চীন সফরে বিনিয়োগ-বন্যা : তুলসী কার্ড কাজ করছে না : ভারতপন্থা দায় হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে

ইউনূসের কৌশলে অস্বস্তি দিল্লির


২০ মার্চ ২০২৫ ১৩:৩৮

॥ ফারাহ মাসুম॥
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার পতিত স্বৈরাচারকে বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিক করে তোলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর দ্রুত নির্বাচনের চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এ কৌশলের অংশ হিসেবে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভর করতে চাইছে বিজেপি সরকারের নীতি নির্ধারকরা। কিন্তু এ কৌশল বাংলাদেশকে অধিকতর চীন-ঘনিষ্ঠ করার আশঙ্কা ভারতের বিভিন্ন বিশ্লেষকের। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ডকে দিয়ে ভিন্ন বার্তা দিতে চেয়েছে প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু ঢাকা সফররত মার্কিন সিনেটর ও হোয়াইট হাউসের মুখপাত্রের বক্তব্যে বিষয়টি ভিন্ন দিকে টার্ন নিয়েছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রধান উপদেষ্টার কৌশলী পদক্ষেপ এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট হবার ব্যাপারে সংস্থার মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের ঘোষণা জাতীয় রাজনীতিতে মোড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রফেসর ইউনূসের এ কৌশলে বাংলাদেশের রাজনীতির বিষয়ে প্রতিবেশী ভারত নেতিবাচক অবস্থান অব্যাহত রাখলে এখানকার ক্ষমতার পরিবর্তনে দিল্লি প্রাসঙ্গিকতা হারাতে পারে। এতে একপর্যায়ে ভারতপন্থি রাজনীতি বাংলাদেশে করার বিষয়টি একটি দায় হিসেবে পরিণত হতে পারে।

ইউনূসের বিশাল পদক্ষেপ : সরকার পরিচালনার জটিল কাজের সাথে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের একটি বড় পরিকল্পনা হলো অর্থনৈতিক গতি ও সমৃদ্ধি আনার পথে একটি বড় পদক্ষেপ নেয়া। এরই অংশ হিসেবে তিনি ইউরোপ-আমেরিকার বড় বিনিয়োগকারীদের সাথে যোগসূত্র এর মধ্যেই তৈরি করেছেন। সাম্প্রতিক দাভোস সম্মেলনে বহুসংখ্যক বিনিয়োগকারী প্রধান উপদেষ্টার সাথে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পশ্চিমা দেশের পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশের সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রযুক্তিবিষয়ক কর্মকর্তা বিশ্বের এক নম্বর ধনী ইলন মাস্ক অধ্যাপক ইউনূসের সাথে কথাবার্তা বলে বাংলাদেশে তার বিনিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন। মাস্কের স্টারলিংক দুয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে পারেন। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিপুলভাবে আসতে শুরু করেছে। আমদানি এলসির ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার পরও রিজার্ভ ১০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট সংকট কেটে গিয়ে অভূতপূর্ব এক গতি আসবে এবং তরুণদের ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি এখানে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের স্বার্থে সরকার ও রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যও ভূমিকা রাখবে। তুলসী গ্যাবার্ডের তুলনায় ইলন মাস্কের প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসনে অনেক বেশি। মাস্কের বিনিয়োগ বাংলাদেশে ইউনূস সরকারের স্থিতি ও এগিয়ে যাবার একটি গ্যারান্টির মতো কাজ করতে পারে।

