ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠক

রাজনীতির নতুন মেরুকরণের আভাস


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:০৯

॥ জামশেদ মেহ্দী॥
সংস্কার, নির্বাচন ও ঐকমত্যের রেলগাড়ি লাইনে উঠেছে। এখন কে কার আগে ছুটবে, সেটাই দেখার বিষয়। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শনিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রায় ৩৯টি রাজনৈতিক দলের প্রায় ১০০ নেতার সাথে বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকে তার সাথে ছিলেন ৬টি সংস্কার কমিশনের ৬ চেয়ারম্যান এবং উপদেষ্টা পরিষদের ৬ সদস্য। অন্যপক্ষে অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের প্রায় সকলকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এমনকি একাধিক রাজনৈতিক দলÑ যাদের নিবন্ধন নেই, তাদেরও ডাকা হয়েছিল। আশার কথা, যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাদের সকলেই দাওয়াত কবুল করেছিলেন এবং যথারীতি বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী ঘরানার দলগুলোকে ডাকা হয়নি। এ দলগুলোর মধ্যে ছিল মেননের ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর জাসদ, জিএম কাদেরের জাতীয় পার্টি, ইত্যাদি।
যতদূর জানা গেছে, ১৫ ফেব্রুয়ারির ওই বৈঠক ছিল অনেকের ভাষায় সূচনা বৈঠক। অনেক রাজনৈতিক দল বলেছে, এক অর্থে এটি অনেকটা পরিচিতি এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের বৈঠক। ওই বৈঠকে প্রধান বক্তা ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বয়ং। বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে এ বৈঠক চলে। সূচনা বক্তৃতা করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর আমন্ত্রিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। ঐ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন একাধিক নেতা এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, এত অধিকসংখ্যক রাজনৈতিক নেতা ছিলেন যে, সকলকে সুযোগ দেওয়া হলেও নেতাদের বক্তব্যের নির্ধারিত কোনো সময় ছিল না। কাউকে ১ বা দেড় মিনিট বক্তৃতার সুযোগ দেওয়া হয়। আবার কাউকে কাউকে ৫-৬ মিনিট বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে অধিকাংশ বক্তাই বলেন যে, যেহেতু সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ওপর তাদের বক্তব্য রাখার কথা, কিন্তু সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সংস্কার রিপোর্ট সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় তারা যা পড়েছেন, তার বেশি কিছু তারা জানেন না। এ পর্যায়ে ড. ইউনূস জানতে চান যে, তারা সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের হার্ডকপি পেয়েছেন কিনা? উত্তরে সকলেই বলেন, তারা হার্ডকপি পাননি। তখন প্রধান উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যে, যত দ্রুত সম্ভব নেতৃবৃন্দের কাছে যেন হার্ডকপি পৌঁছানো হয়। ফলে সংস্কারের পয়েন্টগুলো সুনির্দিষ্টভাবে একের পর এক আলোচনা করা সম্ভব হয়নি।
এ পটভূমিতে কীভাবে সংস্কার সম্পর্কে রাজনৈতিক দলসমূহ মতামত দেবে, তার একটি গাইডলাইন দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সবগুলো রিপোর্ট ইতোমধ্যেই ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। তারা হার্ডকপি না দেওয়া পর্যন্ত ওয়েবসাইট থেকে যতদূর সম্ভব পড়ে নিতে পারেন। তিনি বলেন, আপনারা এসব রিপোর্ট পড়ার পর রিপোর্টের কোন্ কোন্ সুপারিশের সাথে একমত সেটি উল্লেখ করবেন। আবার কোন কোন সুপারিশের সাথে আংশিকভাবে সহমত পোষণ করেন, সেটিও উল্লেখ করবেন। আবার কোন্ কোন্ সুপারিশ মোটেই অনুমোদন করেন না, বরং বিরোধিতা করেন, সেটিও উল্লেখ করবেন। আবার যেসব সুপারিশের অংশবিশেষ অনুমোদন করেন এবং অংশবিশেষ অনুমোদন করেন না সেই অংশবিশেষ কেন অনুমোদন করেন না, সেটিও উল্লেখ করবেন। বিষয়টি তিনি বিশদ ব্যাখ্যা করেন এভাবেÑ
