ঐক্য উপলব্ধি এবং কুরবানি
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:১৩
॥ মাহবুবুল হক ॥
অনেক দিন ধরে অনেকেই ঐক্যের কথা বলছেন। কিন্তু কী জন্য ঐক্য? কী লক্ষ্য হাসিলের জন্য ঐক্য? কী প্রাপ্তির জন্য ঐক্য? সে কথা কেউ খোলাসা করে বলছেন না। তবে ঐক্য চাই, ঐক্য চাইÑ সে আওয়াজ হাইওয়ে থেকে শুরু করে অলি-গলিতেও পৌঁছে গেছে। ঐক্য বা একতার অর্থ আমাদের দেশের জনগণ সঠিকভাবে বুঝতে পারে। ঐক্য থেকে একতা শব্দটা আমাদের সমাজে বেশি প্রচলিত। একটা সময় একাট্টা বলতেও আমরা ঐক্য বুঝতাম।
কিন্তু এখন কী জন্য ঐক্য দরকার, সে কথাটা সবাই ভালোভাবে বুঝতে পারছে না। আন্দোলন করে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। এ বিষয়টা মোটামুটি সবাই উপলব্ধি করে ও বিশ্বাস করে।
নানাজনে নানা কথা বললেও দেশবাসী জানে, নতুন সরকারকে কিছুটা সময় দিতে হবে। স্বৈরাচারী সরকার যেসব লুটপাট করে নিয়ে গেছে। সব ধূলিসাৎ করে গেছে, সে কথা জনগণ ভালোভাবে জানে। সে কারণেই তারা অপেক্ষা করছে, নতুন সরকার একটু গোছগাছ করুক, একটু আবর্জনা পরিষ্কার করুক, পরিস্থিতি একটু শান্ত হোক, কাজকর্ম একটু ভালোভাবে শুরু হোক, তারপর সময়মতো নিশ্চয়ই একটা ভালো নির্বাচন হবেÑ এ কথা তারা জানে। বিশ্বাস করে ও আশা করে।
যারা বয়স্ক, তারা তাদের চেয়ে কম বয়স্ক তাদের বোঝাচ্ছেন, তোমরা তো জানো না, শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে এসে দেশের ক্ষমতায় বসে বলেছিলেন, ‘তিনটা বছর কিছু দিবার পারুম না।’ বলেছিলেন, “পাকিস্তানিরা সব ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। সব লুটপাট করে নিয়ে গেছে। ব্যাংকে টাকা-পয়সা নেই। কোথাও কোনো সম্পদ নেই। সুতরাং এখন আমাদের একটু কষ্ট করতে হবে। কাজকর্ম করে সম্পদ তৈরি করতে হবে। তারপর দেওয়ার প্রশ্ন আসবে। এখন আমাদের সবাইকে কৃচ্ছ্র সাধন করতে হবে। ধৈর্যধারণ করতে হবে। সবর এখতিয়ার করতে হবে।”
কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, মুজিবের শাসনের ৩ বছরের মধ্যেই দেশে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেল। আহ! সে কী দুর্ভিক্ষ! ৫০ পয়সার চালের দাম হয়ে গেল ১০ টাকা এবং এ হারেই সবকিছুর দাম বেড়ে গেল। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। বাজারে নিত্যপণ্য বলতে যা বোঝায়, তার কিছুই থাকলো না। সরকার আমদানি করে বাজারে পণ্যের স্টক বৃদ্ধি করার চেষ্টা করল কিন্তু কোনো কিছুই হলো না। ফলে দেখা গেল বাজারের চাল, ডাল, তরিতরকারি, তেল, নুন, চিনি কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকলো না। বাজার থেকে সবকিছু উধাও হয়ে গেল। দেশময় দুর্ভিক্ষ নেমে এলো। রাজধানী ঢাকার ডাস্টবিনে ডাস্টবিনে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লো। সাথে কুকুর-বিড়ালও। সামান্য কিছু পাওয়া যায় কিনা? বাঁচার জন্য খাবার, জীবনের জন্য খাবার! পরিবার-পরিজনের জন্য খাবার! বাবা-মার জন্য খাবার! বাচ্চাদের জন্য খাবার! আহ! কী নিষ্ঠুর-নির্মম চিত্র! কী অমানবিক চিত্র! পথে পথে তখন জীবন্ত মানুষের মিছিল ছিল না। ছিল লাশের মিছিল। সে সময় আলেম সমাজের কণ্ঠ ছিল না। তারা কোনো কিছু বলার সাহস পেত না। তবে এ সোনার বাংলা ও হককথা পত্রিকায় সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান রিজিকের মালিক ছিলেন না, কিন্তু ওই যে তিনি বলেছিলেন, তিন বছর কিছু দিবার পারুম না, সে কারণেই ওই দুর্ভিক্ষটা আল্লাহ প্রদান করেছিলেন; রিজিকের মালিক তো একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালা। এখানে তিনি শক্ত শিরক করেছিলেন। মহান লালন-পালনকর্তার জায়গায় নিজেকে স্থাপন করেছিলেন। উনি দেওয়ার বা না দেওয়ার কোনো মালিক ছিলেন না।
