সুস্থতার জন্য হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৪:৪৬
॥ হামিম উল কবির॥
সুস্থতার জন্য হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। পেটের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে যেমন মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে, তেমনি হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে মানুষের চলাফেলা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মানুষের দেহকে বহন করে নিয়ে যায় হাড়। হাড় শক্ত না থাকলে হাড়ে ভঙ্গুরতা দেখা দেয়, চলাফেরা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। হাড় শক্ত রাখতে হলে বেছে বেছে নির্দিষ্ট কিছু খাবার খাওয়া উচিত। মানবদেহের হাড়গুলো সবসময় ক্ষয় হয় আবার পূরণও হয়। ২০ বছর বয়স পর্যন্ত ক্ষয় ও পূরণ করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ২০ বছর পর হাড়ের ক্ষয় প্রক্রিয়া চলতে থাকে, কিন্তু পূরণ হয় ধীরে ধীরে। ৩০ বছর পর্যন্ত হাড়ের ক্ষয়-পূরণ হওয়ার কাজ চলে, কিন্তু ৩০’র পর হাড় ক্ষয় হতে থাকলেও পূরণ হয় না। তবে ৩০ বছর পর্যন্ত মানুষ হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য যা করে, আরো পরিষ্কার করে বললে, হাড়ের ভেতরে যা সঞ্চয় করে রাখতে পারে, তা দিয়েই বাকি জীবনটা সুস্থতার সাথে চলতে পারে। ‘পিক বোন মাস’ বা হাড়ের সর্বোচ্চ ঘনত্ব সৃষ্টি হয় ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই। এরপর হাড়ের ঘনত্ব আর বাড়ে না, সময়ের সাথে সাথে কমে যেতে থাকে। হাড়ের সুস্থতা নির্ভর করে এ অল্প বয়সে অর্জিত হাড়ের ঘনত্ব, স্থিতিস্থাপকতা ও খনিজ পদার্থের ওপর। বেশি বয়সে মানুষ যতটুকু হার ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস) রোগে আক্রান্ত হয়, তা নির্ভর করে যুবক বয়সে হাড়ের গঠন কতটুকু মজবুত হয়, তার ওপর। হাড় ক্ষয় পুরুষ এবং নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই চলতে থাকে। তবে হরমোনের কারণে নারীদের ক্ষেত্রে ৪০ বছর পর হাড় ক্ষয়ের প্রবণতা পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। সুস্থ ও টেকসই হাড় পেতে হলে শৈশব থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি।
হাড়ের সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্ব দিন : হাড়ের স্বাস্থ্য বিভিন্ন কারণে অত্যাবশ্যক, কারণ এটি সামগ্রিক সুস্থতার ক্ষেত্রে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে নড়াচড়া করার এবং সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি, শক্তিশালী হাড় আমাদের জীবিত রাখে এমন পুষ্টি এবং খনিজ পদার্থ সঞ্চয় করে রাখে। যাদের সুস্থ হাড় নেই, তাদের ব্যথা এবং ফ্র্যাকচার (হার ফাটা অথবা ভেঙে যাওয়া) হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফলে অন্যান্য গুরুতর শারীরিক ব্যাধি অস্টিওপোরোসিস ছাড়াও মানুষের গতিশীলতা কমিয়ে দেয় এবং কাজের স্পৃহা কমিয়ে দেয়। শেষাবধি জাতীয় অর্থনীতিতে এ ধরনের লোকের অবদান কমে যায়।
বাংলাদেশে হাড় ক্ষয়ের অবস্থা
বাংলাদেশ অর্থোপেডিক সোসাইটির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩ শতাংশ অস্টিওপরোসিস বা হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত এবং এ রোগে নারীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এ রোগে আক্রান্তদের অনেকেই তাদের রোগ সম্পর্কে জানেন না এবং আক্রান্তদের সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না হলে এমনকি ছয় মাসেই মৃত্যু ঘটতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোফাখখারুল ইসলাম জানান, ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে যারা এ রোগে আক্রান্ত, তাদের প্রতি ১০ জনের ৯ জনই নারী। তবে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। তখন ৩ জন নারীর এ সমস্যাটা হলে সেই তুলনায় ৭ জন পুরুষের হয়ে থাকে। রোগটিতে আক্রান্ত হলে হাড়ের ঘনত্ব কমে হাড় ছিদ্র হয়ে যায়, দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। নামাজসহ ওঠাবসা করা যায় না; এমনকি শৌচকর্ম করতেও কষ্ট হয়।
হাড় ক্ষয় কেন হয়?