তুলসীর মন্তব্য ও ঢাকা-মার্কিন সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ডের বাংলাদেশ সংক্রান্ত মন্তব্য নানা মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এটিকে ‘গুরুতর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামিক খেলাফত ধারণার সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে যারা বাংলাদেশে আসছেন, তারা সবাই ডেমোক্র্যাটিক পার্টির। এতে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ভুল বার্তা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির সাথে আরো জোরালোভাবে কাজ করা দরকার। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিরাও ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্প প্রশাসনে দায়িত্ব নেয়ার আগেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যুতে কথা বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নির্বাচনে জেতার আগে এবং পরে বাংলাদেশ ইস্যুতে টুইট করেছেন। তুলসী গ্যাবার্ডের সাথে ভারতের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রাজনীতি থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই সংখ্যালঘু ইস্যুতে সমস্যা রয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সম্পদের ওপর আক্রমণ নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়েছে। যে ক্ষমতায় থাকে, সে সবসময় এ ধরনের প্রচারণার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করতে চায়। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অধিকার আন্দোলনকারী প্রিয়া সাহা অভিযোগ করেছিলেন, তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান দেশ থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে। তৎকালীন সরকার তা জোরালো প্রত্যাখ্যান করেছিল। এবারো সরকার একটি রক্ষণাত্মক ভূমিকা নিয়েছে। বস্তুত আমাদের এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবেÑ যাতে বলা যাবে যে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছে না এবং সেটা দৃশ্যমান হতে হবে। কেননা দেশের বাইরে থেকে কেউ এ ব্যাপারে অভিযোগ তুললে তাতে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

গত আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পর থেকে ভারত সরকার ও সে দেশের গণমাধ্যম বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে জোরালোভাবে প্রোপাগান্ডা শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বীকার করে নিয়েছে যে, গণঅভ্যুত্থানের পর জনরোষের কারণে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে এবং এর মধ্যে কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও ছিল। কিন্তু এ সময় হিন্দুদের লক্ষ করে আক্রমণ চালানো হয়নি। বরং রাজনৈতিক দলসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংশ্লিষ্টরা সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ভারতেও সংখ্যালঘু; বিশেষ করে মুসলিমদের অবস্থা বেশ খারাপ। তুলসী গ্যাবার্ড বাংলাদেশে এলে হয়তো এখানকার সাংবাদিকরা ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু গ্যাবার্ডের সাথে সাক্ষাৎকারে ভারতের গণমাধ্যম এ প্রশ্ন তুলবে না। তবে আমাদের সমস্যাটা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং ইসলামিক খেলাফতকে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড যে মন্তব্য করেছেন, সেটি ‘গুরুতর’ বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তবে (অর্থ) উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, তুলসীর মন্তব্যে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।
গত ১৭ মার্চ সোমবার দিল্লিতে এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ সম্পর্কে তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ক্যাথলিক ও অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান দুর্ভাগ্যজনক নিপীড়ন, হত্যা ও অন্যান্য নির্যাতন যুক্তরাষ্ট্র সরকার, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের উদ্বেগের একটি প্রধান ক্ষেত্র। ট্রাম্পের নতুন মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে আলোচনা শুরু করেছে। তিনি বলেন, ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের হুমকি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বৈশ্বিক তৎপরতা একই আদর্শ ও লক্ষ্য দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই আদর্শ ও লক্ষ্য হলো ইসলামপন্থী খিলাফতের মাধ্যমে শাসন করা। তারা সন্ত্রাস ও অন্যান্য সহিংস পন্থায় এটা বাস্তবায়নের পথ বেছে নেয়। এতে অন্য যেকোনো ধর্মের মানুষের ওপরও প্রভাব পড়ে।

