ভারতীয় মিডিয়ার গুজব ফ্যাক্টরির নেপথ্যে ফ্যাসিস্টের লুটের টাকা


২৭ মার্চ ২০২৫ ১৫:২৭

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
কথায় আছে ‘টাকায় মিলে বাঘের চোখ/কাঠের পুতুল খোলে মুখ’- ভারতের মিডিয়ায় বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারের সয়লাব দেখে এমন মন্তব্য করেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের অনুসন্ধানী গবেষণা বলছে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার লুটের টাকার জাদুর ছোঁয়ায় ভারতীয় মিডিয়ার এমন আগ্রাসী আচরণের নেপথ্য কারণ। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর তাকে পুনর্বাসনের দুঃস্বপ্ন দেখিয়ে ভারতের কিছু মিডিয়া, সাংবাদিক এবং ব্লগার টাকা কামানোর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের হাসিনাপ্রীতির কারণে বিনাবাধায় তারা গুজব ছড়াচ্ছ। বিশ্লেষকরা মনে করে, এতে শুধু বাংলাদেশেরই ক্ষতি হচ্ছে না, ভারতও উগ্রবাদের ঝুঁকিতে পড়ছে। উগ্রহিন্দুবাদীরা বাংলাদেশের নির্যাতনের মিথ্যা সংবাদে প্রভাবিত হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে ভারতের মুসলমানদের পথে-ঘাটে, ট্রেন, বাস; এমনকি বাসাবাড়িতে হামলা করছে। মুসলিম ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করছে। তাদের সাম্প্রদায়িক আগ্রাসানের শিকার হয়ে প্রায় প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনাগুলো।
ভণ্ডামি তোমারই নাম আ’লীগ ও ভারতীয় মিডিয়া
দীর্ঘ ৮ মাস ধরে অপতথ্য প্রচার করছে ভারতীয় মিডিয়াগুলো। ফ্যাক্ট চেকিংয়ে ধরাও পড়ছে। কিন্তু ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, বরং তাদের গুজবের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। তাই বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার দিন দিন যুক্ত হচ্ছে মূলধারার মিডিয়াগুলোয়ও। কারণ তারা হাসিনার লুটের টাকার সাথে সেদেশের রিসার্চ এন্ড অ্যানালাইসিস উইং (আরডব্লিউ ‘র’)-এর আনুকূল্যও পাচ্ছে, যা তাদের বাড়তি পাওনা। তাই বিশ্ববাসী কী ভাবলো। তাদের মিডিয়ার মর্যাদা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো সেই ভাবনা তাদের নেই। বরং তারা মনে করছে; ভারতবর্ষের পাঠকরা তো আর ক্রস করে সত্য-মিথ্যা যাচাই করছে না। বরং তারা যা গেলাচ্ছে, তাই গিলছে। আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের টাকা, জাদুতে এবং ভারতের বিজেপি শাসনে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পের প্রভাবে তারা বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে অকার্যকর হানাহানিতে ভরা, গৃহযুদ্ধ আক্রান্ত একটি দেশ হিসেবে চিত্রিত করার মিশনে নেমেছে। বিগত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে ভারতের পত্রপত্রিকা এবং অন্যান্য মিডিয়ায় বাংলাদেশের খবর অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে বের করা লাগতো। কিন্তু বিগত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ভারতের মূলধারার পত্রপত্রিকাগুলো কভার স্টোরি এবং প্রধান শিরোনাম করছে বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ফ্যাক্টরিতে তৈরি বিভিন্ন ভুয়া সংবাদ। যেমন- ‘গৃহযুদ্ধের পথে বাংলাদেশ? ‘অপরিপক্ব’ ছাত্রদের নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য সেনাবাহিনীর সেনার হুঁশিয়ারিতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে ইউনূস ও তাঁর দলবল।’ গত ২৫ মার্চ মঙ্গলবার প্রধান শিরোনাম করেছে সংবাদ প্রতিদিন ইন। এমন ভুয়া শিরোনামে বাংলাদেশবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করেছে কলকাতা, দিল্লিসহ ভারতের বড় বড় শহর থেকে প্রকাশিত মূলধারার সংবাদমাধ্যম বলে পরিচিতি পাওয়া সংবাদমাধ্যমগুলো। যেমনÑ এনডিটিভির সাথে আমেরিকার গোয়েন্দাপ্রধানের বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করেছে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম। তিনি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য জঙ্গিবাদ বা উগ্রসাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানকে সমস্যা বলে উল্লেখ করে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারগুলোকে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অথচ ভারতীয় মিডিয়া প্রচার করেছে, তিনি বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের এ অপপ্রচারের আগুনে ঠাণ্ডা পানি ঢেলে পরদিনই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট সংখ্যালঘুদের রক্ষায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করে বিবৃতি দিয়েছে। অথচ সে খবর ভারতের কোনো মিডিয়ায় গুরুত্ব পায়নি।
ভারতীয় গদি, মোদি ও হাসিনার লুটের টাকা খাওয়া মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন কয়েক হাজার উদাহরণ দেয়া যাবে, যা ফ্যাক্ট চেকিংয়ে ভুয়া নিউজ বলে প্রমাণ হয়েছে। রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্তই বাংলাদেশকে নিয়ে কমপক্ষে ৭২ ভারতীয় গণমাধ্যমে অপতথ্য প্রচার করেছে।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশকে নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যগুলোর সংখ্যা ৫০ কোটি ছাড়িয়েছে অনেক আগেই বলে অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে।
পতিত আওয়ামী লীগ তাদের পক্ষে নিউজ ছাপতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে- এ তথ্য নতুন নয়। বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে তারা দেশের জনগণের ট্যাক্সের শত শত কোটি ডলার খরচ করেছে- এ সত্য প্রমাণিত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের তাদের সেই থলের বিড়াল বের হয়ে। কিন্তু তারপরও থামেনি। বরং ক্ষমতা হারানোর পর ভারত সরকারের মদদে আরো ব্যাপকভাবে অপতথ্য প্রচারের মিশনে নেমেছে। গত মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান সূত্রে দেশের অধিকাংশ মিডিয়ায় এমন একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি ব্রিটিশ ৪৭ দলীয় শক্তিশালী অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ (এপিপিজি) আহসান মনসুরের বিষয়ে বিভিন্ন ভিত্তিহীন তথ্যে ভরা ইমেইল পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে মনে করেন ব্রিটিশ এমপি বা সংসদ সদস্যরা। তারা মনে করছেন, আহসান এইচ মনসুর যেহেতু বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা উদ্ধারে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেহেতু তার বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ইমেইলটি পাঠিয়েছেন এক সাংবাদিক। ইমেইলটির সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল পলিসি ডাইজেস্টের একটি লিংক পাঠানো হয়েছে। সেখানে আহসান মনসুরের মেয়ের বিলাসী জীবন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সাংবাদিকের জিজ্ঞাসা, আহসান মনসুরের মেয়ের বিরুদ্ধে কেন তদন্ত করা হচ্ছে না? কিন্তু দ্য গার্ডিয়ান সেই ই-মেইল প্রেরণকারীর সাংবাদিক হিসেবে আর কোনো প্রোফাইল খুঁজে পায়নি। যে ছবি ইমেইলে ব্যবহার করা হয়েছে, তাও নকল বলে মনে হয়েছে।