একটি নির্দিষ্ট বয়স পর স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের হাড় ক্ষয় হয়ে থাকে। মানুষের শরীরের এ ধরনের পরিবর্তনের সাথে হরমোনের প্রভাব থাকে। নারীদের শরীর থেকে হরমোন খুব তাড়াতাড়ি কমে যায়। বয়স বেড়ে গেলে নারীদের ক্ষেত্রে এস্ট্রোজেন এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোনের অভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে মেয়েদের পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে বা মেনোপোজের পর এটি বেশি হয়। আর হরমোন কমে গেলে শরীর থেকে দ্রুত ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি বের হয়ে যায়। শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি কমে গেলে হাড় গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান কমে যায়, ফলে শুরু হয় হাড় ক্ষয়। এছাড়া যারা ক্যান্সার, রক্তরোগ, অপুষ্টিজনিত রোগ, কিডনি রোগে আক্রান্ত তাদের হাড় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর বাইরেও নানা রোগের চিকিৎসার কারণে যারা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবন করেন তাদের হাড়েরও ঘনত্ব কমে গিয়ে হাড় ক্ষয় রোগ হতে পারে। হাড় ক্ষয় একটি নীরব ঘাতক, অনেকেই বুঝতে পারেন না যে, তিনি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছেন।
হাড়ের সুস্থতার জন্য করণীয়
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দিনে এক হাজার মিলিগ্রাম ও নারীর এক হাজার ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত। গর্ভাবস্থায় ও শিশুদের স্তন্য দান করার সময় এবং মেনোপজের পর এ ক্যালসিয়ামের চাহিদা আরো বেশি। উচ্চ ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার হচ্ছে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, নানা ধরনের ছোট মাছ ও সামুদ্রিক মাছ, সবুজ পাতাযুক্ত শাক, বাদামের মতো খাবারগুলো। শৈশব ও কৈশোর থেকে ভালোমানের ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার যথেষ্ট খেলে মজবুত হাড় পাওয়া সম্ভব। এছাড়া হাড় সবল রাখার জন্য পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি দরকার। নির্দিষ্ট প্রকার খাবার ছাড়াও সূর্যের আলোতে আছে এই ভিটামিন। সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি পেতে হলে দিনের একটি সময় রোদে হাঁটাহাঁটি করা উচিত। এই অভ্যাস থাকা দরকার সব বয়সই। এ ছাড়া তৈলাক্ত মাছ, মাশরুম, ডিম ইত্যাদিতে আছে ভিটামিন ডি। অন্যদিকে নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম ও ব্যায়াম হাড়সন্ধিকে মজবুত করে। অল্প বয়সে তো বটেই; এমনকি বেশি বয়সেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করতে পারলে হাড় ক্ষয় বা ভঙ্গুর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। অন্যদিকে ধূমপান হাড়ের ভঙ্গুরতা বাড়ায়। স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ছাড়াও যারা খিঁচুনির কিছু ওষুধ খায়, মিথোট্রেক্সেট (কেমোথেরাপির চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এটি নিয়ন্ত্রণে আনে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। এটি ক্যান্সার কোষ, হাড় মজ্জা কোষ এবং স্কিন কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করতে কাজ করে), ওমিপ্রাজল ইত্যাদি ওষুধ সেবন করেন, তাদের অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। প্রয়োজন না হলে ওসব ওষুধ সেবন না করাই ভালো। এর বাইরেও কিছু কিছু রোগ, যেমনÑ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাইপোগোনাডিজম ইত্যাদির কারণে হাড় ক্ষয় বেশি হয়। নারীদের মেনোপজের পর বেড়ে যায় হাড় ক্ষয়ের আশঙ্কা। তাই বয়স্ক নারীদের খাবারদাবার ও ব্যায়ামের দিকে বেশি সচেতনতা দরকার। যাদের সময়ের আগেই মেনোপজ হয়ে গেছে (যেমন অল্প বয়সে জরায়ু ফেলে দেওয়া) তারা চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন থেরাপি নিতে পারেন। হাড় ক্ষয়ের মাত্রা জানতে এখন বিশেষ পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেয়া যায়। হাড় সুস্থ রাখতে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাছাড়া পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি এবং ভিটামিন কে হাড়কে শক্তিশালী রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো হাড়ের জন্য সুপারফুড, এই উপাদান সমৃদ্ধ খাবারগুলো হাড়কে সুস্থ রাখতে খাবারে যোগ করা উচিত। হাড় ক্ষয়ের পারিবারিক ইতিহাস এবং জেনেটিক্স হাড়ের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। অস্টিওপরোসিস বা হাড়-সম্পর্কিত অবস্থার পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে এমন পরিবারে পরের প্রজন্মের ব্যক্তিদের হাড় ক্ষয়ের বেশি ঝুঁকি থাকে। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল (পেটের পীড়া জাতীয়) রোগ বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা হাড়ের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। কম ওজন এবং অতিরিক্ত ওজন উভয়ই হাড়ের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। কম ওজন বা ক্যালোরি সীমাবদ্ধতা হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস করতে পারে। আবার অতিরিক্ত শরীরের ওজনে হাড় এবং জয়েন্টগুলোয় চাপ পড়ে এবং ক্ষয় শুরু হয়ে যায়।
স্বাস্থ্যকর হাড়ের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার
স্বাস্থ্যকর হাড়ের জন্য সবুজ শাকসবজি হাড়ের জন্য স্বাস্থ্যের প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে থাকে। দুধ ও পনির খুবই উপকারী হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য। কিছু চর্বিযুক্ত মাছ এবং বেশিরভাগ আঁশযুক্ত মাছ হাড়কে শক্তিশালী রাখার জন্য ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টি সরবরাহ করে। এগুলো ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সরবরাহ করে। কমলা ও কমলা জাতীয় অন্যান্য ফল, লেবু, জাম্বুরা ফল হাড় মজবুত করার জন্য চমৎকার খাবার। ভিটামিন সি হাড়ের ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে। হাড়ের সঠিক বৃদ্ধির জন্য কমলার রসও উপকারী। বাদাম প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টির একটি সমৃদ্ধ উৎস। ক্যালসিয়ামের চাহিদা মেটাতে বাদামের দুধও পান করা যায়। যারা দুগ্ধজাত খাবার হজম করতে পারেন না তারা পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম পেতে তাদের খাদ্যতালিকায় বাদাম যোগ করতে পারেন। যেকোনো বীজ খুব পুষ্টিকর এবং এগুলো ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ। ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে দৈনন্দিন খাদ্যে চিয়া বীজ যোগ করতে পারেন। হাড়ের ঘনত্ব উন্নত করতে চাইলে এবং হাড়ের ক্ষয় রোধ করতে চাইলে খাদ্যতালিকায় শুকনো বরই যোগ করা যায়। শুকনো বরই ক্যালসিয়াম এবং পটাসিয়ামের একটি চমৎকার উৎস এবং হাড়ের ফ্র্যাকচার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত কিছু খাবার ক্ষতি ডেকে আনতে পারে
যদিও প্রোটিন সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা সত্ত্বেও অত্যধিক উচ্চ-প্রোটিন ডায়েট ক্যালসিয়ামের নিঃসরণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। চর্বিহীন গোশত, দুগ্ধ, লেগুম (শিমজাতীয় উদ্ভিদ) এবং উদ্ভিদভিত্তিক উৎসসহ বিভিন্ন উৎস থেকে প্রোটিনের সুষম গ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। যদিও ভিটামিন এ হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু অতিরিক্ত (সাপ্লিমেন্ট) গ্রহণ হাড়ের ঘনত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ না থাকলে সাপ্লিমেন্ট খাবার না খাওয়াই ভালো। কারণ বাংলাদেশে অনেকেই নিজে নিজেই ক্যালসিয়াম অথবা ভিটামিন ডি গ্রহণ করে থাকেন।