ধারা যাক, কোনো একটি কমিশনের রিপোর্টে ১০০টি সুপারিশ রয়েছে। আপনি যদি এ ১০০ অনুমোদন করেন, তাহলে ঐ ১০০টিতেই টিক মার্ক দেবেন। আবার যদি ১০০টির একটিও আপনি সমর্থন না করেন, সেটিও উল্লেখ করবেন। তবে এক্ষেত্রে আপনি লিখে দেবেন, কেন আপনি সমর্থন করেন না। অনুরূপভাবে ধরা যাক, ১০০ সুপারিশের মধ্যে আপনি ৪০ সুপারিশ অনুমোদন করেন। তখন ঐ ৪০টি সুপারিশের ওপর টিক মার্ক দেবেন। অবশিষ্ট ৬০টির মধ্যে আপনি ৪০টি সুপারিশের সাথে আংশিকভাবে সহমত প্রকাশ করেন। আর অবশিষ্ট ২০টি আপনি সমর্থন করেন না। এই ২০টি আপনি কেন সমর্থন করেন না, সেটি কারণসহ উল্লেখ করবেন।
অনুরূপভাবে ১০০টি সুপারিশের মধ্যে যদি আপনি ৬০টি সুপারিশ সমর্থন না করেন, তাহলে কেন করেন না, সেগুলোর কারণ দর্শাবেন। অবশিষ্ট ৪০টির মধ্যে যেগুলো আংশিকভাবে সমর্থন করেন, আর আংশিক সমর্থন করেন না, সেই সমর্থন না করার কারণ উল্লেখ করবেন। এভাবে ৬টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ সম্পর্কেই আপনারা পরিষ্কারভাবে লিখিত জানাবেন এবং আপনাদের মন্তব্যের নিচে আপনাদের স্বাক্ষর দেবেন। তিনি বলেন, আপনাদের মনে যা কিছুই থাকুক, সেটি আপনারা নিঃসংকোচে লিখবেন। প্রধান উপদেষ্টা আরো জানান, প্রত্যেকটি কমিশন অফিসে পরিমিতসংখ্যক টেলিফোন দেওয়া হবে। আপনারা কমিশনের রিপোর্ট পড়তে গিয়ে যদি কোনো ক্ল্যারিফিকেশন বা ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করে কমিশনের চেয়ারম্যান বা মেম্বারদের সাথে আলোচনা করবেন এবং ব্যাখ্যা নেবেন। আপনাদের উত্তর প্রেরণে প্রতিটি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররা আপনাদের সাথে আলোচনার জন্য সদা প্রস্তুত থাকবেন।
ড. ইউনূস এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও মন্তব্য হতে হবে স্পষ্ট এবং লিখিত। আপনাদের মতামত দেওয়ার পর আপনারা প্রত্যেকে সই করবেন। প্রতিটি কমিশনের সুপারিশ এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও নেতার লিখিত বক্তব্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। সমগ্র বিষয়টি হবে অত্যন্ত ট্রান্সপারেন্ট এবং স্বচ্ছ। লুকোচুরির কোনো অবকাশ রাখা হবে না।
রাজনৈতিক দলসমূহের মন্তব্য পাওয়ার পর দলগুলো প্রতিটি কমিশনের সাথে বৈঠক করতে পারেন। এভাবে প্রতিটি কমিশনের সাথে বৈঠকের সময় নেতৃবৃন্দ নতুন কোনো পয়েন্ট যোগ করতে চাইলে সেটিও তাদের মন্তব্যে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অতঃপর ঐকমত্য কমিশন তাদের রিপোর্ট চূড়ান্ত করবেন। এখানে একটি বিষয় খোলাখুলি বলা ভালো যে, রাজনৈতিক দলসমূহের ওপর ইন্টারিম সরকার কোনো কিছুই চাপিয়ে দেবেন না। যেসব সুপারিশে রাজনৈতিক দলসমূহের সমর্থন বা অনুমোদন থাকবে, সেগুলো আগে বাস্তবায়ন করা হবে। আর যেগুলো সম্পর্কে মতৈক্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না, সেগুলো পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। যেসব সুপারিশ সম্পর্কে ঐকমত্য কমিশন এবং রাজনৈতিক দলসমূহ একমত হবেন, সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সেই পথ আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। আবার যেগুলো সম্পর্কে মতৈক্যে পৌঁছা সম্ভব হবে না, সেগুলো কীভাবে ট্রিট করা হবে তার পথও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে।
এই ছিল সেদিনের আলোচনার সারাংশ। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো পয়েন্ট বা সুপারিশ নিয়ে আলোচনা না হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তারা সুস্পষ্ট মতামত জানিয়ে দিয়েছেন। যেমন- বিএনপি কোনো রাখঢাক না করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন তারা চায় না। এছাড়া সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional Representation, PR) তারা বিরোধী। তাছাড়া তারা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট চায়। তারা নতুন সংবিধান রচনা বা সংবিধান পুনর্লিখনের পরিবর্তে বর্তমান সংবিধানের সংশোধন চায়।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট ভাষায় বলে যে, তারা কেবলমাত্র প্রয়োজনীয় সংস্কারের পরই জাতীয় নির্বাচন চায়। জামায়াতের পক্ষ থেকে আরো বলা হয় যে, জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। তারা জানান, তারা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা Proportional Representation, PR দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন।