এবারও এসব প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এবার বাজারে খাদ্যদ্রব্য ছিল। জিনিসপত্র ছিল। কোনো কিছুর সেভাবে অভাব ছিল না। কিন্তু জিনিসের দাম অনেক বেশি ছিল। ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ছিল। কিন্তু দেশবাসী দারুণভাবে ধৈর্যধারণ করেছিল।
ক্রমাগতভাবে ভারত কয়েকটি বন্যা উপহার দেওয়ায় রবিশস্যের অনেক ঘাটতি হয়েছিল। কিন্তু সরকারের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করায় খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য অনেক কিছুর ঘাটতি সহসা কমে গেল। তবে দাম কমবেশি বজায় থাকলো। এখনো গ্রামগঞ্জে এ নিয়ে কথা আছে। তর্ক-বিতর্ক আছে। বিবাদ-বিসংবাদ আছে। কিন্তু সবাই ভালোভাবে বুঝে নিয়েছে জিনিসের দাম কেন বাড়ছে? কারা বাড়াচ্ছে? যারা বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণ কথা বলছে। তাদের শাস্তি দাবি করছে। তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া উচ্চারণ করছে। কিন্তু এ বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে বেঁচে আছে যে, ইনশাআল্লাহ এবার আর আগের মতো দুর্ভিক্ষ হবে না।
জনগণ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করছে। কিন্তু এ কথা বলছে না, দেশ-দশের কথা ফেলে দিয়ে তোমরা সবাই এখন স্কুল, কলেজ, মাদরাসা বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়ো। স্কুলের এবং ছোট ছোট মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রীরা তো তাদের শিক্ষায়তনে ঢুকে পড়েছে। শুধু সবাই মিলে ঢুকে পড়েনি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা কিছুটা বড় হয়েছে এবং তারাই তো এবার আন্দোলন, অভ্যুত্থান বা বিপ্লব ঘটিয়েছে। সুতরাং তাদের কথা তারা কিছুটা তো বোঝে। বোঝে না এমন নয়।
মাঝখানে বিএনপি নেতা ফখরুল সাহেব শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, এবার তোমরা ফিরে যাও। ফিরে যাও তোমাদের নিজস্ব শিক্ষায়তনে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ কর। দেশকে দেখা বা দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য আমরা তো আছি।
শিক্ষার্থীরা দ্বিধা না করে উচ্চারণ করেছিল, আপনি তো অনেক বড় শিক্ষক ছিলেন, তো আপনি আপনার কলেজ ছেড়ে দিয়ে রাজনীতির জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন কেন? আপনিও আপনার কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। আমরাও আমাদের শিক্ষায়তনে ফিরে যাব।
একটা জবাব পাওয়ার পর তিনি আর এ বিষয়ে কথা বাড়াননি। এদেশে এখন আর কোনো কথা মাটিতে পড়ে না। মাটিতে পড়ার আগেই সেই কথাটি মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে উচ্চকিত হয়। সমুজ্জ্বল হয়।
