কে চলাচলে নতুন নির্দেশনা
ঈদে রাজধানী থেকে এক কোটির বেশি মানুষ বাড়ি ফেরেন। অন্যদিকে ৩০ লাখের মতো রাজধানীতে প্রবেশ করেন। এ বিপুলসংখ্যক মানুষের বের হওয়া এবং প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নির্দেশনার অংশ হিসেবে কিছু সড়কে ২৫ মার্চের পর যাত্রীবাহী যানবাহন ছাড়া অন্য বাহন চলাচল না করার আহ্বান জানিয়েছে ডিএমপি। নির্দেশনায় বলা হয়, ২৫ মার্চ থেকে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত ঈদযাত্রা সংশ্লিষ্ট যানবাহনের চলাচল সুগম করার জন্য জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্যান্য যানবাহনসমূহকে কিছু সড়ক এড়িয়ে চলার অনুরোধ করা হলো। এসব সড়কের মধ্যে রয়েছেÑ এক. ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক (এয়ারপোর্ট টু আব্দুল্লাপুর), দুই. ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক (যাত্রাবাড়ী টু সাইনবোর্ড) তিন. পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফিট সড়ক) চার. ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক (মিরপুর রোড: শ্যামলী টু গাবতলী) পাঁচ. ঢাকা-কেরানীগঞ্জ সড়ক (ফুলবাড়িয়া টু তাঁতিবাজার টু বাবুবাজার ব্রিজ), ছয়. ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক (যাত্রাবাড়ী টু বুড়িগঙ্গা ব্রিজ), সাত. মোহাম্মদপুর বসিলা ক্রসিং হতে বসিলা ব্রিজ সড়ক ও আট আব্দুল্লাপুর টু ধউর ব্রিজ সড়ক। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে ২৫ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত এবং ঈদ পরবর্তী তিন দিন মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য, পচনশীল দ্রব্য, গার্মেন্টসসামগ্রী, ওষুধ, সার এবং জ্বালানি বহনকারী যানবাহনসমূহ এর আওতামুক্ত থাকবে। এছাড়া আব্দুল্লাহপুর থেকে ধউর/আশুলিয়া সড়ক একমুখী করা হবে। আর বিআরটি লেন দিয়ে শুধু ঢাকা থেকে যানবাহন বের হবে।