বিধ্বস্ত গাজায় ইসরাইলের নির্মমতা
২৭ মার্চ ২০২৫ ১৫:২২
৫০ হাজার মুসলিম হত্যা, যার ১৭ হাজারই শিশু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধবিরতির ‘স্বস্তি’ হৃদয়ে ধারণ করে গাজার বিধ্বস্ত স্তূপের বাড়িগুলোয় ফিরে আসা অনেক বাসিন্দা রাতে ছিলেন গভীর ঘুমে মগ্ন। কেউ কেউ সাহরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় (গত ১৭ মার্চ মধ্যরাতে) ইসরাইলি যুদ্ধবিমান থেকে ফেলা ‘যুক্তরাষ্ট্রের নামাঙ্কিত’ একের পর এক বোমায় হতাহত হতে থাকেন নারী-শিশুসহ সব বয়সী ফিলিস্তিনি। রাতের অন্ধকারে রক্তাক্ত মানুষের আর্তচিৎকার আর আতঙ্কিতদের দিগি¦দিক ছোটাছুটিতে আবারও ‘নির্মমতা’ নেমে আসে এ উপত্যকায়। নির্বিচার হামলায় হাতে হাতে সন্তানের ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহ নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটতে শুরু করেন অভিভাবকরা। যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন করে ইসরাইল গাজায় এভাবে মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। এরপর থেকে প্রতিদিনই অব্যাহত রয়েছে হামলা, প্রাণ হারাচ্ছে, নিরীহ-নিরস্ত্র গাজাবাসী।
মৃত্যু হতে হলে তো জীবন থাকা বাঞ্ছনীয়। অথচ নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের আদৌ সেই জীবন আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এ মৃত্যু উপত্যকার শীর্ষ কবিদের একজন মুরিদ বারগুতি। গুলি-বোমা-ক্ষুধা-নির্যাতন আর বিনা চিকিৎসায় অগুনতি মৃত্যু দেখতে অভ্যস্ত মুরিদ বারগুতি লিখেছিলেন ‘নিরাশার কালে শুধু মনে রাখি/মৃত্যুর পরও এক জীবন আছে;/ফলে কোনোই সমস্যা নেই আমার।/কিন্তু প্রশ্ন রাখি;/হে খোদা,/মৃত্যুর আগে কি কোনোই জীবন নেই?’ মুরিদ বারগুতির মতো তারই বন্ধু কিংবদন্তিতুল্য ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ লিখে যান, ‘আমার শোক মিছিলে সর্বদাই আমি আগাম হাজির: কে তবে মরে গেল কে?’ এমন সুলভ মৃত্যুর পরিসরেও গত ১৭ মার্চ মধ্যরাতের পর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ঘুমন্ত গাজাবাসীর ওপর নতুন করে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে দখলদার ইসরাইল, এতে বিস্ময়-ক্ষোভে বিমূঢ় গোটা বিশ্ব।
গাজায় নিহতের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়াল
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। গত ২৩ মার্চ হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ১৫ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে গত ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তির বাস্তবায়ন হয়। চুক্তির প্রথম ধাপ চলাকালীন দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় ধাপে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের নিরসন, হামাসের হাতে বন্দি থাকা সব জিম্মির মুক্তি ও গাজা থেকে চিরতরে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রথম ধাপের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ওই আলোচনায় কোনো আগ্রহ দেখায়নি ইসরাইল। বরং হামাসকে প্রস্তাব দিয়েছে প্রথম ধাপের মেয়াদ বাড়িয়ে বাকি জিম্মিদের মুক্তি দিতে। স্বভাবতই এতে রাজি হয়নি হামাস। ১ মার্চ প্রথম ধাপের মেয়াদ শেষে চুক্তি বাড়ানোর চাপ দিতে থাকে ইসরাইল। এ চাপের অংশ হিসেবে গাজায় সব ধরনের পণ্য আনা-নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতেও কাজ না হওয়ায় আবারও বিমান ও স্থল হামলা শুরু করে ইসরাইল।
প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বড় আকারে হামলা চালিয়েও হামাসকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইল। ২০০৭ সাল থেকে গাজা শাসন করছে ফিলিস্তিনি এ সংগঠনটি। জানুয়ারির যুদ্ধবিরতির আওতায় ৩৩ জন জিম্মি মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি ইসরাইলি কারাগারে আটক হাজারো ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পান। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, তিন ধাপে গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে ওই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠা হওয়ার কথা ছিল। তবে শুরু থেকেই এ চুক্তিকে ‘ভঙ্গুর’ বলে এসেছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি, খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ ভেস্তে গেলে গত ১৭ মার্চ মধ্যরাত থেকে আবারও বড় আকারে হামলা শুরু করে গাজার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন করে ইসরাইল।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই হামলা শুরুর পর থেকে মোট ৬৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গত ২৩ মার্চ দুপুর নাগাদ মন্ত্রণালয় জানায়, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় নিহতের সংখ্যা ৪১। পাশাপাশি নিহতের তালিকায় আরও ২৩৩ ‘নিখোঁজ’ ব্যক্তির নাম যোগ হয়। নিখোঁজ ঘোষিত ব্যক্তিদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা একটি কমিটি এ সংখ্যা হালনাগাদ করে। যার ফলে সব মিলিয়ে গাজায় নিহতের সংখ্যা অর্ধলক্ষ ছাড়িয়েছে। চিকিৎসাকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহের হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। আল-জাজিরার প্রতিবেদন মতে, মোট নিহতের ১৭ হাজারই শিশু।
এ মুহূর্তে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের লক্ষ করে হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। ইতোমধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ইসাম আল-দা’আলিস এবং হামাস পরিচালিত স্বরাষ্ট্র ও বিচারবিভাগের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এছাড়া ২৩ মার্চ গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শহরে ইসরাইলি বিমান হামলায় হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা সালাহ আল-বারদাউইল নিহত হয়েছেন।
আল-জাজিরার একজনসহ দুই সাংবাদিক নিহত
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় পৃথক ইসরাইলি হামলায় দুজন গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন আল-জাজিরার সাংবাদিক। তার নাম হোসাম শাবাত। বয়স ২৩ বছর। তিনি আল-জাজিরা মুবাশ্বেরে কর্মরত ছিলেন। গত ২৪ মার্চ সোমবার গাজার উত্তরাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় নিহত হন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা আল-জাজিরাকে জানান, বেইত লাহিয়ার পূর্বাংশে হোসাম শাবাতকে বহনকারী গাড়ি লক্ষ করে হামলা হয়। গাজার মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম বলেন, এর আগেও অন্য একটি ইসরাইলি হামলায় হোসাম শাবাত আহত হয়েছিলেন। তাও গাজায় সংবাদ প্রতিবেদন করা অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি। তারেক বলেন, কোনো ধরনের পূর্বসতর্কতা ছাড়াই হোসামের গাড়িকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। ২৪ মার্চ দিনের শুরুতে গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিস এলাকায় আরেকটি ইসরাইলি হামলায় মোহাম্মদ মানসুর নামে আরেক সাংবাদিক নিহত হন। তিনি ‘প্যালেস্টাইন টুডে’ নামের একটি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ছিলেন।