যাহোক ঐক্যের কথা বলছিলাম। কিছুটা অন্যদিকে চলে গেলাম। গেলেও উপর্যুক্ত কথাগুলো যে অপ্রাসঙ্গিক, সেটা বোধ হয় মনে করার কোনো কারণ নেই। সাধারণ মানুষের সাধারণ রাজনীতি এখন খুব দরকার। সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলেছে আগে এখন দেশটা রক্ষা করতে হবে। দেশটা বিক্রি করার জন্য অনেকেই এখন চেষ্টা করছে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কাছে দেশ বিক্রির এজেন্টরা খুব আনাগোনা করছে। দেশটা পুরোপুরিভাবে বিক্রি হয়ে গেলে বিক্রেতাদের জন্য খুব সুবিধা হতো।
তাই দেশবাসী দেশটা বাঁচানোর জন্য, রক্ষার জন্য নিজেদের মতো করে নিজেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেছে। পূর্বতন স্বৈরাচারী সরকার বা তাদের চেলা-চামুণ্ডা ছাড়া বাকিদের নিয়ে দেশ রক্ষার জন্য একটা ঐক্য কিন্তু আড়ালে-আবডালে হয়ে গেছে।
তিতুমীরের বাঁশের লাঠিতে সব তৈরি হয়ে আছে। তিতুমীর একবার হেরে গেছেন বলে বার বার হেরে যাবেনÑ এমন কথা কেউ ভাবছে না।
গত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে তিতুমীরকে বলা হয়েছিল, তিনি ছিলেন জঙ্গি। তিনি দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছিলেন। শুধু তিনি নন, ফকির মজনুসহ হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তাদের বংশধর সবাই তো ফরায়েজী আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনগুলো স্থানীয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে কামিয়াবও হয়েছিল।
এদিকে সংস্কারের বিষয়টা প্রথমে সবাই স্পষ্টভাবে না বুঝলেও এখন কিন্তু সবাই বোঝে এবং বোঝে বলেই সবাই এখন মনে মনে সংস্কার চায়। সচিবালয়ে বার বার নানা ঘটনা ঘটায় জনগণ এখন বুঝে ফেলেছে যে, সরকারের উচ্চপদের অফিসাররা দেশবিরুদ্ধ কাজ করছে।
সরকার যেভাবে বলছে, তারা সেভাবে কাজকর্ম করছে না। তারা সরকারের আদেশ মানছে না। সরকারের কূটনীতি মানছে না। সরকারের রাজনীতি মানছে না। সরকারের সংস্কার মানছে না। সরকারের ভূ-রাজনীতি মানছে না। মানছে না কোনো কিছুই।
আমাদের এক মামা অসুস্থ হয়ে দিনাজপুর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু তার জন্য প্রতিদিন বেশুমার টাকা লাগছে। মামাতো ভাইকে প্রশ্ন করলাম, এত টাকা লাগছে কেন? মামাতো ভাইয়ের সহজ-সরল-সোজা জবাব হলো- ভাইয়া এখন তো সরকার নেই। সে কারণে অনেক টাকা লাগছে। সরকার থাকলে তো এত টাকার প্রশ্ন উঠতো না। জিজ্ঞেস করলাম, কেন দিনাজপুরে অন্তর্বর্তী সরকার নেই? বলল, না। সরকার তো তাদের লোকজনসহ পালিয়ে গেছে। কিছু ছোট-খাটো প্রশ্ন করার পর যেটা জানা গেল, তা হলো, তারা জানে যে আওয়ামী সরকারই এ দেশের একমাত্র সরকার! বিভিন্ন সময়ে যারা সরকারে ছিল, তারা সত্যিকার অর্থে সরকার নয়, তারা বিরোধীদল। আসল দল ক্লান্ত হয়ে গেলে ওইসব নকল দল কিছুদিন সরকারে থাকে। একটা সময় তারাও ক্লান্ত হয়ে চলে যায়। তখন আবার আসল দল অর্থাৎ জেনেটিক দল (আওয়ামী সরকার) চলে আসে।
স্বৈরাচারী সরকার এ ধরনের নানা কথা, নানা সময় বলেছিল। মনে করেছিলাম, এসব ফাও কথা। এখন দেখছি ফাও নয়, একেবারে মূল কথা। ফান্ডামেন্টাল কথা। তবে দেশের অন্য জেলায় এ ধরনের মনোভাব আছে বলে মনে হয় না।
