একান্ত সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

আমরা দেশটাকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই


২০ মার্চ ২০২৫ ১৩:০৫

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমরা দেশটাকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহায্য করবেন। মনোবল, ধৈর্য, চূড়ান্ত ঐক্য, পবিত্র কুরআনের ভাষায় আমি যদি বলি, বুনিয়ানুম মারসুস সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য। বিশেষ করে ফ্যাসিস্টবিরোধী যে জনমত, সেটা যদি অটুট থাকে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ কেেরছন হারুন ইবনে শাহাদাত
সোনার বাংলা: ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গণবিপ্লবকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম আম্মাবাদ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার বিপ্লব আমি বিশ্বাস করি- আল্লাহ তায়ালার খাস মেহেরবানি। বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ৩৬ জুলাই পূর্ববর্তী স্বৈরশাসকের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারা মহান আল্লাহর দরবারে জুলুম-নির্যাতন থেকে মুক্তির জন্য দোয়া করেছেন, আল্লাহ তায়ালা জনগণের দোয়া কবুল করেছেন। তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসকের পতন ঘটিয়েছেন- এটাই আমার প্রথম জবাব। এরপর বলব, “কুলিল্লাহুম্মা মালিকাল মুলকি তু’তিল মুলকা মানতাশাউ ওয়া তানযিউল মুলকা মিম্মানতাশাউ ওয়াতু ইযযু মানতাশাউ ওয়াতু যিল্লু মানতাশাউ বিয়াদিকাল খাইর। ইন্নাকা আলা কুল্লি সাইয়্যিন কাদীর।” আল-কুরআনের সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.কে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন- বলে দিন, হে আল্লাহ তায়ালা! আপনিই সার্বভৌম শক্তির মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন এবং যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন। আপনার হাতেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনিই সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।” আল্লাহ তায়ালার এ চিরন্তন বিধানের ভিত্তিতেই এ পরিবর্তনটা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা নাজমের ৩৯নং আয়াতে বলেছেন, “লাইসা লিল ইনসানে ইল্লা মা সাআ” অর্থাৎ মানুষ যা চেষ্টা করে, তার ভিত্তিতেই তিনি তাদের দান করেন। মানুষ শুধু চেষ্টাই করতে পারে ফলাফল দেয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। অন্যত্র বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সেই জাতি তার নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করে। কুরআন মজিদের এ দিগদর্শনের আলোকে বলা যায়, এদেশের মানুষ চেষ্টা করেছে, নিষ্পাপ শিশু-কিশোরসহ অনেক মজলুম মানুষ কোনো অপরাধ না করেও জুলুমের শিকার হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন। আমি মনে করি, তাদের ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা পরিবর্তনটা দিয়েছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, আবাবিল পাখি দিয়ে আল্লাহ তায়ালা হস্তি বাহিনীকে যেভাবে ধ্বংস করেছিলেন, সাহায্য করেছিলেন, আমাদেরও তিনি সেভাবে সাহায্য করেছেন। কারণ ফ্যাসিস্ট শক্তি যেভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র সাজিয়েছিল, বাইরের শক্তি (ভারতকে বুঝিয়েছেন) যেভাবে ফ্যাসিস্ট শাসন টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে, তাতে এদেশের মানুষ চিন্তাও করতে পারেনি, এত দ্রুত একটা পরিবর্তন আসবে। সবই আল্লাহ তায়ালার বিশেষ মেহেরবানিতেই সম্ভব হয়েছে- আমি বিশ্বাস করি।