তুলসী গ্যাবার্ডের মন্তব্য বিভ্রান্তিকর এবং বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ও সুনামের জন্য ক্ষতিকর উল্লেখ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইসলাম চর্চার জন্য সুপরিচিত এবং চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। গ্যাবার্ডের মন্তব্য কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ বা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে করা হয়নি। তার বক্তব্যে পুরো বাংলাদেশকে অন্যায় ও অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশের মতো, বাংলাদেশও চরমপন্থার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারত্বে আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সংস্কার এবং অন্যান্য সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছে। বাংলাদেশকে ভিত্তিহীনভাবে ইসলামিক খেলাফতের সাথে যুক্ত করার অর্থ হলো এ দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কঠোর পরিশ্রমকে খাটো করে দেখা, যারা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামিক খেলাফত ধারণার সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে সরকার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
তুলসী গ্যাবার্ড একজন মার্কিন রাজনীতিবিদ এবং সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। তিনি গত ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বহু সংস্কৃতির পরিবারে বেড়ে ওঠা গ্যাবার্ড হিন্দু ধর্মের অনুসারী। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ওপর নিপীড়নে তিনি সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিতি। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনে গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে নিয়োগ পাওয়া তুলসী একসময় ডেমোক্রেট ছিলেন, পরে তিনি রিপাবলিকান দলে যোগ দেন। তার মা হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করলে জন্মসূত্রে তুলসীও হিন্দু ধর্ম পালন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইসকনের একজন উপদেষ্টা ছিলেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি নেতৃত্বের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন। ভারতীয় হিন্দুদের ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন দেয়ার জন্য ইসকনকে নিয়ে কাজ করে তুলসী ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন। তুলসী দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ভারত সফরে আসেন। ভারতে এসে বাংলাদেশ নিয়ে সংবেদনশীল মন্তব্য করেন।

তুলসীর মন্তব্য নিয়ে শোরগোলের মধ্যে মার্কিন সিনেটর গ্যারি পিটার্স (ডি-এমআই) গত ১৮ মার্চ মঙ্গলবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দুই নেতা পারস্পরিক স্বার্থের বিষয় এবং দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে সম্পর্ক গভীর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। সিনেটর পিটার্স অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ, গুরুত্বপূর্ণ কমিশনের রিপোর্ট এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। প্রধান উপদেষ্টা তাকে জানান, রাজনৈতিক দলগুলো কম সংস্কারে রাজি হলে সরকার ডিসেম্বরে নির্বাচন করবে। তবে দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংস্কারের বড় প্যাকেজ চাইলে কয়েক মাস পরেই সাধারণ নির্বাচন হবে।

অধ্যাপক ইউনূস জানান, রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত সংস্কারে সম্মত হলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে। তিনি বলেন, ‘জুলাই চার্টার দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।’
পিটার্স সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে একটি মসৃণ গণতান্ত্রিক উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। সিনেটর পিটার্স বলেন, ডেট্রয়েট শহরসহ মিশিগানে তার নির্বাচনী এলাকায় অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাম্প্রতিক মাসগুলোয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়েও প্রচুর পরিমাণে ভুল তথ্য রয়েছে। এ ভুল তথ্যের কিছু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে, যা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তিনি বলেন যে, গত বছরের আগস্টে পরিবর্তনের পরে সংখ্যালঘুদের ওপর; বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর আক্রমণগুলো রাজনৈতিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তবে তার সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। অধ্যাপক ইউনূস মার্কিন সিনেটরকে বাংলাদেশের শহর ও শহর পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রকৃত তথ্য জানতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও কর্মীদের দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
দুই নেতা সামাজিক ব্যবসা, দারিদ্র্যবিহীন একটি বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি বিশ্বের দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ নিয়েও আলোচনা করেছেন।

চীনা সম্পর্কের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগ এবং সমর্থনদানের মতো আরেকটি বড় দেশ হলো চীন। প্রফেসর ইউনূস ২৬ মার্চ চীন সফরে যাচ্ছেন। তিনি কৌশলগতভাবে পশ্চিমা বলয়ে থাকলেও চীনা বিনিয়োগ গ্রহণের বিষয়ে এর মধ্যে সবুজ সংকেত পেয়েছেন বলে মনে হয়। প্রধান উপদেষ্টা চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক করবেন ২৮ মার্চ। এর মধ্যে মোংলা বন্দরের উন্নয়নে ৪ হাজার কোটি টাকার চীনা বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নের ব্যাপারে ইতিবাচক উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে। চীন সফরকালে আরো কয়েকটি বৃহদাকার প্রকল্পে বিনিয়োগ ছাড়াও চীনা শিল্প বাংলাদেশে পুনঃস্থাপন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন প্রধান উপদেষ্টা।

