ফ্যাসিবাদ রুখতে জাতীয় ঐকমত্য
২৭ মার্চ ২০২৫ ১৫:৪২
॥ ফারাহ মাসুম ॥
ফ্যাসিবাদকে ফেরানোর সব স্বপ্নই দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। জরুরি অবস্থা জারি হচ্ছে মর্মে একটি গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন আগে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, এ নিয়ে সংবেদনশীল একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। পরে বলা হয়, এ আলোচনা নেতিবাচক সিদ্ধান্তের দিকে গড়িয়েছে। এর আগে ছাত্রদের নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ভাইরাল হওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ঝড়ের সৃষ্টি হয়। এতে তিনি দাবি করেন, সেনাপ্রধান পরের নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য একটি পরিশীলিত আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে ছাত্রদের রাজি করাতে চেষ্টা করেছেন। পরে তার আরেক সহকর্মী সারজিস আলম বলেছেন, সেনাপ্রধান তার মত ব্যক্ত করেছেন। তিনি কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি। হাসনাত বিষয়টিকে যেভাবে দেখেছেন, সারজিস সেভাবে দেখেন না। এ ইস্যুটি নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এমন একটি ঝড়ের সৃষ্টি হয় যে, সেনা প্রতিষ্ঠান থেকে জেনারেল ওয়াকারের বক্তব্যকে ব্যক্তিগত মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, আওয়ামী লীগ নামে পরিশীলিত হোক বা অপরিশীলিত- ফ্যাসিবাদকে মেনে নেয়ার বিষয়ে জনগণের মধ্যে যেমন তীব্রভাবে অসম্মতি রয়েছে, তেমনি অবস্থা সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও রয়েছে। এ ইস্যুটি সামনে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়ন হলো ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বিবাদ-বিভক্তি ধরনের একটি আবহ দেখা গিয়েছিল, তা অনেকখানি ঐকমত্যে রূপ নেয়। ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার যেকোনো আয়োজন রুখতে ছাত্রদের সাথে প্রায় কাছাকাছি মত ব্যক্ত করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য একই কাতারের রাজনৈতিক দলগুলো। এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন হলো সংস্কার ছাড়া নির্বাচন এবং এরপর সংস্কারের মত ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে জোরালো হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে কিছু মৌলিক সংস্কার শেষে নির্বাচনের আয়োজন করা। এমনকি সে নির্বাচন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে না হয়ে যদি পরবর্তী জুনের মধ্যেও হয়, তা নিয়েও জোরদার কোনো বিরোধিতা হবে বলে মনে হচ্ছে না। চীন সফরের প্রাক্কালে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা নতুন করে দিয়েছেন জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে।
জরুরি অবস্থার গুজব ও ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া
হাসনাত আবদুল্লাহর আলোচিত ভাইরাল পোস্টের পর ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের পরিশীলিত রূপে ফিরে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তাবের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিছু অজনপ্রিয় ইউটিউবার এ বিষয়ে দেয়া প্রস্তাবকে ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। যেটি মেনে নেয়ার জন্য চাপ কোনো কোনো ফ্যাসিবাদবিরোধী বড় রাজনৈতিক দলকেও বৃহৎ প্রতিবেশী দেশের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনায় জরুরি অবস্থা জারি নিয়ে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের মাঠ প্রধানদের মধ্যে আলোচনার কথা উঠে আসে। এমনও গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে দুয়েক দিনের মধ্যে জরুরি অবস্থা বা সেনাশাসন জারি হতে পারে। সেনাশাসন জারির বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি এ কারণে যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেটি খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়। বাকি থাকে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি। হিসাব করা হয় এটি ঘটলে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কী রূপ নেবে।
এতে কয়েকটি বিষয় সামনে চলে আসে। সংবিধানে বর্ণিত অভ্যন্তরীণ বা বাইরের কোনো আক্রমণের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হলে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে মৌলিক অধিকার স্থগিত থাকে। রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ রাখা হয়। আর নিরাপত্তা বিধানের মূল দায়িত্ব সেনা প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। ৬ মাসের জন্য এটি জারি করা হয় এবং পরে তা আরো বাড়ানো যায়।