সোনার বাংলা: বিপ্লবের পর সবকিছু যথাযথভাবে চলছে কি?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: যেকোনো দেশেই বিপ্লবের পর কিছু সমস্যা হয়ই। আমাদের দেশের সমস্যাগুলো হলো, ফ্যাসিস্ট সরকার যাদের দিয়ে দেশ পরিচালনা করে, জনগণের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায়, সেসব ক্ষতিকর লোকগুলো রাষ্ট্র পরিচালনায় নানাভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তারা বিভিন্ন জায়গায় তাদের লোক যেভাবে সেটআপ করে গেছে। যেমন: সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাদের দলীয় লোক এবং তাদের আনুগত্য করে এমন লোক থাকায় যত সহজে বিপ্লবের সুফল পাওয়ার কথা ছিল, তা সম্ভব হয়নি। এখানে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে- যারা বেশি অন্যায় করেছে এবং পরিচিত, তারা পালিয়ে গেছে, নয়তো পালিয়ে আছে, সামনে আসছে না। কিন্তু যারা স্বৈরাচারের অন্যায় কাজে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু পরিচিত নয়, তারা এখনো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছে। যার কারণে বিপ্লবের পর যেসব ভালো পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। বিপ্লবের পর এর সুফল পেতে রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কারের প্রয়োজন হয়। সেই সংস্কারের কাজটি শম্বুকগতিতে হচ্ছে।
সোনার বাংলা: আপনার দৃষ্টিতে এ ধীরগতির কারণ কী?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: এ শম্বুকগতির তিনটি কারণ- ১. স্বৈরশাসক তার ১৭ বছরের দুঃশাসনের সময় যাদের নিয়োগ দিয়েছে, তাদের সেসব দলীয় লোকই এ কাজের দায়িত্ব পেয়েছে। এখানে বিপ্লবের ও সংস্কারের পক্ষের লোক নেই। ২. জামায়াতে ইসলামী বা বিএনপির যারা স্বৈরশাসনের সময় সরকারি বিভিন্ন চাকরির চেষ্টা করেছেন, মেধা বাছাইয়ে তারা উত্তীর্ণ হলেও পুলিশের তদন্তে তাদের বাদ দিয়েছে। এ কারণে বিপ্লবের পক্ষের লোক প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পাওয়া যায়নি এবং যাচ্ছে না। তাই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার বিপ্লবের পক্ষের লোকদের বসাতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশ চালানো কষ্টকর হবে। ৩. প্রশাসন, পুলিশ, আর্মিসহ স্বৈরাচারের দোসররা অপকর্মের সহযোগী হিসেবে তাদের অপকর্ম প্রকাশের ভয়ে সরকারকে যথাযথভাবে সহযোগিতা করছে না। তবে আশার কথা হলো- দেশের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করছে। তাই তাদের কোনো ষড়যন্ত্র সফল হচ্ছে না। ষড়যন্ত্রকারীরা প্রকাশ্যে বিরোধিতার সাহস পাচ্ছে না। আশা করি, এ ঐক্য অটুট থাকলে পারবেও না।
সোনার বাংলা: বিপ্লব সফল করতে আমাদের করণীয় কী?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: আপনার আগের প্রশ্নের উত্তরে এ প্রসঙ্গে অনেক কথা এসে গেছে। তবে সমাধানের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। জামায়াতে ইসলামী একটি পরামর্শভিত্তিক সংগঠন। সবার সাথে পরামর্শের ভিত্তিতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই এবং কথা বলি। তবে আমি বিপ্লব সফল করতে প্রথমত, আত্মবিশ্বাস আমাদের রাখতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একটা বিরাট জুলুমের হাত থেকে আমাদের অর্থাৎ এদেশের জনগণকে রক্ষা করেছেন। এ জুলুম থেকে বাঁচার জন্য আমরা দেশটাকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তায়ালা আমাদের সাহায্য করবেন। মনোবল, ধৈর্য, চূড়ান্ত ঐক্য, পবিত্র কুরআনের ভাষায় আমি যদি বলি, বুনিয়ানুম মারসুস সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য। বিশেষ করে ফ্যাসিস্টবিরোধী যে জনমত, সেটা যদি অটুট থাকে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয়ত, আপনি জানেন যে, চট্টগ্রামে এডভোকেট আলিফ শহীদ হয়েছেন। প্রতিবেশী একটি দেশের প্ররোচনায় এ ঘটনা ঘটে। তাদের গড়া সংগঠন ইসকনের নাম ব্যবহার করে সারা দেশকে অস্থির করার একটি চক্রান্ত শুরু হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবেশী দেশের সেই চক্রান্ত এদেশের সর্বস্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ এ শপথ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, ‘আমরা জীবন দেব, তবু আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব। দেশের এক ইঞ্চি জমিন শত্রুর হাতে তুলে দেব না।’ সকল রাজনৈতিক দল, মিডিয়া, সব ধর্মের মানুষ সবাই একবাক্যে এক কথা বলেছে। এটি আমাদের দেশের জন্য একটি প্লাস পয়েন্ট। আমি মনে করি, সমস্যা সমাধানের জন্য এ নীতি কাজে লাগাতে হবে। আমি আরো মনে করি, প্রচারমাধ্যমে এজন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রচারমাধ্যম জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নেতিবাচক প্রচারণায় মানুষের মনোবল ভেঙে যায়। তাই প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সকল মিডিয়াকে ইতিবাচক প্রচারের কাজে এগিয়ে আসতে হবে। বিপ্লবকে সফল ও টেকসই করতে ভূমিকা পালন করতে হবে। আমি আর একটি পয়েন্ট এক্ষেত্রে যোগ করতে চাই, বিশ্বের যেসব দেশ স্বাধীনতা বা বিপ্লব-পরবর্তীতে দ্রুত উন্নতি করেছে, তারা প্রত্যেকে তাদের জনগণকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করেছে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ তারপর সেকেন্ডারি প্রশিক্ষণ- এভাবে ধাপে ধাপে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
এছাড়া দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সকল নাগরিক; এমনকি ইসলামী অনুশাসন মেনে নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আগ্রাসন মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। আল্লাহর কাছে আমরা সাহায্য চাই, তিনি অবশ্যই সাহায্য করেন এবং বিজয় দান করেন। কারণ আল্লাহর সাহায্য এলেই বিজয় হয়, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বিজয়ের পর নাজিল করেন- ১. ইজা-জাআ নাছরুল্লা-হি ওয়াল ফাতহ। ২. ওয়ারাআইতান না-ছা ইয়াদখুলূনা ফী দীনিল্লা-হি আফওয়া-জ্বা। ৩. ফাছাব্বিহ বিহামদি রাব্বিকা ওয়াছতাগ্ফিরহ; ইন্নাহু কা-না তাওয়্যা-বা। অর্থাৎ ১. আসিবে যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়, ২. দেখিবে তুমি মানুষকে আল্লাহর দীন দলে দলে গ্রহণ করতে, ৩. তখন তোমার রবের প্রশংসা তাসবীহ পড় এবং ক্ষমাপ্রার্থনা কর। তিনি তাওবা কবুলকারী।’ বিজয়ের জন্য আল্লাহর সাহায্য অপরিহার্য। তাই তার সাহায্য চাইতে হবে। তার বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। বড় গুনাহ অর্থাৎ কবীরাহ না করা। দেশের মানুষের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সততা এবং আল্লাহভীতি তাকওয়া বৃদ্ধির কর্মসূচি নেয়া। মানুষকে যদি সরকারি-বেসরকারিভাবে আখিরাতমুখী করা যায়, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনায় উদ্বুদ্ধ করা যায়। তাহলে আমরা অবশ্যই আল্লাহর সাহায্যে সব বাধা অতিক্রম করতে পারব বলে বিশ্বাস করি।