মনে হয় ইলেকশন ত্বরান্বিত করার জন্য শুধু দেশের একটি দল উৎপাত করছে এমন নয়, এর পেছনে সেক্যুলার দেশগুলো উসকানি দিচ্ছে। তাদের ধারণা, সংস্কারগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে দেশবাসীর সেক্যুলার মনোভাব ও চেতনা ভিন্নদিকে প্রবাহিত হবে। তাদের ধারণা, ইসলামফোরিয়ার দিকে বাংলাদেশের জনগণ দ্রুতবেগে এগিয়ে যাবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে অল্প কিছু দেশে গিয়ে অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি যখন হাসি-খুশিভাবে কথা বলেছেন, তখন দূর থেকে আমাদের মনে হয়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান তার সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিষয়টার মধ্যে অত সরলীকরণ নেই। অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান তাকে সহযোগিতা করবেন বলে আশাবাদ উচ্চকিত করলেও বাস্তবে তেমনটি মনে হচ্ছে না। সুইজারল্যান্ড আমাদের কালো টাকা সহজে ফেরত দেবে বলে খুব একটা মনে হচ্ছে না। সবাই হয়তো ভাবছে, ড. ইউনূস তার সারা জীবনের সেক্যুলার ভিশন থেকে ধীরে ধীরে সরে দাঁড়াবেন।
শুধু সেক্যুলার দেশগুলো নয়, তথাকথিত মুসলিম দেশগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। তারাও আবার প্রায় সবাই মুসলিম প্লাস সেক্যুলার থাকতে চায়।
কোনদিকে কী পোলারাইজেশন হচ্ছে, আমাদের সেসব বিষয়ে খুব সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে।
সংস্কার কমিশনের রিপোর্টগুলো পাওয়া গেছে এবং পাওয়া যাচ্ছে। এসব নিয়ে টেবিল ওয়ার্ক হচ্ছে। অল্প-স্বল্প কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু বড় পরিসরে সেমিনার, আলোচনা সভা ইত্যাদি কিছুই হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না। এ থেকে কী প্রমাণিত হয়? এসব কে কখন এক্সিকিউট করবে, তা নিয়েও কিন্তু কোনো আলাপ-আলোচনা নেই। সংস্কার ছাড়া সংবিধান চালু করা, সংস্কার ছাড়া আমলাতন্ত্রের ওপর নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করা, সংস্কার ছাড়া বিচার বিভাগের ওপর পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করা এবং সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বিশ্বাস করা একদম ঠিক হবে বলে মনে হয় না।
সকল নির্বাচনে যাতে দল বা ব্যক্তি অর্থ ব্যয় করতে না পারে, এ বিষয়টি নিশ্চিত করা না হলে ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল ইলেকশন হবে বলে মনে হয় না।
আমাদের দেশে যে নির্বাচন সিস্টেম রয়েছে, তা ব্রিটিশ বেনিয়াদের গড়া। ব্রিটিশরা রিফর্ম করে সিস্টেমটিকে অনেক আধুনিক করেছে এবং সাথে সাথে বাস্তবসম্মত করেছে। সে কারণে তারা অল্প সময়ের মধ্যে সবরকম নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে। আমরা তো দেখছি ওদের সরকার কত দ্রুত চেঞ্জ হতে পারছে।
আমরা পারছি না। ব্রিটিশরা আমাদের ঘাড়ে একটা বদনাম চাপিয়েছিল, তা হলো বাঙালিরা ‘মাছি মারা কেরানি।’ এ বদনামটা সংরক্ষণ করে যদি আমরা নির্বাচন পদ্ধতিটিকে মাঝে মাঝে সংস্কার করতাম, তাহলে মনে হয় খারাপ হতো না।
আমরা কারো ভালোটা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকি, কিন্তু খারাপটা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হই না।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে বর্তমান যে অবস্থা ও ব্যবস্থা চালু আছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে পাবলিক ভোট দিতে পারবে বলে মনে হয় না। পূর্বের মতো মাস্তানরাই ভোট দিতে পারবে আর ভোট দিতে পারবে গডফাদার ও কিশোর গ্যাংরা।
