আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ ঐতিহ্যের ঘ্রাণ
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৫৪
॥ জাকির আবু জাফর ॥
আল মাহমুদ নামটি এখন বাংলা আধুনিক কবিতার সঙ্গী হয়ে উঠেছে। তাঁকে বাদ রেখে বা আড়াল করে এখন আর আধুনিক কবিতার পাঠ চলে না। আলোচনা-সমালোচনাও নয়। বাংলা কবিতার এক অনন্য নাম আল মাহমুদ।
‘সোনালী কাবিন’ আল মাহমুদের সব থেকে আলোচিত বই। আল মাহমুদ প্রসঙ্গ এলেই এসে পড়ে সোনালী কাবিনের নাম। অথচ তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘সেলাই করা মুখ’ কবিতার এ বইগুলোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এসব বইয়ের প্রত্যেকটিতে আল মাহমুদের নিজস্বতা রয়েছে। রয়েছে ভাষা, নতুন আঙ্গিক, নতুন বাণী। আরও একটি বই ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস।’ এ বইটির কবিতায়ও রয়েছে ভিন্ন স্বাদ।
প্রশ্ন হলো- বাংলা কবিতায় আরও আরও কবিরাও নতুন আঙ্গিক পত্তন করার কোসেস করেছেন। আল মাহমুদও সেই চেষ্টারই একটি রূপ। কিন্তু কোথায় আল মাহমুদ বিশিষ্ট? কেন আল মাহমুদ এতটা পাঠকপ্রিয়! কেন আল মাহমুদ নিয়ে এত তর্কবিতর্ক! তিনি প্রশংসা এবং নিন্দা দুটিরই মুখোমুখি হয়েছেন। প্রশংসিত হয়েছেন তাঁর কবিতার জন্য। কিন্তু নিন্দুকরা নিন্দা করেছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষবাষ্প থেকে। শিল্প-সাহিত্যকে শিল্পের শৈল্পিক সৌন্দর্য থেকে বিচার না করে, রাজনৈতিক বাটখারা দিয়ে ওজন করা হয়েছে। আর কে না জানে, রাজনীতি হলো নির্মমতার ভয়ংকর এক খেলা। যে খেলায় গরুও সিংহ হয়ে ওঠে। আবার সিংহও দিব্যি গরু বনে যায়। আল মাহমুদ রাজনীতির এমনই নির্মমতার শিকার হয়েছিলেন।
তবে কবি হিসেবে আল মাহমুদ অপ্রতিদ্বন্দ্বী! কিন্তু কেন?
এর জবাব খুব ছোট করে দিলে বলতে হয়- আল মাহমুদ কবিতায় নতুন আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন এমনটি শুধু নয়। সেই সাথে তিনি নতুন শব্দের ব্যবহার করেছেন। কিংবা পুরনো শব্দের নতুন ব্যবহার ঘটিয়েছেন। আরও বিশেষত্ব হলো- তিনি গ্রামীণ শব্দকে যেমন শহুরে করেছেন। তেমনই গ্রামীণ শব্দকে করেছেন আধুনিক। এই যে বৈশিষ্ট্যের কথা বললাম, বাংলা কবিতায় এটি সম্পূর্ণ নতুন। নতুনত্বের সাহেবী প্রকাশ ঘটেছে সোনালী কাবিনে।
প্রকাশ হবার সাথে সাথেই কবিতাঙ্গনে একরকম ঢেউ উঠে গেলো। বইটি পেয়ে গেলো বিপুল পাঠকপ্রিয়তা।
এখন প্রশ্ন হলো- কীভাবে বইটি এতটা পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠলো? পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠার গল্পের সাক্ষী বইটি নিজেই। বইয়ের বুকে বাস করা কবিতাগুলো নিজেরাই কথা বলে আনন্দের সাথে। নিজেরাই বলে ওঠে- আমরা উঠে এসেছি তোমাদের পাঁজরঘেঁষা গ্রামের নিসর্গ, ফুল পাখি ও পতঙ্গের শরীর থেকে। পাতার সবুজ শরবত ও মেঘমল্লার থেকে। ক্ষেতের আল, রাতজাগা জোনাকি এবং নাড়ার দহন থেকে। কবিতাগুলো যেন বলতে থাকে- আমরা বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সাধারণ জীবনের পরিতৃপ্তির তৃষ্ণা হয়ে এসেছি।