সোনার বাংলা: সংস্কার এবং নির্বাচন প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: প্রত্যেকটি দল তাদের নিজেদের মতামত ব্যক্ত করবেই। কেউ সংস্কারের আগে নির্বাচন চাচ্ছে, কেউ স্থানীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় নির্বাচন চাচ্ছে। এভাবে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কাজের উদ্যোগ নিলে যে রাজনৈতিক দল যেটা ভালো মনে করে, তারা যে মতামত দেয় এবং দেবে। অমৎবব ঃড় ফরভভবৎ (ভিন্নমত পোষণ করা)-এটা দোষের কিছু নয়। বরং সবার গণতান্ত্রিক অধিকার। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হলো, সবাইকে নিয়ে বসে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিষয়টির সমাধান করা। মেজরিটি মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া।
সোনার বাংলা: ফ্যাসিবাদমুক্ত উন্মুক্ত পরিবেশে মাহে রমজান উদযাপনের সুযোগ আমরা এবার পেয়েছি। এ সুযোগ আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে আমাদের পরিকল্পিতভাবে মাহে রমজানের প্রথম থেকেই অগ্রসর হওয়ার দরকার ছিল। মাহে রমজান তো চলেই যাচ্ছে। প্রথমত, রমজান মাসকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা সরকারের পক্ষ থেকেই দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু এদেশের সরকারগুলো ইসলামী আদর্শ ধারণ না করার কারণে অতীতেও এ বরকতময় মাসকে কাজে লাগাতে পারেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও ইসলামী নয়, তাই তারাও সে চিন্তা বা পরিকল্পনা নিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। আমরাও আসলে যথাযথ উদ্যোগ নিতে পেরেছি বলে মনে করি না। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্মভীরু। মাহে রমজানে সাহরির জন্য রাত্রিজাগা, রাতে কিয়ামুল লাইলসহ বিভিন্ন ইবাদতের আয়োজন তারা স্বউদ্যোগেই করে। ইসলামের আলোচনাও তারা এ সময় শুনতে চায়। এ ব্যাপারে আমরা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জনগণের উদ্যোগে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকি। তবে মাহে রমজানের পরিবেশ; বিশেষ করে দিনের বেলা হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং অশ্লীলতার প্রসার ঘটায় এমন আয়োজন বন্ধ রাখা, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে পানাহার বন্ধসহ মাহে রমজানের পবিত্রতার পরিপন্থি বিষয়গুলো সরকারি ও সামাজিকভাবে চিহ্নিত করে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে টেলিভিশন, রেডিও, পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমকে কাজে লাগালে, আমার মনে হয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দেখা যায়, মাহে রমজান উপলক্ষে তাদের অনুষ্ঠান সূচিতে কোনো পরিবর্তন নেই। মাহে রমজানে অশ্লীল গান, নাটক, সিনেমা তারা অন্য সময়ের মতোই প্রচার করে থাকে। অথচ নৈতিক চরিত্র গঠন ও তাকওয়া অর্জনের কাজে এ মাসে উল্লেখিত প্রচারমাধ্যমেগুলোকে কাজে লাগাতে সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ নেয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, পবিত্র কুরআন নাজিলের এ মাসে সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা মসজিদে মসজিদে কুরআন শিক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারতেন। গ্রামে গ্রামে যেসব মক্তব আছে, সেখানে শিশুদের জন্য বিশেষভাবে পবিত্র কুরআন, ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা ও মাহে রমজানে রোজা রাখার জন্য উদ্বুদ্ধকরণ প্রকল্প ধর্ম উপদেষ্টার মাধ্যমে নেয়া যেত। যেহেতু এ সময় স্কুল-কলেজ ছুটি থাকে, ছুটির এ সময়টায় তারা ইসলামী শিক্ষার ঘাটতিগুলো পূরণ করার সুযোগ পেত। আমরা জানি, আল্লাহর রাসূলের সাহাবীরা ছোট শিশুদের মাহে রমজানে রোজার অভ্যাসের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিতেন, জোহরের পর বাচ্চারা যখন ক্ষুধার্ত হতো, তখন বিভিন্ন খেলনা দিয়ে তাদের ক্ষুধার