এ গুজব অপতথ্য প্রচার করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার রোগ আওয়ামী লীগের অতি পুরনো। জন্মের পর থেকেই এ অপকর্ম করে দেশ, জনগণ, বিশ্ব সম্প্রদায়, বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর অনেক ক্ষতি করেছে, যা কোনো দিন পূরণ হবে না। তাদের এ স্বভাবের কারণেই প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল হামিদ স্পষ্টভাষী মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলেন, ‘ভণ্ডামি তোমারই নাম আওয়ামী লীগ।’ তাদের এ ভণ্ডামির বিকাশ ও প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভারতীয় মিডিয়া। তারা বুঝতেই চাচ্ছে না, দিন অনেক পাল্টে গেছে। এখন অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ। মিথ্যা, ভিত্তিহীন সংবাদ ও গুজব খুব সহজেই ধরা পড়ে। ভারতের সব অপকর্ম এখন মুর্হূতেই ছড়িয়ে পড়ছে সারা দুনিয়ায়। বিশেষ করে আমেরিকার তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের গ্রকের কবলে পড়ে নাস্তানাবুদ হচ্ছে ভারতের গদিমিডিয়া ও গদির মালিক নরেন্দ্র মোদি।
ইলন মাস্কের ‘গ্রক’ নাস্তানাবুদ মোদি
বিবিসি নিউজ ভারতের সূত্র প্রকাশ, সম্প্রতি ভারতে ‘ডিজিটাল সেনসেশন’ (চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী) হয়ে উঠেছে এ চ্যাটবট। অনেকেই একে বর্ণনা করেছেন ‘ফিল্টারহীন’ এবং অনেকটা ‘উন্মত্ত’ চ্যাটবট হিসেবে। ‘গ্রক’-এর ‘আনফিল্টারড’ উত্তরকে ঘিরে আলোচনার মাঝেই আরও একটা ঘটনা ঘটে। এ চ্যাটবট নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমালোচকদের কাছে দ্রুত প্রিয় হয়ে ওঠে। শুরু হয়ে যায় রাজনৈতিক প্রশ্নের ‘সুনামি’। এমনই এক প্রশ্নের উত্তরে ‘গ্রক’ প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীকে ‘নরেন্দ্র মোদির চাইতে বেশি সৎ’ বলে ঘোষণা করে বসে। তার সঙ্গে জুড়ে দেয়- ‘আমি কাউকে ভয় পাই না।’ এমনকি নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎকার নিয়েও মন্তব্য করেছে। ‘গ্রক’ দাবি করেছে, ওই সাক্ষাৎকার ‘প্রায়শই স্ক্রিপ্টেড মনে হয়।’ এমন অনেক সত্য ‘গ্রক’ প্রকাশ করছে, যার তিক্ততার প্রভাব মোদি সরকার সহ্য করতে পারছে না। আবার বন্ধও করতে পারছে না। ‘গ্রক’ তাকে সাম্প্রদায়িক, মুসলিম নির্যাতনকারী, শিক্ষাগত যোগ্য নিয়ে মিথ্যাচারকারীসহ এমন এমন বিশেষণে অভিষিক্ত করছে যার ফলে মোদি ও গদি মিডিয়ার মুখোশ উন্মোচিত পড়ছে। রিউমর স্ক্যানারে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তি আমলে না নিলেও গ্রককে উপেক্ষা করতে পারছে না।
রিউমর স্ক্যানারে প্রকাশিত প্রতিবেদন
রিউমর স্ক্যানারে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪-এর কয়েক মাসে বাংলাদেশকে নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যগুলো দেখা হয়েছে অন্তত ২৫ কোটি বার। বাংলাদেশকে নিয়ে ছড়ানো অপতথ্যে বড় অংশ সাম্প্রদায়িক বিষয়ে। রিউমর স্ক্যানার জানাচ্ছে, সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের সংখ্যা অন্তত ১০৭টি। সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের প্রচারে ভারতীয় গণমাধ্যমও ভূমিকা রেখেছে। ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই), এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, জিনিউজ, আজতক, রিপাবলিক বাংলার মতো মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোয় অপতথ্য প্রচার করা হয়। রিউমর স্ক্যানার বলছে, সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচার করেছে ভারতের বাংলা ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল ‘রিপাবলিক বাংলা’। এই তালিকায় পরের তিন অবস্থানে রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস (৯), জি ২৪ ঘণ্টা (৬) ও আজতক (৫)। চারটি করে ভুল অথবা অপতথ্য প্রচার করে পঞ্চম অবস্থানে যৌথভাবে রয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, মিন্ট, ইন্ডিয়া টুডে, টিভি নাইন, ওয়ার্ল্ড উজ ওয়ান নিউজ ও এই সময়। চিন্ময় কৃষ্ণ দাস, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন ও ছাত্রলীগ নেত্রী আতিকা বিনতে হোসাইনকে নিয়ে বেশি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। কী ছিল এএফপির সেই সন্ধানী প্রতিবেদনে, আশা করি তা এদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। তারপরও একঝলক তুলে ধরা হলো।