এ বইয়ে বাংলাদেশের নিঝুম নিসর্গের কোলাহল ভাষায় বন্দী হয়েছে। বাঁধা হয়েছে দেশের মুসলিম চাষি পরিবারের মুখের ভাষা। ‘সোনালী কাবিন’ পড়তে পড়তে মনে হবে এ যে আমার পায়ের নিচ থেকে চারপাশের ঝোপজঙ্গল, গাছতলার ঝরাপাতার শব্দ ঘুমিয়ে আছে কবিতার শরীরে। পাঠ করলেই জেগে ওঠে পাতার শব্দ। এভাবে আল মাহমুদ তার সোনালী কাবিনে গ্রামের আটপৌরে জীবনকে মিশিয়ে দিয়েছেন আধুনিক জীবনের সঙ্গে।
‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ এই সোনালী কাবিনেরই একটি কবিতা। কবিতাটি একটি জ্বলজ্যান্ত ঘটনার গল্প। কবি নিজেই এ গল্পের নায়ক। এটি ট্রেন ফেল করে ফেরত আসার একটি লাজুক কাহিনী। ট্রেনের যাত্রা ছিলো শেষ রাতে। শীতকাল। শীতের দীর্ঘ শীতল রাত্রি। কুয়াশায় ঢাকা পথ। সে পথ মাড়িয়ে তিনি পৌঁছালেন স্টেশনে। পৌঁছে দেখলেন- তাঁর ওঠার সামান্য আগেই ছেড়ে দিয়েছে গাড়িটি। আহা কষ্টের স্রোত তখন আল মাহমুদের হৃদয়কে মথিত করে চিরে যাচ্ছিলো। কী করবে তখন? বাড়ি ফিরবে? ট্রেন ফেল করে বাড়ি ফেরা যে লজ্জার! তবে কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে? কীভাবে! সুতরাং তাকে ফিরতেই হবে বাড়ি। লাজুক চোখে বাড়ি ফেরার গল্পটিই ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা।’
কাব্যিক অথচ সাবলীল ভাষার জালে মুড়িয়ে ঘটনার বর্ণনা চিত্রিত করেছেন আল মাহমুদ। কবিতাটির শুরুর অংশ পাঠ করা যাক- ‘শেষ ট্রেন ধরবো বলে/একরকম ছুটতে ছুটতে/স্টেশনে পৌঁছে দেখি/নীল বর্ণ আলোর সংকেত! হতাশার মতন হঠাৎ/দারুণ হুইশেল দিয়ে/গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।/যাদের সাথে শহরে যাবার কথা ছিলো /তাদের উৎকণ্ঠিত মুখ/উবুড় হয়ে আমাকে দেখছে/আর হাত নেড়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে। আসার সময় আব্বা বলছিলেন- গোছাতে গোছাতেই তোর/সময় বয়ে গেলো।/তুই আবার গাড়ি পাবি!/মা বলছিলেনÑ আজ রাত নাহয় বই নিয়েই বসে থাক/কতরাত তো অমনি থাকিস/আমার ঘুম পেলো/এক নিঃস্বপ্ন নিদ্রায়/আমি নিহত হয়ে থাকলাম।’
এযে কী অদ্ভুত বর্ণনা! নিঃস্বপ্ন নিদ্রায় নিহত হয়ে থাকার বিষয়টি সত্যিই অনন্য! মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘুমও মানুষের একরকম মৃত্যু। ঘুমের জগতে মানুষের রুহ বা আত্মা বেরিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা ফেরত দিলেই কেবল জেগে ওঠে মানুষ। ফেরত না দিলেই জেগে ওঠে না মানুষ! আহা কী টলমলে জীবন মানুষের!