কষ্ট ভুলিয়ে রাখতেন। এভাবে আল্লাহর সাথে আমাদের সন্তানদের সম্পর্ক সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। প্রচলিত যেসব ইফতার মাহফিল হয়, এতে ইসলাম ও মাহে রমজানের শিক্ষার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাই বেশি হয়। এখানে প্রচারসর্বস্ব কিছু কাজ হয়। দলীয় প্রচারই প্রাধান্য দেয়া হয়। অবশ্য এক্ষেত্রে ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা ব্যতিক্রম। তারা ইসলামের আদর্শ জনগণের সামনে তুলে ধরে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব এর মাধ্যমে জনগণ বুঝতে পারে। এমন অনেক রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান ইফতার মাহফিল করে, তারা ইসলামের আদর্শ সেখানে তুলে ধরে না। কেন তারা এ কাজ করে, আমার বুঝে আসে না। তারা যদি লোকদেখানোর জন্য এ কাজ করে, তা তো গুনাহর কাজ। হাদীসে আছে- যে লোকদেখানো রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, সে শিরক করে। নাম-যশের জন্য নয়, ভালো কাজ বা ইবাদত করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ইন্নামাল আমালু বিন নিয়াত। যদি কেউ নাম-যশের জন্য ইসলামের কাজও করে; এমনকি ইসলামের দাওয়াত, বীরত্ব প্রকাশের জন্য যে জিহাদ করে, সে জাহান্নামি। সকল আমল করতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে। মাহে রমজানে এমন লোকদেখানো যেসব কাজ হয়, তা থেকে মানুষকে ফেরাতে হবে, লোকদেখানো কাজ, বাহাদুরীমূলক প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাকওয়া বৃদ্ধির জন্য মাহে রমজানকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। মাহে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
তাছাড়া খাওয়া-দাওয়া ইফতারির যে বহর, এটা এক সময় ছিল না। কিন্তু বর্তমান সময়ে ইফতার খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করতে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগির কথা অনেকে ভুলে যায়, মহিলাদের ব্যস্ত রাখেন। তারা যথাযথভাবে মাহে রমজানের হক আদায় করতে পারেন না, মহিলারা সবসময় একটি বাড়তি প্রেসারে থাকেন। আমি মনে করি, আগামী রাহে রমজানে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি যদি উল্লেখিত দিকগুলো সামনে রেখে মাহে রমজানের পরিকল্পনা নেয়, তাহলে সাওমের প্রকৃত শিক্ষার আলোয় ব্যক্তি, সমাজ ও দেশ আলোকিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
সোনার বাংলা: আপনি বার বার প্রতিবেশী একটি দেশ বললেও ভারত শব্দটি উচ্চারণ করেননি। কিন্তু আমরা দেখছি, ভারত হাসিনার পতন ও জনগণের বিজয়কে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না; বিশেষ করে ৫ আগস্ট থেকে তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে- বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থিদের উত্থান হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে টার্গেট করেছে। এ ষড়যন্ত্র মোকাবিলার উপায় কী?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: আপনি ঠিকই বলেছেন, আমি তাদের নাম ধরে বলিনি, কিন্তু বুঝতে কারো অসুবিধা হবে না, কোন দেশকে বোঝাতে চেয়েছি। এবার নাম ধরেই বলছি, ভারত আমাদের প্রতিবেশী। আমরা তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই। সব দেশের সাথেই ভালো সম্পর্ক চাই। বন্ধু বাড়াতে চাই। শত্রু কমাতে চাই। ইসলাম বলে, ইদফা বিল্লাতি হিয়া আহসান অর্থাৎ মন্দের জবাব তোমরা ভালো দিয়ে দাও। আমাদের এসব পলিসির কারণে আমরা কখনো এগ্রেসিভলি কোনো কথা বলি না। কেউ আমাদের গালি দিয়েছে, কিন্তু আমরা গালির জবাব দেই না। গালির জবাব না দেয়াটাই