জরুরি অবস্থা জারি করার অর্থ দাঁড়ায় অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের জন্য যে আয়োজন করছে, তা কক্ষচ্যুত হয়ে পড়া। ডিসেম্বর বা জুন শুধু নয়, অজানা সময় পর্যন্ত নির্বাচন এতে পিছিয়ে যেতে পারে। নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হওয়া কোনো দলই সেটি কামনা করেনি। ফলে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনকে কেন্দ্র করে যে অস্থির অবস্থা, সেটি নমনীয় করতে রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কাছাকাছি সুরে কথা বলা শুরু করে। একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ফ্যাসিবাদের পুনরাগমন ঠেকানোর ব্যাপারে সব দলের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের ওপরের দিকে কিছু বাদ দেয়া হলে বড় অংশ ফ্যাসিবাদের পুনরাবর্তন এবং রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয় সৃষ্টিকে সমর্থন করে না মর্মে ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। এ বাস্তবতার কারণে এরপর সেনা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ধারণ করে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায়। জরুরি অবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে গুজবেরও পরিসমাপ্তি ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিলুপ্তি ভায়াবল নয়
ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের লবি প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্র্তী সরকারের পরিবর্তন কামনা করে। জরুরি অবস্থা জারি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বিলুপ্ত হয়ে যাবে বিষয়টি তেমন নয়। তবে জরুরি অবস্থা জারি হলে ওয়ান-ইলেভেনের পরিস্থিতি পুনরাবৃত্তি হবার সম্ভাবনা ছিল। ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও এখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের পার্থক্য হলো আগের সরকার বেসমামরিক মোড়কে থাকলেও ক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক ছিল সেনা প্রতিষ্ঠান। মূল সিদ্ধান্তগুলো মইন উ আহমদ ও তার সহযোগী জেনারেলদের পক্ষ থেকে আসতো। এখন প্রকৃতপক্ষে সরকার চালিত হচ্ছে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারে দৃশ্যমান যারা আছেন, সেসব উপদেষ্টাদের দ্বারা। ক্ষমতার নেপথ্য কোনো নিয়ন্ত্র¿ক সেভাবে নেই। জরুরি অবস্থা জারি হলে ওয়ান-ইলেভেনের পুরনো বন্দোবস্থ কিছুটা পরিবর্তন হয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের অভ্যন্তরীণ ও বাইরের শক্তি কোনোভাবেই সে ব্যবস্থা চাইছে না। এর ফলে পুরনো ব্যবস্থার একমাত্র কাম্য পক্ষ হয়ে গেছে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থক প্রতিবেশী ভারত। কার্যত বাংলাদেশের অন্তর্বর্র্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে মোটা দাগে বৈশ্বিক শক্তির মধ্যে ভারত একদিকে আর বাকি বিশ্ব অন্যদিকে হয়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর সে ভারসাম্যের পরিবর্তন করানোর প্রচেষ্টা ভারতীয় লবির সফল হয়নি। হোয়াইট হাউসের সাম্প্রতিক বিবৃতি-বক্তব্যে বোঝা যায় সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
দেশের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যারা পরোক্ষভাবেও ইনক্লুসিভের নামে আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছেন তারা জনসমর্থন হারাচ্ছেন। আর জরুরি অবস্থায় ইউনূস সরকারের পতন না হলেও উপদেষ্টা পরিষদ বা সরকারের নতুন কাঠামো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। যার অর্থ হলো নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়া। এসব বিচেনায় ইউনূস সরকারের বিকল্প কোনো কিছু রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক পথে রাখার জন্য গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হচ্ছে না।
ইন্ডিয়া টুডের তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়া টুডে গত ২৪ মার্চ সোমবার একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের ‘পরিকল্পনা’ কীভাবে বাংলাদেশে ফাটল আরও গভীর করছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নতুন জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান নেতাদের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করলেও রাজনৈতিক ভূখণ্ড উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এনসিপি নেতা আবদুল্লাহকে আওয়ামী লীগের উপদল মেনে নিতে চাপ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে যে, আবদুল্লাহ জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাথে সাক্ষাতের অনুরোধ করেছেন, তিনি তাদের ডাকেননি। আবদুল্লাহর দাবি, বৈঠকে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেনাবাহিনী এর সাথে একমত হয়েছে বিষয়টি সেরকম নয়।
রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নতুন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) একজন বিশিষ্ট নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর করা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে যে, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা তাকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ গঠনে একটি ‘পরিশোধিত’ উপদল গ্রহণ করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন, যারা গত আগস্টে একটি জনপ্রিয় অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিল।
সুইডেনভিত্তিক অনুসন্ধানী ও জনস্বার্থ সাংবাদিকতা প্ল্যাটফর্ম নেত্র নিউজের বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে শেয়ার করা এক বিবৃতিতে বলা হয় যে, সেনা সদর দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে এর প্রধান, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ১১ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসে আবদুল্লাহর সাথে দেখা করেছিলেন। তবে সেনাবাহিনী আবদুল্লাহর দাবিকে ‘অত্যন্ত হাস্যকর এবং গল্পের একটি অপরিপক্ব বিন্যাস’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
সেনাবাহিনী বলেছে যে, বৈঠকটি ‘আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়ে তাদের (এনসিপি নেতাদের) তলব করা এবং প্রস্তাব দেওয়া বা চাপ দেওয়ার’ বিষয়ে নয়। বরং আবদুল্লাহ ও এনসিপি সমন্বয়কারী সারজিস আলমের অনুরোধে বৈঠকটি আয়োজন করা হয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সাথে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ চেয়েছিলেন।
রিপোর্টটিতে হাসনাত আবদুল্লাহর পরিচয় তুলে ধরে বলা হয়, সাবেক ছাত্র কর্মী আবদুল্লাহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, যা সরকারি চাকরির জন্য কোটা ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পরে গতি লাভ করেছিল। শেষ পর্যন্ত গত বছরের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনে এ বিক্ষোভগুলো ভূমিকা রাখে। তারপর থেকে আন্দোলনের কিছু ছাত্র নেতা অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালন করেছেন যখন আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম এনসিপির আঞ্চলিক প্রধান সংগঠক হন।
ইন্ডিয়া টুডে উল্লেখ করে যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সাম্প্রতিক ভাইরাল পোস্টে, আবদুল্লাহ দাবি করেছেন যে, তাকে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য একটি ‘ভারতীয় পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, সাবেক সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সাবেক এমপি শেখ ফজলে নূর তাপসের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্বে দলের একটি ‘পরিশোধিত’ উপদল প্রকাশ্যে হাসিনার উত্তরাধিকার ত্যাগ করবে এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ এর আদর্শ পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করবে। বিনিময়ে যারা এ সংস্কারপন্থী দলটিকে সমর্থন করবে তারা সংসদীয় আসন এবং অন্যান্য ছাড় পাবে বলে উল্লেখ করা হয়।
এক সংবাদ সম্মেলনে আবদুল্লাহ তার অভিযোগ পুনরুদ্ধার করেন কিন্তু ১১ মার্চ তার বৈঠকে সেনাপ্রধান জড়িত কিনা তা নিশ্চিত করতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য এ বৈঠক ডাকা হয়েছিল।
সেনাবাহিনী দৃঢ়ভাবে আবদুল্লাহর দাবি অস্বীকার করেছে। এর বিবৃতি নিশ্চিত করে যে আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম বৈঠকের অনুরোধ করেছিলেন এবং ১১ মার্চ আলম বৈঠকের ব্যবস্থা করার জন্য সেনাপ্রধানের সামরিক উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেনাবাহিনী বলেছে যে, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার অফিসিয়াল দায়িত্ব পালন শেষে তাদের সাথে দেখা করার আগে আবদুল্লাহ এবং আলম সেনা ভবনে অপেক্ষা করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, আবদুল্লাহ ও আলম এ বৈঠকের জন্য এনসিপির সম্মতি পেয়েছিলেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দলের নেতা নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী সিলেটে এক ইফতার মাহফিলে আবদুল্লাহর ফেসবুক পোস্টের সমালোচনা করে একে ‘সৌজন্যের অভাব’ বলে বর্ণনা করেছেন।
২৩ মার্চ আলম একটি ফেসবুক পোস্টে আবদুল্লাহর বক্তব্য থেকে বৈঠকের ভিন্ন একটি বর্ণনা দেন। তিনি সেনাপ্রধানের সাথে বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন কিন্তু মনে করেননি যে, সামরিক কর্মকর্তা তাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বা আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবনের পরামর্শ দিচ্ছেন। আলম বলেন, সেনাপ্রধান বরং ‘সোজা’ভাবে তার মতামত প্রকাশ করছেন। তিনি বিশ্বাস করেননি যে, তাদের সেনাভবনে তলব করা হয়েছিল।