শোনা যায় পূর্বের লুটপাটকারী দল নির্বাচনের জন্য মাত্র এক লাখ কোটি টাকা খরচ করবে। যদি তা করতে পারে, তাহলে তো আবার তারাই নির্বাচনে জয়লাভ করবে। মানি টক্স। টাকা সর্বকালে সবসময় কথা বলে।
নির্বাচন একটা বড় ব্যবসা। এ ব্যবসায়ে বড় বা বৃহৎ পুঁজি বিনিয়োগ করলে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই। এদেশে তো আমরা দেখেই এলাম তথাকথিত ব্যবসায়ীরা বরাবর এমপি হয়েছে আবার এমপিরা ব্যবসায়ী হয়েছে। এসব সিলসিলা বন্ধ না করলে শুধু শুধু নির্বাচন করে কোনো লাভ হবে না। নির্বাচনে অর্থ থামাতে হবে। সব খরচ সরকারকে বহন করতে হবে।
অনেকেই ভাবছেন, ভোটার তালিকা নতুন করে প্রস্তুত না করে আমাদের ন্যাশনাল আইডিটা আপডেট করা যায় কিনা। দুনিয়ার বেশিরভাগ জায়গায় ‘এনআইডি’ ব্যবহার করেই তো অতি দ্রুত নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। পৃথক ব্যবস্থা গ্রহণ করার তো কোনো প্রয়োজন হয় না। এটা অযথা একটা বিরাট খরচ। বিরাট ঝামেলা এবং বিরাট একটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও বিষয়টিকে অমল, বিমল ও স্বচ্ছ করা যাবে না। প্রতারণার বেড়াজাল এখানে থাকছেই। জেনেশুনে এ যুগে মান্ধাতা আমলের সিস্টেমকে আমরা কেন অব্যাহত রাখব?
প্রবাসে আমাদের প্রায় এক কোটি ভোটার। তাদের ভোটটা আমরা কীভাবে কাস্ট করবো?
আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে উজ্জ্বল করতে হলে নির্বাচনের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য লোকদের টেনে তুলতে হবে। সর্বক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অন্তত যারা সংসদ অধিবেশনে অংশগ্রহণ না করে অংশগ্রহণের ভাতা গ্রহণ করেছেন, তাদের মতো দুর্নীতিবাজ মানুষ যাতে আর সংসদে না যেতে পারে, সে ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের হাতে এখনো অনেক কাজ। যেনতেন সংস্কার করে দ্রুততার সাথে একটা নির্বাচন দেখানো তাদের কাজ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্তত দেশবাসী, জনগণ এবং নাগরিকদের চেয়ে। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের প্রকৃত মালিক নয়, প্রকৃত স্টেকহোল্ডার হলো জনগণ দেশে-বিদেশে অবস্থান করে যারা এ হতভাগা দেশটা টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তারা।
অন্তর্বর্তী সরকারকে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো গভীরভাবে ভাবতে হবে। শুধু ঐক্য ঐক্য ফাঁদ পেতে সরকারের পতন বা সরকার থেকে সরে যাওয়ার স্বার্থপরতা দেখানো চলবে না। নিঃস্বার্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে।
এসবকে আমরা বলছি কুরবানি। নির্বাচনের জন্য ঐক্য ঐক্য স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে লাভ হবে না।
এদিকে সরকার বাহাদুরকে বলি, দায়িত্ব যখন গ্রহণ করে নিয়েছেন, তখন দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করুন। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর সাহায্য পাবেন এবং পাবেন দেশবাসীর অন্তস্তলের একান্ত ভালোবাসা।