হচ্ছে সত্যিকার অর্থে জবাব। এবার আপনার প্রশ্নের উত্তরে আসা যাক। ভারত আসলে কখনোই আমাদের সাথে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ করেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তারা যে সহযোগিতা করেছে, তাও আসলে আমাদের স্বার্থে নয়, নিজেদের স্বার্থেই করেছে। দেশটাকে নিজের কব্জার মধ্যে রেখে শোষণ করার জন্য। ইতিহাস সাক্ষী, যুদ্ধ শেষে তারা লুটপাট করে আমাদের অস্ত্রগুলো নিয়ে চলে যাচ্ছিল, সেই সময় মেজর জলিল প্রতিবাদ করেছিলেন। এজন্য তাকে জেলও খাটতে হয়েছে। ভারত তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল- এটা নিয়ে এখন আর কোনো দ্বিমত নেই। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের বিপ্লবকে যে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলা হচ্ছে। এটা এজন্যই বলা হচ্ছে, কারণ আমরা সেই স্বাধীনতার মাধ্যমে সত্যিকারে মুুক্তি পাইনি। তখন আমরা একটি ভূখণ্ড, পতাকা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ সম্পর্কে মেজর জলিল ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ নামে একটি বই লিখেছেন। এ বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সবার পড়া উচিত। বিগত ৫৪ বছরে ভারত আমাদের নানাভাবে বিভিন্ন সরকারের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের জালে বন্দি করে রেখেছে। তিস্তার পানি দিচ্ছে না। ফারাক্কায় বাঁধ দিয়ে শুকনা মৌসুমে খরায় এবং বর্ষায় পানিতে ডুবিয়ে দিচ্ছে। আমাদের ফসল নষ্ট করছে। সম্প্রতি সিলেট ও ফেনীতে যে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এটা ভারতের সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়। আন্তর্জাতিক আইনে আন্তঃদেশীয় কোনো নদীতে একতরফাভাবে বাঁধ দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ভারত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি কিছুই মানছে না। পতিত স্বৈরাচারী সরকারকে তারা কীভাবে ১৭ বছর বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে টিকিয়ে রেখেছিলো, তা কারো অজানা নয়। ২০১৪-তে বিনা ভোটে, ২০১৮-তে রাতের ভোটে এবং ২০২৪-এ ডামি প্রার্থীর নির্বাচন, নানা-নাতির গল্পের মতো। নানা সব নাতির বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করছে- এমন সময় এক নাতি নানাকে জিজ্ঞেস করলো- নানা, সবার বিয়ের কথা বলছেন, আপনার বিয়ের কথা তো বলছেন না। তখন নানা বললেন, কেন, আমি তো অনেক দিন আগেই বিয়ে করেছি। নাতির প্রশ্ন- কাকে? নানা বললেন, কেন, তোমার নানিকে। নাতি বলল, ‘তোমরা ঘরে ঘরে কাজ সেরে ফেলেছো। ১৭ বছর কোনো নির্বাচন হয়নি। হয়েছে প্রহসন। ভারত এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে, সমকামিতা, মাদক দিয়ে তরুণদের চরিত্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছে। তারা শুধু সুবিধা নিয়েছে, দেয়নি কিছুই। দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলো এখন স্বীকার করছে, জামায়াতে ইসলামী ৫৪ বছর আগে যা বুঝেছিল, এখন আমরা তা বুঝতে পারছি। বাংলাদেশকে ঘিরে তাদের আছে শুধু লোভ-লালসা, আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী মানসিকতা। এজন্যই তারা সুপতিবেশীসুলভ আচরণ করছে না। এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির রীতিনীতি না মেনে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।
আমরা বিশ্বাস করি, মজবুত ঈমানদারির সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকলে ভারত আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না। আমরাই বিজয়ী হবো, ইনশাআল্লাহ।