ফিরে দেখা: এএফপির সন্ধানী প্রতিবেদন
এএফপির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের পক্ষে লেখক হিসেবে যাদের নাম ও পরিচয় দেয়া হয়েছে ওইসব কলামে, বাস্তবে তাদের অস্তিত্বই নেই। এরকম মোট ৩৫ জন ভুয়া কলামিস্টের ৭০০ নিবন্ধ এক বছরে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে প্রশংসা করে লেখা হয়েছে। কথিত কলামিস্ট হিসেবে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে ১৭টির সঙ্গে পশ্চিমের এবং এশিয়ার বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথিত সংযোগ দেখা যায়। তাদের মধ্যে ৯ জন যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন বলে পরিচয়ে লিখেছেন, সেসব বিশ্ববিদ্যালয় এএফপিকে নিশ্চিত করেছে, ওইসব নাম তারা কখনো শোনেনি। এসব কলামিস্টের মধ্যে আটজন যেসব ছবি ব্যবহার করেছেন, সেগুলো অন্য মানুষের। তাদের মধ্যে ভারতের একজন জনপ্রিয় ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সারের ছবিও রয়েছে। কথিত লেখকদের একজনের নাম ডরিন চৌধুরী। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসা করে অন্তত ৬০টি নিবন্ধ লিখেছেন। ডরিন চৌধুরী তার পরিচয়ে একজন ভারতীয় অভিনেত্রীর ছবি ব্যবহার করেছেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছেন বলে জানিয়েছেন, সে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তার নামে কোনো তথ্য খুঁজে পায়নি। ব্যাংকক পোস্ট এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের একটি ব্লগসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন ফুমিকো ইয়ামাদা নামে একজন। তাকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলা হয়েছে। তবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার উপস্থিতির কোনো প্রমাণ নেই এবং বাংলাদেশ স্টাডিজ নামে সেখানে গবেষণার কোনো ক্ষেত্রও নেই। নেদারল্যান্ডসের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল স্টাডিজের একজন অধ্যাপক জেরার্ড ম্যাকার্থি বলেছেন, পৃথ্বীরাজ চতুর্বেদী নামে মিয়ানমারের প্রতি ‘পশ্চিমা দ্বিচারিতার’ নিন্দা করে একটি নিবন্ধ তার চোখে পড়েছে। এতে তার নামে সম্পূর্ণ বানোয়াট উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক খান বলেন, ‘বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সর্বশেষ যে ভুয়া কলামিস্টের ঘটনাটি প্রকাশ পেল, সেটা অভূতপূর্ব। এমনটি এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এটা একেবারেই নতুন। এটা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। এর আগে আমরা ভাড়াটে লেখক, দলীয় লেখক- এসব বিষয়ে জেনেছি। কিন্তু ভুয়া লেখক, অস্তিত্বহীন কলামিস্ট একেবারেই নতুন। কিন্তু এই লেখাগুলো তো কেউ না কেউ লিখেছেন। তারা কারা? তারা একটি গ্রুপ, সংঘবদ্ধ গ্রুপ।’ এ সংঘবদ্ধ চক্র যে আওয়ামী দৃর্বুত্ত সাংবাদিক এবং তাদের গুরু ভারতীয় সাম্প্রদায়িক অর্থলোভী গোষ্ঠী এতে কোনো সন্দেহ নেই। এরা ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর আরো জোরেশোরে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। তাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তির সাংবাদিক, লেখক ও কলমযোদ্ধাদের বসে থাকার সুযোগ নেই। তাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ যুদ্ধ চলছে বিরামহীনভাবে। সামরিক শক্তির প্রয়োগের যুদ্ধের মতো শুরু এবং বিরতির সুযোগ এ যুদ্ধে নেই। বিপ্লবের পক্ষের রাজনৈতিক দল, সরকার ও পৃষ্ঠপোষকদেরও দায়িত্ব কলমযোদ্ধারদের কাজের মনিটরিংয়ের সাথে সাথে সুযোগ-সুবিধা না কমিয়ে বাড়ানোর চিন্তা করা।