জীবনের এ রহস্য কবিতায় উঠে এলো অনায়াসে। নিদ্রায় নিহত হয়ে না থাকলে নিশ্চয় তিনি গাড়ি পেতেন। সময়মতো পৌঁছে যেতেন স্টেশনে।
এখানে বোঝার বিষয় হলোÑ আল মাহমুদ একাই শুধু ট্রেন ফেল করলেন? না, এমন ফেলের ঘটনা প্রতিটি মানুষের জীবনেই ঘটে থাকে। আর যদি আমরা মনে করি, মানুষের গোটা জীবনটাই একটি ট্রেন, যার কোনো স্টেশন নেই। এই স্টেশনহীন গাড়িটি যেমন করে চলার তেমন যদি না চলে, তবে তো জীবনই ফেল হয় যায়।
কবিতার শেষের দিক থেকে পাঠ করা যাকÑ “কুয়াশার সাদা পর্দা/দোলাতে দোলাতে/আবার আমি ঘরে ফিরবো/শিশিরে আমার পাজামা ভিজে যাবে। চোখের পাতার ওপর শীতের বিন্দু জমতে জমতে/হঠাৎ নির্লজ্জের মতো/উঠে আসবে লাল সূর্য/পরাজিতের মতন/আমার মুখের ওপর রোদ নামলে/সামনে দেখবো/ ছড়ানো ছিটানো ঘরবাড়ি/গ্রাম/জলার দিকে বকের ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে।’ এযে বাংলাদেশের গ্রামীণ দৃশ্যের এক জবজবে বর্ণনা! যা একদম তরতাজা! শীতকালের এক রাজসিক দৃশ্য। ক্ষেতের আল কিংবা মেঠোপথ বেয়ে হাঁটতে গেলেই কুয়াশার সাদা শরীর পরিস্কার হয়ে ওঠে। শিশিরে, কুয়াশায় পরনের পোশাক ভিজবেই। বাস্তবতার স্রোতে মনও ভিজে ওঠে।
কবিতার শেষ অংশের আগের অংশটি পাঠ জরুরি- ‘বৈঠকখানা থেকে/আব্বা আমাকে একবার দেখে/মুখ নিচু করে/পড়তে থাকবেন/ফাবি আইয়্যে আলাই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান!’ এখানে আল মাহমুদের গভীর মুন্সিয়ানা প্রকাশ্য হয়েছে। কুরআনের একটি গোটা আয়াত, কুরআনের ভাষায় আধুনিক কবিতার শরীরে পুরে দিয়েছেন।
একইসাথে গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি ভোরের এক জীবন্ত চিত্র এঁকে দিয়েছেন। এই জীবন্ত দৃশ্যের বর্ণনা হৃদয়ে টোকা দিতে থাকে! এই তো বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষের জীবন! এই তো জীবনের গভীর আদর্শময় ঐতিহ্য! বাংলাদেশের গ্রামগুলোর এ দৃশ্য কমবেশি আজও দৃশ্যমান। আজও ফজরের নামাজ আদায় করে একজন মুসলিম চাষা, জেলে এবং খেটে খাওয়া মানুষ পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআন পাঠ করে কাজে যোগ দেন। মুসলিম সমাজে এটিই এক বিরাট ঐতিহ্য!
কবিতার একেবারে শেষে এসে লিখলেন কবি- ‘বাসি বাসন হাতে/মা আমাকে দেখে হেসে ফেলবেন/ভালোই হলো তোর ফিরে আসা/তুই না থাকলে/ঘরবাড়ি কেমন শূন্য হয়ে যায়/হাতমুখ ধুয়ে আয়/নাস্তা পাঠাই/আমি মাকে জড়িয়ে ধরে/আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে/ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো!’ এ-ও কি জীবন্ত চিত্র নয়! বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে মায়ের সাথে সন্তানের বন্ধন কী চমৎকার!
কোথাও যাওয়ার জন্য রওনা হয়ে ফিরে আসার একটি লজ্জা তো আছেই। এর সাক্ষী প্রায় প্রতিটি যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী। কিন্তু সেই লজ্জাকে মায়ের আঁচলে ঢুকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলার বিস্ময় দৃশ্য আল মাহমুদ ছাড়া আর কে বর্ণনা করেছেন! শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছে ফিরে আসাই আমাদের চিরদিনের ঐতিহ্য। সবুজ লতা পাতায় মোড়ানো বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এখনো ছড়িয়ে আছে এ ঐতিহ্যের এ ঘ্রাণ! লেখক : কবি।