সোনার বাংলা: তার মানে ঐক্য ও ঈমান আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের গ্যারন্টি?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: ঠিক তাই। আল্লাহ তায়ালা যেভাবে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, আমরা যেভাবেই চলব আমাদের লক্ষ্য শুধু দুনিয়া নয়, আখিরাত। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমাদের সংগ্রাম থেকে আমরা কখনো পৃষ্ঠপ্রদর্শন করব না। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের দমাতে পারবে না। তবে আমরা সীমালঙ্ঘন করব না, জুলুম করব না। আল্লাহ বলেছেন, সীমালঙ্ঘনকারীদের তিনি পছন্দ করেন না। ইসলামের যুদ্ধ কিন্তু সবসময় আত্মরক্ষামূলক, আগ্রাসী কখনোই ছিল না। তাই আমাদের ধ্বংস করতে এলে আমরা বসে থাকব না।
সোনার বাংলা: প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, পতিত সরকার লুটের বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ ব্যয় করছে দেশকে অস্থিতিশীল করতে। সম্প্রতি এর প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় আপনার পরামর্শ কী?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: আপনার আগের প্রশ্নের উত্তরে আমি বলেছি, ঐক্য ও ঈমান আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের গ্যারন্টি। এর সাথে আমি আরেকটি কথা যোগ করছি, বর্তমান সরকার জনগণের চাহিদা এবং দাবির ভিত্তিতেই গঠন করা হয়েছে। আমাদের ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে এ সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে এ সরকার শক্তিশালী থাকবে। অন্যদিকে আমাদের অনৈক্যে সরকার দুর্বল হবে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ঁহরঃবফ বি ংঃধহফ ফরারফবফ বি ভধষষ. মানে একসাথে হলে আমরা আরো শক্তিশালী হবো, বিভক্ত হলে আমাদের পতন হবে। এ ফর্মুলা মেনে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে ইনশাআল্লাহ, আমাদের কেউ পরাজিত করতে পারবে না, ধ্বংসও করতে পারবে না। আল্লাহ তায়লা আমাদের সাহায্য করবেন, ইনশাআল্লাহ।
সোনার বাংলা: নতুন রাজনৈতিক দল ও শক্তির উত্থান সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো- প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহ তায়ালা যে রাইট দিয়েছেন, তাকে বাধা দেয়া ঠিক না। আমরা গণতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাস করি। প্রত্যেক নাগরিকেরই তাদের চিন্তার আলোকে ইতিবাচক কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক দল করার অধিকার আছে। তারা যদি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও আদর্শকে লালন করে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে দেশ-জনগণের সেবার মানসে কোনো দল গঠন করে, এতে আপত্তির কিছু নেই। এটা তার অধিকার। আল্লাহ তায়লা বলেছেন, আমি ভালো পথ ও মন্দ বোঝার ক্ষমতা মানুষকে দিয়েছি। কেউ যদি আল্লাহর দেখানো ভালো রাস্তার আলোকে কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। যেমন- একাধিক মাদরাসা যদি হয়, তারা তো একই সিলেবাস পড়াবে। পবিত্র কুরআন-হাদীসের আলো বেশি ছড়াবে। বেশি বেশি মানুষ শিক্ষিত হবে। আলোকিত হবে। ইসলামের প্রচার-প্রসার হবে। একইভাবে যদি রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি ও জাতি গঠনে ভালো ভূমিকা রাখে, ডব ধিহঃ লঁংঃরপব. ২০২৪-এর স্লোগান ছিল। এ লক্ষ্যে মানুষের কল্যাণের জন্য চাঁদাবজি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে কাজ করার এবং দেশ গড়ার জন্য জনগণ; বিশেষ করে দলের নেতা-কর্মীদের প্রশিক্ষিত করতে যে কেউ দল গঠন করলে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। মহান আল্লাহ তায়ালা সবাইকে লোভ-লালসা, অন্যের প্ররোচনামুক্ত থেকে দেশ-জাতির কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দিন।