চীনের সাথে ইতিবাচক আলোচনা হলে প্রফেসর ইউনূস রোহিঙ্গাদের আগামী বছর ঈদের আগে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে পারেন। প্রফেসর ইউনূসের প্রতি ভারতের শত্রুতামূলক নীতির বিপরীতে পশ্চিমা বলয়কে আস্থায় রেখে চীনা বিনিয়োগ গ্রহণ টেকসই সংস্কারের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হতে পারে।
ড. ইউনূস চীনের কাছ থেকে শক্ত সমর্থন পেলে সেটি হবে এমন একটি দেশের সমর্থন যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত স্থানগুলোর মধ্যে গণ্য করে। চীন যদি বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে তার পা শক্তিশালী করতে পারে, প্রধানত বিনিয়োগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে, ভূ-রাজনীতিতে পারস্পরিক সুবিধা অনুসরণ করতে দোষ কী? হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের সাথে দেখা করার পর বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্রথম দৃশ্যমান রাউন্ড। তিনি জামায়াতে ইসলামী নেতাদের সাথে একটি প্রেস কনফারেন্স করেছিলেন, যে দলটিকে হাসিনা নিষিদ্ধ করেছিল। চীন তখন থেকে ইসলামপন্থি দলগুলোর নেতাসহ কয়েকটি প্রতিনিধিদলের সফরের আয়োজন করেছে।

ড. ইউনূসের চীন সফরটি পারস্পরিক সুবিধা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথমত, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা করা এবং দ্বিতীয়ত, হাসিনার অধীনে একটি অসন্তোষজনক অবস্থায় রেখে যাওয়া অংশীদারিত্বকে নতুন আকার দেওয়া। ইউনূস সম্ভবত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে ব্যাপকভাবে উন্নীত করবেন। গত জুলাইয়ে হাসিনার সফরের সময় যৌথ বিবৃতিতে এমন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল কিন্তু দিল্লির বাধায় তা হতে পারেনি।

চীনের জন্য, এটি কেবল বাংলাদেশের বিষয়ে নয়, বড় আকারের বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা, ভারতের বিরুদ্ধে তার আঞ্চলিক অবস্থান আরও গভীর করা, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পের সম্প্রসারণ এবং বেইজিংপন্থী ঝোঁককে একত্রিত করার জন্য চুক্তিগুলো পুনরায় আলোচনা করার বিষয় থাকবে। এ সফর একটি ভূ-রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মঞ্চ তৈরি করতে পারে, যা ঢাকার বাইরেও চীনের স্বার্থে কাজ করে। বিনিময়ে ইউনূস এক বিশ্ব নেতার সাথে একটি দরকারি ফটো-অপ করবেন, যা দেশে এবং বিদেশে তার স্বীকৃতি মজবুত করবে।