অন্যদিকে নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী, হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং সারজিস আলম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের বিচারের পরেই নির্বাচন হবে, তার আগে নয়। তারা দৃঢ়ভাবে বলেন, ৫ আগস্টের বিল্পবের পর বর্তমান সংবিধান অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। এ সংবিধান মুজিববাদী সংবিধান। তারা অনেক আগেই এ সংবিধান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা জুলাই বিপ্লবের অভিপ্রায় ধারণকারী নতুন সংবিধান চান। তারাও জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চান।
১৫ ফেব্রুয়ারির বৈঠককে অনেকে সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রথম ইনিংস বলে বর্ণনা করেছেন। অনেকে তো স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় ইনিংস। দ্বিতীয় ইনিংস থেকেই শুরু হবে আসল কাজ। তখনই দেখা যাবে কার কী রাজনৈতিক মতাদর্শ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বলেন যে, ড. ইউনূস ঐকমত্যে পৌঁছাকে যত সহজ মনে করছেন, বিষয়টি তত সহজ হবে না। অতি সহসা আসছে সেই দিন, যখন দৃশ্যপট আমূল পরিবর্তিত হবে।
৯০ দশকের শুরু থেকে রাজনৈতিক ময়দানে টিম ছিল প্রধানত দুটি। একটি বিএনপি, অপরটি আওয়ামী লীগ। ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়েছে। যদিও ভারতের সহায়তায় এবং দেশে একশ্রেণির আমলা ও বুর্জোয়া গোষ্ঠী ছদ্মবেশ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রশাসনে ঘাপটি মেরে আছে। তবুও জনরোষের সামনে তারা আসতে পারবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা এবং নাগরিক কমিটি রাখঢাক না করে বলেছেন যে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। তারা চায় অবিলম্বে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হোক। যদি তা করা না হয়, তাহলে তারা আওয়ামী লীগকে মাঠ-ঘাট সর্বত্র প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করবে।
তাই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে দৃশ্যমানভাবে ময়দানে প্রধান দল বিএনপি এবং দ্বিতীয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলওয়ারী ভোটের হার ২০২৫ সালে প্রযোজ্য হবে না। এর মধ্যে ৩টি নির্বাচনী মশকরা করা হয়েছে। ১৫ বছর ধরে মানুষ ভোট দিতে পারেননি। এ ১৫ বছরে অনেক কিশোর তরুণ হয়েছে এবং এবার তারা ভোটার হয়েছে। নতুন ভোটারদের সংখ্যা আনুমানিক ২ কোটির ওপর। এরা আর যাই করুক, আওয়ামী লীগ বা কারো কণ্ঠে আওয়ামী স্বরের প্রতিধ্বনি শুনলে তারা সেই দলকে ভোট দেবে না। ডিসেম্বরে যদি নির্বাচন হয়, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের এখনো ১০ মাস বাকি। আর যদি আগামী বছরের জুন মাসে নির্বাচন হয়, তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ১৬ মাস বাকি। এর মধ্যে রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এবার একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে, দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা আর যাই করুক, ভারতপন্থীদের ভোট দেবে না। তারা সেক্যুলারিস্টদেরও ভোট দেবে না। তরুণ প্রজন্ম পবিত্র ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ছাত্র তরুণদের যে দল আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে, তারাও আগামী ইলেকশনে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনো স্পষ্ট নয়। সংস্কার পর্ব শেষ হলে নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হবে। তখনই হবে রাজনৈতিক মেরুকরণ। তবে এখন যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, সেখানে একদিকে হবে আদর্শিক মেরুকরণ; অন্যদিকে হবে ক্ষমতার রাজনীতির মেরুকরণ। ততক্ষণ পর্যন্ত জনগণকে অপেক্ষা করতে হবে।
Email: jamshedmehdi15@gmail.com