সোনার বাংলা: আমিন। দেশবাসীর উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান: একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার তিনটি দাওয়াত দেশবাসীর কাছে- ১. আমাদের এ দুনিয়ার জীবন সংক্ষিপ্ত ৬০-৭০ বছরের। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এরপর আছে আখিরাতের সীমাহীন জীবন। আমরা যেন এ ৬০-৭০ বছরের জীবনের চিন্তা শুধু না করি। আখিরাতের অনন্ত জীবনের কথা চিন্তা করি। সেই জীবনের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করি। সেই পুঁজি হলো দুনিয়ার জীবনের ভালো কাজ। তাই এদেশের ১৮ কোটি মানুষের উদ্দেশে আমার বক্তব্য হলো- আসুন, আমরা সেই অনন্ত জীবনে ভালো থাকার জন্য এ দুনিয়ার জীবনে ভালো কাজ করি। ২. অমুসলিমদের জন্য আমার বক্তব্য হচ্ছে, সিরাতাল মুস্তাকিমের পথই আল্লাহর দেখানো পথ। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত জীবনবিধান- ‘ইন্নাদ্দিনা ইন্দাল্লাহিল ইসলাম’ এ কথা আল্লাহ তায়ালা নিজেই পবিত্র কুরআনে বলেছেন। পবিত্র কুরআনকে বলা হয়েছে হুদাল্লিন নাস- দুনিয়ার মানুষের জন্য হিদায়েত বা পথপ্রদর্শক গ্রন্থ হলো আল কুরআন। সুতরাং এ কুরআন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থসহ আপনারা পড়ুন। এর ভালো মেজেসগুলো জানুন। তাহলে আপনাদের দুনিয়া ও আখিরাতের জীবন শান্তিময় হবে।
লা ইকরা ফিদ্দীন ইসলামে কোনো জোর জবরদস্তি নেই। সবাইকে ইসলাম জানার জন্য সর্বাধিক সুযোগ দিতে হবে। ৩. বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের লোক আছে, তারা সবাই যদি ঝগড়া করে, তাহলে ক্ষতিই হবে, কোনো লাভ নেই। বরং অশান্তি বাড়বে। তাই সবাই একসাথে থাকতে হবে। যার যার যে মত আছে, তা থাকবেই। কিছু মৌলিক বিষয় আছে, যেটা নিয়ে একসাথে থাকতে কোনো বাধা নেই, বরং তা সবার জন্য কল্যাণকর। যেমন- স্বামী-স্ত্রীতেও ঝগড়া হয়। তাই বলে তো বাড়ি ছেড়ে চলে যায় না। মনে করেন, সবাই কোনো এক জায়গায় যাচ্ছেন। যার যার গাড়ি নিয়ে অথবা একই গাড়িতে। সেই গাড়িতে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আস্তিক-নাস্তিক, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি নানা দল-মতের লোক আছে। কিন্তু রাস্তায় একটি বড় গাছ পড়ে আছে, রাস্তা বন্ধ। তখন যদি কেউ মনে করেন, ঐ গাছ সরানোর কাজ বিএনপি করবে আমরা করব না কিংবা জামায়াত গাছটি ধরেছে, তাই আমরা ধরব না, তাহলে রাস্তা পরিষ্কার হবে না। কারো পক্ষেই গন্তব্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো- সবাই মিলে একসাথে সমস্যার সমাধান করা। আমি মনে করি, জাতীয় নেতাদের মধ্যে যদি পরমতসহিষ্ণুতা থাকে, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধানই সম্ভব। আর ইসলামের বিধানের সুফল সবাই পাবে। চুরি, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ হলে এর সুফল কি শুধু মুসলিমরা পাবে? অবশ্যই না। হিন্দু-মুসলিম সবাই পাবে। এমন সব ভালো ভালো বিধানই ইসলামের বিধান। পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান মদিনা সনদের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সা. সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। সবাই সুখী-সমৃদ্ধশালী জীবন পেয়েছিল, আজও তা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। ওয়া আখেরি দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন”।
সোনার বাংলা পরিবারের সবাইকে ধন্যবাদ।
সোনার বাংলা: আপনাকেও ধন্যবাদ।