একটি তাৎপর্যপূর্ণ মূল্যায়ন
তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের মতে, গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধ শক্তি বাংলাদেশে একটি ছদ্মযুদ্ধ চালাচ্ছে। তিনি নিজের ফেসবুকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভায় নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও সহিংসতা নিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমরা সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলাম, সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে। বিভিন্ন জায়গায় অপরাধীদের গ্রেফতার চলমান এবং বিচারের কাজ দ্রুত ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যেও সরকার তৎপর।
ছাত্র-যুবকদের জন্য লক্ষাধিক চাকরির ব্যবস্থা ও তরুণদের জন্য জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ও সাম্প্রতিক আলোচনায় উত্থাপিত হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হবে। সরকার জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাবে এবং সে লক্ষ্যে সমন্বিত তৎপরতা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও বিচার, প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা, জুলাই শহীদ ও আহতদের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার সক্রিয় ও সফল। কিন্তু সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী শ্রেণি ও মিডিয়ার মধ্যকার গণঅভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর বিরোধ, স্বার্থান্বেষা ও মতান্ধতা অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধ শক্তির ঐক্যবদ্ধ হয়ে ক্রমশ উত্থান সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে।
সরকার যুদ্ধে লড়ছে গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত একটি শক্তিশালী দেশি-বিদেশি জোটের বিরুদ্ধে। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল জনগণের মধ্যকার অভ্যুত্থানের ঐক্যকে নস্যাৎ করতে উঠেপড়ে লেগেছে, সফলও হচ্ছে। সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল ও অভ্যুত্থানের বিভিন্ন শক্তিকে মুখোমুখি না করাই আমাদের জন্য আখেরে ভালো হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশে এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সে যুদ্ধ অন্য জায়গা থেকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। একটা কন্ট্রোলরুম থেকে সে যুদ্ধের প্রতি সপ্তাহ ও দিনের কর্মসূচি চালু করা হয় ও মনিটর করা হয়। আমাদের সে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়তে হবে।
রাষ্ট্র সংস্কার, গণহত্যা ও লুটপাটের বিচার, প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনরুজ্জীবন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরসহ নানা বিষয় আমাদের লক্ষ্য থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এ সরকারের আমলে এদেশকে গড়ে তোলার সুযোগ ও সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলেই ভিনদেশ থেকে দ্রুততার সাথে সরকার পরিবর্তনের প্রেস্ক্রিপশন আসছে। কিন্তু নির্বাচন যথাসময়েই হবে এবং জুলাই সনদের ভিত্তিতে এ দেশে নির্বাচনের আগেই রাষ্ট্র সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটবে এবং খুনি, ধর্ষক ও লুটেরাদের বিচার হবে।

ভবিষ্যৎ পথনকশা
প্রধান উপদেষ্টা আগামী ডিসেম্বর বা পরবর্তী জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন। এ বিষয়ে গঠিত সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে। ২০ মার্চ বৃহস্পতিবার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ঈদের অবকাশ শেষে ১০ দিনের বিরতির পর তা আবার শুরু হবে। এর মধ্যে বড় দলগুলোও সংস্কার বিষয়ে তাদের মতামত জানিয়ে দেবে।
সংস্কার নিয়ে সব দল যেসব বিষয়ে একমত হবে তা বাস্তবায়ন নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করবে সরকার। এরপর আংশিক একমত হওয়া বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্র ঠিক করা হবে। এভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি আর সংস্কার কাজ একসাথে চলতে থাকবে। ধারণা করা হচ্ছে সংস্কার বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো সংশ্লিষ্ট হলে বিরোধের অনেক কিছুই নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। ফলে জরুরি সংস্কারের কাজগুলো সম্পন্ন করে জুনের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠান কঠিন হবে না।
এদিকে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে জাতিসংঘের সংলাপে জড়িত হবার প্রস্তাবে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘ রাষ্ট্র সংস্কারে যুক্ত হলে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মতো ক্ষেত্র থেকে চাপ প্রয়োগের সুযোগ যেমন সীমিত হয়ে পড়ে, তেমনিভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বেপরোয়া চাপ দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসের চার দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের গঠনমূলক আবহ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রগঠন কার্যক্রমে জাতিসংঘ জড়িত হলে অস্থিরতা সৃষ্টির বিদেশি ইন্ধনে যে তৎপরতা চলছে, সেটিও কমে আসবে বলে ধারণা করা যায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে যেভাবে জাতিসংঘকে সংশ্লিষ্ট করতে পেরেছেন, সেটি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূসের দ্বারাই সম্ভব বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ।
সংস্কার ছাড়া দ্রুত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা ও চাপ দুটিই এখন কমতে শুরু করেছে। জরুরি সংস্কারের পর নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নের একটি টেকসই ব্যবস্থার জন্য কল্যাণকর হতে পারে। ইলন মাস্কের স্টার লিংকের বিনিয়োগ এবং প্রফেসর ইউনূস চীন সফর শেষ করার পর বাংলাদেশে এক নতুন ইতিবাচক ধারার সূচনা ঘটবে বলে আশা করা যায়।