সেনাবাহিনী তার বিবৃতিতে স্বীকার করেছে যে, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। তবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি কথিতভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, অপরাধমূলক রেকর্ড বা সন্দেহজনক কুখ্যাতি রয়েছে এমন ব্যক্তি ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতারা যদি একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তবে এটি নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা উন্নত করতে পারে এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে পারে। জেনারেল ওয়াকার আরও বলেছিলেন যে, তিনি তরুণ কর্মীদের ‘তাঁর ছেলেদের মতো’ দেখেন।
ইন্ডিয়া টুডে বলেছে, বিতর্কটি বাংলাদেশে একাধিক উপদলের মধ্যে একটি অনাকাক্সিক্ষত শব্দের যুদ্ধকে প্রজ্জ্বলিত করেছে। বিশিষ্ট বাংলাদেশি সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জুলকারনাইন সায়ের খান বলেছেন যে, জুলাই ২০২৪ সালের বিদ্রোহ হাসিনার শাসনের প্রতি ব্যাপক জনগণের অসন্তোষ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘হাসিনা আওয়ামী লীগের সমার্থক হয়ে উঠেছেন এবং দলটি সম্পূর্ণরূপে তার নেতৃত্ব দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়েছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় কোনো শক্তি ছিল না।’
প্রতিবেদনে বলা হয় যে, খান অবশ্য সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা অবাস্তব হবে, বরং যুক্তি দিয়েছিলেন যে, দলের ভাগ্য বাংলাদেশের জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে। তিনি পরামর্শ দেন, ‘আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে গণভোট আয়োজন করুন। এটাই হওয়া উচিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুত সংস্কারের প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, গত অক্টোবরে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য হাইকোর্টে করা রিট প্রত্যাহার করে নেন আবদুল্লাহ ও আলম। পিটিশনে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ এনে এ দলগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন বাতিলের দাবি করা হয়েছে এবং সাবেক সংসদ সদস্যদের তাদের বেতন এবং সুবিধাগুলো কোষাগারে ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শুনানির জন্য নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও হাইকোর্টের বেঞ্চ জটিল সাংবিধানিক সমস্যা উল্লেখ করে অগ্রসর হতে অস্বীকৃতি জানায়। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ উল্লেখ করেছেন যে আদালত আবেদনকারীদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক উদ্বেগের কারণে একটি সিনিয়র বেঞ্চের সামনে তাদের মামলা উপস্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছে।
বেশকিছু পুরনো ভিডিওতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলম প্রমুখ ছাত্র নেতা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ উন্নয়নগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করেছে, জাতীয় অনিশ্চয়তার সময়ে উত্তেজনাকে আরও প্রসারিত করেছে বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।
আগামী কোন পথে?
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ২৬ মার্চ এ রিপোর্ট লেখার সময় চীনে চার দিনের সফরে রওনা দিয়েছেন। তিনি সেখানকার একটি দ্বীপে আয়োজিত এক বিনিয়োগ সম্মেলনে যোগ দেবেন। পরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তিনি বৈঠকে বসবেন। এ পত্রিকা যখন পাঠকের হাতে পৌঁছাবে তখন প্রধান উপদেষ্ঠার চীন সফর শেষ হয়ে যেতে পারে। এ সফরটির সাথে গত কয়েকদিনে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে হয়। ইউনূস সরকারের পতনের জন্য বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটির অব্যাহত তৎপরতা অন্তর্বর্র্তী সরকারকে চীনের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমা শক্তির আস্থা বজায় রেখে সরকার চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়াতে চাইতে পারেন।
এটি সরকারের পেছনের ভিত্তিকে আরো মজবুত করবে। আর মৌলিক কিছু সংস্কার করে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের যে কথা প্রধান উপদেষ্টা বলছেন, তা সব পক্ষকে মেনে নিতে বাধ্য করবে। আর ফ্যাসিবাদের আইকনরা যে স্বপ্ন দেখছে দেশে ফিরে আগের মতো কর্তৃত্ববাদ কায়েম করার, সেটি দুঃস্বপ্ন থেকে যাবে।