নারী নির্যাতন বন্ধে প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:২৫
কন্যা, জননী ও জায়ারূপে নারী আমাদের আদরের, শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার অনুষঙ্গ। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার দেশ। নারীমুক্তির অগ্রদূত আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা.। ইসলাম নারীকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। পবিত্র কুরআনে সূরা তাওবার ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভালো কাজে আদেশ দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবনযাপন করে। এদেরই ওপর আল্লাহ তায়ালা অচিরে দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার বহুল উচ্চারিত এ পঙক্তিমালা ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ তিনি যে সত্য উচ্চারণ করেছেন, তাতে ইসলামে নারীর মর্যাদার কথাই তিনি কাব্যময় ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। যেদেশের শতকরা ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ মুসলিম দাবি করেন, সেদেশ হবে নারীর জন্য এক নিরাপদ আবাস। হোক হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনো বিশ্বাসে বিশ্বাসী সেই নারী- তারা থাকবেন নিরাপদ। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশে শিশুরাও নির্যাতিত হচ্ছে।
শিশুরা পাশবিক লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। জাহিলিয়াতের সেই অন্ধকার যুগের মতো পিতার কাছেও নিরাপদ নয় কন্যাশিশু। ‘১০ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবা গ্রেপ্তার।’ (ডেইলি স্টার, ১০ মার্চ ২০২৫)। উল্লেখ্য, নির্যাতনের শিকার কন্যা ও বাবা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী। এটি এমন একটি অপরাধ, যা সকল ধর্মে শাস্তিযোগ্য। অন্য একটি ঘটনাও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বরগুনায় মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন মেয়েটির বাবা। সেই বাদীর লাশ পাওয়া গেছে বাড়ির কাছের একটি ঝোপে। বাড়ির পাশে ঝোপ থেকে কাদামাখা অবস্থায় বাদীর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনা ঘটেছে সম্প্রতি বরগুনা পৌর শহরে। বাদীর স্ত্রী বলেন, ‘ধর্ষণ মামলার ১ নম্বর আসামি শ্রীজিৎ জেলহাজতে আছে। ওই আসামির বন্ধু ও তার স্বজনরা আমার স্বামীকে হত্যা করতে পারে।’ (জুম বাংলা, ১২ মার্চ ২৯২৫)। তবে সম্প্রতি দেশে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা মাগুরার আছিয়ার মৃত্যু। নিজ বোনের শ্বশুরের লালসার শিকার আট বছরের আছিয়া ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। সারা দেশে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, মানববন্দন ও প্রতিবাদ চলছে। এখন প্রশ্ন হলোÑ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি ঘরে ঘরে মোতায়েন করে অপরাধ দমন করতে পারবে? অবশ্যই তা সম্ভব নয়। তাহলে সমস্যার সমাধান কী? মানুষ কেন পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারের ওপর দায় চাপাচ্ছে? স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করছে? তাদের দাবি অযৌক্তিক নয়। কারণ কোনো ঘটনার দায়ই সরকার ও প্রশাসন এড়াতে পারে না। ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ সব অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব অবশ্যই সরকার ও প্রশাসনের। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার করে কঠোর দৃষ্টামূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের ভুল তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধীরা যেন কিছুতেই ছাড়া না পায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। বিচারহীনতা ও বিচারে দীর্ঘসূত্রতাও আমাদের কাম্য নয়।
আমরা মনে করি, এছাড়া সরকারের আরেকটি বড় দায়িত্ব হলো, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিকদের সুশিক্ষিত করা। শুধু কেরানি তৈরি নয়, সৎ, যোগ্য, দক্ষ নাগরিক তৈরির মতো শিক্ষাব্যবস্থা অপরাধ দমনে অপরিহার্য। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের এদেশে ইসলামের সুমহান আদর্শের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো খুব সহজ। সাথে সাথে অপরাধ দমনে ইসলামের বিধান বাস্তবায়ন করলে ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ সব অপরাধ নির্মূল হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী, মদিনায় কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর একজন ষোড়শী স্বর্ণালঙ্কারসহ সানা থেকে হাজরা মাউত একাকী হেঁটে যেতেন নির্ভয়ে। তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করতেন না। আমরা বিশ্বাস করি, সেই সুদিন আবার ফিরে আসবে, যেদিন ইসলামের সুমহান আদর্শের আলোয় আমাদের সোনার বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। নারী নির্যাতন বন্ধে নৈতিক শিক্ষা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজনীয়তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয় উপলব্ধি করবেন।